একজন মুনের কথা
সকালে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রূপে খবর এল আমাদের মুন আর নেই। লিখেছে তানিয়া, আমাদের সোভিয়েত ফেরৎ গ্র্যাজুয়েটদের সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। এরপরে অন্যান্য গ্রূপে আর ফেসবুকে একে একে মুনের অস্ত যাওয়ার খবর আসতে শুরু করল। মনের ভেতর ভীড় করলো সোভিয়েত দিনের স্মৃতি। ঐ সময় আমি আর সোভিয়েত ছাত্র সংগঠনের শিক্ষা ও সাহিত্য সম্পাদক। ওরা বিভিন্ন সমস্যায় সভাপতি সালাম ভাই বা সাধারণ সম্পাদক সুশান্ত দাকে ফোন করত। ফোন মানে আগে থেকে বুকিং দেয়া, সময় মত টেলিগ্রাফ অফিসে হাজির হয়ে অপেক্ষা করা। আমিও বেশ কয়েকবার গেছি সালাম ভাই ব্যস্ত থাকলে।
মুন ১৯৮৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়তে আসা সেই প্রাণোচ্ছল মেয়েটি যার হাসিতে মুক্তো ঝরে পড়ত। নিয়মিত যোগাযোগ হত ফেসবুক আর ফেসবুকের বাইরে। ও লিখত বিভিন্ন বিষয়ে, তবে মহাকাশ ছিল ওর প্রিয় বিষয় যদিও পড়াশোনা কেমিস্ট্রির উপর। পছন্দ করত আশেপাশের প্রকৃতিতে ঘুরে বেড়াতে, রান্না আর ছবি। আমি নিজেও ছবি তুলি। ওর ভিলেজ টাউনের ছবি দেখে কতবার মনে হয়েছে দেশে গেলে ওর ওখানে যাব ছবি তুলতে। আর আচার নিয়ে কথা হত। এই তো সেদিন এক বাবুশকা বললেন
- সিনক, ক্রিঝোভনিকিগুলো নিয়ে যাও। আর বসে থাকতে পারছি না।
আমি বাবুশকাদের কাছ থেকে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনি শুধু তাদের কষ্ট কমাতে। অনেক আগে একটু দরদাম করলে ছোট্ট সেভা রাগ করত। তাই আর দরদাম করি না। সেদিন ক্রিঝোভনিক কিনেই মুনকে লিখলাম
- মুন আচারের রেসিপি দাও।
ও পাঠালো। আর লিখল খেয়ে যেন জানাই। বিভিন্ন ব্যস্ততায় আচার করতে দেরি হয়ে গেল। তারপর চলে গেলাম পিটার, পস্কোভ, পেচোরা, ইজবোর্স্ক, ভেলিকি নভগোরাদ, ভালাআম ঘুরতে। গত বৃহস্পতিবার ভালাআম থেকে ফেরার পথে বিশাল চাঁদটাকে দেখে কেন যেন মুনের কথা মনে পড়ল।
বেড়াতে যাবার কয়েক দিন আগে এক
স্বপ্ন দেখলাম যাকে অবশ্য দুঃস্বপ্ন বলাই শ্রেয়। আমি এক সময় স্বপ্নে প্রায়ই উড়ে বেড়াতাম। এবার অনেক দিন পরে ছাত্রজীবনে ফিরে গেলাম। কী উপলক্ষ্যে যেন সবাই মিলিত হয়েছি। বিশাল এক মাংসের টুকরা। আমার উপর দায়িত্ব পড়ল সেটা কাটার। সবাই ততদিনে জেনে গেছে আমার রান্নার দক্ষতার কথা। স্বপ্নে মাংসের এই স্তুপ দেখেই কেমন যেন এক অস্বস্তি, এক দুঃসংবাদের আশঙ্কা মনের মধ্যে ভীড় করেছিল।
কে জানত মুনের কাছে থেকে দুঃসংবাদ আসবে! গত রাতে দুবনা ফিরে ভেবেছিলাম আচার খেয়ে তোমাকে জানাব। এখন আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখতে হবে।
তুমি আকাশ নিয়ে ভাবতে, আজ আকাশ তোমার ঠিকানা। আকাশ অনেক বিশাল। ফোটনের ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াও অনন্তের পথে।
ও হ্যাঁ, এইমাত্র আচারটা চেখে দেখলাম। জান তো রান্নার ব্যাপারে আমি একমেবাদ্বিতীয়ম। তার উপর তোমার রেসিপি। তোমার ফেসবুক আইডি এখনও এক্টিভ। সময় করে উঁকি দিও।
দুবনা, ৩০ আগস্ট ২০২৬
Comments
Post a Comment