ব্যস্ত দিনের কথা
গতরাতে মস্কো এলাম। বাসায় এসে যখন পৌঁছলাম মাঝ রাত পেরিয়ে গেছে। মনিকা অপেক্ষা করছিল। আমি দুবনা থেকে ওদের জন্য বিভিন্ন ফল, মাশরুম, শসা এসব নিয়ে এসেছি স্থানীয় লোকদের কাছ থেকে কিনে। নিজ বাগানের সার ছাড়া ফলমূল আর বনে কুড়ানো মাশরুম। কিছু ফল কয়েক দিন আগে কেনা, তাই দ্রুত খাওয়ার দরকার বা চিনি মিশিয়ে রাখা দরকার। তাই ওকে তাড়া দিলে মনিকা বলল
- সেভা ঘুরতে গেছে। তুমি খেয়ে নাও। আমরা শুয়ে পড়ব।
ক্যাফে থেকে আনা সালাদ ছিল। আর সেভার করা কাটলেট ও নুডলস্।
আজ মস্কো আসা ক্রিস্তিনার সাথে দেখা করতে। ও রাত দুটোর ট্রেনে রওনা হবে পিতের থেকে। এসে পৌঁছুবে সকাল সোয়া দশটায়। বাসায় আসতে আসতে ১১টা। এরপর রেস্ট। এদিকে অমল অনেক দিন হয় বলছে প্রেমের সাথে দেখা করার জন্য। তাই ভাবলাম ক্রিস্তিনার ফ্রেশ হতে হতে কয়েক ঘণ্টা লাগবে। এই সময়টায় বন্ধুদের সাথে দেখা করে আসি।
সকালে মনিকা বলল প্রিওব্রাঝেনস্কি রিনকে যাবে ফল কিনতে। ওখানে দাম বেশ কম। বললাম
- চল একসাথে যাই। সেভাকে নিয়ে চল। তাহলে নিজেদের টানাটানি করতে হবে না।
এরমধ্যে ক্রিস্তিনা এসে হাজির। ওকে আমার প্ল্যান জানালাম।
- ঠিক আছে। তোমরা যাও। এই সময় আমি পার্লার থেকে চুল কাটিয়ে আসি।
- পার্লারে যাবি কেন। আমি নিজেই তোর চুল কেটে দেব।
- তাহলেই হয়েছে। - মনিকা টিপ্পনী কাটল।
- দেখ তোরা ডিএসসি ডিগ্রিধারী জীবনেও পাবি না।
সকালে ঘুম ভাঙার পর যখন বন্ধুদের মেসেজ গুলো পড়ছিলাম তখন রবীনের কল এল। বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে করতে প্রায় ঘন্টা খানেক কেটে গেল। তারপরেও আমি স্নান করে ব্রেকফাস্ট সেরে রেডি ছিলাম। মনিকাও মোটামুটি প্রস্তুত। ক্রিস্তিনা স্নান সেরে আমাদের সাথে বেরুবে ঠিক করেছে। সমস্যা হল পোশাক নিয়ে। ও এক কাপড়ে চলে এসেছে। এখন এখানে পছন্দ মত কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না যদিও দুই আলমারি ভর্তি ওর জামাকাপড় দিয়ে। মনিকার কাছে জামাকাপড় চাইল। আমি মনে মনে ভাবলাম এই সেরেছে। ওরা যখন ছোট ছিল প্রায়ই একে অন্যের জামাকাপড় পরত। এখন মনিকা আমার কানের কাছাকাছি, আমি উল্টো ক্রিস্তিনার কান পর্যন্ত। যাহোক শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল। ইতিমধ্যে সেভা আমাদের সাথে যাবে না বলে জানাল। পথে মনিকা অবশ্য ক্রিস্তিনাকে রাজি করালো আমাদের সাথে যেতে। ওরা দুজন একসাথে হলেই ছোট বেলার গল্প জুড়ে দেয়। অনেক দিন পর ক্রিস্তিনা বলল
সেভা সেভা সেভা গুস
ইয়া সেভসিয়াকো নি বাইয়ুস
সেভা হাঁস, আমি সেভাকে ভয় পাই না।
পথে মনিকা সূর্যমুখী ফুল দেখল। বলল তিন শ' রুবল করে। দুই শ' করে দিলে নেব। আমি মনে মনে ভাবলাম যাওয়ার পথে কিনে দেব।
- আমি তিনটে সূর্যমুখী কিনব।
আগামীকাল মনিকার জন্মদিন। তাই এক হাজার রুবল ফুলের জন্য খরচ করাই যায়।
- আমি পাঁচটা সূর্যমুখী নেব। - ক্রিস্তিনা বলল।
আমি ভাবলাম, না ভাই আমি সূর্যমুখী ছাড়াই ভালো আছি।
রিনকে গিয়ে বিভিন্ন ধরণের ফল কিনলাম। রিনকে দোকানদাররা সবসময় বলে টেস্ট করতে। এটা আমি জীবনেও করি না। মনিকাও না। ক্রিস্তিনা দিব্যি একটার পর একটা ফল টেস্ট করল। ওকে দেখে মনে হল আমার নিজেরই পেটে সমস্যা হবে। অবশ্য গুলিয়াও টেস্ট করে। ক্রিস্তিনার কাছ থেকে গ্রীন সিগন্যাল পেলে আমরা এসব নেই। এর বাইরে আমি কিনলাম শালগমের পাতা। শাক খাব। এরা সাধারণত পাতা ফেলে দেয়।
আমি দুবনায় বাবুশকাদের বলি পাতা আনতে। আমি কিনি। এসব করতে করতে প্রায় দুটো বেজে গেল। তাড়াতাড়ি মেট্রোয় এলাম। মনিকারা বাড়ি যাবে। আমি প্রেম আর অমলের সাথে দেখা করতে।
অনেক দিন পর তিন জনের দেখা। প্রেম অফিসে কিছুক্ষণ বসে গেলাম লেনিনস্কি প্রসপেক্ট। একটা স্তালোভায়ায় খাব। খাওয়া আর বিভিন্ন বিষয়ে গল্প করা। এরমধ্যে ক্রিস্তিনার মেসেজ এল। পাঁচ হাজার রুবল পাঠাও। আমি যা ভেবেছিলাম তারচেয়ে অনেক বেশি লাগছে চুল কাটাতে।
টাকা পাঠিয়ে ভাবলাম ভালোই হল। বেশ কিছু ছবি তোলা যাবে। আমার বাসায় ফেরার কথা ছিল চারটের দিকে। ওদের নিয়ে কোথাও ঘুরব, খাওয়া দাওয়া করব, ছবি তুলব। আটটার দিকে ওরা মস্কোর বাইরে এক গ্রামের বাড়িতে যাবে জন্মদিন পালন করতে। আমি ফিরব দুবনা। সেভা যাবে না। ও চাইছিল ওর বন্ধু স্তপা আর কাকে যেন সাথে নিতে। স্তপা আমাদের পরিচিত, প্রায়ই আমাদের বাসায় থাকে। তবে অপরিচিত আরেকজনকে নিতে মনিকা আপত্তি করায় সেভা যাবে না বলেছে।
প্রেম আর অমলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যখন বাসায় ফিরছি তখন পাঁচটা বাজে। এমন সময় মনিকার ফোন।
- তুমি কোথায়?
- মেট্রোর পাশে।
- তুমি উছাচেভস্কি রিনকের ওখানে চলে আস। ওখান থেকেই কোথাও চলে যাব।
- ঠিক আছে।
তাই হাঁটা দিলাম দীপুর হোস্টেলের দিকে। এরমধ্যে সেভার ফোন
- পাপা তুমি কোথায়?
- উছাচেভস্কি রিনকের দিকে যাচ্ছি। মনিকা ক্রিস্তিনা ওখানে। তারপর কোথাও খেতে যাব। তুই চলে আয়।
- ঠিক আছে। আসছি।
রিনকের ওখানে গিয়ে দেখলাম মনিকারা একটা পারফিউমের দোকানে। ঢুকেই আমার হাঁচি শুরু হয়ে গেল। এলার্জি। তাই বাইরে এসে সেভার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। শেষ পর্যন্ত সেভাকে ফোন করলে জানাল আমরা যেন বার্গার কিং চলে যাই। ও আসছে। সেভা বার্গার কিং ছাড়া অন্য কিছু পছন্দ করে না। কি আর করা। আমরা হাঁটতে শুরু করলাম পার্ক কুলতুরির দিকে। পথে হাজারো গল্প। আমি প্রথমে একটু বিরক্ত হয়েছিলাম এত দূর আসার জন্য। পরে যখন দেখলাম এটা আমার অতি প্রিয়, অতি পরিচিত প্রগতি প্রকাশনার শো রুম, অনেকটাই নস্টালজিক হয়ে পড়লাম।
বসে সেভার অপেক্ষা করছি। শেষ পর্যন্ত মনিকা আর ক্রিস্তিনা গেল খাবার অর্ডার দিতে। খাবার চয়েস করছি তখন সেভার ফোন
- পাপা তোমরা খাবার অর্ডার দিয়েছ?
- দিচ্ছি। তুই কী খাবি বল।
- দরকার নেই। আমি অনলাইনে সবার জন্য অর্ডার দিয়েছি। এক্ষুনি আসছি।
সুতরাং আমরা আর অর্ডার দিলাম না। কিছুক্ষণ পরে সেভা এল। ও ক্রিস্তিনাকে নিয়ে গেল খাবার আনতে। যা ভেবেছিলাম তাই। চারটে ডাবল বার্গার, পটেটো ফ্রাই, নাগেটস। মুস্কিল। আমি কিছুক্ষণ আগে খেয়ে এসেছি।
- ঠিক আছে তাহলে কফি আর আইসক্রিম অর্ডার দে। এসব যতটুকু পারিস খেয়ে বাকিটা বাড়ি নিয়ে যা।
এরমধ্যে সেভার বন্ধু স্তপা এল। ওকে আমাদের সাথে জয়েন করতে বললাম। মনিকা তাড়া দিচ্ছিল। ওদের যেতে হবে। ওখান থেকে বেরিয়ে স্তপাকে বললাম আমাদের চারজনের ছবি নিতে। সেভা আর স্তপা চলে গেল নিজেদের কাজে। আমরা অন্য পথে। মাঝে মনিকা গেল উপহার কিনতে। মিশা আসবে ওকে নিতে। আমি আর ক্রিস্তিনা গল্প করতে করতে আর ছবি তুলতে তুলতে গেলাম বাসার দিকে। ও আমাকে ১৫ আগস্টের পর পিতের আসতে বলল। বাসার কাছে এসে দেখি মনিকা আর মিশা এসে হাজির। হঠাৎ করেই মনিকা আবিস্কার করল যে দোকানে ব্যাগ ফেলে এসেছে কার্ড সহ। অগত্যা বেচারা মিশাকেই দৌড়াতে হল ব্যাগের জন্য। ছেলেদের এই এক সমস্যা। মেয়েরা ভুল করে আর ছেলেরা সেই ভুলের মাশুল দেয়।
সাড়ে আটটার দিকে মনিকা, ক্রিস্তিনা, মিশা আর মিশার বন্ধু তার বান্ধবী সহ গ্রামের দিকে চলে গেল। সেভা স্তপার সাথে বাসায় রয়ে গেল। আমি রওনা দিলাম দুবনার পথে। ১৯৯৪ থেকে ২০২৬। অনেক জল গড়িয়ে গেছে ভোলগা দিয়ে।
আজ মনিকা আমার সাদা চুল আর খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি দেখে বলল যে আমাকে নাকি বেশ মানায়। আর পোশাক নিয়ে যখন বললাম
- মামা কোন কিছু পরে যখন জিজ্ঞেস করে কেমন লাগছে আমি বুঝি না জিজ্ঞেস করার কি আছে। কারণ পরা দরকার তাই যা নিজের পছন্দ। আর তোদের আমার সব পোশাকেই ভালো লাগে।
মনিকা বলল, না। মামা শুধু শুনতে চায় তোমার ভালো লাগছে কিনা। তুমি একটু ভালো বললেই মামা খুশি হবে। মেয়েদের একটু প্রশংসা করতে হয়।
- তাহলে যে প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় মামা একটা গাছ, একটা কুকুর দেখিয়ে আমার মতামত জিজ্ঞেস করে তখন কি করব?
- ভালো লাগছে বলবে।
- মিথ্যা বলব?
- এক আধটু মিথ্যা বললে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। তোমার তো স্বর্গে যাবার ভয় নেই।
মেয়েরা বড় হয়ে গেছে।
দুবনার পথে, ০৬ আগস্ট ২০২৬
Comments
Post a Comment