সাফল্য

প্রতিটি মানুষেরই কোন কোন ক্ষেত্রে সবলতা থাকে, অন্য ক্ষেত্রে থাকে দুর্বলতা। সে তার সবল দিকটা সানন্দে প্রকাশ করে আর দুর্বলতা ঢেকে রাখে। তবে যেখানে সে দুর্বল সেখানে সামান্য সাফল্যও তাকে অনেক আনন্দ দেয়। আমি যেমন বাংলা, ইংরেজি ও রুশ এই তিন ভাষায় কথা বলতে পারি, কিন্তু পৃথিবীর আর সব ভাষায় চুপ করে থাকতে পারি। যদি কোন ভাবে অন্য ভাষায় দুই একটা লাইন বুঝতে বা বলতে পারি, কি খুশি যে লাগে! তবে আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা রান্নায়। ওটা আমি নিয়মিত করি আর প্রতিবার একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে যেকোন লোক আমার চেয়ে ভালো রান্না করে। না, এতে আমার কষ্ট হয় না, বরং রান্না যে অকপটে আমাকে ভুল স্বীকার করার সুযোগ দিচ্ছে সেজন্য বরং ভালোই লাগে। কারণ কোন এক বিষয়ে ভুল স্বীকার করতে শিখলে মানুষ অন্য বিষয়েও সেটা করতে পারে। ভুল স্বীকার করাটা আজকাল খুব বিরল বিষয়। যাহোক, যেহেতু রান্নাটা আমার আসে না তাই এখানে ছোটখাটো সাফল্য বেশ উপভোগ করি।

কয়েকদিন আগে ইলেকট্রনিক্সের দোকানে গেলাম গুলিয়ার জন্য ফোন কিনব বলে। আগের ফোনের মেমোরি শেষ। সারাদিন কুকুরদের আর গাছপালার ছবি ভিডিও করলে মেমোরি শেষ হবে, ফোন স্লো হবে এটা তো স্বাভাবিক। বলি অপ্রয়োজনীয় ফাইল ডিলিট করতে বা অন্য কোথাও সেভ করে রাখতে। তা করবে না। যাহোক ফোন কেনা হল। এবার সেখানে বিভিন্ন প্রোগ্রাম ইনস্টল করতে হবে। এখানে যেহেতু বিভিন্ন সাইটের উপর নিষেধাজ্ঞা তাই সহজে কোন এপ ডাউনলোড হয় না। সেজন্য অবশ্যই আমি দায়ী। কখনো যদি পুতিন, ট্রাম্প, সি বা মোদীর সাথে দেখা হত, জিজ্ঞেস করতাম যে আমি কি এদের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছি যে তাদের ভুলের জন্য বউয়ের কাছে জবাবদিহি করতে হয়? এ থেকে অবশ্য একটা বিষয় পরিষ্কার হয়েছে - ভগবান কেন এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর বউ থাকলে কোটি কোটি মানুষের ব্যর্থতার জবাবদিহি করতে করতেই জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠত। যাহোক ফোন কিনে বাসায় ফেরার পথে বাজারে গেলাম মাছ কিনতে। ওকুন আর নেরপা নিয়ে দেখি স্যামনের পেটের দিকের ছোট ছোট টুকরা বিক্রি করছে। স্যামনের দাম ৩০০০+ কেজি, ওগুলো মাত্র ১১০০। ভাবলাম একটু নিয়ে দেখি কেমন লাগে। 

গুলিয়া জিজ্ঞেস করল মাছ রাঁধব কিনা। সকালে মুরগি বের করে রেখেছিলাম তাই মাছ ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিলাম। 

রোববার মস্কো যাব। ইদানিং কালে বাসমতি চাল, মসুর ডাল আর বুলগুর দিয়ে সব্জি বিরিয়ানি করি। গুলিয়ার খুব পছন্দ। ভাবলাম একটু বেশি করে করে সেভা মনিকার জন্য নিয়ে যাই। হঠাৎ মাথায় কুবুদ্ধি ঢুকল। আসলে আমার মাথায় কুবুদ্ধি ঢুকতে হয় না, ওটাই ওদের স্থায়ী ঠিকানা। স্যামন মাছ আলাদা করে রান্না না করে বিরিয়ানির ভেতর চালান করে দিলাম। তবে মাছটা ছিল বাজে, মানে অবাধ্য। ফলে বিরিয়ানির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। আমি এর মধ্যে এক কন্টেইনার বিরিয়ানি ব্যাগে ভরে ফেলেছি মনিকাদের জন্য।

খেতে বসে গুলিয়া জিজ্ঞেস করল মাছ কোথায়? বললাম বিরিয়ানির ভেতরে। আমি নতুন ডিস আবিষ্কার করেছি - মাছ বিরিয়ানি। মাছ না থাকায় নাকি সব এক সাথে রান্না করায় কে জানে গুলিয়া বলল খাবারটা যারপরনাই বাজে হয়েছে। আমি যেন সবটাই বাচ্চাদের জন্য নিয়ে যাই। আমি তাই আরও এক কন্টেইনার বিরিয়ানি ব্যাগে ভরে মস্কো রওনা দিলাম। ভয় ছিল ওদের পছন্দ না হলে আমাকে সবটা খেতে হবে।

বাসায় এসে বললাম বিরিয়ানির কথা। সেভা সাথে সাথে এক প্লেট নিয়ে বলল - আফিগেন্না মানে প্রচন্ড ভাল।

মনিকা আর মিশা এক গেস্ট নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আমি একটা কন্টেইনারের বাকিটা শেষ করে ঘুমিয়ে পড়লাম। 

সকালে ভার্সিটি যাবার পথে ওদের বললাম বিরিয়ানি ফ্রিজে। সেভা জানালো ও ইতিমধ্যে নিজের জন্য বেড়ে নিয়েছে।

সারাদিন কাজ শেষে সন্ধ্যায় যখন বাসায় ফিরি ভাবলাম মন্দ হত না যদি কিছুটা বিরিয়ানি অবশিষ্ট থাকে। সে আশার গুড়ে বালি। দেখলাম দুটো টিফিন বক্স ফাঁকা। ধোয়া। সেভা জানালো মনিকা মিশা খেয়েছে। বাকিটা ও নিয়েছে। মুরগি সেদ্ধ ছিল। আমার এসব পোষায় না। ডিম সেদ্ধ আর সসেজ সেদ্ধ করে স্যান্ডউইচ বানিয়ে খেয়ে নিলাম। এখানেও ঝামেলা। সসেজ অর্ধেক সেদ্ধ হবার পর দেখি আমি ওকে প্যাকেট সহ গরম জলে ফেলে দিয়েছি। সেভা আমাকে উদ্ধার করল।‌ আর বাসা থেকে বেরুনোর সময় বলল বিরিয়ানি প্রচন্ড টেস্টি হয়েছিল।

হ্যাঁ, মাঝেমধ্যে আমিও সুস্বাদু খাবার রান্না করতে পারি। এটা আমার কৃতিত্ব নাকি কোয়ান্টাম থিওরির প্রবাবিলিটির কারণে হয়ে যায় সেটা অবশ্য গবেষণার বিষয়।

দুবনার পথে, ২০ এপ্রিল ২০২৬

Comments

Popular Posts