রাগ লক্ষ্মী
আজ ছিল পিটারের দ্বিতীয় দিন। তবে সারা দিন পিটারের বাইরে। সকাল ৬.০০ প্লোসাদ ভস্তানিয়া (অভ্যুত্থান চত্বর) বাস অপেক্ষা করবে। এত সকালে মেট্রো কাজ করে না তাই ট্যাক্সি ডাকা। ড্রাইভার মধ্য এশিয়ার। কথা বলতে বেশ পছন্দ করে। সকালের ফাঁকা রাস্তা। তারপরেও আধ ঘন্টা লাগল। বড় শহরের এই সমস্যা। হাঁটুর কাছ থেকে বুকে আসতেই দম বেরিয়ে যায়। ট্যাক্সি থেকে নেমে আমাদের বাসের খোঁজে যাচ্ছি। হঠাৎ খেয়াল হল রুকস্যাক ফেলে এসেছি। ট্যাক্সি বুকিং দিয়েছিল ক্রিস্তিনা। বললাম ফোন করতে।
- কোথায় ফোন করব? আমার আছে তো নম্বর নেই।
এক কথায় মা মেয়ে বুঝিয়ে দিল দোষটা আমার। কিন্তু ব্যাগ হারালে আমার দোষ কেন? কেন ব্যাগ দায়ী নয়। তবে সবচেয়ে বড় কথা ক্যামেরার ব্যাগ আমার সাথে। ওখানে ইবুক, পাওয়ার ব্যাংক আর কিছু খাবার। তাই ফাটাল কিছু নয়। কি মনে করে যেখানে ট্যাক্সি থেকে নেমেছি সেখানে গেলাম, যদি এখনও দাঁড়িয়ে থাকে! ঐ রকম এক ট্যাক্সি দেখে আশ্বস্ত হলাম, যদিও এটাই যে আমাদের গাড়ি সে ব্যাপারে নিশ্চিত নই। আমাকে দেখে ড্রাইভার দরজা খুলে বলল,
- আমি গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ ব্যাগটা দেখে ফিরে এলাম। চেষ্টা করছিলাম ফোন করতে।
অনেক ধন্যবাদ দিয়ে ব্যাগ নিয়ে চলে এলাম। এমন কাজ আমার নতুন নয়। আগে প্রায়ই মস্কো বা দুবনাগামী কোন প্রাইভেট কারের চালকের সাথে দুবনা মস্কো করেছি। একবার ইবুক রেখে চলে গেছি। বিভিন্ন ব্যস্ততায় মনেই ছিল না। কয়েক দিন পরে সেই লোক ফোন করে বলল
- আপনার ইবুক আমার গাড়িতে ফেলে গেছেন। কবে, কোথায় পৌঁছে দিতে পারি?
আসলে বেশিরভাগ মানুষ এরকম না হলে আমার টেকাই কষ্ট হত।
বাসে উঠে নতুন ঝামেলা। এক্সকার্শনে বেশ কিছু আইটেম নিজেদের আলাদা করে কিনতে হবে। সেজন্য ভদ্রমহিলা টাকা তুলছেন। এমনকি খাবারের জন্যেও। তারা কি এক আইটেম ঠিক করেছে। সেটা খেতে হবে। দাম ৮০০ রুবল করে। আমার তো মেজাজ খারাপ। সাধারণত বলে দেয় এই এই ক্যাফে বা রেস্টুরেন্ট আছে। আমরা যেন নিজেরাই ঠিক করে নেই।
- আচ্ছা, এই ভ্রমণে আপনাদের দায়িত্বটা কি? তাছাড়া আমার গাইডের কথা শোনার কোন ইচ্ছা নেই। এসেছি ছবি তুলতে। আমি কি করব?
এদেশে খুব কম মানুষই প্রতিবাদ করে। তাই ভদ্রমহিলা খুশি হয়নি।
- আপনি আপনার মত করে ঘুরতে পারেন।
ক্রিস্তিনা আর গুলিয়া আমার উপর না খোশ।
- তোমরা যেতে চাও যাও। আমি আমার মত করে দেখব।
- ঠিক আছে আমি যাব না। ওরা যাবে। কত লাগবে?
- এগারো শ' রুবল।
আমার কাছে নগদ টাকা নেই। ট্র্যান্সফার করতে পারি।
- না, আমার নগদ টাকা দরকার। তাছাড়া আপনি বিদেশি। আপনার বিদেশি ফ্যামিলি নেইম। পরে আমার ঝামেলা হবে।
- প্রথমত আমার রুশ পাসপোর্ট। আমি এদেশে ট্যাক্স পে করি।
- না, নগদ ছাড়া আমি নেব না।
কি আর করা। যদিও গায়ের রং আমার সাথে বিট্রে করেছে। কিন্তু গুলিয়া আর ক্রিস্তিনার ফ্যামিলি নেইমও সাহা। একবার রেগে বলতে চাইছিলাম যে তোমাদের দেশের সবচেয়ে বড় প্রদেশের নাম সাহা, আর তুমি বলছ আমার বিদেশি ফ্যামিলি নেইম। যাহোক ব্যাপারটা অমীমাংসিত রয়ে গেল।
পস্কোভ এলে ভদ্রমহিলা বললেন, স্যরি। বললেন কোথায় খাওয়া যাবে ইত্যাদি। পরে ক্রিস্টিনা কোত্থেকে যেন টাকা উঠিয়ে এনেছিল। ওটা দরকার ছিল পেচোরায়। ওরা এক ফাদারের বকবকানি শুনে সময় কাবার করল। আমি মনাস্তেরি চষে বেড়ালাম। ক্রিস্তিনার মন খারাপ কিছু দেখা হল না বলে। আর আমি এমনকি যে সব জায়গায় মেরামতের কাজ চলছিল সেখানে ঢুকেও ছবি তুলে এলাম। শ্রমিকরা মধ্য এশিয়ার লোকজন, ওদের চোখে আমি রাজ কাপুর।
পস্কোভ-পিচোরা-ইজরোর্স্ক, ২৫ আগস্ট ২০২৬
Comments
Post a Comment