মস্কোর দূর্গা পূজা
আজ (৩০.০৯.২০২৫) দূর্গা পূজা দেখতে গেলাম। মস্কোয় পূজার শুরু সেই ১৯৯০ থেকে। আমাদের ছাত্রজীবনে। সে সময় মস্কোয় পূজা ছিল অভিনব ঘটনা। যদিও পেরেস্ত্রোইকা আর গ্লাসনস্ত ততদিনে জেঁকে বসেছে তারপরেও এদেশে পূজা একেবারেই অপ্রত্যাশিত। এরপর থেকে প্রতি বছরই পূজা হয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে। তবে পূজা এখন পুরানো বন্ধুদের মিটিং পয়েন্ট। কোভিডের আগে একটানা বহুদিন যখন প্যাট্রাস লুমুম্বার ইন্টারক্লাবে পূজা হত তখন তো শুধু ভারত ও বাংলাদেশের বাঙালিরাই নয় আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার সহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মানুষ এখানে আসত। ফলে এটা যতটা না পূজা তারচেয়ে বেশি মিলনমেলা। আমার জন্য পূজা মানে কিছু মানুষের সাথে দেখা করা আর কিছু মানুষকে দর্শন দেয়া। দুগ্গা মা যদি একগাদা ছেলেমেয়ে নিয়ে পায়ে হেঁটে এখানে আসতে পারেন আমিই বা ট্রেনে চেপে একদিনের জন্য যেতে পারব না কেন?
একসময় বাংলাদেশের বিভিন্ন সংগঠন এখানে ছিল। বছরে কয়েকবার দেখা সাক্ষাতের সুযোগ ছিল। কোভিডের পর থেকে ওদের সংখ্যা ও কাজকর্ম সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। আর সরকার পরিবর্তনের পর দূতাবাসের পাবলিক ফাংশন প্রায় নাই হয়ে গেছে। তাই আজকাল পূজায় যাওয়ার তাগিদ আরও বেশি অনুভব করি।
শুনেছি বাইরে পূজা হয় উইকএন্ডে। মস্কোয় একেবারে কোলকাতার তিথি ধরে। তাই হয় বেশ কয়েকদিন ধরে। ফলে আজ না পারলেও কাল যাওয়া যায়। তবে এবার সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। ষষ্ঠী আর সপ্তমী সিলেবাস থেকে উধাও হয়ে গেছে। এতে অবশ্য একটা সুবিধা আমার হয়েছে। সপ্তমী না থাকায় হেলালের বাসায় আড্ডা দেয়া হয়েছে। নাহলে সময় বের করা হত না।
পূজায় গিয়ে শুনলাম এর কারণ কোলকাতা থেকে নতুন প্রতিমার পৌঁছুতে দেরি হওয়ায় সিলেবাসে এই পরিবর্তন।
আমার ইচ্ছে ছিল বিকেল চারটের দিকে ওদিকে যাব। ঘন্টা তিনেক সবার সাথে গল্পগুজব করে বাসা হয়ে দুবনার পথে পা বাড়াব। কিন্তু সকালে ফোন করল অভিষেক
স্যার কখন আসছেন?
তিনটে চারটের দিকে। তুমি কখন যাবে?
আমি অলরেডি রাস্তায়।
এরপর প্রণবের ফোন
দাদা কখন আসছেন?
কেন? তিনটে বা চারটের দিকে।
পূজা শুরু হয়ে গেছে। অনেকেই আছে। চলে আসেন।
ঠিক আছে। আমি এখনও শুয়ে আছি। স্নান খাওয়া-দাওয়া করে আসছি।
এই এলাকায় আমি আগে যাইনি। প্রণব অবশ্য বলে দিয়েছিল। আমি ইয়াসেনেভা মেট্রো থেকে বাসে না গিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। সিদ্ধান্ত খুব একটা ভালো ছিল না। পথ যদিও মাত্র দশ এগারো মিনিটের তবে ঢাল বেয়ে উপরে উঠতে হয়েছে সারাটা রাস্তা যদিও ফেরার সময় আমি আর বিশ্বরূপ দা বেশ আরামে নেমেছি।
এটা আসলে একটি সিনেমা হল। এখন সিনেমা দেখায় না। বিভিন্ন রকমের কালচারাল প্রোগ্রাম হয়। ঢুকতেই এক ভদ্রমহিলা বলে দিলেন কিভাবে যেতে হবে। চেহারা দেখেই টের পেয়েছে যে আমি পূজা মণ্ডপে যাচ্ছি।
শঙ্খ বাজছিল। সবাই পূজায় ব্যস্ত। আমি পেছনে দাঁড়িয়ে ছবি নিলাম। ভিডিও করলাম। পরিচিত কে কে আছে সেটা বোঝার চেষ্টা করলাম। দুটো কাজ করতে হবে।
রাশিয়ায় ক্যান্সারের ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়েছে শোনার পর থেকে দেশ ও ইন্ডিয়া থেকে অনেকেই লিখেছে তাদের অসুস্থ আত্মীয় স্বজনের জন্য এসব জোগার করতে। যদিও বলি এসব এখনও মার্কেটে নেই, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে আছে আর মার্কেটে এলেও হয়তো দোকানে পাওয়া যাবে না, হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মধ্য দিয়ে জনগণকে টিকা দেবে - কে শোনে কার কথা। তাই ঠিক করলাম পাপ্পুকে জিজ্ঞেস করব। ও ক্যান্সার হাসপাতালে কাজ করছে। অন্তত আমার চেয়ে বেশি জানে ও সঠিক ভাবে এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। যাহোক পাপ্পুর সাথে কথা হল। ও আমাকে এ ব্যাপারে কিছু ধারণা দিল আর ওদের কেস হিস্ট্রি পাঠাতে বলল। সুতরাং পূজার আরও একটা প্লাস পয়েন্ট পাওয়া গেল। আর ছিল বিশ্বরূপ দার সাথে আড্ডা। ও ডিসেম্বরে দেশে যাবে। কিছু জিনিস আনাতে হবে। বলল
কল্যাণ দাকে বলে দিস কিনে রাখতে। আমি নিয়ে আসব।
দুই নম্বর প্লাস পয়েন্ট পাওয়া গেল।
এরপর খাওয়া। ঝাল মিষ্টি হরেক রকম। বিভিন্ন জন বাড়ি থেকে রান্না করে নিয়ে আসে। এতে সুবিধা হল কার রান্না ভালো সেটা বিচার করার চেষ্টা করতে পার।
অসুবিধা হল খেয়ে হাঁসফাঁস করতে হয়। কম করে খাওয়া যায়। তবে আমি যেহেতু এরকম রান্না একেবারেই করতে পারি না তাই এক চামচ আধা চামচ করে হলেও খাই। কিন্তু মহাবিশ্বের সাথে পাল্লা দিয়ে আমার পেট এখনও সব ধারণ করার মত স্ফীত হয়ে উঠনি। একজন পান খাওয়া প্রস্তাব দিল কিন্তু পান করার প্রস্তাব কেউই দিল না। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নির্দেশে কিনা সেটা অবশ্য জানা যায়নি।
বেশ কয়েক জন নতুন লোকের সাথে আলাপ হল। এদের একজন একজন সৌগত। বিশ্বভারতী থেকে রসায়নে পড়াশুনা প্লাস পিএইচডি। পরে ইয়েকাতেরিনবার্গে পোস্টডক করতে এসে থেকে যাওয়া। এখানে রসায়নের শিক্ষক। মস্কো এসেছিলেন এটমিক এনার্জির কনফারেন্সে। ওটা রথ দেখা হলে পূজা হল কলা বেচা। আরেকজন অভিজিৎ। ও-ও বিশ্বভারতী থেকে। ফিজিক্সে। এখন ফিজটেখে পোস্টডক। আর আলাপ হল অর্পিতা নামের একাধিক মেয়ের সাথে। নাম যদি আইগেন ভ্যালু হয় তাহলে ওরা ডিজেনারেট স্টেটের আইগেন ফাংশন। আড্ডা, খাওয়া, বিশেষ করে বিশ্বরূপ দা সাথে পুরানো স্মৃতির পিন্ডি চটকানো। আমরা বিশেষ করে পাভলোভস্কায়ায় একসাথে অনেক সময় কাটাতাম। টেবিল টেনিস খেলে, গান গেয়ে। ও, পার্থ, রানা, সঞ্জয় মিনসে। খারকভ থেকে চঞ্চল এলে আমাদের এখানেই উঠত। আশীষ দা আর কাঞ্জি দা রুমমেট ছিল কিনা এ নিয়ে তর্ক হল। ওরা দুজনই মারা গেছে। যদি এখানে না হয় ওখানে হতে পারবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করে ঐ বিতর্ক শেষ করলাম।
আমাদের এসব কথা অনেকেই এনজয় করছিল। তাই বললাম ও বিশ্বরূপ মানে বিশ্ব বা ইউনিভার্স, আমি বিজন মানে জনহীন। আমাদের মেলালে বড়জোর ভ্যাকুয়াম সলুশন পেতে পার।
আমি এসেছিলাম দুপুর দুটোয়, দেখতে দেখতে প্রায় চার ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। বেশ কিছু মেয়ে মা দুর্গাকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে বিশ্বরূপের সাথে ছবি তুলবে বলল। তুলে দিলাম আর বললাম
বিশ্বরূপ দা এরপর থেকে তোমাকে নিয়ে যাব সাথে করে আর টাকা নেব ছবি তুলতে।
তুই আমাকে বানর হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছিস?
না, ইনিশিয়াল ক্যাপিটাল।
এবার ফেরার পালা। দু'জনেই মস্কোর বাইরে থাকি। ও দক্ষিণে আমি উত্তরে। কালুঝস্কায়ায় ও নেমে গেল আর আমি চললাম স্পোরটিভনায়ায়। পূজার ওখানে আর রাস্তায় কথা হল রাজনীতি, ইউক্রেন যুদ্ধ, অর্থনীতি সহ বিভিন্ন বিষয়ে। আজকাল পুরানো পরিচিতদের সাথে দেখা হলে মূলতঃ কথা হয় ছেলেমেয়ে আর অসুখ বিসুখ নিয়ে। এক্ষেত্রে বিশ্বরূপের সাথে আমার আড্ডা সব সময়ই ব্যতিক্রম।
সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা!!
দুবনার পথে, ০১ অক্টোবর ২০২৫

Comments
Post a Comment