মস্কোর আড্ডা

দিন দশেক আগে অফিস থেকে ফেরার পথে একটা ফোন এল অপরিচিত নম্বর থেকে। আজকাল এরকম কল খুব একটা রিসিভ করি না। তবে ফোনটা তুললাম -
হ্যালো।
বিজন দা কেমন আছেন?
আমি তো ভালো থাকি কিন্তু আপনাকে চিনতে পারলাম না।
আমি হেলাল।‌ প্যাট্রিসের।
ও তাই বল। তুমি মস্কোয় নাকি?
হ্যাঁ। বছরের একবার করে আসি মাস খানেকের জন্য। আপনি কি এদিকে আসেন? মানে মিকলুখো মাকলায়া?
আপনি সোমবার করে ক্লাস নেই দনস্কায়ায়। দেড়টা থেকে ঘন্টা খানেক ফ্রি থাকি। চলে আস। গল্প করা যাবে।
আমি কথাটা বললাম ঠিক, তবে এ সময় আমার মাস্টার্স ও পিএইচডি স্টুডেন্টরা কনসালটেশনে আসে। তাই সময় কতটুকু বের করতে পারব সেটাই প্রশ্ন।
আপনি কি সোমবারই চলে যান?
হ্যাঁ। আমি রোববার বিকেলে আসি। সোমবার রাতে দুবনা চলে যাই।
তাহলে এক কাজ করেন। আপনি রোববার আমার বাসায় চলে আসেন চেরতানভস্কায়ায়। আপনার লেখা পড়ি। একটু গল্প গুজব করা যাবে।
তোমার সাথে সানুর যোগাযোগ আছে? 
এবার দেখা হয়নি।
আমি যদি সময় বের করতে পারি জানাব।
রোববার আমি আর সময় বের করতে পারিনি। এই রোববার অন্যান্য ব্যস্ততা। দিল্লি থেকে মনোরঞ্জন দা এসেছেন। উনি টেক্সটাইলে পড়াশুনা করে দেশে সার্ভিস করেছেন। এখন দিল্লিতে অবসর জীবন যাপন করছেন। তাছাড়া সানু ফোন করে বলেছে হেলালের কথা। আমি কবে পারব। তাহলে একসাথে যাওয়া যায়। আবার আমার এক কলিগ এসেছে আর্জেন্টিনা থেকে। গত সোমবার আমাদের সেমিনারে নিজের কাজের উপর আলোচনা করেছে। এই সোমবার আমার আলোচনা - মূলতঃ ওর জন্য যাতে কোল্যাবরেশন করতে সুবিধা হয়।এ জন্য ও মস্কো রয়ে গেছে। ও ফোন করে জানিয়েছে সন্ধ্যায় ওকে আর লেরাকে সময় দিতে। তাই সানুকে বললাম সোমবার সাড়ে সাত আটটার দিকে যাওয়া যায়।
মনোরঞ্জন দা কে বললাম চারটায় মস্কো আসব। আপনি চাইলে পাঁচটার সময় দেখা করতে পারি ঘন্টা খানেকের জন্য। উনি আমাকে বিরক্ত করতে চাইলেন না। আমি ওসভালডো আর লেরার সাথে ফ্রুঞ্জেনস্কায়ার ব্রুসনিকি ক্যাফেতে বসে আড্ডা দিলাম। আর সোমবার আমার আলোচনা শেষে যারা এসেছিলেন তাদের চায়ের আসরে রেখে চললাম হেলালের বাসার উদ্দেশ্যে।

আমি এসেছি ১৯৮৩ সালে, হেলাল ১৯৮৪ সালে সানুর সাথে। ও জড়িত ছিল ন্যাপের স্টাডি সার্কেলের সাথে, আমি ও সানু সিপিবির একমনার সাথে। তাই সানুর সাথে যত ঘনিষ্ঠতা আমার ছিল হেলালের সাথে ততটা ছিল না। তবে এসব আমাদের আড্ডায় বাধা হয়ে দেখা দেয়নি। আমরা তিনজন ছাড়াও ছিলেন মান্নান ভাই। নেদারল্যান্ডস থেকে এসেছেন। ১৯৭৪ সালে মস্কো এসেছিলেন। অর্থনীতিতে মাস্টার্স শেষ করে ১৯৮০ সালে পশ্চিম ইউরোপে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। মস্কো নিয়মিত আসেন। আমাদের আলাপ ভ্লাদিমির কৎসারের ওখানে। হেলাল মাছ আর খাসির মাংস রান্না করেছিল। আর ডাল। প্রতিটি আইটেমে ও আমাকে অনায়াসে পেছনে ফেলে দিত। এমনকি ভাতেও। ওর খাবার পুড়েনি পোড়ে না। ইচ্ছে করেই পোড়ায় না কারণ জানে এক্ষেত্রে আমার কাছে নির্ঘাত হেরে যাবে।
অনেকক্ষণ ধরে মন ভরে আড্ডা দিলাম। পিন্ডি চটকানোর মত খুব বেশি কমন পরিচিত ছিল না আমাদের তাই মস্কোর বাঙালিরা বড্ড বাঁচা বেঁচে গেল। সানু অসুস্থ। আড্ডাটা ও বেশ এনজয় করছিল। তবে উঠতে হবে। মনিকা ফোন করেছে বিড়ালরা আমার অপেক্ষায় বসে আছে। ওদের খাবার প্লেটে নাকি মহাকাশের মত শূন্যতা নেমে এসেছে। বাইরে এসে মনে হল সবাইকে নিয়ে ছবি তোলা হল না। তাই সানু আর মান্নান ভাইয়ের সাথে ছবি তুললাম। মান্নান ভাই জানালেন তিনি সিরাজগঞ্জ থেকে। কেন জানি না, একথা শুনে মনে পড়লো সিরাজগঞ্জে মায়ের স্কুল জীবন কেটেছে। মা আর বাপ্পী লাহিড়ীর মা একসাথে পড়তেন আর আমার দাদু মারা যাবার পর দিদিমা মামাদের নিয়ে ইন্ডিয়া চলে গেলে তাদের বাড়িটা পুলিশ ফাঁড়ি হিসেবে পাকিস্তান সরকার অধিগ্রহণ করে। মান্নান ভাই জানালেন পুলিশ ফাঁড়ি এখনও আছে আর বাড়িটা অনেক পুরানো ও এখনও বেশ সুন্দর। কেন যেন তখন মামা বাড়ি দেখার একটা সুপ্ত ইচ্ছা জেগে উঠল
মামা বাড়ি পুলিশ ফাঁড়ি!!
বারাভিৎস্কায়া আমি আর সানু নেমে গেলাম, মান্নান ভাই চেঞ্জ করবেন চেখভস্কায়ায়। সানু যাবে বাবুশকিনস্কায়া আমি স্পোর্টিভনায়া। ওকে উঠিয়ে দিয়ে আমি চললাম বিড়ালদের উদ্ধার করতে।

মস্কো, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫

Comments

Popular Posts