শিক্ষা

রুশরা বলে ভেক ঝিভি ভেক উচিছ - মানে শত বর্ষ বাঁচ, শত বর্ষ শেখ। আসলে আমাদের শেখার কোন শেষ নেই। যদিও ফর্মাল শিক্ষা বা শিক্ষা সংক্রান্ত ডিগ্রি পাই এক আধটা বিষয়ে - শিখি আমরা শত শত বিষয়ে। কই আমাদের কেউ তো হাঁটতে শেখার জন্য, কথা বলতে শেখার জন্য, শ্বাস প্রশ্বাস নেবার জন্য ডিগ্রি দেয় না, যেমন দেয় না খাওয়া, নাওয়ার ইত্যাদি হাজার কাজের জন্য। আসলে আমাদের এই শেখার প্রক্রিয়া অন্তহীন। তার পরেও আমরা শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকেই শিক্ষা মনে করি। অনেক সময় হয় যে আমরা কোন কিছু শিখি কোন এক সময় আর তার রহস্য ভেদ করি যুগ যুগ পরে। তেমনই এক ঘটনা ঘটল আমার সাথে কয়েক দিন আগে।

আমরা যারা সোভিয়েত ইউনিয়নে লেখাপড়া করতে এসেছিলাম এক সময় তারা প্রায় সবাই রাঁধুনি হয়ে গেছি। প্রথমত বাসায় নিজেরা রান্না করে খেলে খরচ কম। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নে এ ছাড়াও আরও একটা ব্যাপার ছিল। এখানে যেভাবে রান্না করা হত আমাদের অধিকাংশের পক্ষেই প্রথম দিকে সেটা খাওয়া সম্ভব হত না। শত হলেও ভাজা পোড়া আর তেল মশলা আমাদের কাছে মায়ের দুধের মত। ফলে আমরা কয়েকজন করে মেস করে রান্না করে খেতাম, মূলত রাতের খাবারটা। আমার মেসের কুক ছিল জালাল। আমি ফাঁকিবাজ - শুধু রান্নার ক্ষেত্রেই নয়, খাওয়ার ক্ষেত্রেও। প্রায়ই রান্নায় সাহায্য তো দূরের কথা খেতেও আসতাম না। ফলে মেস থেকে বহিষ্কৃত হওয়া ছিল নিয়মিত ব্যাপার। যাই বলুন, মানুষের যদি ক্ষমতা থাকে কারো উপরে খবরদারি করার, তখন প্রগতিশীল, প্রতিক্রিয়াশীল - সবাই এক, সবাই স্বৈরাচারী - শুধু ছোট স্কেলে। যাই হোক - জালালই আমাকে শিখিয়েছিল যে মুরগী রান্না করার সময় আগে মশলা দিতে হয় আর গোরু বা শুয়োয় রান্না করতে পরে। মানে মুরগী তেলে দেবার আগে মশলা দিতে হবে আর গোরু বা শুয়োর একটু কষিয়ে পরে মশলা দিতে হবে। এটা ছিল ১৯৮৩ - ১৯৮৪ সালের কথা। আমি এতদিন পর্যন্ত সেটাই করতাম। তেলে মশলা দিয়ে কিছুটা ভেজে পরে মুরগী ছাড়তাম আর গরু বা শুয়োর রান্না করার সময় খালি তেলে মাংস ভেজে পরে মশলা দিতাম। এরপরে পেঁয়াজ, রসুন এসব। কয়েকদিন আগে হঠাৎ মনে হল আচ্ছা এমনও তো হতে পারে যে মুরগি রান্নার সময় প্রথমে মসলা দিয়ে পেঁয়াজ রসুন এসব কষিয়ে পরে তাতে মাংস ছাড়া। প্রায় চল্লিশ বছর পরে সেই এক্সপেরিমেন্ট মনে হয় সফল। অন্তত খেতে ভালো লেগেছে। হতে পারে আমি তখন জালালের কথার মর্ম উদ্ধার করতে পারিনি আবার এও হতে পারে যে আগের রান্নাটা একঘেয়ে হয়ে গেছিল, নতুন পদ্ধতিতে তাই ভালো লাগছে। কোনটা ঠিক সেটা জানার জন্য আরও চল্লিশ বছর এভাবে রান্না করে তারপর আগের পদ্ধতিতে ফিরে দেখতে হবে। ততদিন মনে হয় আরও কোন নতুন পদ্ধতি শিখে যাব।

দুবনা, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪

Comments

Popular Posts