জন্মদিন
রুশরা বলে অপ্রত্যাশিত ভাবে শীত চলে এলো। ঠিক তেমনি করেই অপ্রত্যাশিত ভাবে আসে জন্ম দিন। পৃথিবী গোল হবার এই এক বিড়ম্বনা – জন্মদিন আসে একে জায়গায় একে সময়। তাই মস্কোয় বারোটা বাজার আগেই কিছু কিছু শুভেচ্ছা ফেসবুকের টাইম লাইনে জমা হতে শুরু করে। বারোটা বাজার পর প্রথম বার্তা এলো ক্রিস্টিনার কাছ থেকে
পাপা, শুভ জন্মদিন। আমি প্রায় চলে এসেছি।
না, ও আমার এখানে আসছে না, যাচ্ছে পিটারের ক্যাথলিক চার্চে যীশুর জন্মদিনে। দুপুরেই বলেছিল।
পাপ, আমি ক্যাথলিক চার্চে ক্রিস্টমাসের উপাসনায় যেতে চাই।
যা।
তুমি গেছ কখনও?
অনেক আগে, ইটালিতে। ক্যাথলিক চার্চ অবশ্য রুশ অর্থোডক্স চার্চ বা হিন্দু মন্দিরের মত তত সাজানো নয়। তারপরেও যেতে পারিস।
তুমি তো এসবে বিশ্বাস কর না তারপরেও কেন যাও?
দেখ আমি যাই স্থাপত্য দেখতে। ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেছেন নাকি মানুষ ঈশ্বরের সৃষ্টিকর্তা এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও উপাসনালয় যে মানুষের তৈরি তা নিয়ে তো কোন বিতর্ক নেই। আর মানুষ যা কিছু তৈরি করে তা আমাকে টানে, তাই যাই - দেখতে, ছবি তুলতে।
যাহোক, ক্রিস্টিনা যাচ্ছে ক্যাথলিক চার্চে। বললাম
ওখানে প্রার্থনা হয় অর্গান বাজিয়ে, তোদের মত খালি গলায় নয়। দেখে আয়, পরে গল্প করিস। তা এত রাতে ফিরবি কী করে?
ওখানে শেষ হতে হতে মনে হয় রাত তিনটে বাজবে। এটা সেন্টারে। হেঁটে ওখান থেকে হোস্টেলে যেতে ঘণ্টা দুই লাগবে। তবে যদি রিজনেবল ভাড়ায় ট্যাক্সি পেয়ে যাই তাহলে খুব সময় লাগবে না।
ঠিক আছে। দরকার হলে ফোন করিস।
এখন আমার না ঘুমানোর একটা অজুহাত আছে। গুলিয়াকে অবশ্য বলিনি, অযথা টেনশন করবে আর কয়েক মিনিট পর পর আমাকে বলবে ক্রিস্টিনাকে ফোন করতে।
শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিলাম তখন ওমরের ফোন এলো। ও মস্কোয় আমার ইয়ারমেট, এখন পোল্যান্ডে থাকে। আমার মতই ওমরও পৃথিবীতে এন্ট্রি করেছে ২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৪। আমার সাল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ওমরেরটা বিতর্কের ঊর্ধ্বে। বছরে এই একটি দিনই আমাদের যোগাযোগ হয়। ওমর জানালো শুভ এসেছে আমেরিকা থেকে। শুভও আমাদের ইয়ারমেট। শুভ বলল
তুই তো এখনও বাচ্ছা ছেলের মতই রয়ে গেলি। তোর বৌয়ের পাশে তোকে বাচ্চা বাচ্চা মনে হয়।
আমি হাসলাম। হয়তো তাই। আসলে লাঠি যদি সরু না হয় তাহলে তাতে ভর করে চলা কষ্ট। আমার বিশ্বাস আমার স্ত্রী, ছেলেমেয়েরা আমাকে সেই লাঠির মতই মনে করে যার উপর ভর করে সামনে চলা যায়। জীবনের সার্থকতা ততক্ষণ যতক্ষণ তা কারো না কারো কাজে লাগে। তাই বাচ্চাদের মত থাকায় ক্ষতির কিছু নেই। তাছাড়া এটাও ঠিক যে ষাট বছরের দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে নিজেকে ঠিক ততটা জীবনে পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ মানুষ হিসেবে দেখতে পাইনি।
রাত পহিয়ে দিন চলে এলো। সকালে দেখি ফেসবুক আর মেসেঞ্জারে রাশি রাশি শুভেচ্ছা। জন্মদিনের সুবিধা হল এই উপলক্ষ্যে মানুষকে শুভেচ্ছা জানানো যায়, অন্য সময় যাদের সাথে কথা বলতে বা যাদের লিখতে দ্বিধা হয় এই উপলক্ষ্যে নির্দ্বিধায় তাদের লেখা যায়, পছন্দ করুক আর নাই করুক দুটো কথা বলা যায়। অন্যান্য জাতীয় বা আন্তর্জাতিক দিবসের মত এ কারণেই আমি জন্মদিন পছন্দ করি এবং সবার জন্মদিনে দু’ কলম লিখি। আমি খুশি যে আমার বন্ধুরাও গতকাল দুই হাতে সেই সুযোগ গ্রহণ করেছেন, আমাকে নিয়ে তাদের ভাবনা ব্যক্ত করেছেন। তবে সেটা মূলত তাদের আশাবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, কেউ সমালোচনা করেননি যা সত্যিকার অর্থেই আমাকে ত্রুটিমুক্ত হতে কিছুটা হলেও সাহায্য করত। ফলে কনিগা ঝালব ই প্রেদলোঝেনিয়া (книга жалоб и предложения) ভারসাম্য হারিয়েছে।
বন্ধুদের কাছ থেকে রাশি রাশি শুভেচ্ছা পেয়েছি। পেয়েছি বিভিন্ন রকম আবদার। সবচেয়ে বেশি যেটা তা হল সুস্থ থাকার। আমি আজীবন অসহায়দের পক্ষে কথা বলেছি (করতে অবশ্য কিছুই পারিনি)। তাই ভাবছি মানুষের এই ইচ্ছা পূরণ করা কি আদৌ মানবিক? কারণ দীর্ঘ দিন যাবত যেসব অসুখ বিসুখকে আমি আশ্রয় দিয়েছি, যত্ন করে নিজের শরীরে পুষেছি আজ হঠাৎ করে তাদের গৃহহীন করি কীভাবে? সবাই একটা আস্থার জায়গা খোঁজে, অসুখও ব্যতিক্রম নয়। সুস্থ থেকে ওদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা কি ঠিক? এতে কি আদৌ তাদের প্রতি ন্যায় বিচার করা হবে? এসব প্রশ্নও মনের কোণে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে।
আচ্ছা ষাট বছর এটা কম না বেশি। জীবন যত দীর্ঘ হয় তা তত অভিজ্ঞতা সম্পন্ন হয়। রুশরা বলে আমার বয়স আমার সম্পদ। বর্তমান তথ্যের যুগে বয়স তাই সম্পদ – অঢেল সম্পদ। অন্যদিকে আমাদের জীবন যেহেতু সময় দ্বারা সীমাবদ্ধ তাই চলে যাওয়া প্রতিটি বছরকে হারানো সময় হিসেবে মনে করা যায়। কিন্তু আমাদের জীবন মহাবিশ্বের মতই ক্রমবর্ধমান। এই চলার কখন শেষ কেউ জানে না। মহাভারতের গল্প অনুযায়ী অভিমন্যু মাতৃগর্ভে থাকার সময় চক্রব্যূহে প্রবেশের কৌশল শিখে নেয়। তার পিতা অর্জুন তখন তার মাকে চক্রব্যুহ ভেদ করার গল্প শোনাচ্ছিলেন। কিন্তু অর্জুন যখন ব্যুহ থেকে বেরুনোর উপায় বলেন তখন মা ঘুমিয়ে পড়লে অভিমন্যুর কখনই আর চক্রব্যুহ থেকে বেরুনোর উপায় শেখা হয়নি। ফলে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের এক পর্যায়ে সপ্ত রথীর সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে অভিমন্যু মৃত্যুবরণ করে। আমার মনে হয় আমরা সবাই একটুখানি হলেও অভিমন্যু। আমরা সবাই এই পৃথিবীতে আসি, আজীবন সংগ্রাম করি বেঁচে থাকার জন্য। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যুদ্ধে জিতেও যাই, কিন্তু কখনোই মৃত্যুকে চূড়ান্ত ভাবে জয় করতে পারি না, শুধুমাত্র মৃত্যুর মধ্য দিয়েই পৃথিবী থেকে চলে যেতে পারি। সেটা ভালো না মন্দ কে জানে?
আমাদের মহাবিশ্ব হোমোজেনাস ও আইসোট্রপিক। এর বিভিন্ন এলাকা প্রায় একই রকম। মহাবিশ্বের বিভিন্ন এলাকা একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করতে পারে আলোর মাধ্যমে। কিন্তু স্বাভাবিক তত্ত্ব অনুসারে মহাবিশ্বের দুই বিপরীত মেরু একে অন্যের থেকে এতই দূরে যে এমনকি আলোর পক্ষেও সেই দূরত্ব অতিক্রম করা সম্ভব ছিল না। তাহলে তারা কীভাবে একে অন্যের মত দেখতে হল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জন্ম নিল ইনফ্ল্যাশন থিওরি। তবে আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষই একে অন্যের সাথে যুক্ত। এক সময় যখন আমরা মহাকাশে মিশে যাব আমাদের ইলেক্ট্রন, প্রোটন ইত্যাদি কণা যখন মহাবিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়বে তখন এসব প্রশ্ন উঠবে না। হয়তো ওদের কেউ কেউ ঠিকই একে অন্যকে খুঁজে পাবে। তাই অভিমন্যুরা এখানেই শেষ হয়ে যাবে না, ঘুরে বেড়াবে অসীম শূন্যে স্বাধীনভাবে - সেখানে সেই স্বাধীনতা কোন ধর্ম, কোন তন্ত্র দ্বারা সীমাবদ্ধ হবে না। জন্মদিনকে অর্থবহ করে তোলার জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা। সবাইকে ভালবাসা। আপনারাও সুস্থ থাকবেন, তবে রোগ বালাইয়ের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন এই আশায়।
দুবনা, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪
পাপা, শুভ জন্মদিন। আমি প্রায় চলে এসেছি।
না, ও আমার এখানে আসছে না, যাচ্ছে পিটারের ক্যাথলিক চার্চে যীশুর জন্মদিনে। দুপুরেই বলেছিল।
পাপ, আমি ক্যাথলিক চার্চে ক্রিস্টমাসের উপাসনায় যেতে চাই।
যা।
তুমি গেছ কখনও?
অনেক আগে, ইটালিতে। ক্যাথলিক চার্চ অবশ্য রুশ অর্থোডক্স চার্চ বা হিন্দু মন্দিরের মত তত সাজানো নয়। তারপরেও যেতে পারিস।
তুমি তো এসবে বিশ্বাস কর না তারপরেও কেন যাও?
দেখ আমি যাই স্থাপত্য দেখতে। ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেছেন নাকি মানুষ ঈশ্বরের সৃষ্টিকর্তা এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও উপাসনালয় যে মানুষের তৈরি তা নিয়ে তো কোন বিতর্ক নেই। আর মানুষ যা কিছু তৈরি করে তা আমাকে টানে, তাই যাই - দেখতে, ছবি তুলতে।
যাহোক, ক্রিস্টিনা যাচ্ছে ক্যাথলিক চার্চে। বললাম
ওখানে প্রার্থনা হয় অর্গান বাজিয়ে, তোদের মত খালি গলায় নয়। দেখে আয়, পরে গল্প করিস। তা এত রাতে ফিরবি কী করে?
ওখানে শেষ হতে হতে মনে হয় রাত তিনটে বাজবে। এটা সেন্টারে। হেঁটে ওখান থেকে হোস্টেলে যেতে ঘণ্টা দুই লাগবে। তবে যদি রিজনেবল ভাড়ায় ট্যাক্সি পেয়ে যাই তাহলে খুব সময় লাগবে না।
ঠিক আছে। দরকার হলে ফোন করিস।
এখন আমার না ঘুমানোর একটা অজুহাত আছে। গুলিয়াকে অবশ্য বলিনি, অযথা টেনশন করবে আর কয়েক মিনিট পর পর আমাকে বলবে ক্রিস্টিনাকে ফোন করতে।
শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিলাম তখন ওমরের ফোন এলো। ও মস্কোয় আমার ইয়ারমেট, এখন পোল্যান্ডে থাকে। আমার মতই ওমরও পৃথিবীতে এন্ট্রি করেছে ২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৪। আমার সাল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ওমরেরটা বিতর্কের ঊর্ধ্বে। বছরে এই একটি দিনই আমাদের যোগাযোগ হয়। ওমর জানালো শুভ এসেছে আমেরিকা থেকে। শুভও আমাদের ইয়ারমেট। শুভ বলল
তুই তো এখনও বাচ্ছা ছেলের মতই রয়ে গেলি। তোর বৌয়ের পাশে তোকে বাচ্চা বাচ্চা মনে হয়।
আমি হাসলাম। হয়তো তাই। আসলে লাঠি যদি সরু না হয় তাহলে তাতে ভর করে চলা কষ্ট। আমার বিশ্বাস আমার স্ত্রী, ছেলেমেয়েরা আমাকে সেই লাঠির মতই মনে করে যার উপর ভর করে সামনে চলা যায়। জীবনের সার্থকতা ততক্ষণ যতক্ষণ তা কারো না কারো কাজে লাগে। তাই বাচ্চাদের মত থাকায় ক্ষতির কিছু নেই। তাছাড়া এটাও ঠিক যে ষাট বছরের দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে নিজেকে ঠিক ততটা জীবনে পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ মানুষ হিসেবে দেখতে পাইনি।
রাত পহিয়ে দিন চলে এলো। সকালে দেখি ফেসবুক আর মেসেঞ্জারে রাশি রাশি শুভেচ্ছা। জন্মদিনের সুবিধা হল এই উপলক্ষ্যে মানুষকে শুভেচ্ছা জানানো যায়, অন্য সময় যাদের সাথে কথা বলতে বা যাদের লিখতে দ্বিধা হয় এই উপলক্ষ্যে নির্দ্বিধায় তাদের লেখা যায়, পছন্দ করুক আর নাই করুক দুটো কথা বলা যায়। অন্যান্য জাতীয় বা আন্তর্জাতিক দিবসের মত এ কারণেই আমি জন্মদিন পছন্দ করি এবং সবার জন্মদিনে দু’ কলম লিখি। আমি খুশি যে আমার বন্ধুরাও গতকাল দুই হাতে সেই সুযোগ গ্রহণ করেছেন, আমাকে নিয়ে তাদের ভাবনা ব্যক্ত করেছেন। তবে সেটা মূলত তাদের আশাবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, কেউ সমালোচনা করেননি যা সত্যিকার অর্থেই আমাকে ত্রুটিমুক্ত হতে কিছুটা হলেও সাহায্য করত। ফলে কনিগা ঝালব ই প্রেদলোঝেনিয়া (книга жалоб и предложения) ভারসাম্য হারিয়েছে।
বন্ধুদের কাছ থেকে রাশি রাশি শুভেচ্ছা পেয়েছি। পেয়েছি বিভিন্ন রকম আবদার। সবচেয়ে বেশি যেটা তা হল সুস্থ থাকার। আমি আজীবন অসহায়দের পক্ষে কথা বলেছি (করতে অবশ্য কিছুই পারিনি)। তাই ভাবছি মানুষের এই ইচ্ছা পূরণ করা কি আদৌ মানবিক? কারণ দীর্ঘ দিন যাবত যেসব অসুখ বিসুখকে আমি আশ্রয় দিয়েছি, যত্ন করে নিজের শরীরে পুষেছি আজ হঠাৎ করে তাদের গৃহহীন করি কীভাবে? সবাই একটা আস্থার জায়গা খোঁজে, অসুখও ব্যতিক্রম নয়। সুস্থ থেকে ওদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা কি ঠিক? এতে কি আদৌ তাদের প্রতি ন্যায় বিচার করা হবে? এসব প্রশ্নও মনের কোণে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে।
আচ্ছা ষাট বছর এটা কম না বেশি। জীবন যত দীর্ঘ হয় তা তত অভিজ্ঞতা সম্পন্ন হয়। রুশরা বলে আমার বয়স আমার সম্পদ। বর্তমান তথ্যের যুগে বয়স তাই সম্পদ – অঢেল সম্পদ। অন্যদিকে আমাদের জীবন যেহেতু সময় দ্বারা সীমাবদ্ধ তাই চলে যাওয়া প্রতিটি বছরকে হারানো সময় হিসেবে মনে করা যায়। কিন্তু আমাদের জীবন মহাবিশ্বের মতই ক্রমবর্ধমান। এই চলার কখন শেষ কেউ জানে না। মহাভারতের গল্প অনুযায়ী অভিমন্যু মাতৃগর্ভে থাকার সময় চক্রব্যূহে প্রবেশের কৌশল শিখে নেয়। তার পিতা অর্জুন তখন তার মাকে চক্রব্যুহ ভেদ করার গল্প শোনাচ্ছিলেন। কিন্তু অর্জুন যখন ব্যুহ থেকে বেরুনোর উপায় বলেন তখন মা ঘুমিয়ে পড়লে অভিমন্যুর কখনই আর চক্রব্যুহ থেকে বেরুনোর উপায় শেখা হয়নি। ফলে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের এক পর্যায়ে সপ্ত রথীর সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে অভিমন্যু মৃত্যুবরণ করে। আমার মনে হয় আমরা সবাই একটুখানি হলেও অভিমন্যু। আমরা সবাই এই পৃথিবীতে আসি, আজীবন সংগ্রাম করি বেঁচে থাকার জন্য। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যুদ্ধে জিতেও যাই, কিন্তু কখনোই মৃত্যুকে চূড়ান্ত ভাবে জয় করতে পারি না, শুধুমাত্র মৃত্যুর মধ্য দিয়েই পৃথিবী থেকে চলে যেতে পারি। সেটা ভালো না মন্দ কে জানে?
আমাদের মহাবিশ্ব হোমোজেনাস ও আইসোট্রপিক। এর বিভিন্ন এলাকা প্রায় একই রকম। মহাবিশ্বের বিভিন্ন এলাকা একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করতে পারে আলোর মাধ্যমে। কিন্তু স্বাভাবিক তত্ত্ব অনুসারে মহাবিশ্বের দুই বিপরীত মেরু একে অন্যের থেকে এতই দূরে যে এমনকি আলোর পক্ষেও সেই দূরত্ব অতিক্রম করা সম্ভব ছিল না। তাহলে তারা কীভাবে একে অন্যের মত দেখতে হল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জন্ম নিল ইনফ্ল্যাশন থিওরি। তবে আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষই একে অন্যের সাথে যুক্ত। এক সময় যখন আমরা মহাকাশে মিশে যাব আমাদের ইলেক্ট্রন, প্রোটন ইত্যাদি কণা যখন মহাবিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়বে তখন এসব প্রশ্ন উঠবে না। হয়তো ওদের কেউ কেউ ঠিকই একে অন্যকে খুঁজে পাবে। তাই অভিমন্যুরা এখানেই শেষ হয়ে যাবে না, ঘুরে বেড়াবে অসীম শূন্যে স্বাধীনভাবে - সেখানে সেই স্বাধীনতা কোন ধর্ম, কোন তন্ত্র দ্বারা সীমাবদ্ধ হবে না। জন্মদিনকে অর্থবহ করে তোলার জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা। সবাইকে ভালবাসা। আপনারাও সুস্থ থাকবেন, তবে রোগ বালাইয়ের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন এই আশায়।
দুবনা, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪


Comments
Post a Comment