নস্টালজিয়া

কয়েক দিন আগে এক ফেসবুক বন্ধু আমার এক স্ট্যাটাসে এই মন্তব্য করলেন।

"তার মানে আপনার জন্ম আমার চেয়ে 9 বছর পর। আপনি রাশিয়ান হয়ে গেছেন।কিন্ত আপনার কি দেশের কথা, ছোট বেলার কথা মনে পরে না ? সে কথা মনে পরে কখনও কি মনটা উদাস হয় না ? আমি কৈশোরের দিনগুলি পর্যন্ত বাংলাদেশে কাটিয়েছি। এখন কলকাতায় থাকি। কিন্ত মনটা মাঝেমাঝেই স্মৃতি কাতর হয়ে পরে। মনে হয় আবার যদি সেখানে ফিরে যেয়ে বসবাস করতে পারতাম। জানি না এটা সেই জায়গা তে ফিরে যাবার টান না সেই কৈশোরে ফেরার আর্তি।
আপনার সন্তানদের কে অনেক আশীর্বাদ জানাই। ওরা কি একটুআধটু বাংলা জানে। আপনাদের জন্য অনেক শুভ কামনা রইলো । ভালো থাকবেন।"

আমার লেখার একটা বড় রসদ যোগায় ফেসবুকের বন্ধুদের বিভিন্ন কমেন্ট। সব সময় উত্তর দেই তা নয়, তবে কোন কোন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নিজের জমানো কথা বলে ফেলা যায়। তাই আজকের লেখা।

প্রথমেই মনে হল ৯ বছর আগে জন্ম নেয়া ভালো না মন্দ? আমার মনে হয় ভালো। কারণ নগদ হিসেবে আপনি আমার চেয়ে ৯ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। আর জীবন মানেই তো অভিজ্ঞতা, অভিজ্ঞতাই জ্ঞান যদি সেটা সঠিক ভাবে বিশ্লেষণ করে সারমর্ম উদ্ধার করা যায় অনেকটা আকরিক থেকে ধাতু আলাদা করার মত। বলতে পারেন ৯ বছর পরে জন্ম বলে আমার পরে দেখবার সম্ভাবনা বেশি। তবে প্রকৃতি আমাদের এক্সপায়ার ডেট শরীরে লিখে দেয়নি, তাই বয়স এখানে খুবই আপেক্ষিক।

শুধু ছোটবেলা কেন সব সময়ের কথাই মনে পড়ে। এক সময় হয়তো হত, কিন্তু এখন হয় না। যখন থেকে কসমোলজির উপর কাজ করতে শুরু করেছি তখন থেকেই এসব খুব গৌণ হয়ে গেছে। পৃথিবীর প্রকৃতিতে ঋতু থাকলেও বা অমাবস্যা পূর্ণিমা থাকলেও দিন তারিখের হিসেব নেই। এটা আমাদের মানুষের তৈরি নিজেদের সুবিধার জন্য। তাছাড়া স্মৃতি কাতর হয়েই লাভ কী? মনে আছে ২০১১ সালে ১৪ বছর পরে যখন দেশে ফিরি - ইচ্ছে ছিল ছোটবেলাকে খুঁজে বের করা। সারাদিন ক্যামেরা হাতে ঘুরতাম সেই ছোটবেলার ছবি তোলার জন্য। পরে সেই সব ছবি দিয়ে এক্সিবিশন করেছি, অনেকের অনেক প্রশংসা পেয়েছি, কিন্তু ছোটবেলাকে ফিরে পাইনি। বলে নিই, আমার জন্য দেশ মানে আমার গ্রাম, তার নদী, মাঠ এসব। কিন্তু ফিরে গিয়ে দেখি সেই মাঠ আজ মানুষের দখলে, নদী শুকিয়ে মৃতপ্রায়। আর মানুষ? অধিকাংশ বিভিন্ন জায়গায় চলে গেছে। কেউ বিদেশে, কেউ শহরে। আমি মস্কোয় কাটিয়েছে ১০ বছর, এর পর ৩০ বছর দুবনায়। চোখের সামনেই এসব জায়গা এত বদলে গেছে যে বলার মত নয়। আমরা এখন যে বহুতল বিল্ডিঙে থাকি তার নীচ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট্ট এক নদী। এই বাড়ি তৈরির আগে আমি ছেলেমেয়েদের জন্য সেখান থেকে নল খাগড়া তুলতাম। যেখানে ওদের নিয়ে পিকনিক করতাম বা পাখিদের ছবি তুলতাম - সবই আজ নতুন নতুন দালানের বাসস্থান। তাই অতীতে ফিরে যাওয়া একেবারের সম্ভব নয়। অতীত ক্যামেরায় তোলা ছবির মত - অ্যালবাম খুলে ছবি দেখার মত অতীত দেখি বা পুরনো বন্ধুদের সাথে কথা হলে সেই সব দিনের কথা মনে পড়ে। এ নিয়ে নস্টালজিক হবার কিছু নেই। হয়তো এ কারণে যে আমাকে যদি আবার বেছে নিতে বলা হত - আমি ঠিক এই একই পথে আজকের আমিতে আসতে চাইতাম। তার মানে কি সবই ঠিক ছিল। না। তবে অন্য পথে গেলে আজকের আমিতে আসা হত না। জীবন এক ধারাবাহিক রেখা। এখানে পৌঁছুনর হাজারটা পথ ছিল। কিন্তু সমস্ত সম্ভাবনার মাঝ থেকে আমি ঠিক এই পথটাই বেছে নিয়েছিলাম। আর যা আমাকে নিজের মত থাকতে দেয় সেটা বদলানোর কি খুবই প্রয়োজন। তাছাড়া এটাও তো ঠিক, আমারা যদি অতীতে ফিরে যেতেও পারতাম, যারা তাদের বর্তমান নিয়ে সন্তুষ্ট তাদের অধিকাংশের জন্যই সেটা হত কয়েক দিনের জন্য বেড়াতে যাওয়া, সেখানে আজীবন আটকে পড়া নয়। তাছাড়া আমার জন্য জীবন মানেই কাজ, যা করি তা থেকে আনন্দ পাওয়া, কাজ উপভোগ করা। নিজের অফিস, বাড়ি, ভোলগা নদী, পাশের বন, ক্যামেরা, বাসার কুকুর, বিড়াল, আর সেই সাথে প্রিয় মানুষেরা মিলেই জীবন - অতীত আমাদের জন্য অভিজ্ঞতা রেখে যায়, সেটা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানে আমরা ভবিষ্যতের পথ খুঁজে বের করি। আমি নিজেকে এখনও একজন ছাত্রই মনে করি যে সব সময় কিছু না কিছু শেখার জন্য মনটাকে খুলে রাখে। তাই কৈশোরে গিয়ে কী হবে? আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ আমি। আমার পৃথিবী আমাকে ঘিরেই। অন্যদের ভালবাসি না? বাসি। কারণ অন্যদের ভালবাসতে, অন্যদের জন্য কিছু করতে আমার ভালো লাগে। তাই ক্লাসে একজন ছাত্র উপস্থিত থাকলেও আমি ক্লাস নিতে পারি। তাই কেউ যদি জিজ্ঞেস করে আমি কেমন আছি - মন থেকেই বলি খারাপ থাকার সময়, ইচ্ছে, সামর্থ্য - কোন কিছুই আমার নেই। ভালো থাকা আমার পেশা, নেশা। আপনিও ভালো থাকবেন।

দুবনা, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪

২০১১-২০১২ সালে দেশে তোলা ছবির এক্সিবিশন
http://bijansaha.ru/albshow.html?tag=79

Comments

Popular Posts