আমার হিয়ার মাঝে

আজ আমার রবি ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস। কবি প্রয়াত হয়েছিলেন ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট যা বাংলায় ২২ শে শ্রাবণ। আমরা অনেক কিছু ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পালন করলেও কতগুলো দিন পালন করি বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে। এটা পয়লা বৈশাখ নববর্ষ, ২৫ শে বৈশাখ কবির জন্মদিন আর ২২ শে শ্রাবণ কবির মৃত্যু দিবস। এই যে বাংলা পঞ্জিকা ধরে কবির জন্মদিন ও মৃত্যু দিবস পালন করা এটাই মনে হয় বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, বাংলার মাটি, বাংলার জলের সাথে কবির একাত্মতার অকাট্য প্রমাণ। আমরা নিজেরাও কিন্তু নিজেদের জন্মদিন ইংরেজি ক্যালেন্ডার ধরেই করি। একটা সময় ছিল যখন সব বাংলা ভাষাভাষীর জন্য বছরে পয়লা বৈশাখ, ২৫ বৈশাখ বা ২২ শে শ্রাবণ একটা করেই ছিল। এখন রাজনীতির খপ্পরে পড়ে অঞ্চল ভেদে এরাও ভাগ হয়ে গেছে। তাই ফেসবুকে একাধিক বার এসব দিন নিয়ে আলোচনা হয়। আমার ধারণা রবি বাবু বেঁচে থাকলে তিনি আজকের দিনটিই ২২ শে শ্রাবণ হিসেবে বেছে নিতেন। তাই তাকে নিয়ে দুটো কথা।

রবীন্দ্রনাথ কী আমার জীবনে? এখন ঠিক মনে নেই কোনটা দিয়ে শুরু – “জল পড়ে পাতা নড়ে” নাকি “আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে”। নদীর তীরে বাস। তাই দুটোই একই রকম পরিচিত, একই ভাবে জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমার বাড়তি পাওনা ছিলেন জ্যাঠামশাই। তাঁর চুল দাড়ি ছিল রবীন্দ্রনাথের মতই শুভ্র আর মুখমণ্ডল জুড়ে। শুভ্র এ কারণেই বলছি যে আমার যখন জন্ম বাবার বয়স তখন ৫৬, জ্যাঠামশাই ৬০ এর কাছাকাছি। তাই জন্ম থেকেই এরা বৃদ্ধের দলে। যদিও আজ ষাটে পা দিয়ে নিজেকে ২৫ বছরের যুবক বলেই মনে হয়। তবে সেই সময় আমাদের দেশে তো বটেই সারা বিশ্বেই মানুষের বার্ধক্য আসত বেশ আগে। যাহোক জ্যাঠামশাইয়ের বদৌলতে রবীন্দ্রনাথ শুধু বইয়ের পাতা বা দেয়ালে ঝুলানো ক্যালেন্ডারের পাতা থেকেই উঁকি দিতেন না, দিব্যি ঘোরাফেরা করতেন চোখের সামনে। এর সাথে যোগ হত হয়তো পারিবারিক শিক্ষা আর রামায়ণ মহাভারতের গল্প। কারণ এসব মহাকাব্যের কারণে ঠাকুর দেবতা কখনও আকাশে থাকতেন না, তারা গ্রামের বনে বাদাড়ে নদীর চড়ে ঘুরে বেড়াতেন। আর এ সব কারণে শিশু মনে রবীন্দ্রনাথ সেই ছোটবেলা থেকেই নিজের মানুষ হয়ে যান। আশ্চর্যের বিষয় হল অন্য কোন কবি সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে এমনটা হয়নি। এমনকি সেই স্কুল জীবনে বা পরবর্তীতে নিজেও যখন টুকিটাকি লেখালিখি করতে শুরু করি অন্যান্য অধিকাংশ লেখক কবিরাই কেন যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছেন যদিও তাদের অনেকেই ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিলেন।

এক সময় গান শিখতে শুরু করি। মনে পড়ে প্রথম গান –

ওগো নদী, আপন বেগে পাগল-পারা
আমি স্তব্ধ চাঁপার তরু, গন্ধ ভরে তন্দ্রাহারা
আমি সদা অচল থাকি, গভীর চলা গোপন রাখি
আমার চলা নবীন পাতায়, আমার চলা ফুলের ধারা।।

তখন এসব গানের কথাগুলো ঠিক বুঝতাম না। সময়ের সাথে সাথে সুরের সাথে কথাগুলি জীবন পেয়েছে জীবনে। রামায়ণ মহাভারতের দেবতারা যতই দূরে সরে গেছেন রবীন্দ্রনাথ ততই কাছে এসেছেন। না, এটা রবীন্দ্রনাথের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা বা অন্ধ ভক্তি নয় – তিনি জোর করে আসেননি, আমিই তাকে বার বার খুঁজে নিয়েছি। এক সময় তিনি আমার হিয়ার মাঝে আশ্রয় নিয়েছেন অথবা আমি নিজেই তাঁর শরণাপন্ন হয়েছি। হয়তো প্রবাসে বিজন জীবনের কারণে। ভোলগা যেমন আমার কালীগঙ্গার অভাব পূরণ করে রবি ঠাকুর তেমনি রাশিয়ায় আমার জন্য নিয়ে আসেন বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল। শুধু কি আমার জন্যেই? মনে হয় না। এমনকি যারা ঘোর রবীন্দ্র বিরোধী তারাও রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া চলতে পারে না। ভগবানের যেমন শয়তান ছাড়া চলে না, এদেরও তেমনি রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া চলে না। কোথায় যেন পড়েছিলাম এক মেয়ের গল্প যে বিয়ে করবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। এ নিয়ে এক সাধুর সাথে কথা বললে তিনি বলেন – ঠিক আছে বুঝলাম তুমি সব পার, উপার্জন করতে পার, কিন্তু কোন কাজে ব্যর্থ হলে সেই দায় কারো ঘাড়ে চাপানোর জন্য হলেও তো একজন স্বামী দরকার। আমাদের রবীন্দ্র বিরোধীদের সেই অবস্থা। নিজেদের ব্যর্থতা রবীন্দ্রনাথের কাঁধে চাপানোর জন্য হলেও তাদের রবীন্দ্রনাথকে দরকার। তাই তিনি থাকবেন অনন্ত কাল – কারো ভালবাসায়, কারো ঘৃণায়। ঠাকুর তো শুধু উপাধি নয়, তা ঈশ্বরের আরেক নাম। ঠাকুর হওয়া কি এতই সহজ!

দুবনা, ০৮ আগস্ট ২০২৫

Comments

Popular Posts