হাসপাতাল

আজ আমার দিন শুরু হল বেশ সকালে। হ্যাঁ, সকাল সকাল হাসপাতালে যেতে হবে। ধরতে হবে ৭-১১ এর বাস। গিয়ে দেখি এক ভদ্র মহিলা দাঁড়িয়ে। এগিয়ে এসে বললেন

হাসপাতালে যাচ্ছ?
হ্যাঁ।

ততক্ষণে তাকে চিনতে পারলাম। নার্সদের একজন। আসলে চারিদিকে সাদা মানুষের ভিড়ে আমি প্রায়ই ওদের মনে রাখতে পারি না কিন্তু এক্সটিক বলে ওরা আমাকে ঠিক মনে রাখে।

আকুপাংচার করাবে না? করিয়েছ কখনও?
১৯৯২ সালে মস্কোয়। দেখি ডাক্তার কি বলেন?

আসলে এখানে আমাদের যে সাধারণ ইনসিওরেন্স তাতে বেসিক চিকিৎসা পাওয়া যায়, এমন কি অনেক জটিল অপারেশন পর্যন্ত। তবে কিছু কিছু চিকিৎসা পয়সা দিয়ে করতে হয় অথবা কর্মক্ষেত্র থেকে পে করে। ২০২২ সালে আমি যখন ক্যাটারাক্ট অপারেশন করাই তাতে দুই অপশন ছিল। সিংগল ফোকাল লেন্স বিনে পয়সায় মানে সাধারণ ইনসিওরেন্সে। সেক্ষেত্রে আমাকে একটা চশমা নিতে হত। মাল্টি ফোকাল লেন্স করালে পে করতে হবে সাড়ে তিন লাখ রুবল বা সেই সময়ের পাঁচ হাজার ডলার। ইনস্টিটিউট সেটা পে করল। এখানেও তাই। আসলে এ কারণেই আমি এখনও ছুটিতে যাইনি। কারণ ছুটির সময় সব নিজের খরচে। যাহোক গিয়ে ইউরিন দিলাম টেস্টের জন্য।

ব্লাড নেবে সকাল ৮ টা থেকে। তাই চললাম নিজের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে। ৬ বেডের রুম, তবে মনে হয় একজন বাদে সবাই বাড়ি চলে যায়। ঐ একজন আর্মেনিয়ান।
দব্রোয়ে উৎরো!
দব্রোয়ে উৎরো!
আর কোন কথা না বলে ও বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে আমি গেলাম দেখতে ব্লাড নিচ্ছে কিনা। না, এখনও খোলেনি। ফিরছি, দেখি ওয়ার্ডের সামনে আমার আর্মেনিয়ান রুমমেট মধ্য এশিয়ার কেউ একজনের সাথে কথা বলছে। আমি কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম।

সালামালাইকুম বলে না? - সেই লোক আমার রুমমেটকে জিজ্ঞেস করল।
রুশ ভাষায় কথা বলে। - ও উত্তর দিল।
কিছুক্ষণ পরে ওয়ার্ডে ফিরে আর্মেনিয়ান জিজ্ঞেস করল

তুমি কোন দেশ থেকে?
বাংলাদেশ।
আমি ভাবলাম ইন্ডিয়া বা পাকিস্তান থেকে। আমাদের ওখানে ইন্ডিয়া আর পাকিস্তানের অনেক লোকজন। অনেকেই বিয়ে থা করেছে। ওরা রাস্তা দিয়ে আর্মেনিয়ান ভাষায় কথা বলতে বলতে যায়।
আমি এখানে বিয়ে করেছি। বৌ ছেলেমেয়েদের সাথে রুশ বাসায় কথা বলি।
এখানে অনেক দিন?
দুবনায় ৩১ বছর, রাশিয়ায় ৪১।
তোমার বয়স কত?
৬১!
বল কি? কি কর।
আমি বিজ্ঞানী, পাশাপাশি শিক্ষকতা করি।

এরপর ও আর কিছু বলল না। পরে জানলাম ও স্যানিটারি ইঞ্জিনিয়ার। ইতিমধ্যে আটটা বেজে গেছে। গেলাম ব্লাড দিতে, টেস্টের জন্য। কে জানে এসব টেস্টি কিনা? মশাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। এরপর গেলাম ফিজিও থেরাপি ডিপার্টমেন্টে। ম্যাগনেট ও লেজার ফ্রি, তবে ডাইনামিক্যাল ইলেক্ট্রোস্টিমুলেশন ফ্রি হবে না, পে করতে হবে।
ঠিক আছে। লিখে দিন। আমি কথা বলছি।
ওখান থেকে গেলাম যিনি আকুপাংচার করেন তার কাছে। সাথে সাথে তিনি আমাকে উল্টো করে ভীষ্মের শরশয্যায় শুইয়ে দিলেন। পরে একটা কাগজ ধরিয়ে দিলেন। পরে এসব নিয়ে গেলাম ইনস্টিটিউটে। কুড়ি হাজার রুবলের একটি গ্যারান্টি চেক হাতে ধরিয়ে দিলেন। এর মাঝেই ডাক্তার ওয়ার্ডে এলেন দেখার জন্য। আজকে আমার তেমন কিছু নেই, শুধু জিজ্ঞেস করলেন টেস্টের জন্য ম্যাটেরিয়াল দিয়েছি কিনা। বেরিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এলেন

তোমাদের জন্য অনেক সমবেদনা!

আমি প্রথমে বুঝে উঠতে পারিনি।

গতকাল বিমান বিধ্বস্ত হয়ে অনেক শিশু মারা গেছে। ভয়ঙ্কর ব্যাপার।
স্পাসিবা!

দুবনা, ২২ জুলাই ২০২৫

Comments

Popular Posts