উপাসনালয়

সকালে ঘুম ভাঙ্গলে অন্য দিনের মত আলসেমি না করে উঠে পড়লাম। হাসপাতাল যেতে হবে। সেই ২০০৫ সাল থেকেই শুরু, বিগত প্রায় বছর পনের নিয়মত স্যালাইন থেরাপি নেই। বছরে একবার নিউরোলজিস্ট মেরুদণ্ড সোজা করে দেন আরেকবার কারডিওলজিস্ট হৃদপিণ্ডের পিন্ডি চটকান। তবে বিভিন্ন কারণে ইদানিং আর সময় করে উঠতে পারি না। কিন্তু ব্যাথা তো মামা বা মাসি নয়!

মাস দুয়েক আগে নিউরোলজিস্ট হাসপাতালে ভর্তি হতে বললেন। ধরেই নিয়েছিলাম যে সেটা বরাবরের মত ডে শিফট - সকালে এসে চিকিৎসা নিয়ে কাজে বা বাসায় ফিরে যাওয়া। সেভাবেই সকালে উঠে গেলাম পরিচিত জায়গায়। যে মেয়েটা এখানে এসব দেখাশুনা করে ওকে আমি চিনি সেই ২০০৫ সাল থেকেই। ও ঠাট্টা করে বলে আমি নাকি ঘরে ফিরলাম। যাহোক এক ঘণ্টা সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে ওকে যখন কাগজ দেখালাম, বলল

আপনাকে তো অন্য ডিপার্টমেন্টে যেতে হবে।
কি করা। সেখানে গেলাম। আবার লাইনে দাঁড়ানো। সব ঠিকঠাক করে তেতলায় উঠে আরেক গাদা ডকুমেন্ট সই করে জিজ্ঞেস করলাম

আজ কি কোন কিছু হবে না অফিসে চলে যাব?
অফিস মানে? এখানে আপনাকে ১১ থেকে ১৪ দিন থাকতে হবে।

মেজাজ বিগড়ে গেল। কারণ হাতে অনেক কাজ। তাছাড়া মানসিক ভাবে প্রস্তুত নই এখানে শুয়ে শুয়ে দিন কাটাতে। যাহোক, অনেকক্ষণ বসে থাকার পর ডাক্তার ডাকলেন। এর মধ্যে অবশ্য দুপুরের খাবার খেয়ে নিয়েছি। আমার হাসপাতালের খাবার সম্পর্কে বরাবরই অশ্রদ্ধা ছিল। কিন্তু কোভিডের সময় হাসপাতালের খাবার এতটাই ভালো লেগেছিল যে তার পর থেকে আমি প্রতিদিন পরিজ খাই। অনেক দিন পরে সোভিয়েত বা রুশ স্টাইলে ফুল কোর্স খেলাম - সালাদ, স্যুপ, মাংস দিয়ে আলু আর কম্পোত বা ফলের তৈরি সরবত। মনে মনে বললাম, এ জন্যে হলে লাঞ্চের সময়টা এখানে কাটাতে হবে।

ডাক্তার বেশ খানিকক্ষণ ধরে পরেক্ষা করলেন। কয়েক দিন আগে করা পিঠের এমআরআই আর কিডিনির সিটি স্ক্যান দেখালাম। তারপর বললেন, যদি বাসায় বা অফিসে যেতে চান, সিস্টারকে বলে যাবেন।

বাইরে গেলে সাধারণত একটা কাগজে সই করে যেতে হয়, যে বাইরে কোন সমস্যা হলে সেটার দায়দায়িত্ব রোগীর। তারপরেও বাইরে যে আসতে দেয় সেটা খুব ভালো। নাহলে ওখানে বোর হয়েই মারা যেতাম। কারণ চারিদিকে অসুস্থ মানুষ, কারো পা নেই কারো বা অন্য কিছু। এটা ঠিক, ওদের মধ্যে থাকলে জীবনকে অন্য ভাবে দেখা যায়, জীবন সম্পর্কে নতুন অনেক কিছুই শেখা যায়, তবে এর চেয়ে দুবনার প্রায় জনহীন রাস্তায় বা বনে ঘুরে বেরানো অনেক বেশি আনন্দদায়ক।

স্যালাইন নিয়ে আর ইসিজি করিয়ে গেলাম সিস্টারদের টাটা বলতে। আগামীকালের প্রোগ্রাম হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন যেন ভোর সাতটার মধ্যে আসি।
হ্যাঁ, কাগজে লেখা - সকাল সাতটায় ইউরিন দিতে হবে, এরপর ব্লাড, পরে ফিজিও থেরাপি। তবে ইউরিনের ব্যাপারটা পরে বেশ কিউরিওসিটি জাগল। ওখানে লেখা উপাসনালয়ের বিপরীতে রুমে ইউরিন রাখতে হবে। আমি মানস চোক্ষে দেখলাম ওখানে বসে কেউ নামাজ পড়ছে। কারণ অন্যরা সাধারণত এসব করে না, অন্তত রাশিয়ায়।

উপাসনালয় - ব্যাপারটা কি?
ও! মাঝে মধ্যে পাদ্রী এসে রুগীদের সাথে কথা বলে।
তাই? অন্তিম যাত্রার যাতে নিষ্কণ্টক হয় প্রার্থনা করে?

ওরা একটু হেসে উঠলো। আমি দেখালাম পাশের ওয়ার্ডে দুই জন বৃদ্ধ বসে আছেন। মনে মনে ভাবলাম, আমার এই কথা যদি ওনাদের কানে যায় তাহলে নিশ্চয়ই বিচলিত হবেন।

দুবনা, ২১ জুলাই ২০২৫

Comments

Popular Posts