মনিকার সাথে আপতেকারস্কি আগারোদে

গত মঙ্গলবার গেলাম মনিকার সাথে আপতেকারস্কি আগারোদে। এটা মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটির বোটানিক্যাল গার্ডেন। আসলে বিকেলে ডাক্তারের সাথে কনসাল্টেশন ছিল, তাই থেকে যাওয়া আর সকালটাকে কাজে লাগানো। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল চল্লিশ বছর মস্কো থাকলেও এবং গাছপালা পছন্দ করলেও কেন জানিনা এর আগে এখানে যাওয়া হয়নি। তবে গিয়ে যে খুব খুশি হয়েছি তাও না। কারণ কিছু স্নোড্রপ বা পাদস্নেঝনিকি ছাড়া কোন ফুল নেই আউটডোরে। বেশ কিছু প্যাভেলিওয়ন বন্ধ। দেখলাম শুধু ক্যাকটাস, ট্রপিক্যাল কিছু গাছপালা এই আর কি। জাপানী গার্ডেন বন্ধ। টিউলিপ সেকশন বন্ধ। দুজনে এক হাজার রুবলের টিকেট কিনে এত কম দেখা খুব ভালো কিছু নয়। তবে এটাও ঠিক, ওটা যে মেট্রোর সাথে সেটা জানা হল। এরপর ভালো কোন এক্সপোজিশন থাকলে চলে আসা যাবে। তবে এই উপলক্ষ্যে মনিকার সাথে অনেক ঘোরা হল। ওদের ছোটবেলা কেটেছে দুবনায়। মনিকার যখন দুই বছর বয়স তখন ওরা দুবনা যায়, ফেরে ১৫ বছর বয়সে। 
- আমরা যখন মস্কো আসি বাসের ভাড়া ছিল ২৮ রুবল। 
- আমি যখন আসি তখন ভাড়া ছিল ৫ কোপেক। 
- বেশ কমতো। তখন অন্যান্য জিনিসপত্রের দাম কেমন ছিল? 
- এক কেজি মাংসের দাম ছিল ২ রুবল।
- তাহলে তো বাসের ভাড়া অনেক বেশি! 
বুঝলাম কোপেকের সাথে ওরা তেমন পরিচিত নয়। তাই বললাম, 
- পাঁচ রুবল নয়, ৫ কোপেক। 
- তাই বল। তুমি রান্না তখন স্তালোভায়ায় (হোটেলে) খেতে নাকি রান্না করতে? 
- মেস করে খেতাম, তবে কাজকর্ম করতাম না বলে আমাকে প্রায় মেস থেকে বের করে দিত। তাই স্তালোভায়ায় খেতাম। 
- কেন, আলু পেঁয়াজ তো কেটে দিতে পারতে। 
- আলসেমি। 
- এতক্ষণে বুঝলাম সেভা কোত্থেকে এত অলস।  
- আসলে এটা ঠিক আলসেমি নয়, আমরা যা করতে ভালো লাগে তাই করি। 
ধীরে ধীরে সময় কেটে গেল। আমরা ফিরলাম লেনিনস্কি প্রস্পেক্ট মেট্রোয়। ও যাবে একটা দোকানে পোশাক দেখতে, আমাকে যেতে হবে গুলিয়ার শসা, টম্যাটো, ফুলের বীজ আনতে। বুকিং দেয়া ছিল।
- দেরি করিস না। পরে গ্যাগ্যারিনে চলে আয়, ওখানে কিছু খেয়ে নেব। 
আমি কাজ শেষে গ্যাগারিনে এসে ফোন করলাম। মনিকা কেবল বেড়িয়েছে। তাই আসানে ঢুকলাম মার্কার কিনতে। ওটাও গুলিয়ার জন্য। গাছের গায়ে নাম লিখবে। এরমধ্যে মনিকা এসে ফোন করল। ও ভকুস্না ও তোচকায় মানে এক্স মাকডোনাল্ডে চলে এসেছে। আমি ওদিকে গিয়ে ওকে খুঁজে পাই না। পরে ফোন করে জানলাম, সেটা অন্য দিকে, যেখানে ফুড কোর্ট সেখানে নয়। গিয়ে নিজেদের জন্য বার্গার আর কফি অর্ডার দিলাম, সেভা আর মিশার জন্য সাথে নিলাম। বুকিং করে মনিয়াক পে করতে যাচ্ছে, বললাম 
- আমি দিচ্ছি। 
- কেন?  
- পাপা কি সেলফে বসিয়ে রাখার জন্য? 
খাওয়া শেষ হলে রওনা হলাম বাসার দিকে। দেখলাম আমার সোজা হাসপাতালে চলে যাওয়া বেটার। তাই ওকে বললাম, আমাকে দেখিয়ে দিতে কীভাবে ইয়ানডেক্স ম্যাপ ব্যবহার করে জায়গাটা খুঁজে পেতে পারি। ওদিকে এর আগে যাইনি। ও বেশ ভালো ভাবে বুঝিয়ে দিল। মনিকার কাঁধে ক্যামেরার ব্যাগ ঝুলিয়ে দিয়ে আমি গেলাম ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করতে। জানি না কারো কাছে যখন ক্যামেরা দেই মনে হয় হৃদয়ের এক টুকরো দিয়ে দিলাম। যতক্ষণ না হাতে পাচ্ছি কেমন যেন টেনশন অনুভব করি। যাই হোক ১৭.০০ আপয়েন্টমেন্ট ছিল। গিয়ে দেখি তখন ১৬.০০ রোগী অপেক্ষায়। শেষ পর্যন্ত ডাক এলো। ইয়ং ডাক্তার - মনে হয় তিরিশের কোঠায়, তাতার মনে হয়। আগে অল্প বয়সী ডাক্তার দেখলে এক ধরণের অবিশ্বাস জন্মাত, এখন বেশ ভালই লাগে। অল্প বয়সী ডাক্তাররা বেশ ভালো সার্ভিস দেয়। একটা বিষয় খেয়াল করলাম - ডাক্তার পুরুষ হলে রোগীর প্রতি খুব বেশি আবেগ দেখান না, মহিলা হলে উল্টোটা। মহিলা ডাক্তার বারবার বলেন কিভাবে কি খেতে বা করতে হবে, পুরুষ ডাক্তার একবার বলেই শেষ। বাচ্চারা যখন ছোট ছিল ওদের নিয়ে নিয়মিত ক্লিনিকে যেতে হত। এটা এ দেশের নিয়ম। না গেলে ডাক্তার নিজেই বাসায় চলে আসেন। ইঞ্জেকশন বা টিকা নিতে হয় নিয়মিত। গুলিয়া ওদের সাথে গেলে আগেই ওরা চিৎকার শুরু করত। গুলিয়ার ভয় ওদের মাঝে সংক্রামিত হতে। আমি গেলে চুপচাপ। কারণ আমি জানতাম যদি ব্যথা একটু আধটু পায় তো বাচ্চারা পাবে। আমার কিছু হবে না। ডাক্তাররাও মনে হয় এই নিয়মেই চলেন।

বাসায় ফেরার পর মিশা বেশ দ্রুত রানা করে ফেলল। দ্রুত মানে - তাও ঘণ্টা খানেকের বেশি। আমি রান্না করি ২০ থেকে ২৫ মিনিটে। সে তুলনায় এটা অনন্ত কাল। ওর সেকেন্ড আইটেম শেষ হয়নি। আমার ট্রেন। তাই যা ছিল খেয়ে চলে এলাম। বলল, আগামী রবিবার যখন আসব, ও আবার সেটা করবে - আস্ত মাংসের টুকরা ফ্রাই প্যানে ভেজে এরপর অল্প আগুনে ঘন্টা খানেকের জন্য ওভেনে ঢুকিয়ে দেয়। এমন রান্না শেষ হতে হতে মনে হয় ক্ষুধায় মরে যাওয়া যায়।

মস্কোর পথে, ২৩ মার্চ ২০২৫

Comments

Popular Posts