বাড়ি

রাত বারোটার দিকে সেভাকে বললাম চা করে দিতে। ও চায়ের সাথে বিভিন্ন ধরনের ডাল পালা দেয়। একটু অন্যরকম স্বাদ।
- এতে তোমার রাতে ঘুমের সমস্যা হবে না তো?
- দে তো দেখি।
ল্যাভেন্ডার দেয়া চায়ের গন্ধই আলাদা। অর্ধেক কাপ খেয়েই মনে হল মাথায় লাগছে। তারপরেও বাকিটা খেলাম। সকালের লেকচার দেখতে দেখতে মাথা ব্যথা বাড়ল। প্রেসার মেপে দেখি ১৫৫/৯৮। কি করা? সেভা অবশ্য এর মধ্যে এসে কয়েকবার জিজ্ঞেস করে গেছে খারাপ লাগছে না তো। অনেকক্ষণ পরেও যখন প্রেসার খুব একটা কমল না আরও একটা ট্যাবলেট খাওয়ার কথা ভাবলাম। তবে শেষ পর্যন্ত না খেয়েই শুয়ে পড়লাম। আসলে শুয়েই ছিলাম। শুধু টিভি অফ করলাম, খাতা কলম আর ফোন সরিয়ে রাখলাম। রাতে বরাবরের মতই বেশ কয়েকবার ঘুম ভাঙল। আসলে সকালে ওঠার ঝামেলা থাকলেই আমার ঘুম মাটি হয়ে যায়। সকালে দেখি প্রেসার ঠিক হয়ে গেছে। স্নান খাওয়া সেরে চলে গেলাম ভার্সিটি। ক্লাসে গিয়ে দেখি কেউ নেই। মিনিট কুড়ি অপেক্ষা করে ডিপার্টমেন্টে ফিরে এলাম। সোয়া দশটার দিকে সের্গেই এসে বলল আজ ক্লাস সাড়ে দশটা থেকে। এক সপ্তাহে নয়টায় শুরু, আরেক সপ্তাহে সাড়ে দশটায়। ক্লাসে জনা তিরিশ ছাত্র ছাত্রী। উপস্থিত একজন। ওকে ধীরে সুস্থে কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়িয়ে ডিপার্টমেন্টে এসে দেখি আমার সাথে যারা থিসিস লিখবে তাদের কয়েকজন দাঁড়িয়ে। ওদের ক্লাস নিলাম গ্র্যাভিটেশনের উপর। এরপর আবার ইলেক্ট্রোডাইনামিক্সের ক্লাস। এবার দুজন উপস্থিত। পর পর দুটো ক্লাস। একটু আগেই ছেড়ে দিলাম। এরপর ডিপার্টমেন্টের সাপ্তাহিক সেমিনার। গত সপ্তাহে আমার রিপোর্ট ছিল কসমোলজির উপর, আজ ইউরি পেত্রোভিচের কোয়ান্টাম মেকানিক্সের উপর। এরপর চায়ের আয়োজন। চায়ের আগে অবশ্য ওয়াইন, ভোদকা, কনিয়াক সার্ভ করি যে যেটা পছন্দ করে। সাথে স্যান্ডউইচ। তবে এখনকার মূল উপভোগ্য বিজ্ঞানের উপর খোলামেলা আলোচনা। আমি ও আমার দু তিনজন বন্ধু ষাটের দশকে পা দিয়েছি, বাকিরা অশতিপর। তারা মাঝেমধ্যে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলেন। বলেন তাদের ছাত্রজীবনের গল্প, গবেষণার কথা। এই সেমিনার আমার উদ্যোগেই শুরু। সোমবার অন্য কারো ক্লাস থাকে না তাই আমার শিক্ষকদের সাথে দেখা হয় না। এজন্য সেমিনারের আয়োজন। ভয় ছিল এই বয়সে তাঁরা আসবেন কি না। এখন সবাই এই দিনটির অপেক্ষায় থাকে। বিভিন্ন ইনস্টিটিউট থেকে আসে। করোনার সময় সব অনলাইনে চলে যাবার পরে মুখোমুখি মেলামেশার চাহিদা বেড়েছে। একসময় ইউরি পেত্রোভিচ মনে করিয়ে দেন সেভা অপেক্ষা করছে। আমি যেন দুবনা ফেরার আগে ওকে সময় দিতে পারি। 

বাসায় ফিরে দেখি মনিকা স্যুপ রান্না করেছে। সেভাকে জিজ্ঞেস করলাম খেয়েছে কিনা। 
- আমি স্যুপ খাব না।
তাড়াতাড়ি মাংস বের করে রান্না বসালাম। সেভা আলু পেঁয়াজ কেটে দিল।
- তোমার শরীর এখন কেমন?
- হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। পায়ে ব্যথা।
- আমি ম্যাসাজ করে দিচ্ছি।
সেভা পা টিপে দিচ্ছে। আমার মনে পড়ছে ছোটবেলার কথা। আমরাও বাবা মার পা টিপে দিতাম। একসময় রান্না শেষ। খেয়ে আমি চললাম দুবনার পথে। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে। অবশ্য আমি যখন অফিসে যাই বা ডিপার্টমেন্টে সেটাও আমার বাড়ি বলেই মনে হয়। এমনকি ভোলগার তীর বা বন। আমার অবস্থা অনেকটা কচ্ছপের মত। যেখানেই যাই বাড়িটা সাথে সাথে যায়। আমি যখন মস্কো, তরা বা দুবনা নিয়ে কথা বলি প্রায়ই বাড়ি শব্দটা চলে আসে। গুলিয়া প্রায়ই বুঝতে পারে না ঠিক কোন বাড়ির কথা বলছি। মহা মুস্কিল।

দুবনার পথে, ০৩ মার্চ ২০২৫

Comments

Popular Posts