অভাগা যেদিকে চায়
অনেক আগে মস্কোয় যখন টাকার ছড়াছড়ি তখন তখন সিঙ্গাপুর, তুরস্ক গিয়েও আমার ঋণের বোঝা দেখে বন্ধুদের অনেকেই বলত অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকিয়ে যায়। এখনও যে খুব একটা ভাল অবস্থা তা নয়, তবে এখন ঋণ ব্যাঙ্কের কাছে। যাহোক, আজ অন্য গল্প।
গত বছর সামারের শুরুতে এক ছেলে এসে বলল
-স্যার, আমি আপনার সাথে কাজ করতে চাই।
- ভাল, তা তুমি কি করছ?
- সেপ্টেম্বর থেকে মাস্টার্স শুরু করব। আগামীকাল দেশে যাব ভিসা সংক্রান্ত ব্যাপারে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে সামসোনেঙ্কো এক ছেলেকে এনে বলল,
- ও তোমার সাথে কাজ করতে চায়। ভাল ছেলে।
তারপর ওরা দু' জন আমার সাথে কাজ করতে শুরু করল। আমার ছাত্রদের জন্য আমি এক্সট্রা কি৮ছু ক্লাস নেই রিলেটিভিটি আর কসমোলজির উপরে। ওরা নিয়মিত আসে। চেষ্টা করে।
এবার আমার রুটিন একটু অন্য রকম। ১০.৩০ থেকে ১৬.২০ পর্যন্ত এক নাগারে চার ক্লাস। ৮০ মিনিট ক্লাস, ১০ মিনিট ব্রেক। এরপর দিপারট্মেন্টের সেমিনার। তাই আমার ছাত্রদের সাথে দেখা করি সকালে। ৯.০০ - ৯.২০ পর্যন্ত। গতকাল এসে দেখি একজন বসে আছে। ওর সমস্যা শুনলাম। এর আগে কিছু টাস্ক পাঠিয়েছিয়াম অনলাইনে। ও বলল একটু আগে থেকে শুরু করেছে। আমাকে ওর খাতা দেখতে দিলে বুঝলাম লিখছে ফ্রেঞ্চ ভাষায়।
- তুমি ফ্রেঞ্চ ভাষায় লিখলে। তুমি কোন দেশ থেকে?
- গিনি।
আমি এতক্ষনে বুঝলাম আমি ওকে গিদন বলে ভুল করছিলাম। ও আসলে ইউজিন।
- তুমি যে কসমোলজির উপর কাজ করছ, দেশে গিয়ে কি করবে?
- জানি না।
- তাহলে এই সাবজেক্ট বেছে নিলে কেন?
- আসলে দেশে আমি মাইনিং-এর উপর ব্যাচেলর ডিগ্রি করেছি। অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়ে রাশিয়া এসে দেখি মাইনিংএ ওরা নিচ্ছে না। তাই তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যায় আপনার কাছে।
- গিদন কি এদেশে লেখাপড়া করেছে?
- না, ও নাইজেরিয়ায়। কেমিস্ট্রিতে।
কিছুক্ষণ পরে গিদন এল। গত এক বছরে ওরা কেউ আমাকে বলেনি এসব কথা। অবশ্য আমিও জানতে চাইনি। ভেবেছি ফিজিক্সেই পড়াশুনা করেছে।
আচ্ছা তোমরা ইলেক্ট্রডাইনামিক্স পড়েছ? স্পেশাল রিলেটিভিটি? কোয়ান্টাম মেকানিক্স?
- না। আমাদের ওসব ছিল না।
- তাহলে, হোয়াট হেল তোমরা আমার কাছে এসেছ? আগে বলনি কেন তোমাদের ফিজিক্সের ব্যাকগ্রাউন্ড নয়।
- স্যার, প্রথম দিকে কিছুই বুঝতাম না। এখন ভালই লাগছে।
- ঠিক আছে। এই সাবজেক্টে কাজ করে ইন্টারেস্ট পাও।
- খুব।
- যাক।
আজ দুবনায় আমার কাছে প্রাক্টিক্যালে তিন ছাত্র এসেছে। দুইজন সারবিয়ার, একজন ইজিপ্টের। পরিচয়ের পরে জিজ্ঞেস করলাম কে কি করছে।
- মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং।
- প্রোগ্রামিং।
- প্রোগ্রামিং।
- আমি তোমাদের নিয়ে কি করব?
- স্যার, আমাদের টেনসর আনালাইসিস সম্পর্কে বলেন আর কসমোলজি সম্পর্কে।
আমি বুঝি না, এরা কি ভেবে আসে। আমি ঠিকই ক্লাস নিলাম। কিন্তু ওদের চোখের ভাষায় বোঝা যাচ্ছিল - ওরা ঠিক বুঝতে পারছে না ইন্ডেক্সের ওঠানামা। ওদের আর কি দোষ। মনে হয় আমার তাকানোতেই যত সমস্যা।
বছর তিনেক আগে ডীন অফিস থেকে ফোন করে বলল এক আমেরিকান তোমার আন্ডারে পিএইচডি করতে চায়। বুঝতে দিল যে তারা চাইছে আমি ওর সাথে কাজ করি। দেখা হলে বুঝলাম সে ইন্ডিয়ান আমেরিকান। দেশে মানে ভারতে পড়াশুনা। এরপর আমেরিকায়। আমার পোর্টফোলিও দেখে কাজ করার আগ্রহ জেগেছে। স্বাভাবিক ভাবেই রাজী হলাম। ও এডমিশন নিল। পরে জানলাম তার ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাকগ্রাউন্ড। চেষ্টা করে। তবে আমাদের যেহেতু বেশিরভাগ জিনিষ আবস্ট্রাক্ট তাই পদে পদে সমস্যা। আমার অবস্থা সেই ছড়ার মত
তোমার মাথায় কি?
আমের বোঝা।
খাও না কেন?
দাঁতে পোকা।
ফেলাও না কেন?
ওরে বাপরে বাপ।
হ্যাঁ, অনেক সময় ব্যয় হয়েছে ওর পেছনে। তাই না করতেও বাঁধে আবার টানাও দিন দিন কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।
দুবনা, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Comments
Post a Comment