পারিবারিক
সেদিন সকালে উঠে দেখি চাকুগুলো আগের জায়গায় নেই। আমি অবশ্য এই চাকু ব্যবহার করি না। তবে বুঝলাম সেভা নিজের সুবিধামত জায়গায় রেখেছে। এতে আমার সমস্যা হয় না, তবে গুলিয়া এলেই এ নিয়ে হইচই করবে।
সেভার কাজ দেখে আমার মনে পড়ল ১৯৯৮-১৯৯৯ সালের কথা। তখন রতন প্রায়ই আমাদের বাসায় বেড়াতে আসত আর ও চলে যাবার পরে টিভি চ্যানেল থেকে শুরু করে কাপ প্লেট সব নতুন করে আগের জায়গায় আনতে হত।
২০০৮ সালে এক পশলা ঝগড়ার পরে গুলিয়া বাচ্চাদের নিয়ে মস্কো চলে যায়। আমি সাধারনত উইকএন্ডে যেতাম ওদের সাথে দেখা করতে। আর গুলিয়া বছরে একবার সামারে কয়েক দিনের জন্য দুবনা আসত বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে। ও চলে যাবার সময় নিজের মত করে কাপ প্লেট এসব সাজিয়ে রেখে যেত। এ নিয়ে আমার কোন সমস্যা ছিল না। আমি ও ভাবেই ব্যবহার করতাম পরের বছর গুলিয়া আবার অন্য ভাবে সেসব সাজানো না পর্যন্ত। তো একবার কৌশিক এল আমাদের ইনস্টিটিউটে কয়েক দিনের জন্য। আমরা মাঝেমধ্যে রাতে বাসায় আড্ডা দিতাম। বাসায় একা। সবচেয়ে বড় কথা কুকুররা তখন মস্কোবাসী। তাই মাঝেমধ্যেই পরিচিতদের নিয়ে আড্ডা দেয়া যেত, ছবিও তুলতাম স্টুডিও বানিয়ে। তা কৌশিক যাবার সময় প্লেটগুলো উলটো করে রেখে বলল এতে ধূলা পড়বে পেছন দিকে, প্লেট পরিষ্কার থাকবে। পরে গুলিয়া এসে প্লেট ওভাবে দেখে সে কি জেরা। আসলে আমি বুঝি না, কাপ প্লেট কীভাবে রইল তাতে সমস্যা কোথায়?
যখন প্রথম দুবনা আসি, তার মাস খানেক পরে কিছু অন্য শহর থেকে কয়েকজন কলিগ এলেন একসাথে কাজ করার জন্য। একদিন দুপুরে জিজ্ঞেস করলেন
-তুমি আমাদের সাথে খাবে?
-চলুন।
-তাহলে ফ্রিজ থেকে হ্যাম নিয়ে আস।
-সেটা না হয় বুঝলাম, কিন্তু ফ্রিজ কোথায়?
দেখা গেল আমি যে টেবিলে বসে কাজ করি তার পাশেই ফ্রিজ। এক মাসেও আমি টের পাইনি। অনেক সময় আমার মনে হয় আমি সেই অথর্ব মানুষ যাকে কোথাও বসিয়ে হাতে কিছু একটা ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। আশেপাশে কি আছে সেদিকে খেয়াল নেই। এ নিয়ে গুলিয়ার কাছে প্রায়ই কথার গুলি খেতে হয়। যাহোক, সমস্যা হল, সেভা যদি ওলটপালট কিছু করে তার দায়টা আমার ঘাড়েই পড়বে।
সেভা এসেছে কুকুরদের দেখভাল করতে। গুলিয়া গেছে বেলারুশ। সাথে ক্রিস্টিনা। সেভা অবশ্য এমনি এমনি আসেনি। দিন প্রতি ৫০ ডলার করে বেতনের বিনিময়ে। কিন্তু এসেই নিজের মত করে সব এদিক ওদিক করা শুরু করেছে। তবে মায়ের কাছে বেতন নিলেও বাবার কাছে বেড়াতে যে এসেছে সেটা ও ভোলে না। প্রতিদিন সন্ধ্যায় একটা করে বিল ধরিয়ে দেয়। যদিও আমি রান্না করি ও দেখি রেডিমেড খাবার খেতেই পছন্দ করে। হতে পারে আমার রান্না তেমন টেস্টি না সেটা সরাসরি বলতে চায় না। আমারও সুবিধা। রান্না নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না। এই তো রোববার মস্কো গেলাম। পথে চন্দনদের সাথে গল্পগুজব করলাম। ভাবলাম মনিকা নিশ্চয়ই রান্না করেছে। ওখানেই খাব। বাসায় পৌঁছানোর পর মনিকার ফোন
-পাপা, তুমি কোথায়?
-এইমাত্র বাসায় ঢুকলাম। কেন?
-তাহলে বিড়ালদের খাবার আর জল দিও। আমরা আর দিন দুয়েক বন্ধুর বাগান বাড়িতে থাকব।
কী আর করা। বিড়ালদের পেছনে স্বেচ্ছাশ্রম দিলাম।ফ্রিজে রান্নার বিভিন্ন জিনিস আছে। কিন্তু আলসেমি। তাই কয়েকটা ডিম পোজ করে খেয়ে নিলাম। পরের দিন সকালে আবার ডিম পোজ। খেয়ে ভার্সিটি। ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে সালাদ কিনলাম। ওটা খেয়ে গেলাম সেন্টারে অমলের সাথে দেখা করতে। চন্দনদের না পেয়ে বাসায় ফিরলাম মিনিট চল্লিশের জন্য। আবার ডিম পোজ। আসলে কেউ না থাকলে রান্নাটা ঠিক করতে ইচ্ছে করে না। আমি মস্কো এলে গুলিয়া বলে সামুদ্রিক মাছ, সল্টেড মাছ এসব কিনে রাখতে। অথবা পিলিমেনি - যা সেদ্ধ করে খাওয়া যায়। আলসেমিটা মনে হয় আমাদের পারিবারিক।
মস্কো, ০৯ জুন ২০২৬
Comments
Post a Comment