সুবোধ দা

২৪ জুন ২০২৪। ঘুম ভাঙতেই দেখি কল্যাণ দার মেসেজ। সে সময় আমাদের সোভিয়েত ফেরতদের সংগঠন সাবের নির্বাচনী প্রচার তুঙ্গে। তাই সারা রাত ধরেই বিভিন্ন মেসেজ আসে। তবে কল্যাণ দার মেসেজ পেয়ে প্রথমেই মনে হল সুবোধ দার কিছু হল না তো? মাত্র দু দিন আগে কল্যাণ দার সাথে কথা হল। জিজ্ঞেস করলাম সুবোধ দার কথা। বলল, হাসপাতাল বাড়ি এভাবেই চলছে, এখন মনে হয় কাউকে তেমন চিনতেও পারে না। লাইফ সাপোর্টেই দিন কাটছে। ওটা ছিল সুবোধ দার মারা যাবার খবর।

সুবোধ দা আমাদের সাত ভাই এক বোনের মধ্যে সবচেয়ে বড়। মজার ব্যাপার হল আজীবন সাত ভাই আর এক বোন বা অনেকের ভাষায় সাত ভাই চম্পা নামে আমাদের ডাকা হলেও কখনোই আমরা একসাথে মিলিত হইনি। আমার হিসেব মতে সবচেয়ে বড় সমাবেশ ঘটে আমার জন্মের পরে। তখন বাড়িতে ছিল ছয় ভাই আর এক বোন। আমার ছয় মাস বয়সে বাড়িতে ডাকাত পড়ে। এরপর স্বপন দা ইন্ডিয়া চলে যায়। আর কখনও দেশে আসেনি। ফলে একসাথে দেখেছি আমাদের পাঁচ জন আর দিদিকে। সুবোধ দার শুধু নামই শুনেছি। দেখেছি মাত্র তিন বার ইন্ডিয়া বেড়াতে গেলে। পরে ২০১৪ সালে সুবোধ দার মুখেই শুনেছি ও শেষ বারের মত বাড়ি আসে শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে। সেটা ১৯৬২ সাল। তার মানে আমার জন্মের দুই বছর আগে। ফলে আমাদের সবার এক হওয়ার কোন সম্ভাবনাই ছিল না।

সুবোধ দা আমাদের সৎ ভাই যদিও সেটা কখনও মনে হয়নি। শুধু লেখার স্বার্থেই এটা লেখা। জন্মের সময় বা কিছু দিন পরে ওঁর মা মারা যায়। যেহেতু আমাদের সেই মা ছিলেন ঝিটকা জমিদার বাড়ির মেয়ে তাই দিদিমা সুবোধ দাকে নিজের কাছেই নিয়ে যান। পরে বাবা আবার বিয়ে করেন। সেই ঘরেই আমরা বাকি ছয় ভাই ও এক বোন। যদি ভুল না করি সুবোধ দার জন্ম ১৯৪২ সালে। দেশ ভাগের সময় ঝিটকার সবাই ইন্ডিয়া চলে গেলে দাদাও তাদের সাথেই চলে যান। সেখানেই পড়াশুনা, সেখানেই ঘর সংসার, সেখানেই সব। ২০১৪ সালে দাদার মুখেই শুনি ছোটবেলায় ঝিটকা আর তরা করেই তার সময় কাটে। বড় জ্যাঠামশাইয়ের অনেক গল্প করলেন। তাঁকে আমি দেখিনি। আমার জন্মের আগেই তিনি মারা যান। ঝিটকার সবাই ভারতে চলে গেলে তিনিও তাদের সাথেই চলে যান। তবে ছুটিতে আসতেন। শেষ বার আসেন ১৯৬২ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ শেষ করে। এরপর চাকরি জীবন, ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ, সুবোধ দার নামে ঝিটকায় যে সম্পত্তি ছিল সেটাও শত্রু সম্পত্তি হয়ে যাওয়া - এসব কারণে আর আসা হয়ে ওঠেনি। ২০১৪ সালে আমি যখন দেশে আসতে বলি, বললেন এখন আর পাসপোর্ট ভিসার ঝামেলা করতে চাই না। তোরা সবাই মিলে কোলকাতা চলে আয়, ওখানে দেখা করি।

তবে না দেখলেও নামে সুবোধ দাকে চিনি জন্মাবধি। কারণ আমাকে ছোটবেলা থেকেই শুনেছি আমরা সাত ভাই এক বোন আর নামগুলো নামতার মতই মুখস্ত ছিল – সুবোধ, সুধীর, স্বপন, তপন, কল্যাণ, রতন, বিজন আর দিদির নাম বন্যা। এখনও এই নাম থেকে কোন একটা বাদ পড়লে তা ছন্দ হারিয়ে ফেলে। দাদাকে প্রথম দেখি ১৯৬৯ সালে ইন্ডিয়া বেড়াতে গেলে। আমাদের তখন একান্নবর্তী পরিবার। মেঝমা, মা আর খুড়িমা পালা করে রান্না করেন। তিন মাস করে শেফের দায়িত্ব, অন্যেরা সাহায্য করে। তিন মাসের রান্নার পালি শেষ হলে মা তিন মাসের জন্য চলে যান ইন্ডিয়া ভাইবোনদের কাছে। কোতরঙ-এ ছোট দাদুর ওখানে কিছু দিন থেকে বহরমপুর মামা ও মাসিমার কাছে, এরপর বড় দাদুর বাসা হয়ে এক সময় সুবোধ দার ওখানে। কোলকাতায় ভাগুদা, দীপুদা, স্বপন দা থাকে বেহালায়। আর তীর্থ ভ্রমণ তো আছেই। এভাবে তিন মাস কাটে। সেবার আমরা যাবার পর দাদা কোলকাতা থেকে আমাদের নিয়ে গেলেন বোকারো স্টিল সিটিতে। ওর পোস্টিং ওখানে। তখন স্বপ্ন বৌদি সন্তানসম্ভবা। আমিই তাকে সাদ খাওয়াই। সেটা বাপির জন্য। সুবোদ দার বড় ছেলে, আমাদের বংশেরও। অনেক পরে ২০১১ সালে রতনের ছেলের সাদও আমিই খাওয়াই। ঋতম আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের শেষ প্রতিনিধি। দাদা তখন কাজে ব্যস্ত। আমিও খুব ছোট। তাই খুব একটা কথাবার্তা হয়েছে বলে মনে হয় না। তবে প্রায়ই বিকেলে আমাদের নিয়ে যেতেন অশোক মামার ওখানে। তিনিও সেখানে ইঞ্জিনিয়ার। মার সেজো ভাই। একটু দূরে থাকেন। হেঁটেই যাওয়া যায়। এরপর দেখা ১৯৭২ সালে কোলকাতায়। স্বাধীনতার পরে। তখন তাঁর একটা অপারেশন হয়েছিল। সেসব দিনে অপারেশন মানেই বিশাল ব্যাপার। তাই হাসপাতাল বেডে শুয়ে থাকার ছবি ছাড়া কিছুই মনে নেই। এরপর ১৯৮০ সালে কোলকাতায় গেলেও দাদার সাথে দেখা হয়নি। ওরা মনে হয় তখন বিশখাপত্তম ছিল। ১৯৮৯ সালে বাবার সাথে আবার গেলাম। দাদা তখন দিল্লীতে। ফোন করে বললেন বিমানের টিকেট পাঠিয়ে দেবেন, আমি যেন বেড়াতে যাই। কিন্তু বাবার শরীর খারাপ থাকায় আর যাওয়া হয়নি। ১৯৯৭ সালে ভাগুদা মারা গেলেন। তখন মনে হল দেশে ফিরে সবার সাথে দেখা করা দরকার। ১৯৯৭ সালে তাই গেলাম পুনেতে এক কনফারেন্সে। উদ্দেশ্য পাশাপাশি আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা করা। সেবার দাদার সাথে দেখা হয়নি তাঁর কর্ম ব্যস্ততার কারণে। বৌদি আর বাপি কোলকাতায় ছিল। ২০১৪ সালে যখন ইন্ডিয়ার বিভিন্ন ইনস্টিটিউটে যাই দেড় মাসের ট্যুরে তখন স্পেশালি মুম্বাই যাই দাদার ওখানে। সেবারও আসামে একটা কাজে যাবার কথা ছিল, তবে ম্যানেজ করেছিলেন। এটা ছিল দাদার সাথে তৃতীয় বার দেখা। আমি কোলকাতা, ভুবনেশ্বর, চেন্নাই হয়ে পুনে এলাম। সেখান থেকেই মুম্বাই হয়ে এলাহাবাদ, দিল্লী ঘুরে কোলকাতা – তারপর ঢাকা। টাটা ইনিস্টিটিউটে দুদিনের জন্য যাওয়া। পুনেতে ছিলাম দশ দিন। বাপির পাঠানো গাড়িতে পৌঁছে গেলাম মুম্বাই। ১৯৭২ থেকে ২০১৪ – দীর্ঘ ৪২ বছরের গ্যাপ। চিনব কি? গাড়ি থেকে নামতেই দেখি দাদা দাঁড়িয়ে আছে। চিনতে এতটুকু অসুবিধা হয়নি। এখন দেখতে বাবার মত। তেমনি গোলগাল মুখ। ওদের নিজদের বাড়ি মুম্বাইয়ের উপশহরে। ছেলের ও মেয়ের আলাদা বাড়ি। তবে তখন সবাই থাকত ভাড়া বাড়িতে। বললেন

- বুঝলি, পরিচিত এলাকা। এত দিন আছি। অফিস কাছে। নাতনীরা আছে। আজকালকার দিনে যার যার বাসায় গেলে তো দেখা করার সময় হবে না।

এতদিনে আমার অনেক প্রশ্ন জমে গেছে। বিশেষ করে বাবাকে নিয়ে। তাঁর কলেজ জীবন, আসামে হারিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। বাবার জীবদ্দশায় জানা হয়নি। এরপর যারা বলতে পারতেন তারাও এই গ্রহ ত্যাগ করে অসীমের পথে পাড়ি জমিয়েছেন। দাদাই একমাত্র সম্বল। কিন্তু উনি তো ছোটবেলা থেকেই মামাদের সাথে থাকেন। তাই নতুন করে কিছু বলতে পারলেন না। সেদিন ওখানেই ছিলাম। অনেক গল্প হল।

- বয়স তো অনেক হল। তাই মৃত্যু নিয়ে তত ভয় করি না। তবে ভয় কি জানিস? আমাদের বাড়ির সবাই দীর্ঘ দিন রোগে ভুগে মারা যায়। কে জানে আমাদের কী হবে?
- হ্যাঁ, জ্যাঠামশাই, বাবা, কাকা, মা, মাসিমা যারা ইতিমধ্যে মারা গেছিলেন সবাই দীর্ঘদিন বিছানায় পড়া থেকে মারা গেছেন। জানি না এটা পারিবারিক কি না।

আসলে একটা বয়সে মনে হয় চাকরি বাকরি, সাফল্য ব্যর্থতা, ছেলেমেয়ে এসবে স্থান দখল করে অসুখ বিসুখ। তখন দেখা হলে শারীরিক সমস্যা নিয়েই বেশি কথা হয়। যাহোক, পরের দিন সকালে আমি চলে গেলাম টাটা ইনস্টিটিউটের গেস্ট হাউজে। বিকালটা ওখানে কাটল। পরের দিন সেমিনার। এর আগে গেলাম এলিফান্টা। কখন যে মোবাইল ফোনটা মিউট হয়ে গেছে জানি না। সেমিনারের পরেও একই অবস্থা। কথা ছিল পরের দিন ভোরে আমি এখান থেকেই বেনারস ফ্লাই করব, ওখান থেকে গাড়িতে এলাহাবাদ। সন্ধ্যার দিকে রিসেপশন থেকে কল এল।

- একজন লোক নীচে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।

গিয়ে দেখি ড্রাইভার বসে আছে। দাদা সারাদিন ফোন করে না পেয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। রাতটা ওদের সাথে থেকে ওখান থেকেই এয়ারপোর্টে যেতে হবে। আবারও বাড়ির গল্প। আসলে ইন্ডিয়া বেড়াতে গেলে দাদারা সাধারণত গ্রামের বিভিন্ন জনের কথা জিজ্ঞেস করে, জানতে চায়। আমি নিয়েও তখন ত্রিশ বছরের উপরে বাইরে। তাই সবার কথা বলা হয় না, আর সবাইকে আমি চিনিও না। বিশেষ করে ওদের ছোটবেলার লোকজনদের। সকালে বেরুনোর আগে দাদা আমার হাতে একটা ইনভেলপ ধরিয়ে দিলেন।

- বাচ্চাদের জন্য কিছু কিনে নিয়ে যাস।

২০১৪ থেকে ২০২৪ দীর্ঘ ১০ বছর। দাদা বেশ কিছুদিন প্রচণ্ড অসুস্থ। শেষের অপারেশনটা মনে হয় পুরোপুরি সফল হয়নি। শেষের দিকে তো কাউকেই চিনতে পারতেন না। হুইল চেয়ারে বসে থাকা। মজার বিষয় হল আগে যখন আজকের মত মোবাইল ছিল না তখন ওদের সাথে যোগাযোগ অনেক বেশি ছিল। চার মামা, মাসিমা, সুবোধ দা নিয়মিত মা বাবাকে চিঠি লিখতেন। এমন দিন খুব কমই ছিল যখন বাড়িতে চিঠি না আসত। হয়তো মা বাবা বেঁচে থাকলে প্রতিদিন সবার এসএমএস আসত। অসুস্থ হবার আগে দাদাকে কয়েক বার কল করেছি। তবে কমন স্মৃতি না থাকলে কথা খুব বেশি দূর এগোয় না। অসুস্থ থাকার সময় দুই একবার ভিডিও কলে দাদাকে দেখেছি। আর মনে হয়েছে মুম্বাই ভিজিটের সময় তাঁর সেই আশংকা – আমাদের সবাই রোগে ভুগে অনেক কষ্ট করে মারা যায়। যদিও যারা বেঁচে থাকে তাদেরও প্রচণ্ড কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন কাটে, তারপরেও প্রায় সবাই কেন যেন শেষ চেষ্টা করে দুই পক্ষের কষ্টটা আরও দীর্ঘ করতে।

আজ ২৮ জুন ২০২৫। ঠিক এক বছর আগে সুধীর দা আর দিদির পরে আমাদের সাত ভাই চম্পা নামের মালার আরও একটি ফুল হারিয়ে গেছিল।

দুবনা, ২৪ জুন ২০২৫

Comments

Popular Posts