সমাধি

যদিও রাশিয়ায় থাকি প্রায় ৪২ বছর আর নভদেভিচি মনাস্তিরের লেক ও পার্ক মস্কোয় আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গার একটি তারপরও কখনোই নভদেভিচি সমাধি ক্ষেত্রে যাওয়া হয়নি। ক্রেমলিনের দেয়ালের পর এটাই হয়তো এদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমাধি ক্ষেত্র। গতকাল মস্কো এসে যখন মনিকাকে জিজ্ঞেস করলাম কিছু দরকার হলে দোকানে যেতে পারি ও প্রস্তাব দিল বাইরে খাওয়ার। সেভা যেতে চাইল না। মনিকা বলল হাঁটতে হাঁটতে গ্যাগারিন মার্কেটে যেতে। হেঁটে ওখানে যাওয়া মানে অনেক সিঁড়ি ভাঙা। সেভা বলল আমরা যেন তাহলে অন্য রাস্তায় যাই। যাহোক শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো দোকান থেকে মাংস কিনে বাড়িতেই রান্না করব। পথে মনিকা বলল 
- চল নভদেভিচি সমাধি ক্ষেত্রে যাই। তুমি তো যাওনি।
- চল।
এ যেন ইতিহাসের বই খুলে বসা। কত পরিচিত মানুষের সমাধি। পরিচিত মানে বিখ্যাত। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার আমার মনেই হল না এটা মৃত্যুপুরী। এ যেন জীবন্ত ইতিহাস বা ইতিহাস এখানে যেন জীবন্ত হয়েছে। হঠাৎ চোখে পড়ল আন্দ্রেই গ্রোমিকোর সমাধি। মিঃ নো। আমার শিশুকাল আর যৌবন কেটেছে তাঁকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেখে। একটু দূরে ফিওদর শালিয়াপিন বসে আছেন। আসলে রুশ দেশের ও সোভিয়েত ইউনিয়নের শিল্পী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, নভোচারী, রাজনীতিবিদ কে নেই সেখানে? ভাভিলভ, কুরচাতভ, তোপোলেভ, তিতভ, খ্রুশেভ, ঝিরিনভস্কি, লিওনভ, দুরভ। গত শতকের চল্লিশের দশকের ফিজিক্যাল রিভিউ, প্রসেডিংস অব রয়াল সোসাইটি খুললেই যেমন একেরপর এক বিশ্বখ্যাত পদার্থবিদদের লেখা চোখে পড়ে এখানেও ঠিক তাই। রুশ ইতিহাসে এদের কারো গুরুত্ব কারো চেয়ে কম নয়।
দেয়ালে কিছু ফাঁকা খুপরি দেখে মনিকা বলল
- ওখানে কিন্তু ফাঁকা জায়গা আছে।
- হ্যাঁ এখন মরাটাই বাকি। তবে তার আগে অনেক যোগ্য করে তুলতে হবে নিজেকে। 
এর মধ্যেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। হালকা বৃষ্টি অবশ্য। আমাদের মত মানুষ দুই ফোঁটার মধ্য দিয়ে দিব্যি চলে যেতে পারে। ওখান থেকে বেরিয়ে গেলাম দোকানে। কেনা কাটা করে ফিরতেই সেভা বলল ওর খুব ক্ষিদে পেয়েছে। দ্রুত রান্না শেষ করে খেতে বসেছি তাইনা এসে হৈচৈ শুরু করল। কী দুবনায়, কী মস্কোয় - আমি খেতে বসলেই কুকুরদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। ওদের ধারণা আমি হয়তো ওদের খাবার খাচ্ছি। বিড়াল গুলো এদিক থেকে বেশ ভদ্র। নিজেদের খাবার খায়, আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। এর মধ্যেই সেভা নিজের গাছের স্ট্রবেরি তুলে বলল ছবি তুলতে মাকে পাঠাবে বলে। একটাই মাত্র স্ট্রবেরি। দুই টুকরো করা। ছবি তোলার পর আমাকে এক টুকরা নিতে বলল। ভাবলাম ওটাকে দু'ভাগ করে মনিকাকে অর্ধেক দেই। কিন্তু কি মনে করে যেন খেয়ে ফেললাম। বেশ টেস্টি। সেভা ওর ভাগ থেকে অর্ধেক কেটে তাইনাকে খাইয়ে বাকিটা নিজে খেল। আমার এখনও পর্যন্ত ভালোবাসা ব্যাপারটা ঠিক শেখা হল না।

মস্কো, ০৯ জুন ২০২৫

Comments

Popular Posts