মৃত্যুঞ্জয়ী
অনেক আগে, ছাত্রজীবনে যখন দাস্তইয়েফস্কির ইডিয়ট পড়ছিলাম তখন প্রিন্স মিশকিন মৃত্যুর মুখ থেকে এক লোকের ফিরে আসার গল্প শুনিয়েছিলেন। কী অনুভূতিই যে হয়েছিল! সেই মুহূর্তে ওটা ছিল কেবলই গল্প। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধীকে আক্ষরিক অর্থেই ফাঁসির রজ্জু থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। পরে জেনেছি দাস্তইয়েফস্কি নিজে রাষ্ট্রদ্রোহী কাজের জন্য মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং যখন ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করছিলেন ঠিক সেই মুহূর্তে জারের বার্তা আসে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে সাইবেরিয়ায় নির্বাসনের আদেশ নিয়ে। অনেক পরে এক কবি বন্ধু, যার লেখার সাথে মস্কোর ছাত্রজীবন থেকেই আমি পরিচিত, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরে আসে। আর এর পর থেকেই তার কবিতায় এক ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়। আসলে লেখক বা কবি তার জীবনের কাহিনীই লিখে যায় – যা সে বাস্তবের হোক আর কল্পনায় যাপিত জীবনের হোক। তবে সবার সাহস থাকে না জীবনের সব কথা জনসম্মুখে তুলে ধরার। মানুষ মাত্রই নিজের ভালো বা পজিটিভ দিকটা তুলে ধরতে চায়, একটু ভালো পোশাক পরে বাইরে যেতে চায়। চায় নিজের দুর্বলতাগুলো অতি যত্নে লুকিয়ে রাখতে। যারা সেটাকে অতিক্রম করতে পারে তাদের সংখ্যা হাতে গণা।
রমা যার পোশাকি নাম কল্যাণী রমা আমার প্রিয় লেখকদের একজন। আমাদের দেখা হয়নি কখনোই তবে ওকে চিনি সেই ১৯৮৬ সাল থেকে যখন ওর বান্ধবীরা মস্কোয় পড়াশুনা করতে আসে। তখন রাজশাহীর অনেকেই আমাদের সার্কেলে ঢুকে গেছিল ওদের গল্পের মাধ্যমে। ফলে দেখা না হলেও গল্পে গল্পে ও আমার পুরানো পরিচিত। পরে আলাপ ফেসবুকে। আর সেই সুবাদেই নতুন করে পরিচয় লেখক রমার সাথে। ওর লেখা মানেই জীবনের সাধারণ কথা অসাধারণ করে বলা। এ যেন শব্দের এক নিরবচ্ছিন্ন ঝর্ণা। আর সেই থেকেই রমার লেখার প্রতি আমার এত ভালোবাসা।
ওর লেখা বাইপোলার টিয়ারস (সূর্যাস্তের আলো) সেদিক থেকে এক ভিন্নধর্মী লেখা। অনেক দিন ওকে ফেসবুকে না দেখে একটু দুশ্চিন্তাই হয়েছিল যদিও সেটা আমার স্বভাবসিদ্ধ নয়। পরে এ লেখাতেই সেই প্রশ্নের উত্তর পাই। ইদানিং কালে আমার বই আর পড়া হয়ে ওঠে না। মূলত ফিজিক্সের আর ম্যাথের বই পড়তে পড়তেই দিন কাবার। কয়েকটা বই শুরু করে খোলা অবস্থায় রেখে দিয়েছি অনেক দিন। চারিদিকে যুদ্ধ, বিপ্লব, সহিংসতা ইতিহাস আর পলিটিক্সের প্রতি আগ্রহের জন্ম দেয় কিন্তু সাহিত্যের বই পড়ার দিকে মন বসাতে দেয় না আজকাল। তারপরেও রমার বইটা হাতে পেয়ে অফিসে বসেই প্রায় এক দমে পড়ে ফেললাম। কী যে ভালো লাগলো! অনেক কিছুই জানতে পারলাম। আমেরিকার হাসপাতাল জীবন। সত্যিকার অর্থে হাসপাতাল জীবন একেবারেই ভিন্ন। সে আমেরিকায় হোক আর রাশিয়ায় হোক। আমি নিজে করোনার প্রেমে পড়ে হাসপাতালবাসী হয়েছিলাম সপ্তাহ খানেকের জন্য। মৃত্যু তখন জানালার ওপাশে অপেক্ষা করত। সুযোগ পেলেই কাউকে নিয়ে চলে যেত। রমার বই পড়ে সেই দিনগুলোয় ফিরে গেছিলাম। বলব না যে বইটি যাকে বলে ইজি রিডিং ছিল। মাঝেমধ্যেই খেই হারিয়ে ফেলেছি, অসংলগ্ন বাক্য বা শব্দ কানে এসেছে। এখানেই মনে হয় লেখকের সার্থকতা নিজের সেই সময়ের অবস্থা পাঠকের সামনে তুলে ধরায়, অতি যত্নে সেই সময়ের জলরঙ ছবি আঁকায়।
রমা যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে সেটা সবার হয় না। অভিজ্ঞতা তা সে যত ভয়ানকই হোক না কেন – জীবনকে ঋদ্ধ করে। রমার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। কষ্ট মানুষকে মানুষ করে যদি সে সেটা সঠিক ভাবে উপভোগ বা উপলব্ধি করতে পারে। এটা অনেকটা নতুন করে বাঁচতে শেখা, নতুন জীবনে ফিরে আসা। ঠিক সে রকম না হলেও আমরা যারা সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়াশুনা করেছি – আক্ষরিক অর্থেই নতুন করে জন্ম নিয়েছিলাম। আগেই বলেছি রমার লেখা মানেই শব্দের ঝর্ণাধারা। তবে এখানে সেটা কম, খুব বেশি করে আছে জীবনের কঠিন বাস্তবতা। জীবনে এসব কথা সবাই বলতে পারে না। কেউ বা লজ্জায়, কেউবা ভয়ে লুকিয়ে রাখে। সেটাকে অতিক্রম করে এভাবে লেখা এটাও এক বিশাল বিজয়। জীবনের জয়। আমরা তো স্বাধীন না। আমরা পরাধীন কে কি ভাববে তার কাছে, নিজের ভাবমূর্তির কাছে। মৃত্যু এক আশ্চর্য জিনিস। অবধারিত জেনেও তাকে সবাই এড়িয়ে চলে। মৃত্যু অনেকটা ব্ল্যাক হোলের মত। ওয়ান ওয়ে রোড। ওখানে শুধু যাওয়াই যায়, ফেরা যায় না। তবে হকিং রেডিয়েশন বলে একটি ব্যাপার আছে। রমাদের মত কেউ কেউ ইভেন্ট হরাইজনে কিছু সময় আটকে থেকে আবার জীবনে ফিরে আসে আমাদের মৃত্যুলোকের গল্প বলার জন্য। মৃত্যুর গল্প। জীবনের গল্প, জীবন মরণের লুকোচুরি খেলার গল্প।
দুবনা, ১৯ জুন ২০২৫
রমা যার পোশাকি নাম কল্যাণী রমা আমার প্রিয় লেখকদের একজন। আমাদের দেখা হয়নি কখনোই তবে ওকে চিনি সেই ১৯৮৬ সাল থেকে যখন ওর বান্ধবীরা মস্কোয় পড়াশুনা করতে আসে। তখন রাজশাহীর অনেকেই আমাদের সার্কেলে ঢুকে গেছিল ওদের গল্পের মাধ্যমে। ফলে দেখা না হলেও গল্পে গল্পে ও আমার পুরানো পরিচিত। পরে আলাপ ফেসবুকে। আর সেই সুবাদেই নতুন করে পরিচয় লেখক রমার সাথে। ওর লেখা মানেই জীবনের সাধারণ কথা অসাধারণ করে বলা। এ যেন শব্দের এক নিরবচ্ছিন্ন ঝর্ণা। আর সেই থেকেই রমার লেখার প্রতি আমার এত ভালোবাসা।
ওর লেখা বাইপোলার টিয়ারস (সূর্যাস্তের আলো) সেদিক থেকে এক ভিন্নধর্মী লেখা। অনেক দিন ওকে ফেসবুকে না দেখে একটু দুশ্চিন্তাই হয়েছিল যদিও সেটা আমার স্বভাবসিদ্ধ নয়। পরে এ লেখাতেই সেই প্রশ্নের উত্তর পাই। ইদানিং কালে আমার বই আর পড়া হয়ে ওঠে না। মূলত ফিজিক্সের আর ম্যাথের বই পড়তে পড়তেই দিন কাবার। কয়েকটা বই শুরু করে খোলা অবস্থায় রেখে দিয়েছি অনেক দিন। চারিদিকে যুদ্ধ, বিপ্লব, সহিংসতা ইতিহাস আর পলিটিক্সের প্রতি আগ্রহের জন্ম দেয় কিন্তু সাহিত্যের বই পড়ার দিকে মন বসাতে দেয় না আজকাল। তারপরেও রমার বইটা হাতে পেয়ে অফিসে বসেই প্রায় এক দমে পড়ে ফেললাম। কী যে ভালো লাগলো! অনেক কিছুই জানতে পারলাম। আমেরিকার হাসপাতাল জীবন। সত্যিকার অর্থে হাসপাতাল জীবন একেবারেই ভিন্ন। সে আমেরিকায় হোক আর রাশিয়ায় হোক। আমি নিজে করোনার প্রেমে পড়ে হাসপাতালবাসী হয়েছিলাম সপ্তাহ খানেকের জন্য। মৃত্যু তখন জানালার ওপাশে অপেক্ষা করত। সুযোগ পেলেই কাউকে নিয়ে চলে যেত। রমার বই পড়ে সেই দিনগুলোয় ফিরে গেছিলাম। বলব না যে বইটি যাকে বলে ইজি রিডিং ছিল। মাঝেমধ্যেই খেই হারিয়ে ফেলেছি, অসংলগ্ন বাক্য বা শব্দ কানে এসেছে। এখানেই মনে হয় লেখকের সার্থকতা নিজের সেই সময়ের অবস্থা পাঠকের সামনে তুলে ধরায়, অতি যত্নে সেই সময়ের জলরঙ ছবি আঁকায়।
রমা যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে সেটা সবার হয় না। অভিজ্ঞতা তা সে যত ভয়ানকই হোক না কেন – জীবনকে ঋদ্ধ করে। রমার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। কষ্ট মানুষকে মানুষ করে যদি সে সেটা সঠিক ভাবে উপভোগ বা উপলব্ধি করতে পারে। এটা অনেকটা নতুন করে বাঁচতে শেখা, নতুন জীবনে ফিরে আসা। ঠিক সে রকম না হলেও আমরা যারা সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়াশুনা করেছি – আক্ষরিক অর্থেই নতুন করে জন্ম নিয়েছিলাম। আগেই বলেছি রমার লেখা মানেই শব্দের ঝর্ণাধারা। তবে এখানে সেটা কম, খুব বেশি করে আছে জীবনের কঠিন বাস্তবতা। জীবনে এসব কথা সবাই বলতে পারে না। কেউ বা লজ্জায়, কেউবা ভয়ে লুকিয়ে রাখে। সেটাকে অতিক্রম করে এভাবে লেখা এটাও এক বিশাল বিজয়। জীবনের জয়। আমরা তো স্বাধীন না। আমরা পরাধীন কে কি ভাববে তার কাছে, নিজের ভাবমূর্তির কাছে। মৃত্যু এক আশ্চর্য জিনিস। অবধারিত জেনেও তাকে সবাই এড়িয়ে চলে। মৃত্যু অনেকটা ব্ল্যাক হোলের মত। ওয়ান ওয়ে রোড। ওখানে শুধু যাওয়াই যায়, ফেরা যায় না। তবে হকিং রেডিয়েশন বলে একটি ব্যাপার আছে। রমাদের মত কেউ কেউ ইভেন্ট হরাইজনে কিছু সময় আটকে থেকে আবার জীবনে ফিরে আসে আমাদের মৃত্যুলোকের গল্প বলার জন্য। মৃত্যুর গল্প। জীবনের গল্প, জীবন মরণের লুকোচুরি খেলার গল্প।
দুবনা, ১৯ জুন ২০২৫



Comments
Post a Comment