কত অজানারে
গত সপ্তাহে ভার্সিটি থেকে নোটিশ পেলাম ফার্স্ট এইড প্রোগ্রামে অংশ নিতে হবে। আগে এসব ছিল কাগজে কলমে, মানে আমরা মূলত সই করে আসতাম যে কোর্স শুনেছি। এখন সরকার কড়াকড়ি করেছে। এসব প্রোগ্রামে অংশ না নিলে প্রতি কর্মচারীর জন্য ভার্সিটিকে এক লাখ বিশ হাজার রুবল জরিমানা করবে। আর যেহেতু সব দেশেই সব অত্যাচার সইতে হয় সাধারণ পাবলিককে, তাই দিনের শেষে আমাদেরই ডাকা হল ক্লাসে উপস্থিত থাকতে। বেশ কিছুদিন মস্কো যাওয়া হয় না, ছেলেমেয়েদের সাথেও দেখা হয় না। তাছাড়া রেগুলার মেডিক্যাল চেক আপ যেটা আমি করাইনি (আসলে ওটা করার কথা ছিল সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে, আমি জানতাম না। ওরা যেখানে ইনফর্ম করে সেই মেইল আমি সাধারণত চেক করি না। এটা ওদের সমস্যা নাকি আমার সেটা ভাবার বিষয়)। ইচ্ছে ছিল ক্লাসে হাজিরা দিয়ে পালিয়ে যাব। আসলে শিক্ষক যখন ছাত্র হয় তার ঘাড়ে ছাত্রের ভূত এসে ভর করে এবং সেও সুযোগ খোঁজে ফাঁকি দেবার। যাহোক ক্লাসে ঢুকেই এক ধরণের নেগেটিভ অনুভূতি তৈরি হল। শিক্ষক ইমারজেন্সি মেডিসিনে কাজ করেন। বললেন – আমি আর মানুষের প্রতি এমপ্যাথি বোধ করি না। মৃত্যু দেখতে দেখতে অভ্যেস হয়ে গেছে। জানি নিজে না বাঁচলে অন্যকে সাহায্য করতে পারব না, তাই আপনাদের যেটা করতে হবে – আগে দেখতে হবে কাউকে সাহায্য করতে গিয়ে আপনি কতটুকু নিরাপদ। যেকোনো লোকের মৃত্যুই দেশের জন্য ক্ষতিকর, কিন্তু একটা মৃত্যু দুটো মৃত্যুর চেয়ে ভালো। তবে পরবর্তীতে তিনি এমন ভাবে সব বললেন, দেখালেন আর আমাদের দিয়ে করালেন যে মনে হল আরও একদিন যদি ক্লাস হত আমি অংশ নিতাম। কেসগুলো ছিল স্বাভাবিক। ধরুন ক্লাসে বা কোথাও দেখলেন একজন লোক চিত হয়ে শুয়ে আছে। তখন কী করা? আগে তাকে ডেকে দেখবেন তার চেতনা আছে কিনা। এরপর দেখতে হবে সেখানে এমন কিছু আছে কিনা যা আপনার জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। এরপর হাতে গ্লাভস পরে, না থাকলে কোন প্যাকেট বা অন্য কিছু দিয়ে হাত জড়িয়ে তার মুখে কোন কিছু আছে কিনা সেটা দেখা, যাতে জিহ্বা শ্বাসনালী বন্ধ না করে তাকে কাত করে শোয়ানো ইত্যাদি। আর যদি উপুড় হয়ে পরে থাকে তবে এখানে শ্বাসনালী বন্ধের ভয় নেই। তাই তাকে ডাকতে, জ্ঞান আছে কিনা, শ্বাস নিচ্ছে কিনা এসব করে দেখতে হবে তার নীচে রক্ত আছে কিনা। থাকলে তাকেও আগের মতই কাত করে শোয়াতে হবে আর রক্ত বন্ধ করতে হবে। সব ক্ষেত্রেই দুই মিনিট পর পর চেক করা শ্বাস আছে কিনা। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই এ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হবে। এর পরের বিষয়টি ছিল আমার জন্য অভিনব। সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন হৃদপিণ্ড মানে হৃদয় কোথায় সেটা দেখাতে। সবাই নিজের মত করে দেখাল। আমি তো জানি হৃদপিণ্ড বুকের বাঁ দিকে থাকে। শপথের ভঙ্গি করে ওখানে হাত দিয়ে বসে রইলাম। জীবনে এই প্রথম জানলাম যে হৃদপিণ্ড বুকের মাঝে থাকে, একটু বাঁদিকে। মনে হল যখন আমার বুকের বাঁ দিকে একটু ব্যথা করে আমি হার্টে সমস্যা হচ্ছে বলে বিচলিত হই যার কোনই কারণ নেই। তবে এতদিন বুকের মাঝে একটু আধটু ব্যথা করলে যে এড়িয়ে যেতাম সেটা ভুল ছিল। আমি এতদিন ভাবতাম বুকের বাঁ দিকে চাপ নিয়ে জ্ঞান ফেরাতে হয়, এখন দেখি তা নয়, চাপ দিতে হবে বুকের মাঝে। আরও একটা জিনিস টের পেলাম। সেটা ছিল জীবনে হাজার হাজার প্রেমে যে ব্যর্থ হয়েছি তার মূল কারণ হৃদয়ের সঠিক অবস্থান জানা ছিল না, তাই প্রেমের তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পাশ কেটে চলে গেছে। বাসায় ফিরে সেভাকে জিজ্ঞেস করলাম হৃদপিণ্ড কোথায়। ও ঠিকঠাক দেখিয়ে দিল আর আমি যখন বললাম যে আমি ভাবতাম বাঁ দিকে ও একটু মুচকি হাসল, যেন বলল, সাধে কি আমরা বলি তোমরা কিছুই জান না। আজ গুলিয়াকে জিজ্ঞেস করলাম ও জানে কি না হৃদপিণ্ড কোথায়। বলল বুকের বাঁ দিকে। হয়তো এ কারণেই প্রেমের তীরটা ওর হৃদয়ে আটকে গেছিল। শিক্ষা কী? তুমি যদি কোন কিছু ভুল জান তাহলে সেই রকম ভুল জানা আরেক জনকে খুঁজে বের করতে হবে, তাহলে ভুলটাও অনেক সমস্যার সমাধান দিতে পারে।
দুবনা, ২২ জানুয়ারি ২০২৫
দুবনা, ২২ জানুয়ারি ২০২৫

Comments
Post a Comment