ভ্লাদিমির মিখাইলোভিচ দুবোভিক
সকালে ফোন এলো। তাকিয়ে দেখি লেনা ফোন করছে। ও বলার আগেই অনুমান করলাম। তারপরেও বললাম
- প্রিভিয়েত লেনা! তোমাদের সব ঠিকঠাক তো?
- প্রিভিয়েত বিজন! ভ্লাদিমির মিখাইলোভিচ আর নেই।
- কোন কিছু দরকার হলে জানিও। আমি আজ দুবনায়।
- অবশ্যই।
অনেকে হয়তো এই কথোপকথনে অবাক হচ্ছেন। কিন্তু মৃত্যু আমার কাছে জীবনেরই অংশ।
ভ্লাদিমির মিখাইলোভিচ দুবোভিক। দুবনায় আমার প্রথম ও শেষ মেন্টর। ১৯৯২ সালেই মস্কোয় আমার সুপারভাইজার ইউরি পেত্রোভিচ রীবাকভ বলেছিলেন শেষ করে যেন কিছুদিনের জন্য হলেও দুবনায় কাজ করি। সে সময় ওনার এক কোল্যাবরেটর ছিলেন দুবনায়। আমার ইচ্ছে ছিল শেষ করেই দেশে চলে যাওয়া। তবে ১৯৯৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর যখন পিএইচডি থিসিস ডিফেন্ড করলাম তখন জীবনে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। আরও কিছুদিন এখানে থাকাটা অবশ্যম্ভাবী না হলেও জরুরি হয়ে পড়েছে। তাই এবার নিজেই ইউরি পেত্রোভিচকে বললাম দুবনার ব্যাপারটা দেখতে। ইতিমধ্যে তাঁর সহযোগী প্রফেসর মাখানকভ আমেরিকা চলে গেছেন। তাই বললেন, আমার বন্ধু দুবোভিক ওখানে কাজ করেন ইলেক্ট্রডাইনামিক্সের উপর। ওনার সাথে কথা বলে দেখতে পারেন। কিছুতেই সময় বের করতে পারছিলেন না তাই একদিন বললেন আমি নিজেই যেন দুবনা গিয়ে ওনার সাথে দেখা করি। উনি ফোন করে দেবেন।
মস্কো থেকে দুবনায় অনেক ট্রেন গেলেও এক্সপ্রেস ট্রেন যেত ভোর ৭ টার দিকে। আমি প্রথম মেট্রোয় সাবিওলভস্কি স্টেশনে এসে বসে রইলাম। তিন বা চার বগির খেলনা ট্রেন। দুবনায় পৌঁছে গেলাম যেখানে পাস দেয় সেখানে। ইউরি পেত্রভিচ বলেছিলেন - যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেবে। সেখান থেকে ভ্লাদিমির মিখাইলোভিচকে ফোন করলাম।
- তুমি আমার বাসায় চলে এসো। এটা স্টেশনের পাশেই।
যেতেই ঘর খুলে দিলেন। পঞ্চাশোর্ধ ভদ্রলোক। দুটো ছোট বাচ্চা। একজনকে পোশাক পরাচ্ছেন। অন্য জনকে দেখিয়ে বললেন
- তুমি ওর সাথে বস। আমি একে কিন্ডার গারটেনে পৌঁছে দিয়ে এক্ষুনি আসছি।
উনি ইঙ্গা বা গোগাকে নিয়ে চলে গেলেন। সাথে রইল কেশা বা ভিকেন্টি। কিছুক্ষণ পরে ফিরে কেশাকে নিয়ে গেলেন অন্য জায়গায়। ফিরে এসেই বললেন
- চল খেয়ে নিই। উখা খাও তো?
আমি ঠিক জানতাম না উখা কি। রাজী হলাম। কিছুক্ষণ পরে বুঝলাম এটা মাছের স্যুপ। আমার তো দম বেরিয়ে যাবার অবস্থা।
- কোন অসুবিধা নেই। রেখে দাও।
এরপর আমরা পাস নিয়ে চলে গেলাম ল্যাবে। কয়েক জনের সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন। ঠিক হল এক সপ্তাহ পরে আমি এখানে একটা প্রবন্ধ পড়ব। এরপর ঠিক হবে আমার ভাগ্য। উনি আমাকে মস্কো ফিরতে দিলেন না। ঘুরে ঘুরে দুবনা দেখালেন। বিভিন্ন বিষয়ে গল্প গুজব হল। সন্ধ্যায় ওনার স্ত্রী লিউবা আমাদের রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলেন। রাতে ট্রেনে উঠিয়ে দেবার আগে হাতে ১০০ ডলার দিয়ে বললেন মস্কোয় এক ভদ্রমহিলা স্টেশন থেকে নিয়ে যাবেন।
পরের সপ্তাহে আমি বক্তব্য রাখলাম। দুবনায় আার কাজ পাকা হয়ে গেল। সমস্ত কাগজপত্র তৈরি হতে কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। ১৯৯৪ সালের ১৮ মে আমি দুবনায় জয়েন করলাম। মানে তিন সপ্তাহ পরে এ বছর ১৮ মে দুবনায় আমার চাকরির বয়স হবে ৩০ বছর। সোভিয়েত আমলে এমনকি বছর দশেক আগেও নিউক্লিয়ার ফিজিক্স ইনস্টিটিউটে ৩০ বছর কাজ করলে ভেটেরান অফ অ্যাটমিক এনার্জির সনদ পাওয়া যেত। জানি না এখন এটা দেয় কি না।
আমি ওনার সাথে কাজ করেছি ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত। ২০০০ সালে ফিজিক্যাল রিভিউ ই-তে আমাদের শেষ পেপার বেরোয়। এর পরে আর এক সাথে কাজ করা হয়নি। ১৯৯৯ সালে অন্য ল্যাবে চলে যাই। উনি আমার কসমোলজির উপর কাজ করাটাকে সহজ ভাবে নিতে পারতাম না আর আমি আমার কাজের ব্যাপারে অন্যের হস্তক্ষেপ খুব একটা পছন্দ করতাম না, যদিও কসমোলজির উপর কাজ করতে গিয়ে আমাদের কোল্যাবরেশন ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। এর পরে আরও অনেক দিন, ২০০৬ সাল পর্যন্ত আমি ওনার সাথে একই রুমে বসতাম। আমাদের মধ্যে শুধু পেশাগত নয়, পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমার স্ত্রী ছোটবেলা যেসব জায়গায় কেটেছে সে সময় উনিও সে সব জায়গাতেই থাকতেন। সব মিলিয়ে এক ধরণের আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওনার স্ত্রী ১৯৯৫ সালে সন্তানদের নিয়ে কানাডা চলে গেলে উনি আবার বিয়ে করেন। লেনা তাঁর খুব সম্ভব সপ্তম ও শেষ স্ত্রী। লেনার যখন ২৫ আর ওনার ৬০ তখন তাদের বিয়ে হয়। আমাদের ছেলেমেয়েরাও প্রায় সমবয়সী। ফলে এক সাথে বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরতে যাওয়া, পিকনিক, সাঁতার বা খেলাধুলা করা এসব ছিল আমাদের জীবনের অংশ। দুবনা তখনও এত বড় নয়, অনেকটা ছোট্ট গ্রামের মত। কিন্তু যখন আমরা পাশাপাশি বিল্ডিং-এ থাকতে শুরু করলাম তখন থেকেই আমাদের মধ্যে যাতায়াত কমে গেল।
আমি ২০০৬ সাল পর্যন্ত ওনার ওখানে বসতাম মূলত ওনাকে সাহায্য করার জন্য। পরে নিজের অফিসে চলে যাই। এরপর দেখা সাক্ষাৎ কমে যায়। কখনও কথা বলার ইচ্ছে হলে ডেকে পাঠাতেন। আসলে খুব ভালো বিশেষজ্ঞ হলেও এবং বন্ধুদের জন্য অনেক কিছু করলেও অন্যদের কথা বা যুক্তি মেনে নিতে পারতেন না। আর যেহেতু আমাদের এখানে কমবেশি সবাই বড় বড় ডিগ্রীধারী ও যুক্তি দিয়ে কথা বলতে পারে, তাই প্রায়ই ওনার সাথে ঝামেলা হত। আমি সব কিছুর পরেও দুবনার প্রথম দিকে সাহায্যের কথা মনে রেখে তাঁর সাথে গল্প করতে যেতাম। কয়েক ঘন্টা কাজকর্ম নিয়ে কথা বলতাম। তবে একটা শর্তে আর কোন কোল্যাবরেশন করব না। উনিও বলেছিলেন তাহলে যতদিন উনি জীবিত আমি যেন ওনার সাথে যে বিষয় নিয়ে কাজ করতাম তার উপর কোন কাজ না করি আর করলেও সেসব যেন পাবলিস না করি।
আমাদের শেষ দেখা বছর চার আগে। পরে কয়েক বার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও দেখা করা হয়নি। বছর দু হল তিনি শয্যাশায়ী। দেখা করতে চাইলেও লেনা আগ্রহ দেখায়নি। ভ্লাদিির মিখাইলোভিচ ছিলেন প্রচণ্ড প্রানবন্ত একজন মানুষ। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ৮৬ পার করে ৮৭ তে পড়েছিলেন। বরাবরের মত আমি লেনাকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম। কিন্তু মাত্র কয়েক বছর আগেও তাঁর দিন কাটত দৌড় ঝাপে মধ্যে। তাই যখনই শুনেছি উনি শয্যাশায়ী মনে হয়েছে এভাবে টিকে থাকাটা তাঁর মত একজন মানুষের সাথে ঠিক যায় না। পদার্থবিদ্যার বাইরেও বিভিন্ন বিষয়ে তিনি দক্ষতার সাথে কথা বলতে পারতেন। তাই আমাদের যখন দেখা হত তখন সাহিত্য, সঙ্গীত, রাজনীতি এসব নিয়েও অনেক কথা হত। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর পরে তাই নিজেই অনেকবার চেয়েছি দেখা করে এসব নিয়ে কথা বলতে। আমাদের সব আলোচনা চলত কয়েক ঘন্টা এবং এক পর্যায়ে সেটা উত্তপ্ত হত। এ জন্যেই লেনা তখন মিখাইলোভিচের শারীরিক অবস্থা দেখে আমাদের দেখা করতে দেয়নি, বলেছে একটু সুস্থ্য হোক, তখন না হয় ভোলগার তীরে বা কোথাও বসে আমরা কথা বলি। একপর স্ট্রোক ও একেবারেই শয্যাশায়ী। মৃত্যুর পর কী আছে এ নিয়ে আমার মোহ নই। তবে শেষ দুই বছরের জীবনের চেয়ে এই মৃত্যু শতগুনে ভালো। অনেক বিষয়ে আমাদের দ্বিমত থাকলেও আপনি সব সময়ই আমার প্রিয় মানুষদের একজন ছিলেন যাদের সাথে সমস্যা নিয়ে কথা বলতে আমি পছন্দ করতাম। আর পদার্থবিদ হিসেবে আমাদের কাজই সমস্যা নিয়ে কথা বলা, তাঁর সমাধান খোঁজা।
দুবনা, ২৭ এপ্রিল ২০২৪
- প্রিভিয়েত লেনা! তোমাদের সব ঠিকঠাক তো?
- প্রিভিয়েত বিজন! ভ্লাদিমির মিখাইলোভিচ আর নেই।
- কোন কিছু দরকার হলে জানিও। আমি আজ দুবনায়।
- অবশ্যই।
অনেকে হয়তো এই কথোপকথনে অবাক হচ্ছেন। কিন্তু মৃত্যু আমার কাছে জীবনেরই অংশ।
ভ্লাদিমির মিখাইলোভিচ দুবোভিক। দুবনায় আমার প্রথম ও শেষ মেন্টর। ১৯৯২ সালেই মস্কোয় আমার সুপারভাইজার ইউরি পেত্রোভিচ রীবাকভ বলেছিলেন শেষ করে যেন কিছুদিনের জন্য হলেও দুবনায় কাজ করি। সে সময় ওনার এক কোল্যাবরেটর ছিলেন দুবনায়। আমার ইচ্ছে ছিল শেষ করেই দেশে চলে যাওয়া। তবে ১৯৯৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর যখন পিএইচডি থিসিস ডিফেন্ড করলাম তখন জীবনে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। আরও কিছুদিন এখানে থাকাটা অবশ্যম্ভাবী না হলেও জরুরি হয়ে পড়েছে। তাই এবার নিজেই ইউরি পেত্রোভিচকে বললাম দুবনার ব্যাপারটা দেখতে। ইতিমধ্যে তাঁর সহযোগী প্রফেসর মাখানকভ আমেরিকা চলে গেছেন। তাই বললেন, আমার বন্ধু দুবোভিক ওখানে কাজ করেন ইলেক্ট্রডাইনামিক্সের উপর। ওনার সাথে কথা বলে দেখতে পারেন। কিছুতেই সময় বের করতে পারছিলেন না তাই একদিন বললেন আমি নিজেই যেন দুবনা গিয়ে ওনার সাথে দেখা করি। উনি ফোন করে দেবেন।
মস্কো থেকে দুবনায় অনেক ট্রেন গেলেও এক্সপ্রেস ট্রেন যেত ভোর ৭ টার দিকে। আমি প্রথম মেট্রোয় সাবিওলভস্কি স্টেশনে এসে বসে রইলাম। তিন বা চার বগির খেলনা ট্রেন। দুবনায় পৌঁছে গেলাম যেখানে পাস দেয় সেখানে। ইউরি পেত্রভিচ বলেছিলেন - যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেবে। সেখান থেকে ভ্লাদিমির মিখাইলোভিচকে ফোন করলাম।
- তুমি আমার বাসায় চলে এসো। এটা স্টেশনের পাশেই।
যেতেই ঘর খুলে দিলেন। পঞ্চাশোর্ধ ভদ্রলোক। দুটো ছোট বাচ্চা। একজনকে পোশাক পরাচ্ছেন। অন্য জনকে দেখিয়ে বললেন
- তুমি ওর সাথে বস। আমি একে কিন্ডার গারটেনে পৌঁছে দিয়ে এক্ষুনি আসছি।
উনি ইঙ্গা বা গোগাকে নিয়ে চলে গেলেন। সাথে রইল কেশা বা ভিকেন্টি। কিছুক্ষণ পরে ফিরে কেশাকে নিয়ে গেলেন অন্য জায়গায়। ফিরে এসেই বললেন
- চল খেয়ে নিই। উখা খাও তো?
আমি ঠিক জানতাম না উখা কি। রাজী হলাম। কিছুক্ষণ পরে বুঝলাম এটা মাছের স্যুপ। আমার তো দম বেরিয়ে যাবার অবস্থা।
- কোন অসুবিধা নেই। রেখে দাও।
এরপর আমরা পাস নিয়ে চলে গেলাম ল্যাবে। কয়েক জনের সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন। ঠিক হল এক সপ্তাহ পরে আমি এখানে একটা প্রবন্ধ পড়ব। এরপর ঠিক হবে আমার ভাগ্য। উনি আমাকে মস্কো ফিরতে দিলেন না। ঘুরে ঘুরে দুবনা দেখালেন। বিভিন্ন বিষয়ে গল্প গুজব হল। সন্ধ্যায় ওনার স্ত্রী লিউবা আমাদের রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলেন। রাতে ট্রেনে উঠিয়ে দেবার আগে হাতে ১০০ ডলার দিয়ে বললেন মস্কোয় এক ভদ্রমহিলা স্টেশন থেকে নিয়ে যাবেন।
পরের সপ্তাহে আমি বক্তব্য রাখলাম। দুবনায় আার কাজ পাকা হয়ে গেল। সমস্ত কাগজপত্র তৈরি হতে কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। ১৯৯৪ সালের ১৮ মে আমি দুবনায় জয়েন করলাম। মানে তিন সপ্তাহ পরে এ বছর ১৮ মে দুবনায় আমার চাকরির বয়স হবে ৩০ বছর। সোভিয়েত আমলে এমনকি বছর দশেক আগেও নিউক্লিয়ার ফিজিক্স ইনস্টিটিউটে ৩০ বছর কাজ করলে ভেটেরান অফ অ্যাটমিক এনার্জির সনদ পাওয়া যেত। জানি না এখন এটা দেয় কি না।
আমি ওনার সাথে কাজ করেছি ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত। ২০০০ সালে ফিজিক্যাল রিভিউ ই-তে আমাদের শেষ পেপার বেরোয়। এর পরে আর এক সাথে কাজ করা হয়নি। ১৯৯৯ সালে অন্য ল্যাবে চলে যাই। উনি আমার কসমোলজির উপর কাজ করাটাকে সহজ ভাবে নিতে পারতাম না আর আমি আমার কাজের ব্যাপারে অন্যের হস্তক্ষেপ খুব একটা পছন্দ করতাম না, যদিও কসমোলজির উপর কাজ করতে গিয়ে আমাদের কোল্যাবরেশন ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। এর পরে আরও অনেক দিন, ২০০৬ সাল পর্যন্ত আমি ওনার সাথে একই রুমে বসতাম। আমাদের মধ্যে শুধু পেশাগত নয়, পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমার স্ত্রী ছোটবেলা যেসব জায়গায় কেটেছে সে সময় উনিও সে সব জায়গাতেই থাকতেন। সব মিলিয়ে এক ধরণের আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওনার স্ত্রী ১৯৯৫ সালে সন্তানদের নিয়ে কানাডা চলে গেলে উনি আবার বিয়ে করেন। লেনা তাঁর খুব সম্ভব সপ্তম ও শেষ স্ত্রী। লেনার যখন ২৫ আর ওনার ৬০ তখন তাদের বিয়ে হয়। আমাদের ছেলেমেয়েরাও প্রায় সমবয়সী। ফলে এক সাথে বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরতে যাওয়া, পিকনিক, সাঁতার বা খেলাধুলা করা এসব ছিল আমাদের জীবনের অংশ। দুবনা তখনও এত বড় নয়, অনেকটা ছোট্ট গ্রামের মত। কিন্তু যখন আমরা পাশাপাশি বিল্ডিং-এ থাকতে শুরু করলাম তখন থেকেই আমাদের মধ্যে যাতায়াত কমে গেল।
আমি ২০০৬ সাল পর্যন্ত ওনার ওখানে বসতাম মূলত ওনাকে সাহায্য করার জন্য। পরে নিজের অফিসে চলে যাই। এরপর দেখা সাক্ষাৎ কমে যায়। কখনও কথা বলার ইচ্ছে হলে ডেকে পাঠাতেন। আসলে খুব ভালো বিশেষজ্ঞ হলেও এবং বন্ধুদের জন্য অনেক কিছু করলেও অন্যদের কথা বা যুক্তি মেনে নিতে পারতেন না। আর যেহেতু আমাদের এখানে কমবেশি সবাই বড় বড় ডিগ্রীধারী ও যুক্তি দিয়ে কথা বলতে পারে, তাই প্রায়ই ওনার সাথে ঝামেলা হত। আমি সব কিছুর পরেও দুবনার প্রথম দিকে সাহায্যের কথা মনে রেখে তাঁর সাথে গল্প করতে যেতাম। কয়েক ঘন্টা কাজকর্ম নিয়ে কথা বলতাম। তবে একটা শর্তে আর কোন কোল্যাবরেশন করব না। উনিও বলেছিলেন তাহলে যতদিন উনি জীবিত আমি যেন ওনার সাথে যে বিষয় নিয়ে কাজ করতাম তার উপর কোন কাজ না করি আর করলেও সেসব যেন পাবলিস না করি।
আমাদের শেষ দেখা বছর চার আগে। পরে কয়েক বার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও দেখা করা হয়নি। বছর দু হল তিনি শয্যাশায়ী। দেখা করতে চাইলেও লেনা আগ্রহ দেখায়নি। ভ্লাদিির মিখাইলোভিচ ছিলেন প্রচণ্ড প্রানবন্ত একজন মানুষ। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ৮৬ পার করে ৮৭ তে পড়েছিলেন। বরাবরের মত আমি লেনাকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম। কিন্তু মাত্র কয়েক বছর আগেও তাঁর দিন কাটত দৌড় ঝাপে মধ্যে। তাই যখনই শুনেছি উনি শয্যাশায়ী মনে হয়েছে এভাবে টিকে থাকাটা তাঁর মত একজন মানুষের সাথে ঠিক যায় না। পদার্থবিদ্যার বাইরেও বিভিন্ন বিষয়ে তিনি দক্ষতার সাথে কথা বলতে পারতেন। তাই আমাদের যখন দেখা হত তখন সাহিত্য, সঙ্গীত, রাজনীতি এসব নিয়েও অনেক কথা হত। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর পরে তাই নিজেই অনেকবার চেয়েছি দেখা করে এসব নিয়ে কথা বলতে। আমাদের সব আলোচনা চলত কয়েক ঘন্টা এবং এক পর্যায়ে সেটা উত্তপ্ত হত। এ জন্যেই লেনা তখন মিখাইলোভিচের শারীরিক অবস্থা দেখে আমাদের দেখা করতে দেয়নি, বলেছে একটু সুস্থ্য হোক, তখন না হয় ভোলগার তীরে বা কোথাও বসে আমরা কথা বলি। একপর স্ট্রোক ও একেবারেই শয্যাশায়ী। মৃত্যুর পর কী আছে এ নিয়ে আমার মোহ নই। তবে শেষ দুই বছরের জীবনের চেয়ে এই মৃত্যু শতগুনে ভালো। অনেক বিষয়ে আমাদের দ্বিমত থাকলেও আপনি সব সময়ই আমার প্রিয় মানুষদের একজন ছিলেন যাদের সাথে সমস্যা নিয়ে কথা বলতে আমি পছন্দ করতাম। আর পদার্থবিদ হিসেবে আমাদের কাজই সমস্যা নিয়ে কথা বলা, তাঁর সমাধান খোঁজা।
দুবনা, ২৭ এপ্রিল ২০২৪


Comments
Post a Comment