কথা
গত সপ্তাহে সেভা জিজ্ঞেস করল কখন আমি ভার্সিটির দিকে যাব।
১০ টায় বেরুবো।
আমিও তোমার সাথে হাঁটতে যাব।
ঠিক আছে।
তোমার কী মনে হয়, সন্ত্রাসী হামলার পুনরাবৃত্তি হবে?
এখন সবাই সতর্ক। এ মুহূর্তে হয়তো হবে না। তবে বর্তমান বিশ্বে অনেক দেশ বা গোষ্ঠী এটাকে ব্যবহার করে। তাই সতর্কতা অবলম্বন করা ছাড়া উপায় নেই।
আমি গেলাম রিং লাইন পর্যন্ত। সেভা হাঁটতে হাঁটতে যাবে লেনিনস্কি প্রসপেক্টে।
আগে বললি না কেন। মিনিট কুড়ি আগে বেরুলে দু'জনেই হেঁটে যেতাম।
আজ সেমিনার না হওয়ায় আগের বাসায় ফিরে এলাম। কথা ছিল বিকেলবেলা ক্রিস্টিনার সাথে হাঁটতে যাব। তবে ক্যামেরা আনিনি বলে নিজের তেমন গরজ ছিল না। তাছাড়া আগে কাজ শেষ হল বলে ঠিক করলাম ১৮.৪৭ ট্রেণে দুবনা ফিরব। ১৯.৫২ বা ২২.০৬ পর্যন্ত বসে থাকব না।
ক্রিস্টিনা, আমি ১৮.০০ বাসা থেকে বেরুব। চাইলে আধা ঘন্টার জন্য হাঁটতে যেতে পারি।
ঠিক আছে। আমি পনের বিশ মিনিটের মধ্যে তৈরি হব।
এরপর রান্না করলাম। সেভা আমার পিঠ ম্যাসেজ করে দিল। আমরা দুজন খেলাম। মনিকা আর ক্রিস্টিনাকে খেতে বললাম। কোন খবর নেই। সাড়ে পাঁচটা সময় ক্রিস্টিনা বলল এখন রেডি হতে পারে।
ঠিক আছে। তাহলে আমরা ফ্রুঞ্জেনস্কায়া পর্যন্ত হাঁটব।
কী খবর তোমার?
কেন? ভালো। খারাপ থাকার সময় কোথায় বল? তোর সব ভালো?
কেমন যেন মন খারাপ। এক ধরণের আশঙ্কা।
কী হল আবার?
ঐ যে সন্ত্রাসী হামলা।
দেখ ওরা চায় আমরা যেন ভয় পাই। তাই ঐ পথে হাঁটা যাবে না। জীবন বসে থাকে না।
তাই বলে ভাবব যে কিছু হয়নি?
না। তবে সাবধানে চলাফেরা করে সব কাজ করতে হবে।
তোমার মন খারাপ হয় না? মনে হয় না অন্যদের সব ভালো চলছে, তোমার কিছু ঠিকঠাক চলছে না?
না। আমার জীবনে আমিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমার যদি ভালো না চলে অন্যদের ভালো চলা না চলা দিয়ে আমি কী করব?
মানে তুমি নিজেকে ছাড়া আর কাউকে নিয়ে ভাব না?
তোদের নিয়ে ভাবি। আরও যারা ঘনিষ্ঠ মানুষ, বন্ধু তাদের নিয়েও ভাবি। এরা ভালো থাকলে আমার ভালো লাগে। আর আমার যখন ভালো লাগে আমি তখন ভালো থাকি।
আর যখন খারাপ লাগে?
আমার অংক আছে, ছবি আছে, লেখালেখি আছে, বই আছে, তোরা আছিস। এরপরেও খারাপ থাকব কেমনে?
সেভার সাথে কী নিয়ে কথা বললে? মিউজিক?
মিউজিক, রাজনীতি, বই যখন যেটা শুনতে চায়।
ও এখন আর বন্ধুদের কারো সাথেই যোগাযোগ রাখে না। একমাত্র তোমার সাথেই মনে হয় কথা বলে আনন্দ পায়।
তোদের দরকার ওর সাথে কথা বলা বেশি করে। যাকগে চলে এসেছি। ফোন করিস।
এই শনিবার মস্কো গেলাম। অনেক দিন বন্ধুদের সাথে দেখা হয় না। দূতাবাসে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান। ভাবলাম যাই, ঘুরে আসি আর রবিবার ছেলেমেয়েদের নিয়ে ছবি তুলতে যাব। মাসুদের সাথে কথা বলে চলে গেলাম। প্রায় দেড় বছর পরে আমাদের দেখা। বসলাম বিখ্যাত ও অতি পরিচিত প্রগতি প্রকাশনে। ওখানে এখন ফুড কর্নার। আমরা অবশ্য টেলিফোনে মাসে একবার হলেও কথা বলি। তারপরেও মুখোমুখি দেখা করার মজাই আলাদা। এরপর দূতাবাস থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম পার্ক কুলতুরির ওখানে ক্রিমস্কি ব্রিজে। কত কথা যে মনে পড়ল!
পরের দিন ছবি তুলতে যাব। মনিকা আর ক্রিস্টিনা বলল ওদের বিকেলে ফটো সেশন, তাই গেলে এর আগে। আমি মস্কো সিটিতে ওদের ছবি তুলব বলে লেন্স এনেছি। মনিকা রাজি হল না। ২২ তারিখে যখন ক্রকস সিটিতে আক্রমণ হয় ও ছিল মস্কো সিটিতে ফটো সেশনে। সেদিন ওদের ওখান থেকে তাড়াতাড়ি বের করে দেয়। সেই রেশ এখনও কাটেনি। তাই আমরা গেলাম নভোদেভিচি মনাস্তিরের ওখানে। সেভা রাজি হল না, বলল ঘুমুবে। আমি যখন একা ওদের কারো সাথে যাই কত রকম গল্প যে হয়। ওরা নিজেরাই শুরু করে। কিন্তু সবাই মিলে গেলে সেটা আর হয়ে ওঠে না। ওরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে। বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে ছবি তুলে বাসায় ফিরলাম। এরপর ওরা গেল নভকুজনেতস্কায়ায় ফটো সেশনে। সেখান থেকে যাবে সারিৎসিনো পার্কে। সেভা ইতিমধ্যে ঘুরতে গেছে। নিস্কুশ্নি সাদে গেছিল। আমারও প্রিয় জায়গা। বিকেলে আমি বেরুলাম ক্যামেরা হাতে। গেলাম মস্কো সিটীতে। সেভা গেল না।
আসলে ক্রকসের মত ঘটনা মনে দাগ কাটে, ঠিক ভয় নয়, তবে সতর্ক করে। কিছুদিন মানুষ আবার একটু সন্দেহের সাথে চলাফেরা করবে, যদিও মস্কোয় ঘুরে, সব জায়গায় প্রচুর মানুষ, বিশেষ করে তরুণ তরুণীদের ভিড় দেখে মনেই হয়না যে সে এত বড় একটা দুর্যোগের মধ্য দিয়ে গেছে।
জীবন থেমে থাকে না!
দুবনা, ০২ এপ্রিল ২০২৪

Comments
Post a Comment