জন্মদিনের গপ্পো

দুদিন আগে জন্মদিন গেল। এবার দাড়ি গোঁফ সহ জন্ম নিয়েছিলাম। এখন বুঝতে পারছি এর ঝক্কি কেমন। ও হ্যাঁ, প্রথমেই যারা শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তাদের আরও দুই সাইজ বড় শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আর যারা জানাননি বা জানাতে পারেননি তাদের আরও বড় শুভেচ্ছা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দায় থেকে আমাকে মুক্ত করার জন্য। তবে সত্যি বলতে কি, আপনাদের ভালো ভালো কথাবার্তা আমাকে বেশ আনন্দ দিয়েছে। শত হলেও বাঙালির রক্ত আমার শিরায় শিরায়। স্নেহ জাতীয় পদার্থ তাই প্রচণ্ড পছন্দ।

এবার আসি দাড়ি গোঁফের কথায়। বয়স বাড়লেই যে বুদ্ধি বাড়বে তার কোন মানে নেই। অন্তত আমার ক্ষেত্রে সেটা ১০০% সত্য। সেদিন ছিল সোমবার। ক্লাস শেষ। ভাবলাম টেস্টের আয়োজন করা যাক। আমার এমনিতেই মস্কো যাবার কথা ছিল দুই সহকর্মীর সাথে দেখা করার জন্য। একজন আমার শিক্ষক ইউরি পেত্রভিচ, অন্যজন কিরিল আলক্সান্দ্রোভিচ। অনেক দিন একটা প্রবলেম নিয়ে কাজ করছি, ঐ নিয়ে কথা বলার জন্য। তবে শেষ মুহূর্তে যাওয়া হয়নি ছাত্ররা অসুস্থ হবার কারণে। টেস্ট অনলাইনে।

পরীক্ষা শুরু হল সাড়ে দশটায়। যখন শেষ করলাম রাত আটটা। গাধামী আমার। ইউনিভার্সিটিতে হলে অন্য কেউ সহযোগিতা করত, এখানে একা। আর আমার কাছে কেউ সহজে আসতে চায় না। অথচ ছাত্রজীবনে আমি সব সময় সবার আগে উত্তর দিতে যেতাম। আমাকে ক্লাসমেটরা বলত প্রবনি কামেন মানে টেস্ট স্টোন। আমাকে দিয়ে ওরা পরীক্ষা করত শিক্ষকের মেজাজ কেমন। আমার এ নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না।

একেক জন উত্তর দিতে আসে, কিছু এক্সট্রা প্রশ্ন করে ফেরত পাঠাই। এভাবে সময় চলে যায়। প্রচণ্ড ক্ষিদে পেয়ে গেছে, কিন্তু কোন উপায় নেই। পরে হিসেব করে দেখলাম, এর ফলে যদি কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হয় সেটা আমি। কারণ এক ছাত্র যখন উত্তর দেয়, অন্যরা খেতে পারে আর আমি একা গাধার মত একজন একজন করে ডেকে প্রশ্নের উত্তর জিজ্ঞেস করি। বাসায় পরীক্ষা নিলে অবশ্য বৌ সাহায্য করে, মানে বলে কি এত ঝামেলা করছ, নম্বর বসিয়ে দাও। ওরা খুশি হয়ে চলে যাক। ও বোঝে না যে আমি ব্যাগে করে আনন্দ নিয়ে আসিনি, এনেছি পরীক্ষার নম্বর যেটা কষ্ট করে পেতে হয়।

শেষের দিকে আমার ছাত্রজীবনের কথা মনে হল। তখন আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান হত। জাসিতা বা ডিফেন্স উপলক্ষ্যে খাওয়া দাওয়া হত। যদি খাবার বিতরণের দায়িত্বে মোক্তার ভাই থাকত, সবাই চাইত আগে খেতে, কারণ উনি আগে সবাইকে বেশি বেশি খাবার দিতেন, পরে যারা আসত তাদের ভাগে কম পড়ত। জালাল ছিল উল্টা। আগে সবাইকে কম কম করে দিত, পরে যারা খেত তাদের জন্য প্রচুর খাবার থাকত। আমিও দেখলাম, যারা প্রথম দিকে আসে, আর আগে ভালো ছাত্ররা, অনেক কষ্ট করে নম্বর পায়, অনেক অতিরিক্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, কিন্তু শেষের দিকে যারা থাকে তারা তেমন না জানলেও আমি নিজেই ক্লান্ত হয়ে উল্টো ওদের পড়াতে শুরু করি, মানে উত্তর দিতে শুরু করি। নিজেকে তো আর কম নম্বর দেয়া যায় না।

বাসায় ফিরে দেখি রান্না হয়নি, ওটা আমার দায়িত্ব। মনিকা কেক পাঠিয়েছে। সেটাও আমার অপেক্ষায়। গুলিয়া আগের দিনের স্মোকড মাংস খেয়ে দিব্যি কাটিয়ে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পরে ক্রিস্টিনা ছবি পাঠাল পিতের থেকে। আমার জন্মদিনে বান্ধবীর সাথে ক্যাফেতে গিয়েছিল। একটু পরে আন্তন ফিরল। দরাজ গলায় জিজ্ঞেস করল
পাপ, তোমার কত বছর হল?
ঊনষাট।
ওর সে কি হাসি। ওটা আমার ঊনষাট বলে নয়, পেটে কিছু পড়েছে বলে। গুলিয়া জিজ্ঞেস করল,
এই সোমবার আবার ড্রিঙ্ক করলি কেন?
পাপার জন্মদিন উপলক্ষ্যে।
ঝামেলা।
আমারা কেক কেটে খেয়ে নিলাম। কিছু করতে ইচ্ছে করছিল না। হাতে বেশ কাজ ছিল। তাই তাড়াতাড়ি খিচুড়ি মত একটা কিছু করে নিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম তপন দার মেসেজ গতকাল তোর জন্মদিন উপলক্ষ্যে আমরা খিচুড়ি আর মটর শাঁক খেয়েছি।

ওটা ছিল দেশে আমার জন্মদিনের স্পেশাল মেন্যু। ছোটবেলায় আমার জন্মদিনে সবার বন্ধুরা আসত। বিভিন্ন রকমের মিষ্টির সাথে থাকত খিচুড়ি আর মটর শাঁক।
ঢেঁকি রাশিয়াতেও ধান ভাণে।
গতকাল এই উপলক্ষ্যে আমরা আবার ফটো ক্লাব অব্রাজে কেক খেলাম। ফকুসে নতুন বছরে। আমি ব্যস্ত বলে আগামীকাল ওখানে যাব না।
দুবনা, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৩

Comments

Popular Posts