সুখ
আজকাল রোববার বিকেলে বাসে বা গাড়িতে মস্কো যাওয়া মানে নরক যন্ত্রণা। এপ্রিলের শেষ থেকেই এর শুরু। এসময়ে মস্কো থেকে লাখ লাখ মানুষ যায় গ্রাম এলাকায় খামার বাড়ি আর ফিরে রোববার বিকেলে। তাই রোববার বিকেলে মস্কো পৌঁছুতে ঘন্টা তিনেক লেগে যায়।
মস্কো পৌঁছতে আমার সাতটা বেজে গেল। ফোন করলাম গুলিয়াকে। ও এখান থেকে ঘন্টা খানেক পরে দুবনা যাবে। যদি আশেপাশে থাকে তাহলে ভকুসনা ই তোচকায় (সাবেক ম্যাকডোনাল্ড) ঢু মারা যাবে। ও পাশেই ছিল। কিছু সময় কাটিয়ে ও গেল দুবনা আমি বাসায়।
বাসায় ঢুকতেই মনিকা প্রশ্ন করল
কে?
আমি। বাসায় কেউ নেই?
আমি ভাবলাম তুমি এ সপ্তাহে আসবে না। পায়ে ব্যথা। মিশা মায়ের কাছে গেছে। সেভা বাইরে। অনেক রাতে ফিরবে।
আমাদের বাসায়ও আমি না থাকলে গুলিয়া রেডিমেড কিছু খায়। মনিকাও সেই পথেই হাঁটছে।
আমিও পথেই হ্যআম, চিজ এসব কিনে এনেছি। বাসায় বিভিন্ন রকম শুকনো ফল আর বাদাম ছিল। তাছাড়া ভকুসনা ও তোচকা থেকে বার্গার খেয়ে এসেছি। তাই তেমন ইচ্ছে নেই রান্না করার।
তোমার পায়ের কি অবস্থা?
এই তো দেখ বেঁচে আছে। হাঁটাহাঁটি পর্যন্ত করছে।
ডাক্তার কি বলল?
বৃহস্পতিবার যাব।
আরও টুকিটাকি বিভিন্ন কথা। ও ঘরে চলে গেল। আমি টিভি দেখা আর নেট করা।
দেখতে দেখতে রাতের বারোটা বেজে গেল। সেভা নেই। জানতে চাইলাম কখন আসবে।
মিনিট কুড়ি পরে রওনা হব।
প্রায় একটার দিকে আবার ফোন করলাম।
আমি মেট্রোয়। মিনিট দশেকের মধ্যেই চলে আসব।
আজ বেশ ক্লান্ত লাগছে। প্রায়ই চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল। তবে সেভার জন্য অপেক্ষা করতে করতে ঘুম পালিয়ে গেছে। মজার ব্যাপার হল আমি নিজেকে বেশ কয়েকবার বললাম ওরা এখানে নিজেরা থাকে, নিজেদের মত করে চলে। সেভা কোথাও গেলে মনিকার কাছে ঠিকানা দিয়ে যায়। আমরা জানিও না। তাহলে এখন এত চিন্তার কি আছে? কিন্তু চিন্তা তো আমাদের দাস নয় যে হুকুম দিলেই চোখের আড়াল হবে।
সকালে ঘুম থেকে উঠতেই সেভা বলল ও আমার সাথে বেরুবে। বলল নিস্কুশনি বাগান পর্যন্ত যাবে। ওখান থেকে মিনিট দশেক হাঁটলেই আমার ভার্সিটি।
পরিজ করবি না?
এক্ষুনি করছি।
স্নান করে খেয়ে অপেক্ষা করছি সেভা বলল ম্যাসেজ করে দেবে। ও ইদানিং ম্যাসেজের উপর একটা কোর্স করছে। তাই এসব ওর প্র্যাকটিকাল। বেশ যত্ন করে পিঠ মালিশ করে দিল। এরপর যখন দুজনে রাস্তায় নামলাম দেখি হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে।
পাটা ব্যথা করছে। আমি বরং মেট্রো করে যাই।
দু'জনে গল্প করতে করতে স্টেশনে এলাম।
কথা হয় মূলতঃ বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে।
বয়স অনুযায়ী সেভার এখন বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণে যাবার কথা। বর্তমানে এটা এক বছর। অল্টারনেটিভ আছে হাসপাতালে কাজ করাই। তিন বছর। না হলে বড় অংকের জরিমানা ও জেল। কোন অফিসিয়াল কাজ পাওয়া এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া কষ্টকর। এসব নিয়ে কথা বলি, বোঝাতে চেষ্টা করি প্রথম দুটোর একটা বেছে নিতে। আপাতত ব্যর্থ। হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনে চলে আসি। আমি যখন বাসায় ফিরে দুবনার পথে নামব ও ক্লাসে থাকবে। আজ পরীক্ষা। তাই আমরা হ্যান্ডশেক করে বিদায় নেই। যদি পরে দেখা হবার সম্ভাবনা থাকে তাহলে আর বিদায় নেই না।
ক্লাস শেষে বাসার দিকে রওনা হয়ে মনিকাকে ফোন করি।
দোকানে কিছু কিনতে হবে?
না। সব আছে।
রান্না করলি?
না। আমি ঘুরতে বেরিয়েছি। তুমি বরং কোথাও খেয়ে নিও।
ভাবলাম ভার্সিটি ফিরে ওখানে খেয়ে নেব। আবার মনে হল ফাস্টফুড কর্নারে কিছু খাব। পরে আর খাওয়া হল না। মাংস কিনে বাসায় ফিরলাম। ভাবলাম রান্না করে নিজে খেয়ে ওদের জন্য রেখে যাব।
বাসায় ফিরে আবার আলসেমি। কয়েকটা স্যান্ডুইচ বানিয়ে খেয়ে ভাবছি একটু আগেই বেরুব। শাহীন ওদিকে থাকে। দেখা করে যাই। এমন সময় সেভার ফোন
পাপা আমি বাড়ি ফিরছি। তুমি অপেক্ষা কর।
কিছুক্ষণ পর শাহীনের ফোন।
দোস্ত তুই তো এদিক দিয়ে যাবি। একটু আগে এলে গল্প করা যেত।
নারে আজ আর হবে না। নেক্সট টাইম।
সেভা এল। মিনিট দুয়েক কথা বলে ঘরে ঢুকে গেল। আমিও টিভি দেখে সময় কাটালাম।
আসলে ছেলেমেয়েদের সাথে খুব যে কথা হয় তা নয়। বিশেষ করে বাসায়। সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। কথা বলতে চাইলে আমরা সাধারণত ঘুরতে যাই। তবে যখন ওরা পাশে থাকে মনে অন্য ধরণের প্রশান্তি। কিছু না বলেও হাজারো কথা বলা হয়ে যায়। আসলে এই যে কেউ আছে যাদের তুমি নিঃশর্ত ভাবে ভালোবাস, ভালোবাসতে পার এর চেয়ে সুখের উপলব্ধি আর কি হতে পারে?
গত শনিবার ক্রিস্টিনা এল পিতের থেকে। ৯ জুন পরীক্ষা ছিল। এর পর ১৯ ও ২৭ তারিখে। তাই মস্কো ফিরছে জিনিসপত্র নিয়ে। বার বার বলেছে কেউ যেন ওকে আনতে যায়। সকাল থেকে ফোন করে সেভাকে পাইনি। মনিকা কাজে। এদিকে আর আধাঘণ্টা পর ট্রেন আসবে। সেভাকে ফোন করলাম। জানাল ও কাজে ছিল। এখন যাচ্ছে ক্রিস্টিনাকে আনতে। কিছুক্ষণ পরে মনিকা লিখল ও-ও যাচ্ছে। খুব ছোটখাটো ব্যাপার। কিন্তু ওদের যখন এভাবে পরস্পরের পাশে দাঁড়াতে দেখি মনে সাহস পাই, শান্তি পাই। বর্তমানের ব্যক্তিকেন্দ্রিক যুগে এ রকম ছোটখাটো ঘটনা অনেক বড় প্রশান্তি আনে মনে।
দুবনা, ১২ জুন ২০২৩

Comments
Post a Comment