একজন আজহার ভাই

১৯৮১ সাল। তখন আমি মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজের ছাত্র।
সে সময় আমি অবশ্য পড়াশুনার বাইরে খুব কিছু একটা করতাম না। তাই সময় কাটত মূলত বই পড়ে – তবে শুধু ক্লাসের বই নয়, এর বাইরেও বিভিন্ন বিভিন্ন কিছু পড়ে। রুশ সাহিত্য ও সোভিয়েত দেশের ব্যাপারে আগ্রহ ছিল বরাবরই। মনি সিংহের নাম শুনেছি। রাজদ্রোহ মামলার পরে কমরেড ফরহাদের নাম শুনেছি। তবে রাজনীতি করার কথা কখনোই মাথায় আসেনি, যদিও এ নিয়ে পড়েছি, বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আসা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। এক কথায় আমি ছিলাম রাজনীতি বিমুখ। যা জানা ছিল সেটা বইপত্র পড়ে।
একদিন কলেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। কে যেন বলল যতীন ঘোষের দোকানে তপন দা অপেক্ষা করছে। আমাকে যেতে বলেছে। সেখানে গিয়ে দেখি তপন দা ওর সমবয়সী একজনের সাথে কথা বলছে।
এ আজাহারুল ইসলাম আরজু। তোর আজহার ভাই। আমার বন্ধু। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সময়ে পড়াশোনা করতাম। ও কমিউনিস্ট পার্টি করে। তোর সাথে কথা বলতে চায়।
আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে তপন দা চলে গেল। হয়তো আমাদের কথা বার্তায় কোন প্রভাব ফেলতে চায়নি। বেশ কিছুক্ষণ কথা হল। তাঁর জাহাঙ্গীরনগর ও বুলগেরিয়ার জীবনের গল্প শোনালেন।
সামনে কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচন। আমরা চাই তুমি ছাত্র ইউনিয়ন থেকে এজিএস পদে নির্বাচন কর।
শুনে আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম।
আমি ছাত্র ইউনিয়ন সম্পর্কে কিছুই জানি না। তাছাড়া রাজনীতি করার ইচ্ছে মোটেই নেই। আপনাদের অন্য প্রার্থী দেখতে হবে।
এখনও সময় আছে। তুমি আমাদের ছেলেদের সাথে পরিচিত হও। তারপর না হয় সিদ্ধান্ত নিও।
আমি এরপর ক্লাসে চলে গেলাম। তবে আজহার ভাইকে তখন থেকেই খুব পছন্দ হয়ে গেল সহজ সরল আর অমায়িক ব্যবহারের জন্য। কয়েকদিন পরে লতিফ সিদ্দিকী, আবুবকর সিদ্দিক তুলু, দুলাল মিত্র, পরেশ রায়, মুজিবুর রহমান আলো বিকেলে এসে হাজির। আমরা তখন ফুটবল খেলছিলাম। বিভিন্ন কথাবার্তা হল। অনেক প্রশ্ন করলাম। কিন্তু উত্তরগুলো পাওয়া হল না। তবে ওদের কথাবার্তা, আচার ব্যবহার ভাল লাগলো। এরপর নির্বাচনে অংশ নেয়া। ছাত্রও রাজনীতিতে এতটাই মেতে উঠলাম যে আজহার ভাই একদিন বললেন –
এখন সব বাদ, সামনে পরীক্ষা, পার্টির পক্ষ থেকে তোমার উপর দায়িত্ব থাকবে পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করার। ছাত্র ইউনিয়ন ভাল ছাত্রদের সংগঠন। তাই ভাল রেজাল্ট করা এটাও দলীয় কাজ।
পরীক্ষা শেষ। অঢেল সময়। আজহার ভাইয়ের মোটর সাইকেলের পেছনে চড়ে কৃষক সমিতি, ক্ষেতমজুর সমিতির বিভিন্ন সভায় যাওয়া, পার্টির গ্রুপে যোগ দেওয়া, তাঁর প্রেরণায় খেলাঘর আসরের সাথে যুক্ত হওয়া আর ১৯৮৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে চলে আসা। আসলে ঐ সময়ে মানিকগঞ্জে বাম রাজনীতি তাঁকে ঘিরেই হত। তাঁর অতিমাত্রায় সক্রিয়তা যেমন পার্টিকে গতিশীল রেখেছিল, এর ফলে ব্যক্তি জীবনে তেমনি তাকে পোহাতে হচ্ছিল বিভিন্ন সমস্যা। সব কিছু বাদ দিয়ে পার্টির কাজ করে একদিকে যেমন পার্টিকে সংগঠিত করেছিলেন, অন্যদিকে খাওয়া দাওয়ায় অনিয়মের ফলে পরবর্তীতে বিভিন্ন সমস্যার বিশেষ করে শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আমার আর দেশে ফেরা হয়নি। ছাত্রজীবনে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, সুযোগ পেলেই মানিকগঞ্জ পার্টির জন্য বিভিন্ন জিনিস পাঠাতাম সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন আর তার জের হিসেবে পার্টি ভাঙার ফলে যোগাযোগ কমে আসে। তবে দেশে গেলেই দেখা করতাম। অনেক কথা হত। অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের মতের মিল হত। কিছু দিন আগেও চিকিৎসার জন্য ইন্ডিয়া ঘুরে এলেন। শুনেছি এরপর শারীরিক অবস্থার একটু অবনতি হয়।
শেষ যোগাযোগ ৭ জানুয়ারি ২০২৩। ফেসবুকে।
তোমার লেখা নিয়মিত পড়ি। অনেক কিছুর সাথেই একমত, তবে দ্বিমতও আছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে।
সেটা তো ভাল কথা। ঐক্য আর দ্বন্দ্ব – এর মধ্য দিয়েই তো আমাদের পথ চলতে হবে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের ঠিক আগে ও পরে সিপিএসইউ এর ভূমিকা নিয়ে গবেষণা মূলক লেখা আছে কি?
এ নিয়ে বেশির ভাগ কাজ হয়েছে বাইরে। এখানে হয় পক্ষে না হয় বিপক্ষে লেখা হয়েছে। নিরপেক্ষ গবেষণা তেমন হয়নি। আসলে সেই ঘা এখনও শুকায়নি। ফলে আবেগ অনেক।
তবুও দেখ যদি পাও কিছু লেখা পাঠিও।
দেখব। কিন্তু এখানকার কাজকর্ম তো রুশ ভাষায়।
দেখ ইংরেজিতে পাও কিনা।
এরপর বিভিন্ন ব্যস্ততায় ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ দু’ তিন দিন আগে মনে পড়ল। ভাবলাম খুঁজতে শুরু করব। আজ রাতে ফেসবুকে আসতে শুরু করল শোকবার্তা।
মানিকগঞ্জে বাম আন্দোলন যথেষ্ট ঐতিহ্যবাহী। সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই এখানে বাম আন্দোলন শক্তিশালী ছিল। তবে আমাদের সময় থেকে মানে আশির দশক বা তার পর থেকে যারাই বাম ঘরানার রাজনীতি করেছে তাদের দীক্ষা হয়েছে আজহার ভাইয়ের হাত ধরেই। তাদের কাছে তিনি ছিলেন অবিসংবাদী নেতা, মানিকগঞ্জের বাম আন্দোলনের প্রাণপুরুষ। সেদিক থেকে দেখলে আজহার ভাই ছিলেন নতুন প্রজন্মের কাছে পথ প্রদর্শক। সেখানে হয়তো ভুল ছিল কিন্তু তাঁর উৎসাহের, বাম আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবার আগ্রহের কোন অভাব ছিল না। বিশেষ করে বর্তমানে বাম আন্দোলনের বন্ধ্যা সময়েও তিনি মানিকগঞ্জে বাম আন্দোলনকে চলমান রাখতে পেরেছেন, তৈরি করতে পেরেছেন যোগ্য উত্তরসূরি। তিনি শুধু যে পার্টি কর্মীদের কাছেই জনপ্রিয় ছিলেন তা নয়, বিভিন্ন দলের লোকজনের সাথে ছিল তাঁর চলাফেরা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যে কলিগ সেটা তিনি মেনে চলতেন। আর হয়তো সে কারণেই মতের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মানিকগঞ্জের সব ধারার রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন প্রিয় ব্যক্তিত্ব।
মৃত্যুর পরও জীবন এগিয়ে যায় যদি যাপিত জীবন রেখে যায় অনুসরণ করার মত আদর্শ। আজহার ভাইয়ের কর্মময় জীবনই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে তাঁর সহযোদ্ধা ও গুণমুগ্ধ অনুসারীদের মাঝে। মানিকগঞ্জের রাজনীতিতে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
দুবনা, ৩০ জানুয়ারি ২০২৩

Comments

Popular Posts