বরোলিন বনাম বরোপ্লাস

ছোটবেলা থেকেই আমাদের কাটা ছেঁড়ার মহৌষধ ছিল জ্যাঠামশাইয়ের ঝাড়ফুঁক আর বরোলিন। কোলকাতা থেকে বরোলিন আর আম্ররুতাঞ্জনের অঢেল সরবরাহ ছিল বাড়িতে। তবে আমরুতাঞ্জনকে আমরা কেন যেন বলতাম অমৃতাঞ্জন। মস্কো এসেও অভ্যেস রয়ে গেছিল। দেশ থেকে অন্যান্য জিনিসপত্রের সাথে বরোলিন আর আমরুতাঞ্জন আমি পেতাম নিয়মিত।


গুলিয়া কেন যেন বরোলিন আর আমরুতাঞ্জনের গন্ধ সহ্য করতে পারত না। তাই মাখলেই হাজারো অনুযোগ। ফলে এক সময় ঘরে বরোলিনের স্তুপ জমতে থাকলেও মাখা হয়নি। শুধু বাড়ি থেকেই নয়, ইন্ডিয়া থেকে কেউ আমাদের ইনস্টিটিউতে এলে চা আর বরোলিন আনত সাথে করে।

২০২১ সালে এরকম সময়ে করোনা মুক্ত হবার পরে আমার আর গুলিয়ার দুজনের গালেই এক ধরণের গোটা ওঠে। মনিকা আমাকে আলভেরা ওয়াশ ক্রীম দেয়। ওটাতেই আমার গোটা পালিয়ে যায়। গুলিয়াকে অনেকদিন বলেছি সেটা ব্যবহার করতে। করেনি। কারণ সময় করে ওটা সম্পর্কে পড়তে পারেনি। কিছু দিন আগে মনে হয় ঠাণ্ডার কারণে গোটাগুলো ঝামেলা শুরু করলে ঠিক করে কিছু একটা ব্যবহার করা দরকার। আমি আবার সেই আলভেরা এগিয়ে দিই।

গত পরশু দেখি নেট খুঁজে ওষুধ বের করেছে। বরোপ্লাস।
আমাকে একটা বরোপ্লাস কিনে দিও তো।
ওটা তো ঘরে অনেক।
ঠিক এই নামে?
না, বরোলিন নামে।
কি রঙের প্যাকেট?
সবুজ।
না, আমার বেগুনী রঙের প্যাকেট চাই।
সবই এক ড্রাম থেকে তোলা। শুধু ভিন্ন বোতলে ঢেলে বিক্রি করে।
একটা ক্রীম কিনতে তোমার এত সমস্যা কেন?
সমস্যা নয়, তবে ঘরে সেটা থাকতে আরেকটা কেনা বোকামি।

যাহোক, দুটো বরোলিন বের করে ওকে দিলাম। একটা খুলে নিজে হাতে মাখলাম, তারপর ওকে দিয়ে অফিসে চলে এলাম। বাসায় রইলো নতুন আরেকটা প্যাকেট, খোলাটা সাথে নিলাম। আর পথে একটা বরোপ্লাস কিনলাম বেগুনী রঙের। ওষুধের দোকানে জিজ্ঞেস করায় সুন্দরী এক মহিলা বললেন
আমাদের বেগুনী আর সবুজ প্যাকেট আছে। কোনটা দেব?
বেগুনীটা দিন।
দুটোই এক, শুধু প্যাকেট ভিন্ন রঙের। হয়তো গন্ধ একটু ভিন্ন।
দেখুন, বউদের মাথায় যদি একবার কোন রঙ ঢুকে যায় হাজার চেষ্টা করেও অন্য রঙ গেলাতে পারবেন না।
তা অবশ্য সত্য - বলে মেয়েটা মুচকি হেসে আমার হাতে বেগুনী বরোপ্লাস ধরিয়ে দিল। আমি মনে মনে ভাবলাম অযথা পয়সা নষ্ট কারণ এই গন্ধ গুলিয়া পছন্দ করে না। একবার মেখে আর মাখবে না।

দুপুরে ফোন এলো।
তুমি মলমটা কোথায় রেখে গেলে?
কেন, টেবিলেই তো।
ওটা তো নতুন। যেটা খুললে সেটা কোথায়?
অফিসে।
এটা খুলব?
হ্যাঁ, খুলতে পার। তবে আমি তোমার জন্য বেগুনী বরোপ্লাস কিনেছি। কিছুক্ষণ পরেই বাসায় ফিরব। চাইলে অপেক্ষা করতে পার।

বাসায় ফিরে বেগুনী বরোপ্লাস ধরিয়ে দিলাম। সাথে সাথে খুলেই মুখে মেখে বলল

গন্ধটা কিন্তু সুন্দর। ধুপ কাঁঠির মত।
হুম।

আজ সকালে জিজ্ঞেস করলাম
কমেছে?
একদিনেই কি সারবে? এখন আবার মাখব।

তারপর শুরু হল বরোপ্লাস মাখা। তীব্র গন্ধে আমার দম বেরুনোর অবস্থা। তবে মুখ টিপে বসে রইলাম। এত দিন গুলিয়ার মুখে বরোলিনের গন্ধের কথা শুনতে শুনতে আমার মনে হয় এলারজি হয়েছে।

অফিসে আসার পথে ভাবলাম কে বিশাল শক্তি ইন্টারনেটের। গত তিরিশ বছরে হাজারবার বরোলিনের প্রশংসা করেছি, কাজ হয়নি। গতকাল নেটে এক রিপোর্ট পরেই ভক্তিতে গদগদ। অবশ্য এই কৃতিত্ব নেটের নাও হতে পারে। সাধারণত বৌ বা বরেরা পরপুরুষ আর পরস্ত্রীর মতামতকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়।

আমিই বা বসে থাকব কেন। রাতে পাশে বসে ধুমসে পায়ে বরোলিন মাখলাম। তৈলমর্দন আমাদের জাতীয় চরিত্র। তবে অনেক দিন বাইরে থাকার পরে চরিত্রে মনে হয় ঘুন ধরেছে। তাছাড়া অতি সাধারণ একজন সোভিয়েত পদার্থবিদ বিধায় আমার পায়ে কেউ কখনও তেল দেবে বলেও মনে হয় না। তাই তেলের পরিবর্তে বরোলিন মাখা। নিজের পায়ে। অনেক জমে গেছে। এই সুযোগে যত তাড়াতাড়ি ওগুলোর সদগতি করা যায়।

দুবনা, ১৯ জানুয়ারি ২০২৩



Comments

Popular Posts