দুর্গাপূজা ২০২৬

ক্রিস্তিনা এসেছিল পিটার থেকে। আমিই আসতে বলেছিলাম। পূজা দেখতে। একমাত্র ক্রিস্তিনাই ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ দেখায়। যোগ ব্যায়াম করে। বিভিন্ন পূজা পার্বণে যায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও গেছে বিভিন্ন সময়। আমাদের পূর্বপুরুষদের কথা জানতে চায়। অনেক আগে হঠাৎ ও ফ্যামিলি ট্রি সম্পর্কে জানতে চাইল। আমার ধারণা ছিল এ আর কঠিন কি। বিশেষ করে আমাদের পারিবারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পূর্বপুরুষদের নাম বলতে হয়। বাবা কাকাদের সেটা করতে দেখতাম। কাকার কাছে বহু পুরুষের (চৌদ্দ পুরুষের) নামের তালিকা করে ছিল বলেই আমার ধারণা ছিল। কিন্তু যখন বাড়িতেই দাদাদের কাছে জানতে চাইলাম কেউ খুঁজে খুব বেশি দূরে যেতে পারল না।‌ তবে ওর প্রশ্ন একটা সতর্ক বার্তা দিল। যদি পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে কিছু জানতে চাই তাহলে বড়রা বেঁচে থাকতে থাকতেই সেটা করার চেষ্টা করতে হবে।

ক্রিস্তিনা এসেছিল শুক্রবার রাতের ট্রেনে। মস্কো পৌঁছে সকাল ১০ টার দিকে। শনিবার গুলিয়া এসেছিল ওর সাথে দেখা করতে। গুলিয়ার অন্য কাজ ছিল, আর ছিল মনিকা ক্রিস্তিনার বান্ধবীর জন্মদিন। তাই ওরা একটা ক্যাফেতে কিছুক্ষণের জন্য দেখা করে। মেয়েরা জন্মদিনে যায়, গুলিয়া সেভার সাথে যায় লুঝনিকি ক্যাবল কারে ঘুরে বেড়াতে। পরে দুবনা ফেরে রাত একটার দিকে। 

আমি গতকাল মানে রোববার মস্কো আসি বরাবরের মতই। কথা ছিল ক্রিস্তিনা রেডি থাকবে। আমি বাসায় ব্যাগ আর ওর জিনিসপত্র রেখে যাব পূজা দেখতে। ফ্রুঞ্জেনস্কায়ায় এসে ওর ফোন পেলাম।
- পাপা, আমি পার্ক কুলতুরিতে। তুমি চা তৈরি কর। খেয়েই বেরিয়ে পড়ব।
আমার জন্য পূজার ওখানে কয়েক জন অপেক্ষা করছে। অভিষেক আর নয়ন এর মধ্যে কয়েক বার ফোন করেছে। এমন সময় ক্রিস্তিনা বাসায় ফিরে বলল
- মনিকা আর মিশা যেতে চাইছে। যাওয়া যাবে।
- যাবে না কেন? 
এরমধ্যে সেভা বাড়ি ফিরল।
- যাবি আমাদের সাথে?
- কোথায়?
- পূজায়।
- যেখানে ঝাল সালাদ দেয় সেখানে?
- মিষ্টিও দেয়। 
- জানি না। 
সেভা গেল না। মিশা আমাদের নিয়ে চলল পূজায়। এর মধ্যে অনেকগুলো ফোন। তাড়াতাড়ি আসেন। খাবার শেষের পথে। আমি যাই লোকজনের সাথে দেখা করতে। খাবার থাকলেই কি আর না থাকলেই কি?

গিয়ে দেখি খাবার সত্যি শেষের পথে। বুঝলাম মনিকা আর মিশার এখানে তেমন ভালো লাগছে না। আমি ব্যস্ত বাংলাদেশী ছাত্রদের নিয়ে। ক্রিস্তিনা বলল 
- মনিকা আর মিশা চলে যেতে চাইছে। আমি ওদের সাথে গাড়িতে চলে যাই। ব্যাগ গোছাতে হবে। 
- ঠিক আছে। 
ওরা চলে গেল। এরপর ছিল আরতি আর সবশেষে সংক্ষিপ্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ভারতীয় দূতাবাসের জেএনসিসির পরিবেশনায়। বাসায় এসে শুনলাম ক্রিস্তিনার ট্রেন রাত বারোটা তেইশ মিনিটে। এখনও সব অগোছালো। তাড়াতাড়ি গোছাতে বললাম। রাত এগারোটায় বলল ও গা ধুয়ে রেডি হবে। বের হতে হতে রাত সাড়ে এগারোটা। প্রথমে ভেবেছিলাম মেট্রো পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসব।
- তুমি আমাকে স্টেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিতে পারবে?
- চল যাই।
আসলে ওর লাগেজ বেশ ভারি। গুলিয়া তিন জোড়া শীতের জুতা দিয়েছে। অন্যান্য জামাকাপড়। কতবার বলি ওর ওখানে অর্ডার দিতে। কিন্তু গুলিয়ার নিজে দেখে কিনতে হবে। তাই ও খালি হাতে এলেও অনেক কিছু নিতে হচ্ছে। মনিকা দিয়েছে জ্যাকেট আর সোয়েটার। তাই একটা এক্সট্রা ব্যাগ। ফলে একা যেতে একটু কষ্ট। তাছাড়া আমাদের বলতে গেলে কথা বলা হয়নি। ছেলেমেয়েরা আমার সাথে কথা বলতে চাইলে সাধারণত ঘুরতে যায় আর যায় একা। ও নতুন যার কাছে গানের তালিম নিচ্ছে তাঁর কথা বলল। তিনি এখন ৮৫ পেরিয়ে গেছেন। সোভিয়েত আমলে নামকরা অপেরা গায়ক। ব্লুঝনিকভ। বোঝা গেল এই সংক্ষিপ্ত সফর ওর ভালো লেগেছে। ওকে ট্রেনে তুলে দিয়ে বাসার দিকে রওনা হয়ে দেখলাম চেরকিজভস্কি মেট্রোর পরিবর্তে চেরকিজভস্কি সেন্ট্রাল রিং এ চলে গেছি। ওটাতেও আসা যেত তবে বেশ ঘুরে। যদিও ক্লান্ত লাগছিল তবে মন ছিল ফুরফুরে। কারণ ক্রিস্তিনাকে ট্রেনে উঠিয়ে না দিলে যতক্ষণ না ও লিখত পায়েখালি মানে ট্রেন ছাড়ল আমি টেনশনে থাকতাম। আজ আর সেই টেনশন নেই। ওকে বিদায় দিয়ে মনে হল একটা ছবি তোলা হল না। তবে পূজা মণ্ডপে ছবি তুলেছি। এবার ছিল মস্কো দুর্গা পূজার ৩৭ তম বার্ষিকী, ১৯৯০ সালে শুরু হয়ে করোনা, যুদ্ধ সব কিছুকে দুহাতে ঠেলে দুর্গা পূজার ভেলা এখনও ভাসছে। সেটাই বা এ লেখায় চলবে না কেন? আমার টেলিফোন সাধারণত মিউট করা থাকে। ক্রিস্তিনাকে বিদায় দিয়ে বেরুতে না বেরুতেই দেখি মনিকার মিসকল। 
- কি ব্যাপার?
- তুমি কোথায়?
- ক্রিস্তিনাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে এলাম। 
- সাবধানে এস। রাত অনেক।
ভালোই লাগে ছেলেমেয়েরা আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করলে। আমি ওদের নিয়ে তেমন টেনশন করি না। কারণ যে নেই তা নয়। তবে জানি এতে সমস্যার সমাধান হয় না, অযথা মানসিক চাপ। তবে আমার ফিরতে দেরী হলেই সেভা, মনিকা বা গুলিয়া ফোন করতে শুরু করে। বাসায় যখন ফিরলাম রাত একটা পেরিয়ে গেছে। সবাই ঘুমে। শুধু তাইনা অপেক্ষা করছে আমার সাথে ঘুমানোর জন্য। 

দেশে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিকতার বাইরেও পূজার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পারিবারিক মিলন। এবার আমাদের সেটাই হয়েছে এই পূজা উপলক্ষ্যে।

যারা নিতে পারেন তাদের সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা!

মস্কো, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

Comments

Popular Posts