ভোটের ভূত / বিজন সাহা
সাবের নির্বাচন জমে উঠেছে। সবাই সদস্যদের কাছে তাদের মূল্যবান ভোট চাইছে। আমার ভোট অবশ্য মূল্যহীন তবে অমূল্য নয়। কি করে যে ভোট নামক এই ভূতের বেগার খাটি সেটাই এখন দুই আনার প্রশ্ন?
যদিও প্রথম প্রথম অনেকেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিতে গড়িমসি করছিল শেষ পর্যন্ত সবাই কোন না কোন ফর্মে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তবে শর্ত সাপেক্ষে। যদি এজিএম অনুমোদন করে। অনেকটা বিয়ের আসরে কনেকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে শর্ত জুড়ে দেয়া যদি বাবা মা সম্মতি দেয়। তবে নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল। প্রতিশ্রুতি না থাকার চেয়ে থাকা ভাল। এটা অনেকটা জেব্রা ক্রসিঙে গাড়ি চাপা পড়ে মরার মত। অন্য জায়গায় গাড়ি চাপা পড়লেও মৃত্যু ঘটত, তবে এখন মরার পর সান্ত্বনা থাকবে যে আইন মেনে মারা গেছি। তাছাড়া আমরা মিথ্যা আশ্বাস বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত। তাই প্রতিশ্রুতি পালন না করলেও খুশি হব। ঠকতে যে আমরা খুশি।
এজিএমে মাত্র ২০০ লোকের উপস্থিতি অনেককেই ভাবাচ্ছে। মাত্র ২০-২৫% সদস্যের উপস্থিতিতে নির্বাচন গণতান্ত্রিক কি না? যেহেতু সদস্যদের বেশিরভাগ দেশের বাইরে অবস্থান করছে তাই সব সদস্যদের গণনায় নেয়া শুরুতেই নাজুক অবস্থার সৃষ্টি করে। এ অবস্থা থেকে বেরুতে হলে হয় ভোটার গণ্য হবে শুধু তারাই যারা দেশে অবস্থান করছে অথবা প্রবাসী সদস্যদের ভোট গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আশা করব এজন্য নতুন কোন করোনার অপেক্ষা করতে হবে না। এর আগেই অনলাইনে ভোট দেবার ব্যবস্থা হবে। এটা টেকনিক্যালি কঠিন নয়, তবে দরকার পারস্পরিক বিশ্বাস। একবার সেটা তৈরি হলে সমস্যা হবে না। আশার বিষয় প্রত্যেক প্রার্থী নিজেদের মধ্যে এই বিশ্বাস গড়ে তোলার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। সবাই অনলাইন ভোট চালু করার কথা বলছে। সেক্ষেত্রে আমার ভোট ভূত থাকবে না, কায়া পাবে।
যদিও ভোট দেব না, তারপরেও যদি দিতাম কাকে দিতাম এ নিয়ে ভাবতে ক্ষতি কোথায়? প্রথমেই বলে নেই, আমি ভোট দিয়ে বন্ধু নির্বাচন করছি না, নির্বাচন করছি সাবের পরবর্তী কমিটি যাদের হাতে পরবর্তী দুই বছরের জন্য প্রিয় সংগঠন সাবের ভালো মন্দ ন্যস্ত করব। তাই ব্যক্তিগত ভাবে কেউ আমার বন্ধু কিনা সেটা এখানে বিবেচ্য নয়। এমনকি ব্যক্তিগত ভাবে কেউ যদি অপছন্দের মানুষও হয় তারপরেও যদি মনে করি সে সংগঠনকে সামনে এগিয়ে নিতে বেশি যোগ্য আমি তাকেই আমার কাল্পনিক ভোট দেব। তবে এর আগে বিভিন্ন লেখায় সাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে যা বলেছি সেটা এখনও প্রাসঙ্গিক। আমি এখনও মনে করি যে কোন ব্যক্তির একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক বারের বেশি সাবের কার্যকরী কমিটিতে নির্বাচিত হতে পারা ঠিক নয়। কারণ আমরা প্রথমত ভিপুস্কনিক, গ্র্যাজুয়েট। আমাদের প্রথম ও প্রধান পরিচয় আমাদের স্পেশালিটিতে এবং চাকুরি বা ব্যবসায়িক জীবনে সমাজে আমাদের নিজ নিজ অবস্থানে। সাবের মাধ্যমে আমরা শুধু সোভিয়েত ও রুশ গ্র্যাজুয়েটদের সেবা করতে পারব, দেশের ও দশের সেবা করতে পারব কর্মজীবনে সাফল্যের মাধ্যমে। সোভিয়েত ইউনিয়নে আমাদের লেখাপড়ার একটি মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের সেবা। ভালো হয় নিজ নিজ দেশের, সেটা না হলে যে যেখানে বাস করি সেই দেশের (এটা আমি নিজের কথা ভেবে বললাম। কারণ আপনাদের অনেকের মত আমি দেশে ফিরে দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে পারিনি) মানুষের জন্য কিছু করা। কিন্তু সিভির বিশাল অংশ জুড়ে যদি সাবের কার্যকরী পরিষদের সদস্য – একমাত্র যোগ্যতা হয় তবে ভিপুস্কনিক হিসেবে তার দায়িত্বপালন নিয়ে আমি সন্দেহ করতেই পারি।
কয়েকদিন আগে কেউ কেউ প্রশ্ন করেছিলেন, গঠনতন্ত্র নিয়ে আলোচনার কি দরকার? সেখানে সব কিছুই ঠিক আছে। আপত্তি করব না। তবে আমি বা আমাদের অনেকেই যে পরিবর্তনের কথা বলছে সেটা আলী রিয়াজের মত সংবিধানের খোলনলচে বদলানো নয়। প্রচলিত গঠনতন্ত্র কীভাবে আরও বেশি কার্যকরী করা যায়, কীভাবে বেশি বেশি ভিপুস্কনিক এতে অংশগ্রহণ করতে পারে সেটাই বিবেচ্য। তাই এটাকে পরিবর্তন না বলে বরং সংযোজন বলা ভালো। যে সমস্ত প্রস্তাব এখানে এসেছে তার মূল উদ্দেশ্য বিভিন্ন দেশে ও দেশের বিভিন্ন শহরে সাবের যেসব সদস্যরা আছে তাদের সক্রিয় করে তোলা। এটা সম্ভব অনলাইনে মত বিনিময় সভার আয়োজন করে, অনলাইনে ভোট দেবার ব্যবস্থা করে আর বিভিন্ন জায়গায় সাবের শাখা কমিটি করে যেমনটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন শহরে। আমি বলছি না যে তাতে এক দিনেই সমস্ত সমস্যার সমাধান হবে। এমনকি এটা ঐক্যের পরিবর্তে ভাঙ্গনের সুর বাজাতে পারে, তারপরেও যেহেতু প্রচুর সদস্য বর্তমানে যেভাবে সাবের কাজকর্ম চলছে তাতে খুশি নয়, অনেকেই নিজেদের সাবের কাজের সাথে সম্পৃক্ত করতে চায়, তাই চেষ্টা করা দেখাই যাক না। কয়েক বছর আগেও এটা যখন টেকনিক্যালি সম্ভব ছিল না, এ নিয়ে কেউ ভাবেনি। আজ যেহেতু প্রযুক্তি আমাদের সেই সুযোগ দেয়, তাহলে কেন তার সদ্ব্যবহার করব না?
যদি প্রার্থীদের কথা বলি, তাহলে এখানে সবাই যোগ্য। যোগ্য বলেই সবাই জীবনে উন্নতি করেছে, যোগ্য বলেই নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে। কিছু কিছু পদে প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় অটো নির্বাচন হয়েছে। আমি আবারও বলব, এদের সবাইকে আলাদা আলাদা ভাবে এজিএমএ পাশ করিয়ে আনতে। এখানে রাশিয়ার সিস্টেম নিয়ে দুই কথা বলতে পারি। এদেশে আমাদের সবার চাকরি সাময়িক, প্রতি এক, দুই, তিন বা পাঁচ বছর অন্তর অন্তর চাকরি রিনিউ করাতে হয়। সবাই এর মধ্য দিয়ে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই এর আগে ফর্মাল বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়, বিগত টার্মের কাজকর্মের পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা হয়, সেমিনারে এই সময়ের কাজের হিসাব মানে পাব্লিকেশন, কনফারেন্সে প্রেজেন্টেশন, ভবিষ্যৎ প্ল্যান এসব বিষয়ে বিস্তারিত বলতে হয়। এসবের পর সায়েন্টিফিক কাউন্সিল ডাকা হয়, যেখানে গোপন ব্যালটে নির্বাচন করা হয়। এটা ঠিক যেমন পিএইচডি ডিফেন্সে ঘটে। এখানে যদি জনা তিনেক (১০%) বিপক্ষে ভোট দেয় তাহলে নির্বাচিত হয় না। আমার মনে হয় যারা সিলেক্টেড হয়েছে, নির্বাচন কমিশন তাদের প্রত্যেককে এমন পরীক্ষার মুখোমুখি করতে পারে। অন্তত ভবিষ্যতে সেটা ভেবে দেখা দরকার। অর্থাৎ নির্বাচন একটা গুরুত্বপূর্ণ ইনস্টিটিউশন, এখানে অটোম্যাটিক্যালি কিছু হয় না সেটা আমাদের বোঝা দরকার।
এবার নির্বাচন হচ্ছে সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ পদে।
সভাপতি পদে দুই জনই প্রচণ্ড যোগ্য। তাদের সিভি দেখলেই সেটা বোঝা যায়। তবে তাদের অতীত আমাদের একটা ধারণা দেয় কিন্তু ভবিষ্যৎ সাফল্যের গ্যারান্টি দেয় না। সোবাহান ভাই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ক্যাপাসিটিতে সাবের কাজ করেছেন, যেমন করেছেন দেশ সেবা। গত বছর বা এবার তার বিভিন্ন পোস্ট থেকে আমার মনে হয়েছে যে সাবের সভাপতি পদ সেই কোহিনূর যেটা তার বর্ণাঢ্য জীবনের মুকুটে এখনও শোভা পায়নি। আমি ভুল করতে পারি। তবে কারও ব্যক্তিগত সিভি তারার মত জ্বল জ্বল করে জ্বলুক এজন্যে আমি ভোট কেন দেব? আবিদ খানের কর্মজীবন কম বর্ণাঢ্য নয়। ব্যক্তিগত ভাবে আমাদের মিলের চেয়ে অমিল অনেক বেশি। কিন্তু আগেই বলেছি আমি এখানে বন্ধু নির্বাচন করছি না, নির্বাচন করছি সাবের সভাপতি। মস্কো জীবনে বিভিন্ন প্রশ্নে আমাদের মতের এন্টাগনিস্টিক অমিল থাকলেও সাবের প্রতি তার ইন্টিগ্রিটি নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। আরও একটি বিষয়। ছাত্র জীবনে আমি সব সময় চাইতাম জুনিয়ররা ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে আসুক। কারণ সময় মত কাণ্ডারি না বদলালে একসময় নৌকা ডুবে যায়। ৬০+ মোটেই ছেলেবেলা নয়, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আবিদ খান সত্তর দশকের বড় ভাইদের আর আশির দশক ও পরবর্তী সময়ের ভিপুস্কনিকদের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করতে পারবে বলেই আমার বিশ্বাস। আফসোস যে আমি সেই সেতু মাড়িয়ে কখনও এপার ওপার করতে পারব না। তাছাড়া আমার কাছে সাবের সভাপতি মানে আমাদের দেশের মত অবিসংবাদী নেতা নয়, যার আদেশ শিরোধার্য। আমার কাছে সভাপতি সেই লোক যাকে আমরা কিছু সময়ের জন্য দায়িত্ব দিয়েছি, যার সাথে দ্বিমত পোষণ করা যাবে, তর্ক করা যাবে, সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে ঝগড়া করা যাবে আবার তারপর একসাথে হাত মিলিয়ে কাজ করা যাবে। নির্বাচন কমিশন যদি অনলাইনে ভোট নিত তাহলে আজ আমার ভোট আবিদ খানের ঝুলিতেই পড়ত।
সাধারণ সম্পাদক পদে দুই জন প্রার্থী। নুরুল হুদা আখন্দ ভিপুস্কনিকদের বিভিন্ন গ্রুপে যথেষ্ট সক্রিয়। তার অনেক পরিকল্পনা যুক্তিযুক্ত। যেহেতু তার সম্পর্কে এর বাইরে তেমন কোন ধারণা নেই তাই কোন রকম মন্তব্য করা ঠিক হবে না। অন্য দিকে আছে তানিয়া আতিক। মস্কো জীবন থেকেই পরিচিত। সাবের বিভিন্ন কাজকর্মে প্রচণ্ড সক্রিয়। আসলে সাবের সাথে এর আগে আমার যতটুকু ফর্মাল যোগাযোগ সেটা তানিয়ার মাধ্যমেই। একাধিক বার সাবে কার্যকরী কমিটিতে ছিল বলে ওকে সমর্থন করলে অনেকেই এর মধ্যে দ্বিচারিতা দেখতে পারে। তবে তানিয়া এই পদে প্রথম মহিলা প্রার্থী। তাছাড়া গতবার ও এই পদে নির্বাচন করে হেরে গেলেও নিজেকে গুটিয়ে নেয়নি, বরং আগের মতই সাবের কাজকর্মে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিল। এটা আজকালকার দিনে খুব একটা দেখা যায় না। এটা প্রমান করে যে তানিয়া পদের কারণে নয়, সাবকে মনে প্রাণে ভালোবাসে আর তাই পদের তোয়াক্কা না করে কাজ করে। তাছাড়া আমি আগের বিভিন্ন লেখায় যেসব দাবি দাওয়া তুলেছিলাম, তানিয়া এজিএমের সম্মতিক্রমে ঠিক সে ধরণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার করেছে। তাই আমার কাল্পনিক ভোট তানিয়ার ঝোলায়।
কোষাধ্যক্ষয় পদে দুইজন। দুজনেই যোগ্য। তবে সাবের কি আদৌ কোন কোষ আছে? যেহেতু সাব অলাভজনক, নন-কমারসিয়াল সংগঠন তাই আমি লিপিকেই ভোটটা দেব। কারণ মেয়েরা শুধু কেবিনেটের সৌন্দর্য বাড়ায় না, এক ধরণের ঘরোয়া পরিবেশ সৃষ্টি করে। তাছাড়া কমিটি মানেই টিম, কিছু মানুষ যারা পরস্পরকে দীর্ঘদিন জানে, একসাথে কাজকর্ম করেছে তাদের সমন্বয়ে কমিটি হলে কাজ স্মুথ হয়।
সাধারণত সংগঠনের সহ-সভাপতিরা হয়ে থাকেন গার্জেন স্বরূপ, একটু বয়স্ক, বিভিন্ন জটিল পরিস্থিতিতে যাদের মতামত সভাপতি ও অন্যদের সাহায্য করে। যেহেতু সবাইকে চিনি না, তাই যাদের চিনি তাদের পক্ষেই বলব। ডঃ গনেশ চন্দ্র রায়, ডাঃ হামিদা মায়দার, ডাঃ সাকী খন্দকার – এরা সবাই অভিজ্ঞ, ধারে ও ভারে দু ভাবেই কাটবে। অন্য দিকে রাজ্জাক সব সময়ই সাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। প্রফেসর খোরশেদ আলম, প্রফেসর স্বপন কুমার বন্দ্যোপধ্যায়, প্রফেসর নাসিম আক্তার সবাই যোগ্য। আশা করি তিন প্রফেসরের মধ্য থেকে সবাই যোগ্য কাউকে বেছে নেবে। আমি কল্পনায় আবার ভোট গনেশ দা, রীনা (হামিদা) আপা, সাকী আপা আর রাজ্জাককেই দেব। তবে যাকেই দেন না কেন, ভোট দেবেন নিজের বিবেচনায়, কারণ আমার নিজের কোন নির্বাচনী অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি নেই। প্রার্থীরা সেটা পূরণে ব্যর্থ হলে তার দায় সম্পূর্ণ নিজেদের। আমি পন্টি পিলটের মত হাত ধুয়ে এখানেই শেষ করছি।
দা দ্রাভস্তভুয়েত সাব।
দুবনা, ০৯ জুলাই ২০২৬
যদিও প্রথম প্রথম অনেকেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিতে গড়িমসি করছিল শেষ পর্যন্ত সবাই কোন না কোন ফর্মে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তবে শর্ত সাপেক্ষে। যদি এজিএম অনুমোদন করে। অনেকটা বিয়ের আসরে কনেকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে শর্ত জুড়ে দেয়া যদি বাবা মা সম্মতি দেয়। তবে নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল। প্রতিশ্রুতি না থাকার চেয়ে থাকা ভাল। এটা অনেকটা জেব্রা ক্রসিঙে গাড়ি চাপা পড়ে মরার মত। অন্য জায়গায় গাড়ি চাপা পড়লেও মৃত্যু ঘটত, তবে এখন মরার পর সান্ত্বনা থাকবে যে আইন মেনে মারা গেছি। তাছাড়া আমরা মিথ্যা আশ্বাস বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত। তাই প্রতিশ্রুতি পালন না করলেও খুশি হব। ঠকতে যে আমরা খুশি।
এজিএমে মাত্র ২০০ লোকের উপস্থিতি অনেককেই ভাবাচ্ছে। মাত্র ২০-২৫% সদস্যের উপস্থিতিতে নির্বাচন গণতান্ত্রিক কি না? যেহেতু সদস্যদের বেশিরভাগ দেশের বাইরে অবস্থান করছে তাই সব সদস্যদের গণনায় নেয়া শুরুতেই নাজুক অবস্থার সৃষ্টি করে। এ অবস্থা থেকে বেরুতে হলে হয় ভোটার গণ্য হবে শুধু তারাই যারা দেশে অবস্থান করছে অথবা প্রবাসী সদস্যদের ভোট গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আশা করব এজন্য নতুন কোন করোনার অপেক্ষা করতে হবে না। এর আগেই অনলাইনে ভোট দেবার ব্যবস্থা হবে। এটা টেকনিক্যালি কঠিন নয়, তবে দরকার পারস্পরিক বিশ্বাস। একবার সেটা তৈরি হলে সমস্যা হবে না। আশার বিষয় প্রত্যেক প্রার্থী নিজেদের মধ্যে এই বিশ্বাস গড়ে তোলার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। সবাই অনলাইন ভোট চালু করার কথা বলছে। সেক্ষেত্রে আমার ভোট ভূত থাকবে না, কায়া পাবে।
যদিও ভোট দেব না, তারপরেও যদি দিতাম কাকে দিতাম এ নিয়ে ভাবতে ক্ষতি কোথায়? প্রথমেই বলে নেই, আমি ভোট দিয়ে বন্ধু নির্বাচন করছি না, নির্বাচন করছি সাবের পরবর্তী কমিটি যাদের হাতে পরবর্তী দুই বছরের জন্য প্রিয় সংগঠন সাবের ভালো মন্দ ন্যস্ত করব। তাই ব্যক্তিগত ভাবে কেউ আমার বন্ধু কিনা সেটা এখানে বিবেচ্য নয়। এমনকি ব্যক্তিগত ভাবে কেউ যদি অপছন্দের মানুষও হয় তারপরেও যদি মনে করি সে সংগঠনকে সামনে এগিয়ে নিতে বেশি যোগ্য আমি তাকেই আমার কাল্পনিক ভোট দেব। তবে এর আগে বিভিন্ন লেখায় সাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে যা বলেছি সেটা এখনও প্রাসঙ্গিক। আমি এখনও মনে করি যে কোন ব্যক্তির একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক বারের বেশি সাবের কার্যকরী কমিটিতে নির্বাচিত হতে পারা ঠিক নয়। কারণ আমরা প্রথমত ভিপুস্কনিক, গ্র্যাজুয়েট। আমাদের প্রথম ও প্রধান পরিচয় আমাদের স্পেশালিটিতে এবং চাকুরি বা ব্যবসায়িক জীবনে সমাজে আমাদের নিজ নিজ অবস্থানে। সাবের মাধ্যমে আমরা শুধু সোভিয়েত ও রুশ গ্র্যাজুয়েটদের সেবা করতে পারব, দেশের ও দশের সেবা করতে পারব কর্মজীবনে সাফল্যের মাধ্যমে। সোভিয়েত ইউনিয়নে আমাদের লেখাপড়ার একটি মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের সেবা। ভালো হয় নিজ নিজ দেশের, সেটা না হলে যে যেখানে বাস করি সেই দেশের (এটা আমি নিজের কথা ভেবে বললাম। কারণ আপনাদের অনেকের মত আমি দেশে ফিরে দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে পারিনি) মানুষের জন্য কিছু করা। কিন্তু সিভির বিশাল অংশ জুড়ে যদি সাবের কার্যকরী পরিষদের সদস্য – একমাত্র যোগ্যতা হয় তবে ভিপুস্কনিক হিসেবে তার দায়িত্বপালন নিয়ে আমি সন্দেহ করতেই পারি।
কয়েকদিন আগে কেউ কেউ প্রশ্ন করেছিলেন, গঠনতন্ত্র নিয়ে আলোচনার কি দরকার? সেখানে সব কিছুই ঠিক আছে। আপত্তি করব না। তবে আমি বা আমাদের অনেকেই যে পরিবর্তনের কথা বলছে সেটা আলী রিয়াজের মত সংবিধানের খোলনলচে বদলানো নয়। প্রচলিত গঠনতন্ত্র কীভাবে আরও বেশি কার্যকরী করা যায়, কীভাবে বেশি বেশি ভিপুস্কনিক এতে অংশগ্রহণ করতে পারে সেটাই বিবেচ্য। তাই এটাকে পরিবর্তন না বলে বরং সংযোজন বলা ভালো। যে সমস্ত প্রস্তাব এখানে এসেছে তার মূল উদ্দেশ্য বিভিন্ন দেশে ও দেশের বিভিন্ন শহরে সাবের যেসব সদস্যরা আছে তাদের সক্রিয় করে তোলা। এটা সম্ভব অনলাইনে মত বিনিময় সভার আয়োজন করে, অনলাইনে ভোট দেবার ব্যবস্থা করে আর বিভিন্ন জায়গায় সাবের শাখা কমিটি করে যেমনটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন শহরে। আমি বলছি না যে তাতে এক দিনেই সমস্ত সমস্যার সমাধান হবে। এমনকি এটা ঐক্যের পরিবর্তে ভাঙ্গনের সুর বাজাতে পারে, তারপরেও যেহেতু প্রচুর সদস্য বর্তমানে যেভাবে সাবের কাজকর্ম চলছে তাতে খুশি নয়, অনেকেই নিজেদের সাবের কাজের সাথে সম্পৃক্ত করতে চায়, তাই চেষ্টা করা দেখাই যাক না। কয়েক বছর আগেও এটা যখন টেকনিক্যালি সম্ভব ছিল না, এ নিয়ে কেউ ভাবেনি। আজ যেহেতু প্রযুক্তি আমাদের সেই সুযোগ দেয়, তাহলে কেন তার সদ্ব্যবহার করব না?
যদি প্রার্থীদের কথা বলি, তাহলে এখানে সবাই যোগ্য। যোগ্য বলেই সবাই জীবনে উন্নতি করেছে, যোগ্য বলেই নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে। কিছু কিছু পদে প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় অটো নির্বাচন হয়েছে। আমি আবারও বলব, এদের সবাইকে আলাদা আলাদা ভাবে এজিএমএ পাশ করিয়ে আনতে। এখানে রাশিয়ার সিস্টেম নিয়ে দুই কথা বলতে পারি। এদেশে আমাদের সবার চাকরি সাময়িক, প্রতি এক, দুই, তিন বা পাঁচ বছর অন্তর অন্তর চাকরি রিনিউ করাতে হয়। সবাই এর মধ্য দিয়ে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই এর আগে ফর্মাল বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়, বিগত টার্মের কাজকর্মের পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা হয়, সেমিনারে এই সময়ের কাজের হিসাব মানে পাব্লিকেশন, কনফারেন্সে প্রেজেন্টেশন, ভবিষ্যৎ প্ল্যান এসব বিষয়ে বিস্তারিত বলতে হয়। এসবের পর সায়েন্টিফিক কাউন্সিল ডাকা হয়, যেখানে গোপন ব্যালটে নির্বাচন করা হয়। এটা ঠিক যেমন পিএইচডি ডিফেন্সে ঘটে। এখানে যদি জনা তিনেক (১০%) বিপক্ষে ভোট দেয় তাহলে নির্বাচিত হয় না। আমার মনে হয় যারা সিলেক্টেড হয়েছে, নির্বাচন কমিশন তাদের প্রত্যেককে এমন পরীক্ষার মুখোমুখি করতে পারে। অন্তত ভবিষ্যতে সেটা ভেবে দেখা দরকার। অর্থাৎ নির্বাচন একটা গুরুত্বপূর্ণ ইনস্টিটিউশন, এখানে অটোম্যাটিক্যালি কিছু হয় না সেটা আমাদের বোঝা দরকার।
এবার নির্বাচন হচ্ছে সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ পদে।
সভাপতি পদে দুই জনই প্রচণ্ড যোগ্য। তাদের সিভি দেখলেই সেটা বোঝা যায়। তবে তাদের অতীত আমাদের একটা ধারণা দেয় কিন্তু ভবিষ্যৎ সাফল্যের গ্যারান্টি দেয় না। সোবাহান ভাই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ক্যাপাসিটিতে সাবের কাজ করেছেন, যেমন করেছেন দেশ সেবা। গত বছর বা এবার তার বিভিন্ন পোস্ট থেকে আমার মনে হয়েছে যে সাবের সভাপতি পদ সেই কোহিনূর যেটা তার বর্ণাঢ্য জীবনের মুকুটে এখনও শোভা পায়নি। আমি ভুল করতে পারি। তবে কারও ব্যক্তিগত সিভি তারার মত জ্বল জ্বল করে জ্বলুক এজন্যে আমি ভোট কেন দেব? আবিদ খানের কর্মজীবন কম বর্ণাঢ্য নয়। ব্যক্তিগত ভাবে আমাদের মিলের চেয়ে অমিল অনেক বেশি। কিন্তু আগেই বলেছি আমি এখানে বন্ধু নির্বাচন করছি না, নির্বাচন করছি সাবের সভাপতি। মস্কো জীবনে বিভিন্ন প্রশ্নে আমাদের মতের এন্টাগনিস্টিক অমিল থাকলেও সাবের প্রতি তার ইন্টিগ্রিটি নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। আরও একটি বিষয়। ছাত্র জীবনে আমি সব সময় চাইতাম জুনিয়ররা ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে আসুক। কারণ সময় মত কাণ্ডারি না বদলালে একসময় নৌকা ডুবে যায়। ৬০+ মোটেই ছেলেবেলা নয়, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আবিদ খান সত্তর দশকের বড় ভাইদের আর আশির দশক ও পরবর্তী সময়ের ভিপুস্কনিকদের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করতে পারবে বলেই আমার বিশ্বাস। আফসোস যে আমি সেই সেতু মাড়িয়ে কখনও এপার ওপার করতে পারব না। তাছাড়া আমার কাছে সাবের সভাপতি মানে আমাদের দেশের মত অবিসংবাদী নেতা নয়, যার আদেশ শিরোধার্য। আমার কাছে সভাপতি সেই লোক যাকে আমরা কিছু সময়ের জন্য দায়িত্ব দিয়েছি, যার সাথে দ্বিমত পোষণ করা যাবে, তর্ক করা যাবে, সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে ঝগড়া করা যাবে আবার তারপর একসাথে হাত মিলিয়ে কাজ করা যাবে। নির্বাচন কমিশন যদি অনলাইনে ভোট নিত তাহলে আজ আমার ভোট আবিদ খানের ঝুলিতেই পড়ত।
সাধারণ সম্পাদক পদে দুই জন প্রার্থী। নুরুল হুদা আখন্দ ভিপুস্কনিকদের বিভিন্ন গ্রুপে যথেষ্ট সক্রিয়। তার অনেক পরিকল্পনা যুক্তিযুক্ত। যেহেতু তার সম্পর্কে এর বাইরে তেমন কোন ধারণা নেই তাই কোন রকম মন্তব্য করা ঠিক হবে না। অন্য দিকে আছে তানিয়া আতিক। মস্কো জীবন থেকেই পরিচিত। সাবের বিভিন্ন কাজকর্মে প্রচণ্ড সক্রিয়। আসলে সাবের সাথে এর আগে আমার যতটুকু ফর্মাল যোগাযোগ সেটা তানিয়ার মাধ্যমেই। একাধিক বার সাবে কার্যকরী কমিটিতে ছিল বলে ওকে সমর্থন করলে অনেকেই এর মধ্যে দ্বিচারিতা দেখতে পারে। তবে তানিয়া এই পদে প্রথম মহিলা প্রার্থী। তাছাড়া গতবার ও এই পদে নির্বাচন করে হেরে গেলেও নিজেকে গুটিয়ে নেয়নি, বরং আগের মতই সাবের কাজকর্মে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিল। এটা আজকালকার দিনে খুব একটা দেখা যায় না। এটা প্রমান করে যে তানিয়া পদের কারণে নয়, সাবকে মনে প্রাণে ভালোবাসে আর তাই পদের তোয়াক্কা না করে কাজ করে। তাছাড়া আমি আগের বিভিন্ন লেখায় যেসব দাবি দাওয়া তুলেছিলাম, তানিয়া এজিএমের সম্মতিক্রমে ঠিক সে ধরণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার করেছে। তাই আমার কাল্পনিক ভোট তানিয়ার ঝোলায়।
কোষাধ্যক্ষয় পদে দুইজন। দুজনেই যোগ্য। তবে সাবের কি আদৌ কোন কোষ আছে? যেহেতু সাব অলাভজনক, নন-কমারসিয়াল সংগঠন তাই আমি লিপিকেই ভোটটা দেব। কারণ মেয়েরা শুধু কেবিনেটের সৌন্দর্য বাড়ায় না, এক ধরণের ঘরোয়া পরিবেশ সৃষ্টি করে। তাছাড়া কমিটি মানেই টিম, কিছু মানুষ যারা পরস্পরকে দীর্ঘদিন জানে, একসাথে কাজকর্ম করেছে তাদের সমন্বয়ে কমিটি হলে কাজ স্মুথ হয়।
সাধারণত সংগঠনের সহ-সভাপতিরা হয়ে থাকেন গার্জেন স্বরূপ, একটু বয়স্ক, বিভিন্ন জটিল পরিস্থিতিতে যাদের মতামত সভাপতি ও অন্যদের সাহায্য করে। যেহেতু সবাইকে চিনি না, তাই যাদের চিনি তাদের পক্ষেই বলব। ডঃ গনেশ চন্দ্র রায়, ডাঃ হামিদা মায়দার, ডাঃ সাকী খন্দকার – এরা সবাই অভিজ্ঞ, ধারে ও ভারে দু ভাবেই কাটবে। অন্য দিকে রাজ্জাক সব সময়ই সাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। প্রফেসর খোরশেদ আলম, প্রফেসর স্বপন কুমার বন্দ্যোপধ্যায়, প্রফেসর নাসিম আক্তার সবাই যোগ্য। আশা করি তিন প্রফেসরের মধ্য থেকে সবাই যোগ্য কাউকে বেছে নেবে। আমি কল্পনায় আবার ভোট গনেশ দা, রীনা (হামিদা) আপা, সাকী আপা আর রাজ্জাককেই দেব। তবে যাকেই দেন না কেন, ভোট দেবেন নিজের বিবেচনায়, কারণ আমার নিজের কোন নির্বাচনী অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি নেই। প্রার্থীরা সেটা পূরণে ব্যর্থ হলে তার দায় সম্পূর্ণ নিজেদের। আমি পন্টি পিলটের মত হাত ধুয়ে এখানেই শেষ করছি।
দা দ্রাভস্তভুয়েত সাব।
দুবনা, ০৯ জুলাই ২০২৬
Comments
Post a Comment