পরিচয়

গত কয়েক সপ্তাহ হল সোমবার মঙ্গলবার মস্কো থাকতে হচ্ছে। মূলতঃ ডাক্তার দেখাতে। আজ ছিল মেডিক্যাল চেক আপ। দুবনায় আমরা প্রতি দুই বছরে একবার করে করি, প্যাট্রিসে (গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে) প্রতি বছর। সে কারণেই মিকলুখো মাকলায়া যাওয়া। এসেছি যখন, ভাবলাম আইডি কার্ড নিয়ে যাই। আগেরটা ছিল এসোসিয়েটেড প্রফেসরের। তাও পুরানো। ইদানিং স্মার্টফোনে ইলেকট্রনিক আইডি ব্যবহার করি। তাই এসব তেমন দরকার হয় না। তবুও ভাললাম প্রফেসরের আইডি কার্ড নিয়ে নেই স্যুভেনির হিসেবে। গেলাম গুমস্যোসে মানে হিউম্যানিটেরিয়ান ও স্যোসিওলজি ফ্যাকাল্টিতে। ওখানে বলল এসব এখন ক্রেস্তে হয়। তাই হাঁটতে শুরু করলাম ক্রেস্তের দিকে রুশ ভাষা, এগ্রিকালচার ও মেডিসিন ফ্যাকাল্টির পাশ দিয়ে।

আগে ক্রেস্তে ঢোকার মুখে পাস দেখাতে হয়। এখন ঢোকার পরে ইনফরমেশন সেন্টার। ডান দিকে এন্ট্রান্স, বাম দিকে এক্সিট। ওখানে একটি মেয়েকে কোথায় আইডি কার্ড দেয় জানতে চাইলে ও জিজ্ঞেস করল 
- আপনি কি এখানে কাজ করেন?
- হ্যাঁ।
- এখন তো ইলেকট্রিক আইডি।
- জানি। আমার আছে। কিন্তু কাগজেরটা চাইছি।
ও পাশে বসা একটি মেয়েকে খোঁজ নিতে বলল। মেয়েটি দেখতে অনেকটা দক্ষিণ ভারতীয়দের মত। ও আমাকে জানাল নীচে মাল্টি ফাংশনাল সেন্টারের ৪ নম্বর উইন্ডো থেকে নিতে হবে।‌
এটা আন্ডারগ্রাউন্ডে। ক্রেস্তের ক্যাফেটেরিয়া ও সেন্ট্রাল এরিয়ার পুরোটা জুড়ে। ছাত্রছাত্রীদের ভীড়। তবে ৪ নম্বর উইন্ডো ফাঁকা। 
- শুভ দিন। আমার আইডি কার্ড দরকার।
- এখন তো সবাই ইলেকট্রনিক কার্ড ব্যবহার করে।
- আমার আছে। তবে আমি কাগজের কার্ড চাইছি।
- আমরা তো কাগজের কার্ড দেই না।
- কিন্তু এর আগে তো দিয়েছিল।
- বুঝলাম। আপনি প্লাস্টিক কার্ডের কথা বলছেন।
- হ্যাঁ। হার্ড কপি।
- পাসপোর্ট দিন।
ভদ্রমহিলা পাসপোর্ট নিয়ে কাজ শুরু করলেন।
- আমার কাছে ইদানিং কালের ছবি আছে। লাগবে?
- কি ফরম্যাটে?
- সফ্ট কপি। 
- দরকার নেই।
মিনিট সাত আট পরে আমার হাতে নতুন কার্ড ধরিয়ে দিলেন। প্রায় আগেরটার মত। শুধু প্রফেসর লেখা ও এক্সপায়ার ডেট নেই। মনে মনে ভাবলাম কার্ডের আগে আমিই এক্সপায়ার করব সেই বিবেচনা থেকে নিশ্চয়ই। 

বেরিয়ে যাচ্ছি, ইনফর্মেশন সেন্টারের মেয়েটি জিজ্ঞেস করল 
- কার্ড পেলেন?
- পেয়েছি। ধন্যবাদ।
এবার পাশ থেকে আমাদের এলাকার মেয়েটি জিজ্ঞেস করল 
- আপ ইন্ডিয়ান? (সঠিক বলতে পারব না, তবে মনে হল হিন্দিতে প্রশ্ন করল)
- নো। বাংলাদেশী। ফ্রম বাংলাদেশ।
এরপর ও কি কি যেন বলল। মনে হল বাংলায়।‌ তাই জিজ্ঞেস করলাম 
- আপনি বাংলা জানেন? পশ্চিম বঙ্গ থেকে?
- না। বাংলাদেশের। আপনার নাম?
- বিজন। বিজন সাহা। এখানে শিক্ষকতা করি।
- আমাকে তুমি বলে বলেন। আমি মাস্টার্স শেষ করেছি। এখন পিএইচডি করছি।
- আচ্ছা। আপনার দেশের বাড়ি কোথায়?
- ঢাকা।
- আমি মানিকগঞ্জ থেকে। কোন সাবজেক্টে পিএইচডি করছেন?
- ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনে। 
- এখন এখানে বাংলাদেশের কত ছাত্র-ছাত্রী আছে?
- একশর মত। তবে অনেকেই একাডেমিক লিভে। আপনাদের সময় হয়তো এমন ছিল না।
- আমি ১৯৮৩ থেকে এখানে। তখন পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল। যাহোক আপনার নাম কিন্তু জানা হয়নি।
- স্নিগ্ধা।
- ঠিক আছে। ভালো থাকবেন।

বাইরে এসে নিজেকে প্রশ্ন করলাম - আচ্ছা, প্যাট্রিস লুমুম্বা এমন একটি জায়গা যেখানে বাংলাদেশী কারোও দেখা পাওয়া খুব স্বাভাবিক। তবুও আমরা একে অন্যকে বাংলাদেশী বলে না ভেবে ভারতীয় ভাবলাম।  এমনকি খানিকক্ষণ বাংলায় কথা বলার পরেও ঘোরটা কাটল না। এমনটা কেন হয়? 

মস্কো, ২১ অক্টোবর ২০২৫

Comments

Popular Posts