জীবন

রুশরা বলে - একটা পেশা আছে, জন্মভূমি রক্ষা করা। আমি বলি আরও একটা পেশা আছে - বাবা হওয়া। 

জীবনে খুব বেশি জায়গায় চাকরি করার অভিজ্ঞতা নেই আমার। পিএইচডির সার্টিফিকেট হাতে পেয়ে ১৯৯৪ সালের ১৮ মে সেই যে দুবনায় এলাম জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ -এ আর কোথাও যাওয়ার কথা মাথায় আসেনি। তবে পাশাপাশি শিক্ষকতা করেছি বিভিন্ন সময়, এখনও করছি। এর বাইরে যা দু' একটা চাকরি করছি তার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন মনে হয় বাবার চাকরি। বরের চাকরি যে সহজ তা বলব না, তবে সেখানে ফাঁকি দেয়া যায়। বাবার চাকরিতে সে সুযোগ নেই। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা বাচ্চাদের অন্যায় আবদার রক্ষা করা।

একটা পারিবারিক কাজে ক্রিস্টিনা মস্কো এসেছিল। সেটা হয়েও যাবার কথা ছিল। তবে আমলাদের ভুলে আবার সবকিছু নতুন করে করতে হল। মনিকার সেন্ট পিটার্সবার্গের টিকেট কাটা ছিল, বাসা ভাড়া নেয়া ছিল। তাই ও মায়ের নামে পাওয়ার অফ এটর্নি করে দিয়ে চলে গেল। ক্রিস্টিনাকেও বলেছিলাম। ও থেকে গেল রাতের ট্রেনে ফিরে যাবে বলে। আমারও দুবনা ফিরে এলাম।

ক্রিস্টিনা সাধারণত রাত একটার ট্রেনে যায়। আমরা পথে থাকতেই ও লিখল
পাপ, আমি ভাবছি কাল দিনের ট্রেনে যাব। আজ বরং রাত জেগে টার্মের পেপারটা কমপ্লিট করি। আমার শুক্রবার সকালে পৌঁছলেই হবে। ফিজিক্যাল ট্রেনিং মিস করা যাবে না।
নিজে ভেবে দেখ কোনটা ভালো।

সকালে ওর মেসেজ

পাপ, আমি ভাবছি ১৬.৩০ ট্রেনে যাব। কিন্তু তখন মেট্রো কাজ করবে না।
ঠিক আছে। ট্যাক্সি করে চলে যাস হোস্টেলে।
আমি সারা রাত ঘুমাইনি। এখন ঘুমুব। উঠে ঠিক করব কোন ট্রেনে যাব।
আচ্ছা।

সন্ধ্যা ছয়টার দিকে মনে পড়ল ক্রিস্টিনার যাবার কথা। ফোন করলাম

তুই ট্রেনে?
আমি কিছুক্ষণ আগে ঘুম থেকে উঠলাম।
যাবি কখন?
দেখি। রাতের ট্রেনে। তবে সস্তা টিকেট সব বিক্রি হয়ে গেছে।
যা আছে তাই কিনে চলে যা।
ঠিক আছে।

রাত সাড়ে আটটার দিকে সুইমিং পুল থেকে বেরিয়ে ফোন করলাম।

টিকেট কিনলি?
না। ভেবে দেখলাম আমি সময় মত পৌঁছতে পারব না।
তাহলে?
মনিকার সাথে কথা হয়েছে। ও যাবে আমার পরিবর্তে।
মানে?
আমি ঐ ক্লাসে কখনও যাইনি। তাই চিনবে না। ক্লাসমেটদের বলে দিয়েছি। ওরা ম্যানেজ করে নেবে। আমি আরও দিন দুয়েক মস্কো থেকে চলে যাব।
মাথা খারাপ? 
তোমাকে ভাবতে হবে না। সব ঠিক হয়ে যাবে। 

সকালে একটু টেনশন ছিল। কেলেঙ্কারি না হয়ে যায়।
দুপুরে ফোন করলাম।

কী খবর?
মনিকা আমার হয়ে জাচত পেয়েছে।

যদিও হাফ ছেড়ে বাঁচলাম তবুও মনে একটা অতৃপ্তি রয়েই গেল। আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটা প্রহসনে অংশ নিলাম। বাবা হবার এই এক মহা বিপদ।

দুবনা, ১৩ মে ২০২৩ 

Comments

Popular Posts