ভাবনা


 

৩০ আগস্ট মস্কো রওনা হলাম ভোর ৫ টায়। আন্তনের ওখানে পৌঁছুতে সাড়ে সাতটা। ওখান থেকে কিছু জিনিস নিয়ে রওনা হলাম স্পরতিভনায়া। মনিকাকে ফোন করলে বলল ও কাজে যাচ্ছে। রাতে ফিরবে, তখন দেখা হবে।

মনিকা ইদানীং প্রায়ই ফোন করে, শরীর কেমন সেটা জিজ্ঞেস করে। বড় হয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যায় এসে বলও তরমুজ কিনে রেখেছে, আমি যেন ধুয়ে কাটি। বাসায় তরমুজ খায় মূলত গুলিয়া আর মনিকা। এখন দুজন দু জায়গায় থাকায় তরমুজ নষ্ট হয় যদিও আগে ১০-১২-১৫ কেজি তরমুজ দুজনে অনায়াসেই সাবাড় করে দিত।

শোন আমি তোদের জন্য ব্লু বেরি, বাবুশাকাদের হাত থেকে কেনা টম্যাটো, শসা এসব এনেছি, সেটা কখন খাবি? আগে ওটা খেয়ে নে।

এর মধ্যে ও আমার জন্য কেনা হাফপ্যান্ট আর জ্যাকেট বের করে দিল, বলল জুতা আগামী কাল নিয়ে আসবে। আমাদের জামা কাপড় ওই কিনে। ক্রিস্টিনার ঘরে গিয়ে দেখি জামা কাপড় দিয়ে ভর্তি।

ও ছবি তুলতে পছন্দ করে। তাই এসব কিনে দিলাম।
টাকা লাগবে?
এখন দরকার নেই। হলে জানাব।

মনিকার বেতন প্রায় পুরোটাই চলে যায় এসব কিনে। নিজের তো বটেই, ক্রিস্টিনা আর সেভার জন্যেও কেনে। আমার জন্যেও।

শোন, প্যান্ট তো নীচের দিকে ছেঁড়া, সেলাই করা কিছু নেই?
এখন এটাই ফ্যাশন। মিশার জন্যেও এরকম জিনিস কিনেছি। তোমাদের দু জনের তো একই সাইজ।

মিশা ওর বন্ধু।

মার জন্য কিছু কিনতে পারতি আর আন্তনের জন্য।
ঠিক আছে। জিজ্ঞেস করব।

এর মধ্যে ওর বান্ধবী এল। ওরা না খেয়েই চলে গেল। ফিরল বেশ রাতে। রান্না করে আমি আর ক্রিস্টিনা খেয়ে নিয়েছি। সেভা এখন স্বাস্থ্যকর খাবার মানে সেদ্ধ মাংস খায়, তাই আমাদের সাথে খেল না। মনিকাও মনে হয় বাইরে থেকে খেয়ে এসেছে, তাই শুধু চা দিতে বলল।

পাপ, আমি চাকরিটা ছেড়ে দিতে চাই। তুমি কী বল?
দে। সমস্যা কি?
আসলে আট বছর জারায় কাজ করছি। ইদানীং বোরিং লাগছে। ভাবছি কিছুদিন রেস্ট নিয়ে পরে অন্য কোথাও ঢুকব। তবে ভয়, যদি চাকরি না পাই।

দরোজার সামনে সেলফ ভর্তি মনিকার জোড়া পঁচিশ জুতা। দেখিয়ে বললাম

এই দেখ কাজ করিস আর জামা কাপড় কিনে সব খরচ করিস। তাই কাজ করলেই কি, না করলেই কি। খাবারের জন্য সমস্যা হবে না। পাপা কি জন্যে?
না না, সেটা অসুবিধা হবে না। তবে ভয় হয়।

আসলে আমি ভার্সিটি শেষ করেই চাকরিতে ঢুকেছি। কখনও কাজ করে বোরিং হইনি। তাছাড়া ঘরে এক ঝাঁক মুখ, তাই চাকরি ছাড়ার কথা কখনও মনেও হয়নি যদিও একবার বলতে গেলে কাজটা ছেড়েই দিয়েছিলাম। সে গল্প অন্য এক সময়। জানি এখন ছেলেমেয়েদের যে চাহিদা, সেটা মেটাতে পারব না, তবে ওরা তো টাকা চায় না, চায় সাহস, ওদের সিদ্ধান্ত যাই হোক তার প্রতি সমর্থন। গুলিয়া সাধারণত এসব শুনলে নিজে প্যানিক করে, ফলে ছেলেমেয়েরাও ওর সাথে এসব ব্যাপারে কথা বলে না।

ভয়ের কিছু নেই। যদি মনে করিস, কাজটা ছেড়ে দে। কিছু দিন রেস্ট নে, তারপর দেখ কি করা যায়।
আচ্ছা।
জন্মদিনে কি করবি? চাইলে দুবনা আসতে পারিস।
ভাবছি। তুমি বলেছিলে মস্কো সীতে কোন দ্বীপে যাওয়া যাবে। কিছু জানলে?
না রে, আন্তন গতবার বন্ধুদের নিয়ে গেছিল। ওকে জিজ্ঞেস করিস।
আচ্ছা। তুমি কি আমাকে কিছু টাকা ধার দিতে পারবে?
কত?
তোমার যেটা সুবিধা হয়।

আমি ওদের ধার দিলে সাধারণত ফেরত পাবার আশা করি না, যদিও ওরা নিজেরাই মাঝে মধ্যে ফেরত দেয়। তাই সে অঙ্কটাই বলি যেটা একেবারে দিয়ে দিতে পারব।

এতে হবে?
এত লাগবে না।
রেখে দিস। পরে দেখা যাবে।

চল বাইরে গিয়ে কয়েকটা ছবি তুলি।
আমি কিন্তু খুব টায়ার্ড।
তাতে কি? এটা তো ফট সেশন নয়।
চল।


মনিকা জনা কুড়ির এক দল নিয়ে গেল ভ্লাদিমিরের এক গ্রামে তিন দিনের জন্য। ক্রিস্টিনাও ছিল। বেশ ভালই নাকি কেটেছে জন্ম দিন। সেভা বলল ও মনিকাকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছে।

মালাদেস। সাবাস।
মনিকা আমাদের সব সময়ই হেল্প করে, অনেক কিছু কিনে দেয়।
মনিকা বা ক্রিস্টিনা কিছু না দিলেও ওদের জন্মদিনে কিছু দেওয়াটা ভাল।

গতরাতে ক্রিস্টিনা সিভি পাঠাল, মনিকার।

এটা দিয়ে কি করব?
দেখ ঠিক আছে কিনা।
ঠিকই তো আছে। আর এই লিংক কিসের?
ভাবছি ওখানে সিভি পাঠাবো।
মনিকা চাইছে?
ওর আপত্তি নেই।
দেখ।

দুপুরে ফোন এল।

প্রিভিয়েত মিউ।
প্রিভিয়েত পাপ।

আমি রিলেটিভিটির উপর কাজ করি। গ্রীক আলফাবিট দিয়েই ছোটবেলায় ওদের ডাকতাম। আলফা, মিউ, কাপ্পা, সিগমা। এখন ওরা বড় হয়ে গেছে। মিউটাই শুধু রয়ে গেছে।

কী খবর?
আমি কাজ ছেড়ে দিচ্ছি। দরখাস্ত লিখছি।
ঠিক আছে। লিখে ফেল।
ভয় লাগছে।
ভয় করলে তো চলবে না। বললাম তো কিছু একটা হবেই।
আমিও এর মধ্যে কাজ খুঁজছি।
শোন তুই যদি কাজ ছাড়ার আগেই কাজ খুঁজিস ছেড়ে লাভ কি? বললাম তো, মাস দেড় দুই রেস্ট নে, তারপর খুঁজিস।
আমি আসলে জানি না কাজ না করলে সময় কাটবে কেমনে? কয়েকদিন না হয় ঘুরে ফিরে কাটল, তারপর?
সেটাও কথা।
কোন কোর্স করব ভাবছি।
ফটোশপ শিখতে পারিস বা থ্রী ডি ম্যাক্স। ইংরেজিটাও শেখ। তুই তো এক সময় কবিতা, গল্প এসব লিখতি, পুরস্কার পেয়েছিলি মস্কোর এক প্রতিযোগিতায়। সেটাও করতে পারিস।
অনেকদিন লিখি না। আর কি হবে?
আমি মাঝে প্রায় পনের বছর লিখিনি। কোন কিছুই লেট হয় না।
দেখি। তবে কাজটা তাড়াতাড়ি দরকার। ফ্ল্যাটের কিছু একটা তো করতে হবে।

আমি সংসার করলেও সংসারী ঠিক নই। বাড়ি ঘর নিয়ে তেমন মাথা ব্যথা নেই। মনিকা আর সেভা দেখি এসব ব্যাপারে এত উদাসীন নয়।

আমি নিজেও অফিস ছাড়া নিজেকে কল্পনা করতে পারি না। কাজ ছাড়া (কাজ, বেতন নয়) কীভাবে সময় কাটবে সেটা ভাবতেই পারি না। জানি না, মনিকা সে জন্যেই দ্বিধাগ্রস্থ নাকি অন্য কারণে।

রুশরা বলে বড় শিশু সর সমস্যা। আমার মনে হয় বড় শিশু বড় সিদ্ধান্ত।

দুবনা, ২২ আগস্ট ২০২১








Comments

Popular Posts