সামার ট্রিপ
অনেক দিন পরে সেদিন বনে ঘুরতে গেলাম। এত দিন যাওয়া হয়নি কারণ শেষ বার যখন যাই তখন আমি ছবি আর ভিডিও নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম আর গুলিয়া আমাকে কি যেন বলতে চাইছিল। যদিও ওই আমাকে বিরক্ত করছিল তবুও কেন যেন নিজেই বিরক্ত হয়ে আর আমার সাথে কোন দিন ঘুরতে যাবে না বলে বাসায় চলে গেল। বৌদের এ এক বিশেষ লজিক। আমি যাচ্ছিলাম অফিসে, তাই দুজনের পথ এমনিতেই দুটো দিকে বেঁকে যেত, তবে সেটা হত কাঁঠালের আঠায় সিক্ত - এই আর কি। আসলে উপমহাদেশের মানুষ বলেই কিনা জানি না, তবে বনে গেলে আমার নিজেকে সন্ন্যাসী সন্ন্যাসী বলে মনে হয়। গাছাপালা দেখি, পাখির ডাক শুনি। ছবি তুলি। গাছের পাতার ভেতর দিয়ে আকাশ খুঁজি। সে সময় ছেলেমেয়ে, কুকুর বিড়ালদের জীবনবৃত্তান্ত শুনতে তেমন একটা ভাল লাগে না।
গুলিয়ার পছন্দ ওয়েল ফোকাসড ছবি, আমি প্রায়ই ইচ্ছে করে হাত কাঁপিয়ে, ফোকাস নষ্ট করে ছবি তুলি। এটাও সমালোচনার বিষয়। আগে ও ছবি তুলতে তেমন পছন্দ করত না, এখন অবশ্য নিজেই চায়। আমি খুব একটা তুলি না, কারণ অন্য মেয়েদের ছবি তুললেই লঙ্কা কান্ড বাঁধিয়ে দেয়। এটা নীরব শাস্তি।
অনেক দিন থেকেই বলছিল ও কৃষ্ণ সাগরে যাবে। লবন জলে না নাইলে নাকি ওর শরীর ঠিক থাকে না। তাই প্রায়ই আমি অনেক অনেক লবন কিনে আনি বাসায় দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর জন্য। আমাকেও যেতে বলছিল। বিভিন্ন কাজের অজুহাতে যাইনি। আসলে আমার প্ল্যান বন্ধুদের সাথে অন্য দিকে যাওয়া। তাই আজ কাল করতে করতে সময় কিল করেছি। তাছাড়া ওর যাওয়া মানে কারও কাজ থেকে ছুটি নেওয়া। কুকুরদের দেখাশুনা করবে কে? শেষ পর্যন্ত যখন বললাম আমি গাড়িতে করে ভোলগার উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত যাচ্ছি প্রথমে বায়না ধরল যাবে বলে। কি করা? বললাম, আমরা তিন জন যাচ্ছি। কখন কোথায় থাকব তার ঠিক নেই। তাছাড়া এটা আয়োজন করছে এক ভারতীয় বন্ধু। আমি অনেকটা ওর গাইড হয়ে যাচ্ছি। তাই আমাদের সাথে না যাওয়াই ভাল। অনেকক্ষণ গজ গজ করে আমাকে বোঝাতে লাগলো যে জাহাজে না গিয়ে গাড়িতে করে ভোলগা তীরের শহরে শহরে ঘোরা আসলে মহা বোকামি। তবে বোকামি করা যেহেতু আমার জন্মগত অভ্যেস তাই শেষ পর্যন্ত ওকে নিরস্ত্র হতে হল। সমঝোতার ফল আমি ওদিকে যাব, গুলিয়া যাবে ক্রিমিয়ায়। আন্তন কুকুরদের দেখভাল করবে। আমি শিওর ও আসলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেবে আর ফিরে আসার পর কুকুরদের ঠিক মত যত্ন আত্তি হয়নি বলে মা ছেলের মধ্যে এক পশল ঝগড়া হবে।
অনেক আগে যখন সবাই একসাথে থাকতাম আমরা প্রত্যেকেই ছিলাম ছয় ভাগের একভাগ, তাই কারও অভাব ততটা অনুভব হত না। গত তিন বছর ছেলেমেয়েরা মস্কোয়, আমরা এখানে। ফলে পরস্পরের জীবনে একে অন্যের উপস্থিতি বেড়েছে। তাই এক ধরণের বিষণ্ণতাও আছে এবারের ট্রিপে। ছেলেমেয়েদের বললাম কাউকে মামার সাথে ক্রিমিয়ায় যেতে। কেউ রাজী নয়। সবাই ব্যস্ত। তার চেয়েও বড় কথা মামার সাথে যাওয়া মানেই নিজেদের স্বাধীনতাটুকু কিছুটা হলেও বিসর্জন দেওয়া। ফলে তাতে হিতে বিপরীত। নিজেকে যুক্তি বোধ সম্পন্ন মানুষ মনে করার প্রধান অসুবিধা হল বাসার অন্যদের অনেক অযৌক্তিক আবদার সকাল বেলায় নিম বা চিরতা পাতার সরবতের মত গিলে ফেলতে হয়।
আগামী কাল যাচ্ছি মস্কো। ছেলেমেয়েদের সাথে দেখা করব। আমার ইচ্ছা ছিল দুবনা থেকেই যাওয়া। গুলিয়া বলল অনেক দিনের জন্য যাচ্ছি, তাই ওদের সাথে দেখা করে যাওয়া উচিৎ। কে জানে? একটু এক্সট্রা জার্নি। যাকগে।
আমরা ওখান থেকে যাব ভালদাই মালভুমিতে আস্তাশকভস্কি এলাকায় - যেখানে ভোলগার উৎপত্তি। তেমন কিছুই নেই দেখার, তবুও মানসিক পরিতৃপ্তির জন্য যাওয়া। ওখান থেকে তভের। গুলিয়া আমাদের সাথে গেলে ও তভের থেকে মস্কো ফিরবে অথবা ওখান থেকেই সিম্ফেরাপল যাবে। আর আমরা সেখান থেকে কিম্রি, কালিয়াজিন, উগলিচ, রিবিন্সক, ইয়ারস্লাভল, প্লেস, নিঝনি নভগোরাদ (গোরকি), চেবকসারি, কাজান, উলিয়ানভস্ক (সিমবিরস্ক), সামারা (কুইবিশেভ), সারাতভ, ভোলগাগ্রাদ হয়ে আস্ত্রাখান যাব। আস্ত্রাখানেই ভোলগা পড়ছে কাস্পিয়ান সাগরে। সেখান থেকে ফিরব সোজা মস্কোয়। আশা করি আবহাওয়া ভালই থাকবে। কিছু ছবি তোলাও যাবে। যদিও ইতিমধ্যেই ক্লাস শুরু হয়ে যাবে, আশা করছি কলিগদের সাহায্যে সেটা ম্যানেজ করতে পারব। আসলে এমন সুযোগ খুব একটা পাওয়া যায় না তো।



Comments
Post a Comment