ডিসটিংগুইস্ড

আমাদের দেশে পত্র পত্রিকায় প্রায়ই ডিসটিংগুইস্ড লোকজনের কথা লেখা হয়। এরা সাধারণত ইউরোপ আমেরিকায় কর্মরত শিক্ষক গবেষক বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর মানুষ। এই শব্দের একটি বাংলা হল অন্যদের থেকে আলাদা বা বিশিষ্ট। সেই অর্থে দুবনায় আমি একসময় বিশিষ্ট লোক হিসেবে নিজেকে মনে করতে পারতাম। সে সময় এমনকি দোকানে গিয়ে চেক না দেখিয়েও খারাপ জিনিস ফেরৎ দিতে পারতাম। ওরা আমাকে সহজেই মনে রাখত। বলত, চেক দেখানোর দরকার নেই। রাস্তায় অনেকেই শুভেচ্ছা জানাত। উত্তর দিয়ে আমি ভাবতে শুরু করতাম লোকটা কে? কোথায় দেখেছি? অনেক চেষ্টার পর বুঝতাম এদের অনেকের সাথে আমার দেখা হয় সুইমিং পুলে বা ছাওনায় স্টীম বাথ করতে গিয়ে। প্রায় উদোম অবস্থায় ওখানে আমাদের দেখা হত। রাস্তায় যখন স্যুটেড বুটেড অবস্থায় ওদের সাথে দেখা হত, ওরা কেমনে কেমনে যেন আমাকে চিনে ফেলত। আমি বরাবরের মতই কাউকে মনে রাখতে পারতাম না।‌

জানুয়ারির ছুটিতে কমোডে প্লাস্টিকের কি একটা ঢুকে গেলে মিস্ত্রী ডাকতে হল ওটা ঠিক করতে। ওরা এসে প্লাস্টিকের টুকরো বের করে বলল "কমোড বদলাতে হবে। সমস্যা কমোডে নয়, কানেক্টিং নল বদলাতে হবে।" ওরা সেটা কিনেও এনেছিল, কিন্তু আমাদের ওখানে ফিট হয় না। তাই সাময়িক ভাবে ঠিক করে চলে গেল আর বলে গেল আমরা যেন কোন এক সময় কমোড বদলিয়ে ফেলি।

গুলিয়াকে নিয়ে এই এক সমস্যা। যখন কিছু কেনে বেছে বেছে বিরল জিনিস কেনে যা অন্য কারো নেই। ওসবে কিছু ঝামেলা হলে সাধারণত মেরামত করা যায় না স্পেয়ার পার্টসের অভাবে। এটা প্রায়ই ঘটে। অনেক সময় মেজাজ খারাপ হলেও চেপে যাই। তখন নিজেকে বোঝাই যে এই গুন বা দোষ ছিল বলেই তো ও আমাকেও বেছে নিয়েছিল চারপাশে অনেক অনেক রুশদের মধ্য থেকে। 

যাহোক জানুয়ারির শুরুতেই নতুন কমোড কিনে দোকানেই রেখে এলাম। বললাম দিন তার পাঁচ পরে ফোন করব ওটা ডেলিভারির জন্য।

এখন মার্চ শেষের পথে। কিন্তু সময় বের করতে পারিনি কমোড বদলানোর। গত বুধবার মিস্ত্রীদের সাথে কথা হল। আগামী বুধবার আসবে, তবে মঙ্গলবার ফোন করে কনফার্ম করতে হবে। 

আমি আবার সেই দোকানে গেলাম জানাতে যেন মঙ্গলবার বা বুধবার সকালে কমোড নিয়ে আসে। আমার ভয় হচ্ছিল ওদের মনে আছে কিনা। আমি মেমো বের করতে গেলে মহিলা বললেন 
দরকার নেই। আমি আপনাকে ঠিকই মনে রেখেছি।

অনেক দিন পরে নিজেকে কেউকেটা মনে হচ্ছিল।

বিকেলে গেলাম সাঁতার কাটতে। ছাউনা থেকে বেরুতেই এক লোক অভিনন্দন জানালেন। ২৬ মার্চ আমাদের ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠা দিবস। আরও বললেন 
- আমি আপনাকে ছাওনায় দেখতে পাইনি অন্ধকারে।
- হ্যাঁ, ওখানে আলো কম। আর আমি ইচ্ছে করেই এরকম কালো রঙের চামড়া পরে ছাউনায় আসি যাতে সহজে কেউ আমার উপস্থিতি টের না পায়। নিজেকে তখন ইনভিসিবল ম্যান বলে গর্ব হয়।

মস্কোর পথে, ২৯ মার্চ ২০২৬

Comments

Popular Posts