এক যোদ্ধার কথা

ক্রিস্টিনা এসেছিল পিতেরবুর্গ থেকে। চারদিন ছুটি ছিল পিতৃভূমির রক্ষী দিবস ২৩ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে। জানতে চাইল 
কি করব? ছোট্ট ছুটি।
ভেবে দেখ।
ঠিক আছে। আমি ভেবে জানাব।
খুব বেশি ভাবলে আজকের কোন গাড়ি পাবি না।

আসলে আমরা চাইলেই হুট করে টাকা যোগাড় করতে পারি না এটা ওরা বোঝে। তাই প্রশ্ন আর চেষ্টা সবচেয়ে কম খরচে যাতায়াত কিভাবে করা যায় সেটা দেখা। অনেকক্ষণ পরে লিখল

খুব ইচ্ছে করছে বাড়ি আসতে।
চলে আয়।
সস্তা টিকেট সব বিক্রি হয়ে গেছে। বাসে আসব?
দেখ।
আমি টিকিট বুকিং দিচ্ছি। তুমি কিনে ফেল। 

লিংক পাঠালো। দেখি বাস আসবে অন্য এক শহরে হয়ে। ডবল সময় নেবে। তাছাড়া ওর হাতে যে সময় তাতে পৌঁছতে পারে কি না সন্দেহ। তবুও আমি আর মনিকা চেষ্টা করছি টিকিট কাটতে। পারছি না। এমন সময় ক্রিস্টিনা লিখল

আমি মেট্রোতে ভুল দিকে উঠেছি। টিকিট কিনতে হবে না। 
তাহলে বাসায় ফিরে যা। কাল দেখিস। 
১২.১০ এ ট্রেণে দুটো সীট বেরিয়েছে। 
শোন, আমি টাকা পাঠাচ্ছি। তুই নিজের সুবিধা বুঝে কিনে নে। 

কিছুক্ষণ পরে লিখল 
টিকিট কাটা হয়েছে।

আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। গতবার যখন পিতের রায় চলন্ত ট্রেণে উঠতে হয়েছে। আসলে ও আমার উল্টো। শেষ মুহূর্তে ব্যাগ গোছাবে। এটা পাবে তো ওটা নেই। আর গাড়ি মিস করা মানে টাকা গচ্চা।

রাত ১২.১০ এর ট্রেণে রওনা হয়ে ক্রিস্টিনা মস্কো পৌঁছুল সকাল ১০ টায়। বাসায় আসতে আসতে পৌনে এগারোটা। এসেই গেল মনিকার ঘরে। দু বোনের গল্প। সেভা যোগ দিল ওদের সাথে। আমি আসলে ও আসবে বলেই অপেক্ষা করছি। না হলে অনেক আগেই দুবনা ফিরতাম। গুলিয়া জানতে চাইল

ক্রিস্টিনা এসেছে?
মনিকার সাথে কথা বলছে।
সব সময়ই ঐ রকম। 
ওদের কথা বলতে দাও। আমার তো তাড়া নেই। 
তোমার জন্যেই এমন। ছেলেমেয়েরা আমাদের তেমন পাত্তা দেয় নাই। 
ঠিকই দেয়। শুধু ওদের ভালো লাগাটাকে পাত্তা দিলেই সমস্যা থাকে না।

যাহোক ভাই-বোনদের প্রাথমিক আলাপ শেষে ক্রিস্টিনা ওর ঘরে এল যা তখন আমার দখলে।

প্রিভেত পাপ।
প্রিভেত। জার্নি কেমন হল।
খুব ইন্টারেস্টিং। এটা ছিল পিতেরবুর্গ - বেলগোরাদ ট্রেণ। আমি যে কম্পার্টমেন্টে এলাম সেখানে ২৮ বছর বয়সী এক ছেলে ছিল। প্রথম দিন থেকেই যুদ্ধ করছে। ছুটিতে এসেছিল। আবার যাচ্ছে যুদ্ধ করতে।
কি বলল যুদ্ধ সম্পর্কে?
বলল, ও গেছে ভলেন্টিয়ার হিসেবে। প্রথম দিকে খুব কষ্ট হয়েছে মানসিক ভাবে। এখন সয়ে গেছে। কোন কোন জায়গায় ওদের সাদরে বরণ করে, ধন্যবাদ জানায় মুক্ত করার জন্য। কোন কোন জায়গায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়। কারণ যুদ্ধের কারণে সবাই খুব কষ্টে আছে। 
আর?
কখনো কখনো ওরা নিজেদের খাবার, জল সব স্থানীয়দের দিয়ে দেয়। এক গ্রামে তিন দিন জল ছিল না। ওরা সবাই নিজেদের খাবার আর পানীয় ওদের দিয়ে সারাদিন কাটিয়েছে। কারণ ওরা জানত দিন শেষে অন্য ক্যাম্পে গিয়ে সব পাবে। ওরা প্রায় সবাই স্বেচ্ছায় এটা করে। আর কেউ লুটপাট করার চেষ্টা করলে সেখানেই গুলি করে মেরে ফেলে। 
আর।
আমাদের সাথে ছিল কিয়েভের একজন লোক। প্রথমে ওদের মধ্যে বেশ কথা কাটাকাটি হয়। পরে কিয়েভের লোকটা বলে ও যা বলছে সেটা সত্য হলে রাশিয়া যেন এই যুদ্ধে জয়ী হয়। ছেলেটা কিয়েভের লোকটাকে একটা স্যুভেনির উপহার দেয়। ওয়াগনের সবাই সারা রাত আমাদের ওখানে ভিড় করে গল্প শুনছিল। ট্রেণ থেকে নামার সময় সবাই ওকে পিতৃভূমির রক্ষী দিবসে অভিনন্দন জানায়।
তুই?
আমিও ওকে অভিনন্দন জানাই। ও বলল পিতেরবুর্গে ওর ফিয়াসে অপেক্ষা করছে। এসে বিয়ে করবে। তাহলে কেন আবার যুদ্ধে যাচ্ছে জানতে চাইলে বলল এই এক বছরে মানুষের এত কষ্ট, এত অসহায়তা ও দেখেছে যে ওখানে না গিয়ে, ওদের এই দুরাবস্থা থেকে মুক্ত না করে ও শান্তি পাবে না। তাই ঠিক করেছে বিজয় না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করবে।
তুই যখন অভিনন্দন জানালি ও কি বলল?
কিছুই না। শুধু তাকালো। ওর চোখে এত কষ্ট, এত বেদনা ছিল যে আমি ট্রেণ থেকে নেমে প্রায় কেঁদে ফেলেছিলাম।

ক্রিস্টিনা চার দিনের জন্য এসে প্রায় তিন সপ্তাহ মস্কওয় কাটিয়ে ১২ মার্চ পিতেরবুর্গ ফিরে যায়। যুদ্ধ চলছে। ঐ ছেলেটিকে আমি দেখিনি। তারপরেও মাঝেমধ্যে জানতে ইচ্ছে করে ও কেমন আছে।

দুবনা, ১৯ মার্চ ২০২৩

Comments

Popular Posts