স্মৃতি

 

আজ পাসখা বা ইস্টার, মৃত্যুলোক থেকে জেসাসের পুনরোত্থানের দিন। ছোটবেলায় ঠাকুর দেবতার প্রতি ভক্তি থাকলেও সময়ের সাথে সাথে সেসব কর্পূরের মত উবে গেছে। তবে এখনও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান আমি উপভোগ করি। কোথাও গেলে সেখানকার মন্দির, মসজিদ, গির্জা, প্যাগোডা, সিনাগগ - সব কিছু দেখার চেষ্টা করি। ধর্মকে আমি সব সময় একটা দেশের, একটা জাতির সংস্কৃতির অংশ হিসেবেই নেই।

মস্কো আসার পর বিভিন্ন গির্জায় যেতাম ঘুরতে। আর ইস্টারের সময় যেতাম ফ্রান্সের দুতাবাসের উল্টোদিকের গির্জায়। তখন এদেশে অধিকাংশ গির্জা ছিল মিউজিয়াম, শুধু হাতে গোনা কিছু গির্জা সক্রিয় ছিল। সেই গির্জাটা ছিল সক্রিয় গির্জাগুলোর একটা।

বিয়ের পর বাসায় ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিছু হত না। আগেও হত বলে মনে হয় না। তখন সাধারণ সোভিয়েত পরিবারগুলো কমবেশি লেনিন পূজারী। প্রথম প্রথম আমার উদ্যোগেই ইস্টারের আয়োজন হত বাসায়। আমার মনে হত ছেলেমেয়েদের এ দেশের সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়া দরকার। তাছাড়া এ উপলক্ষ্যে কেক তৈরি, ডিম সেদ্ধ করে তাতে নানা ছবি আঁকা এসব আমাকে ছোটবেলার বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কথা মনে করিয়ে দিত। ওরা ছোট থাকতে কখনও কখনও ওদের নিয়ে রাতে গির্জায় পর্যন্ত যেতাম। অধিকাংশ লোক আমাকে চিনত, তাই ওখানে সবার সাথে ক্রস বা ওই জাতীয় কিছু না করলেও কেউ কিছু মাইন্ড করত না। এখনও বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে গিয়ে আমি ভেতরে ছবি তুলি। কেউ কিছু বলে না।

এখন সবাই বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আগে ওরা গির্জায় কেক নিয়ে সেটা শুদ্ধ করে আনলেও এখন এসব হয় না। আজ বাসায় ডিম সেদ্ধ পড়ে আছে, কিন্তু ঠোকাঠুকি করে ভাঙ্গার তাড়া নেই। তখন এটা ছিল বিশেষ খেলা। গোটা পঞ্চাশ ডিম সেদ্ধ করা হত আর ভাঙ্গা হত এভাবে।

মনিকা কেকের ছবি পাঠাল। আমিও পাঠালাম। ক্রিস্টিনা পিতের থেকে লিখল ওরও ইচ্ছে করছে কেকে খেতে। টাকা পাঠিয়ে দিলাম। আন্তন কাজে। ও হয়তো খেয়ালই করবে না যে আজ ইস্টার যদি না বাসার কেউ ওকে অভিনন্দন জানায়।

ধর্ম পালন করি বা নাই করি এক সময় এসব অনুষ্ঠান আমাদের সবাইকে এক করত, সবাই মিলে এসব অনুষ্ঠান উপভোগ করতাম। এখনও ইস্টার আগের মতই আসে, শুধু কাজে কর্মে সবাই বিভিন্ন জায়গায় থাকায় আর একত্র হওয়া হয় না। আমি অবশ্য কিছুক্ষণ পরে মস্কো যাব। মনিকা আর সেভার সাথে দেখা হবে। হয়তো ওদের সাথে ওদের ছোটবেলার বিভিন্ন স্মৃতিচারণ করব। সেভা হঠাৎ কাল জিজ্ঞেস করেছিল, পাপা তোমার মনে আছে আমরা যখন ককেসাসে গেছিলাম একটা ছোট বাচ্চা আমার সাথে ঝগড়া করেছিল। আর এই ঘটনা ঘটেছিল দুই বার বিভিন্ন বছরে। আমি অবশ্য এমন ঘটনা মনে করতে পারলাম না, গুলিয়াও বলতে পারল না। হয়তো ঘটেনি, অথবা শিশুরা অনেক কিছুই মনে রাখে যার প্রতি বড়রা কোন গুরুত্বই দেয় না।

দুবনা, ২৪ এপ্রিল ২০২২



Comments

Popular Posts