বাড়ি


অনেকের মতই আমারও ছোটবেলার অনেক ঘটনাই মনে নেই, শুধু কি তাই – এ ঘনাগুলো যে আমার জীবনে ঘটেছিল সেটাই বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় তখন তো আজকের মত চাইলেই সব স্মার্টফোনে তুলে রাখা যেত না তবে মোটামুটি ১৯৬৯ সালের একটু  আগে থেকে বেশ কিছু ঘনা আমার বেশ মনে আছে এর আগে কিছু ঘনা আমি শুনেছি, এখনও শুনি বড়দের মুখে
তাদের একটা হল আমার যখন ছয় মাস বয়েস তখনকার ঘটনা ঐ সময় আমাদের বাড়িতে ডাকাত আসে যেহেতু বাবাই আমাদের ব্যবসা দেখতেন আর টাকা পয়সা আমাদের ঘরে আলমারিতে থাকতো, তাই সবসময় ডাকাতদের লক্ষ্য ছিল আমাদের ঘর যতদুর শুনেছি, এমনিতে দরজা ভাঙতে না পেরে ওরা আমাদের ঢেঁকির ঘর থেকে ঢেঁকি এনে দরজা ভাঙ্গে আর ঘরে ঢুকেই বাবাকে আক্রমন করে এক পর্যায়ে ওরা বাবাকে ছুরিকাঘাত করতে গেলে মা এসে দাঁড়ান সামনে, আর এতে করে মার থুতনিতে ছুরির আঘাত লাগে ডাকাতদের আক্রমনে বাবা মা দুজনেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান  তখন ডাকাতরা আমাকে ন্যাকড়া দিয়ে পেঁচিয়ে তাতে কেরসিন ঢেলে দেয় পুড়িয়ে মারবে বলে সেই সময় স্বপনদা, যে তখন ক্লাস এইটে পড়ত, ডাকাতদের এক রকম হাতেপায়ে ধরে আমাকে ছাড়িয়ে নেয় আর এই ঘটনায় এতটাই ভয় পায় যে, মাত্র কয়েকদিন পরে ইন্ডিয়া চলে যায় এরপর ও আর কোনদিন দেশে আসেনি
আর একটা ঘটনা যার কথা আমি বড়দের মুখে শুনেছি, সেটা হল দোলনা থেকে পড়ে যাওয়া ছোটবেলা আমরা আম বা গাব গাছে দড়ি বেঁধে দল খেতাম, কখনো কখনো কেউ ধাক্কা দিত, কখনো বা গাছের গোড়া পা দিকে ঠেলে দোলনের সৃষ্টি করতাম তবে যে সময়ের কথা বলছি, সে সময় আমি নিজে নিজে দোল খেতে পারতাম না আমাকে দলনায় বসিয়ে কেউ ধাক্কাতো ও দিনও কেউ তাই করছিলো তখনও খুব ভাল বসতে বা শক্ত করে ধরতে পারতাম না এক  পর্যায়ে আমি পড়ে যাই নীচে ছিল কাঁসার থালা পড়বি তো পড় সেটার উপর এখনও সেই কাটা দাগ আমার গালে শোভা পাচ্ছে অনেক পরে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়তে আসি, অনেকেই দাগ সম্পর্কে জানতে চাইত আমাদের সাথে প্রচুর আফ্রিকান ছেলেমেয়ে পড়ত, আর ঐ দেশের বা ঐ গোষ্ঠীর রীতি অনুযায়ী ওদের অনেকেরই গাল কেটে দিত তাই এখানে অনেকেই জানতে চাইতো আমার ঐ কাটা দাগ আমাদের স্থানীয় কন রীতি কি না    
আমাদের স্মৃতি অনেকটা ছবির মত ছবিতে থ্রি ডাইমেনশনাল বা ত্রিমাত্রিক বাস্তবতাকে আমরা টু ডাইমেনশনাল বা দ্বিমাত্রিক কাগজে প্রকাশ করি শুধুমাত্র রঙের ঘনত্ব দেখে আমরা  ছবিতে বিভিন্ন বস্তুর আপেক্ষিক অবস্থান বুঝতে পারি, আর অনেক দুরের বস্তুগুলো মনে হয় সব যেন এক সারিতে দাঁড়িয়ে আছে একই ঘটনা ঘটে স্মৃতির ক্ষেত্রে নিকট অতীতের ঘটনাগুলো আমরা ক্রনিকালি মনে করতে পারলেও অনেক আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সেভাবে সাজাতে আমরা প্রায়ই দ্বিধায় পড়ি তাই ছোটবেলার সেই ঘটনা বলতে গিয়ে অনিচ্ছাসত্বেও আমার স্মৃতি যে মাঝে মধ্যে ধোঁকা দেবে সেটাই স্বাভাবিক
কিছুদিন আগে কী একটা ভাবতে গিয়ে মনে হোল আর্কটিক আর অ্যান্টার্কটিকের কথা। দুটো মহাদেশ, অথচ দেশ নয়। মহাদেশ হতে হলে শুধু ভুখণ্ড থাকলেই যথেষ্ট, কিন্তু দেশ হতে হলে সেই ভুখণ্ডের সাথে মানুষ থাকতে হয়, থাকতে হয় সেই মানুষের চলার কিছু নিয়মকানুন। মানুষের স্মৃতিকথাও তাই – তাতে শুধু নিজের চিন্তাভাবনা থাকলেই হয় না, থাকতে হয় অন্যান্য মানুষের কথা আর সেই মানুষগুলো যেখানে থাকে, চলে, ফেরে, কাজ করে – সেই মাটির কথা। গল্পে শুধু মানুষই থাকে না, থাকে সেই মানুষগুলোর নাট্যমঞ্চ তাই আসুন আমরা আমাদের সেই সময়ের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি।
আমার ছোটবেলায় এলাকায় শুধুই আমাদের গ্রামের লোকজন, মানে অনেক দিন থেকে যারা এখানে বসবাস করত তারাই থাকত। দু’ এক ঘর ভাড়াটে ছিল, তবে সেটা খুবই নগন্য। তাই আমার ধারণা ছিল আমরাও চিরকালই এ গ্রামের বাসিন্দাই ছিলাম। ইদানীং কালে অবশ্য গ্রামে প্রচুর নতুন বাসিন্দা, মূলত পদ্মা ভেঙ্গে হরিরামপুর থেকে আসা লোকজন। ওদের আমার সব সময় আগন্তুক বলেই মনে হত। আমার এসব নিয়ে লেখার কোনই ইচ্ছে ছিল না, তবে ছেলেমেয়েরা, বিশেষ করে ছোট মেয়ে ক্রিস্টিনা বাড়ির কথা জানতে চাইলে নিজের জানাটাও জরুরি হয়ে ওঠে। এটা মনে হয় গবেষক হওয়ার কারণে। যেকোনো ব্যাপারেই জেনেশুনে তারপর উত্তর দেওয়া। বাড়িতে এ ব্যাপারে খোঁজ খবর করা শুরু করলাম। আসলে বড়রা অনেকেই নেই, তাই যারা উত্তর দিতে পারে তারাও মূলত ছোটবেলায় শোনা গল্পের উপর নির্ভর করে বলে। আর আছে জমিজমার দলিলপত্র। সেখান থেকেও অনেক কিছুই ওরা জানতে পারে। আমার পিঠেপিঠি বড় ভাই রতনের মুখেই প্রথমে শুনলাম কয়েক পুরুষ আগে আমাদের এক প্র-প্র-প্রপিতামহ এখানে আসেন পদ্মার ভাঙ্গনে সব হারিয়ে। আমার জ্যাঠতুতো দাদা শ্যামল দাও সেটাই বলেন। যেহেতু ওরা দু জনেই বাড়ির জমিজমার দলিলপত্র ঘাটে আর সেখান থেকেই এই তথ্য উদ্ধার করেছে, ধরে নিতে পারি সেটা একেবারে মিথ্যে নয়। তাঁর এক উত্তরসূরি ব্রিটিশদের কাছ থেকে তালুক কেনেন, সে অর্থে আমরা বা আমাদের কোন পূর্বপুরুষ তালুকদার ছিলেন। যতদূর মনে আছে ঠাকুরদার বাবা ছিলেন হরিদাস সাহা। ঠাকুরদারা তিন ভাই। ঠাকুরদা লাল চাঁদ সাহা, তাঁর ছোট ভাই তারকনাথ সাহা। আরও এক ভাই ছিলেন, যিনি বৈষ্ণব হয়ে যান। তাঁর কোন ছেলেমেয়ে ছিল না। লাল চাঁদ সাহার ছিল সুতা, কাঠ আর কয়লার ব্যবসা। এখনও বাড়ির আশেপাশে খুঁড়লে পাথুরে কয়লার সন্ধান মেলে। ছোট দাদু কোলকাতায় পড়াশুনা করতেন, তিনি ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। ওই সময় দাদুকে না বলে তিনি বালিগঞ্জ বাড়ি তৈরি করেন। সানুরার গোঁসাইএর কাছ থেকে একথা শুনে   কলকাতার বাড়ির দাবি না করেই দাদু ছোটভাইকে দেশে তাঁর প্রাপ্য সম্পত্তি দিয়ে ভিন্ন করে দেন। কোন দাদুকেই আমি দেখিনি। ছোট দাদুর বাড়িতে পিসিমা থাকতেন। দিদিমাও ছিলেন, তবে তিনি যুদ্ধের আগেই মারা যান। ওই বাড়িতে ছিল এলাকার প্রথম বিল্ডিং। আমি ছোটবেলায় কলকাতা গেলে বালিগঞ্জ যেতাম কয়েক ঘণ্টার জন্য বেড়াতে। কিন্তু থাকতাম না কখনো, থাকতাম ভাড়া বাসায় আর পরবর্তীতে দাদাদের ওখানে।
বাবা কাকারা চার ভাই আর এক বোন। পিসিমার বিয়ে হয় ঝিটকায়। পরে তারা ইন্ডিয়া চলে যান। বড় জ্যাঠামশাইকে আমি দেখিনি। উনি ছিলেন ডাক্তার, তাই আমাদের বাড়িা নাম ছিল ডাক্তার বাড়ি। তবে আমার ছোটবেলায় আমাদের বাড়ি বড়বাড়ি নামেই বেশি পরিচিত ছিল। মেজো জ্যাঠামশাই কবিরাজি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, ব্যবসা বানিজ্য দেখা তাঁর পছন্দ হত না। বাবা পড়াশুনা করতেন কোলকাতায়। প্রথমে বঙ্গবাসী কলেযে, পরে নীল রতন মেডিক্যাল কলেজে। যতদূর শুনেছি ফাইনাল ইয়ারে তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান। অনেক পরে আসামের জঙ্গলে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি আবার কলকাতা ফিরে যান। এর মধ্যে দাদু অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছোট কাকা তখন স্কুলের শিক্ষক। তাই বাবাকে ফিরিয়ে আনা হয় দেশে। ভয় ছিল আবার কোথাও চলে না যায়। বাবা এসে ব্যবসার হাল ধরেন। তখনই ঝিটকার জমিদার বাড়ির মেয়ের সাথে বাবার বিয়ে দেওয়া হয়। তবে সন্তান প্রসবের সময় বা পরপরই মার মৃত্যু ঘটে। সেই দাদা মানে সুবোধ দা মানুষ হন জমিদার বাড়িতে আর পরে ও বাড়ির সবাই ইন্ডিয়া চলে গেলে সুবোধ দাও চলে যান। বাড়িতে শেষ এসেছিলেন ১৯৬০ বা ১৯৬১ সালে, আমার জন্মের আগে। সে কথা আমাকে সুবধ দা জানান ২০১৪ সালে আমি মুম্বাই টিআইএফআর ভিজিটের সময় তাঁর বাসায় থাকাকালীন।  
বড় জ্যাঠামশাই তখন অবশ্য ভিন্ন হয়ে গেছেন বা তাঁকে দাদু ভিন্ন করে দিয়েছেন। আমি তাঁকেও দেখিনি। উনি আমার জন্মের আগেই মারা যান। ও বাড়িতে তখন থাকেন বড়দা, বউদি, বড়মা আর জেঠি মা। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি বাবাদের ডাকা হয় বড় কর্তা, মেজো কর্তা, নয়া কর্তা আর ছোট কর্তা হিসেবে। তাঁদের স্ত্রীদেরও সেভাবেই ডাকা হয়। নয়া কর্তা কেন সে প্রশ্ন আমার মনে সব সময়ই জাগত। মনে হয় বাবা নিরুদ্দেশ হয়ে আবার ফিরে এসেছিলেন বলেই এ নাম পেয়েছিলেন। একই প্রশ্ন জাগত বড়মা আর জেঠিমাকে নিয়ে। যদিও বাড়ির কর্ত্রী ছিলেন জেঠিমা, বড়মাই ছিলেন বড় জ্যাঠামশাইয়ের আইনত স্ত্রী, বড়দা আর বড়দির মা। আর জেঠিমা ছিলেন এখনকার ভাষায় যাকে বলা যায় বান্ধবী। এ কারণেই দাদু বড় জ্যাঠামশাইকে ভিন্ন করে দেন আর তাঁর ভাগের সমস্ত সম্পত্তি বড়দার নামে লিখে দেন। এসব তথ্য আমি অবশ্য পরে জানতে পারি। সে সময় আমাদের বাড়ি ছিল বর্তমান বাড়ি থেকে একশ মিটার উত্তরে, নদীর পাড়ে। ও বাড়িকে আমরা বলতাম পুরান বাড়ি বা রঙ খোলা। সেখানে সুতা রঙ করার কারখানা ছিল বলেই এ নাম। ওখানে যে আমগাছ দুটো ছিল তাতেই সুতা, কাঠ বা কয়লা ভর্তি লঞ্চ এসে ভিড়ত। কিন্তু নদীর ভাঙ্গন শুরু হলে দ্রুত বাড়ি সরিয়ে নিতে হয়। ঘটনাটা মনে হয় খুব দ্রুত ঘটেছিল, কারণ তখন ছোট কাকার ঘর ছিল বড়দার বাড়িতে, এরপর আমাদের ঘর, তার উত্তরে মেজো জ্যাঠামশাইয়ের। তার সামনে বড় ঘর যেখানে সুধীর দা থাকত, এরপর পুবে রান্না ঘর, রান্না ঘরের দক্ষিণে ভোগের ঘর মানে পুজা বা একাদশীতে রান্নার জন্য ঘর, এর দক্ষিণে ঢেঁকির ঘর। এসব ঘরের পেছনে ডোবা। আমাদের ঘরের পশ্চিমে রাখালদের ঘর, এর পশ্চিমে গরুদের ডাইনিং টেবিল, তার উত্তরে দুটো গোয়াল, একটা ষাঁড় আর বলদদের, অন্যটা গাভীদের। এখানেও লিঙ্গ বৈষম্য ছিল। এর উত্তরে কাছারি ঘর, যেখানে শ্যামল দা, তপন দা আর রঞ্জিত দা থাকত। অনেক সময় দূর দূরান্ত থেকে যারা দেবেন্দ্র কলেজে পড়াশুনা করত, তারাও থাকত আমাদের বাড়ি। দুলাল মামাকে এখনও মনে আছে। এরা আমাদের আত্মীয় নয়, বাবা কাকাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের ছেলে। কাছারি ঘরের পুবে বড় গুদাম, যেখানে সুতা থাকত, ওখানেই বিক্রি হত সুতা। আমাদের ঘরে পুবে ছিল ছোট গুদাম, সেখানে থাকত ধান, চাল, ডাল, পাট, রঙ ইত্যাদি। বড় গুদামের উত্তরে ঘদনাদের বাড়ি। স্বাধীনতার পরে ওরা ইন্ডিয়া চলে গেলে আমরা সেটাও কিনে নিই। ফলে আমাদের বাড়ি নতুন করে সাজান হয়, কয়েকটা ডোবা ভরা হয়, নতুন নতুন ঘর ওঠে। এরপর গুরুপদ আর গোবিন্দদের বাড়ি। এর পরেই রঙ খোলা। বাড়ি থেকে রঙ খোলা যেতে হত বাঁশ ঝাড়ের ভেতর দিয়ে সরু পথে। রাস্তার পাশে খর রাখার ঘর, যেখানে সাপের আনাগোনা প্রায়ই চোখে পড়ত। কখনো সকালে উঠে দেখতাম মরা সাপ শুয়ে আছে। বেজির সাথে লড়াইয়ের ফল এসব। এরপর পাকা ল্যাট্রিন। এটা আমার পাঁচ বছর বয়েসে তৈরি হয়, গ্রামের প্রথম পাকা ল্যাট্রিন। মনে আছে ওই ল্যাট্রিন তৈরির সময় আমি প্রতিদিন জ্যাঠামশাইয়ের পিছু পিছু ঘুরতাম আর বলতাম আমাকেও যেন একটা ছোট্ট পাকা ল্যাট্রিন তৈরি করে দেওয়া হয় ওর পাশেই। ভাগ্যিস জ্যাঠামশাই বুদ্ধি করে সেটা করেননি। অনেকগুলো গাভী থাকার পরেও ওরা তেমন দুধ দিত না। অনেক গাছ গাছালি থাকার পরেও বাড়িতে তেমন ফল হত না। আম, জাম, জাম্বুরা, কতবেল, গাব, বিলেতি গাব, কামরাঙা, কাঁঠাল, জলপাই, পেঁপে, পেয়ারা, বেল, কুল, খেজুর, নারকেল কত রকমের গাছই না ছিল, কিন্তু পাড়ায় যাদের অনেক কম গাছ ছিল তাঁদের ফলমূল সব সময় ভালো হত। রঙ খোলার সাথেই ছিল ডোবা, ওখানে জল থাকত প্রায় সারা বছর। ওখানেই আমার সাঁতার শেখা। ওখানে মাছও থাকত অনেক। ডোবার পূর্ব ও পশ্চিম পাশে দুখণ্ড জমি। ওখানে সাধারণত মরীচ, তরমুজ, বাঙ্গি এসব ফলান হত। শীতকালে ওখানে আমরা ব্যাডমিন্টন খেলতাম, কখনো হাডুডু, দারিয়াবাধা এসব। তবে এসব খেলা আমরা রঙ খোলায়ও খেলতাম। ওখানে ছিল ক্লাব ঘর। যুদ্ধের আগে সেখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। অনেক বার প্রাইজ পেয়েছি সেখানে। যুদ্ধের পরে নতুন করে আমরা প্রগতি সংঘ স্থাপন করি আর ঘরটা ওখান থেকে নদীর পাড়ে হাট খোলায় নিয়ে যাই।
ছোট কাকার ঘরের পুব দিকেই ছিল বড়দার বিল্ডিং। দোতলা টিন শেড। তিনটে ঘর, মাঝখানে জেঠিমা থাকেন, পশ্চিমে বড়দা আর বউদি। দক্ষিণ দিকে মুখ করা এ ঘরের সামনে বড় উঠান, ডান দিকে কাছারি ঘর। ওখানে সকালে বাচ্চারা পড়ে, রাতে বাড়ির রাখাল আইন উদ্দিন থাকে। সবার প্রিয় ও। উঠানের অন্য দিকে ঠাকুর ঘর। তার দক্ষিণে বড়মার ঘর। বড়মার ঘরের সামনে ভোগের ঘর আর তার পশ্চিমে গোয়াল ঘর। এরপরেই পাগলা সন্তোষদের বাড়ি, ওদের বাড়ির পুব দিকে পচা কাকা, এরপর মন্টু আর মন্টুদের বাড়ির দক্ষিণে পরিমলদের বাড়ি। তার পুবে খাল, খালের ওপার শঙ্কর, বাদল, তাঁতি মন্টুরা, আরও পুবে পিসিমার বাড়ি। গোপাল, নেপাল, সীতানাথ, রাজেন্দ্র আর ভোলা সাহার বাড়িও ঐ পাড়ায়ই। আমাদের রান্না ঘরের পেছনে তাপসদের আর তার উত্তরে সুইস্যাদের বাড়ি রং খোলা লাগানো। আমাদের বাড়ির পশ্চিমে বড় খাল আর ছোট খাল। এই দুই খালের মাঝে দ্বীপ মত। ওটা জেলে পাড়া। তাজু মাতুব্বরের বাড়িও ওখানেই। বড় খালের ওপারে জিতেন, বলাই আর কার্তিকদের বাড়ি। কার্তিকদের বাড়ির উত্তরে রামার ভিটা আর পশ্চিমে মদন মামার বাড়ি। খালের উপর আমাদের কাঠের সাঁকো। বর্ষা এলেই সেটা মেরামত করা হত যাতে আমরা রামার ভিটায় যেতে পারি। ওখানে হত আমাদের বাড়ির দুর্গা পূজা। ছোটবেলায় এটাই ছিল মোটামুটি আমার ঘুরে বেড়ানোর গণ্ডী।
বড়দার ঘরের বারান্দা ছিল বেশ উঁচু আর বড়, সামনে ছিল এক গোলাপ গাছ। ছিল টিয়ে আর পুসি বিড়াল। সারাদিন বারান্দায় রোদ পড়ত, সন্ধ্যায় মা, খুড়িমা, মেজমা, বড়মা, জেঠিমা সবাই গোল হয়ে বসতেন। পাড়ার অনেকেই আসত। কেউ আলতা দিতেন পায়ে, কেউ বা চুল বাঁধতেন, গরমে কেউ হাত পাখার বাতাস করতেন, শীতে মাটির পাত্রে আগুন রেখে আগুন পোহাতেন সবাই মিলে। মা গান ধরতেন। ভক্তিমুলক গান। “ভব সাগর তারণ কারণ হে রবি নন্দন বন্দন স্পন্দন হে” বা “রঘুপতি রাঘব রাজা রাম, পতিত পাবন সীতা রাম” বা অন্য কোন গান। কখনও গীতা, চণ্ডী বা পাঁচালি পড়ে শোনাতেন। অনেক দূর থেকে বাবার কোমরের চাবির গোছার শব্দ পাওয়া যেত। শুনেই মা আর আমরা যেতাম বাবার কাছে।
১৯৭৭ সালে ভিন্ন হওয়ার আগে পর্যন্ত বাড়িতে ছিল গোটা বারো ষাঁড় আর বলদ আর গোটা পাঁচেক গাভী। ছিল প্রায় দুই শ বিঘা জমি। আর ছিল রঙের কারখানা। তাই বাড়িতে সব সময় জনা বিশেক লোক কাজ করত সারা বছর। এছাড়া ছিল কয়েকজন মহিলা, কেউ ধান সেদ্ধ করত, কেউ ধান ভানত, কেউ বা বাসন মাজত, কেউ দুয়ার সুড়ত আর কেউ কেউ রান্না ঘরে সাহায্য করত, মানে কাটাকাটি, বাটাবাটি ইত্যাদি। টানা তিন মাস করে মেজমা, মা বা খুড়িমা পালি করে রান্না করতেন। নিজের পালি শেষ হলেই মা চলে যেতেন ইন্ডিয়া মামা, মাসিদের ওখানে। মার ভাইবোন সবাই পার্টিশনের পরে দেশ ত্যাগ করে ভারত চলে গেছিলেন। শীতের রাতে রাখালরা বাড়িতেই হাডুডু খেলত। সে ছিল দেখার মত দৃশ্য। এক কথায় ছোটবেলাটা ছিল রূপকথার মত। বাড়ির কাকাতো জ্যাঠাতো সব ভাইবোনদের মধ্যে আমি ছিলাম সবার ছোট, তাই সবার আদরের।  কাজের মধ্যে কাজ ছিল পড়াশুনা করা, খেলা আর সন্ধ্যা হলেই ভূতের ভয় পাওয়া।
সন্ধ্যা হলেই হ্যারিকেনের জন্য চিৎকার করতাম, তবে সব ঘরে ধূপ প্রদীপ না দেখানো পর্যন্ত আলো জ্বলত না। সব মিলে ঘর ছিল গোটা বাইশ, তাই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় ছিল না। এই প্রতিটি অপেক্ষা, প্রতিটি মুহূর্ত একটু একটু করে গড়েছে আজকের আমিকে।

দুবনা, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০    


    

Comments

Popular Posts