মঙ্গলবার


অভির জীবনে মঙ্গলবার ছিল আর ছয়টা দিনের মতই, এমন কি বলা যায় সব চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জীবনে কোন জিনিসটা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ তার অনেকটাই গড়ে ওঠে আমাদের ছোটবেলায়। অভির ছোটবেলায় সোমবার বাবা বা কাকা নারায়ণগঞ্জ যেতেন মোকামে। সেখান থেকে সুতা আর রঙ কিনে কখনও এক ট্রাক, কখনোবা দুই ট্রাক মালামাল নিয়ে সোমবার গভীর রাতে বা মঙ্গলবার বাড়ি ফিরতেন তাঁরা। একই ঘটনা ঘটত বৃহস্পতিবারও। তার উপর বৃহস্পতি দেবগুরু, হিন্দু পরিবারে এই দিন তাই একটু অন্য রকম গুরুত্বের অধিকারী। কখনও সখনও এই দিন নারায়ণ পূজাও হত বাড়িতে। আর বিভিন্ন ব্যবসা থাকা স্বত্বেও সুতার ব্যবসাই যেহেতু ছিল ওদের আয়ের প্রধান উৎস, তাই এই দু’ দিনের গুরুত্বও ছিল ভিন্ন রকমের। তাছাড়া সেকালে আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল, কলা ইত্যাদি  দেশী ফলের বাইরে তেমন কিছু গ্রামে তো বটেই ওদের মফঃস্বল শহর মানিকগঞ্জেও পাওয়া যেত না। তাই বাবা কাকার নারায়ণগঞ্জ যাওয়া মানেই ঢাকা থেকে আপেল, আঙ্গুর, কমলা, ন্যাসপাতি, খেজুর আর বিভিন্ন কনফেকশনারি নিয়ে আসা। এসবের মধ্যে খেজুরের প্যাকেট চলে যেত ওর জ্যাঠামশাইয়ের হাতে। মন ভালো থাকলে বা কোন ভালো কাজ করলে জ্যাঠামশাই ডাকতেন “আয়, মনাক্কা নিয়ে যা।“ অভিরাও মনের আনন্দে  জ্যাঠামশাইকে ঘিরে ধরত মনাক্কার জন্য আর “আরও দাও, আরও দাও বলে চিৎকার করত“ আর জ্যাঠামশাই কাঠের সিন্দুক থেকে একটা একটা করে মনাক্কা বের করে ওদের হাতে দিতেন। পাড়ার অধিকাংশ বাড়িতে ছেলেমেয়েরা বাবাকে আপনি আর মাকে তুই বলে ডাকত। অভিদের বাড়িতে এদিক দিয়ে ছিল গণতন্ত্র। বাবা, মা, কাকা, জ্যাঠা, খুড়িমা, জেঠিমা সবাইকে তুমি বলে ডাকা আর ভাইবোনদের তুই বলে ডাকা। শুধু বড়দা, বউদি মানে যারা বয়সে প্রায় বাবা কাকাদের সমবয়েসী তাদের ওরা তুমি বলে ডাকতো। যাহোক, মাঝে মাঝেই অভিদের দেখা যেত মানাক্কার সিন্দুকের পাশে। অভি অবশ্য আজও জানে না খেজুর কিভাবে মনাক্কা হল। ওর ধারণা এসব খেজুর মরক্কো থেকে আমদানী হত বলে নাম পেয়েছিল মনাক্কা। যাহোক, এ তো গেল সোমবার আর বৃহস্পতিবারের কথা। বুধবার ছিল বিশেষ দিন। সেদিন ঘিওর হাট। খুব সকালে বাবা, মদন মামা যেতেন ঘিওর হাটে, ফিরতেন সন্ধ্যার পরে। অনেক সময় ওঁদের সাথে ভাইদের কেউ কেউ যেত সাহায্য করতে। যদিও সারা সপ্তাহ জুড়েই বাড়িতে বা অন্যান্য হাটে সুতা বিক্রি হত, ঘিওর হাটই ছিল প্রধান কেন্দ্র। হয়তো এ কারণেই পরের দিন, মানে বৃহস্পতিবার মোকামে যেতেন বাবা বা কাকা। ঘিওর হাট থেকে আসত বিভিন্ন স্থানীয় ফলমূল, বিশেষ করে শবরী কলা। আর আসত তহবিল ভর্তি টাকা। ছোটবেলা থেকেই অভি  বাবাকে টাকা গুনতে সাহায্য করত। যখন খুব ছোট ছিল ওর ভাগে পড়ত ১ টাকার নোট গণা, স্কুল লাইফে পাঁচ শ’ টাকার নোট পর্যন্ত গুনতে দিত ওকে। অনেক সময় এক বাণ্ডিল এক টাকার নোট নিয়ে ও বলত “এখানে একশ টাকা।“ বাবা বলতেন “ঠিক আছে, যদি বেশি হয় তুমি নেবে, কম হলে ওটা পূরণ করবে।“ পূরণ অবশ্য অভি করত না, টাকাও সাধারণত হাতে পেত না। মাস শেষে ওর ইউনাইটেড আর পরে জনতা ব্যাংকের আকাউন্টে বাবা টাকাটা জমা করে দিতেন। শুকনো মৌসুমে সকালে পাশের গ্রাম থেকে ঘোড়া আসত। পাহাড় প্রমান সুতার বস্তা ঘোড়ার পিঠে উঠে চলে যেত দেশ ভ্রমণে। বাবা যেতেন সাইকেলে। বর্ষাকালে অবশ্য নৌকা আসত ঘোড়ার বদলী হিসেবে। যতদিন পর্যন্ত বড়দি দেশে ছিলেন, বাবা কাকারা খেতেন বড়দির ওখানে। বড়দি ইন্ডিয়া চলে গেলে বাড়ি থেকেই খাবার নিয়ে যেতেন। বড়দির বাসা ছিল ঘিওর হাটের উপরেই, বাসা কাম ফার্মেসি। ঘিওর ছাড়াও বাবা, কাকা শনিবার ঝিটকা হাটে আর রবিবার পাশের গ্রামে জাবরা হাটে যেতেন। সব জায়গাতেই ওদের নিজস্ব দোকান ছিল। ছোটবেলায় অভি নিজেও কখনও কখনও এসব হাটে গেছে নৌকা করে। তবে ঠিক হাটে নয়, ঘিওর গেছে বড়দির বাসায়, ঝিটকা গেছে পিসির বাড়ি। অভির পিসি বাড়ি ছিল ঝিটকা। ওখানে ওর সমসবয়েসী ভাইবোনেরা ছিল আর ছিল অনেক নারকেল গাছ। এসব নারকেল অবশ্য অভিদের এলাকার মত সবুজ নয়, হলদেটে। নাম ছিল সিন্ধি নারকেল। ও এলাকায় খেজুরও ছিল অন্য রকম আর খেজুরের গুড়ের নাম ছিল হাজারি গুড়। অভিরা পিসির বাড়ি গেলে অবশ্য ঝিটকার জমিদার বাড়িও বেড়াতে যেত। এটা ছিল ওদের মামাবাড়ি। তখন অবশ্য মামারা কেউ ছিলেন না, ইন্ডিয়া চলে গিয়েছিলেন। এসব সম্পত্তি শত্রু সম্পত্তি বলে চিহ্নিত হয়েছিল। অভির বাবা এই বাড়ির মেয়ে বিয়ে করেছিলেন একসময়। সেই মা মারা যাওয়ার পর আবার বিয়ে করেন। অভিদের সাত ভাই এক বোনের মধ্যে সাত জনই দ্বিতীয় ঘরের, শুধু ওর বড়দা, সুবোধ দা প্রথম মায়ের সন্তান। শনিবারের গুরুত্ব শুধু ঝিটকা হাটেই নয়, বদ মেজাজি দেবতা শনির কোপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এদিন তাঁর পূজাও করা হয়। আর রবিবার তো রবিবারই, সপ্তাহের প্রথম দিন। অন্তত ইংরেজি বই থেকে অভি তাই জানতো। পরে সোভিয়েত ইউনিয়নে এসে জেনেছে সপ্তাহের প্রথম দিন হচ্ছে সোমবার। তবে পাকিস্তান আমলে রবিবার ছিল হাফ স্কুল আর ছিল জাবরা হাট। মানে ফলমূল ইত্যাদির অপেক্ষা। ঝিটকা আর জাবরা হাটের পর সোমবার আবার নারায়ণগঞ্জ। যেহেতু শুক্রবার বা রবিবার ছিল ছুটি বা হাফ স্কুল, তাই এই দিন দুটোও একেবারে ফেলনা ছিল না। সেদিক থেকে দেখলে মঙ্গলবার ছিল একেবারেই আড়ম্বরহীন, সাদামাটা। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নে এসে অভি হঠাৎ বুঝতে পারল এই দিনের গুরুত্ব। তাই আজকের গল্প মঙ্গলবার নিয়ে।
অভি সোভিয়েত ইউনিয়নে আসে ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৩, মঙ্গলবার। সে সময় ঢাকা থেকে মঙ্গলবার এয়ারোফ্লতের প্লেন আসত মস্কো। তাই মঙ্গলবারেই শুরু হয় অভির সোভিয়েত জীবন। তবে ঘটনা সেখানে নয়। তখন তো আর আজকের মত ইন্টারনেট ছিল না, ছিল না অল্প খরচে আত্মীয় স্বজনদের সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থা। চিঠিই ছিল একমাত্র মাধ্যম। কারো কারো অবশ্য ফোন করার সুযোগ ছিল। সে সময় গ্রামে তো দূরের কথা, ওদের পাশের মানিকগঞ্জ শহরেই টেলিফোন ছিল হাতে গোনা কিছু মানুষের। তাই ওর জন্য চিঠি ছিল যোগাযোগের এক ও অদ্বিতীয় মাধ্যম। যেহেতু দেশ থেকে বিমান আসত মঙ্গলবার, তাই ওই দিনটার অপেক্ষাতেই ওরা থাকত। তাছাড়া ওরা নিজেরা যেমন প্রায়ই কারো হাতে চিঠি পাঠাতো, দেশ থেকেও কেউ এলে তাদের হাতেই চিঠি আসত ওদের জন্য। সে সময় ছাত্র ছাড়া মূলত আসতেন পার্টি ডেলিগেট। আসত একতা নামে একমাত্র বাংলা পত্রিকা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র। দেশের খবর তখন ওরা যা পেত তা এই একতার মাধ্যমে বা বিভিন্ন ডেলিগেটদের মুখে। তাই কেউ এলেই ওরা চেষ্টা করত তাদের সাথে দেখা করতে, দেশের খবরাখবর শুনতে। এভাবেই ওর সাথে পরিচয় ঘটে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বামপন্থী নেতাদের সাথে। কর্মীরা যে আসতেন না তা নয়, তবে নেতাদের সংখ্যাই ছিল বেশি।  
সে সময় আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট এ দেশে খুব বেশি ছিল না। মস্কোয় চারটি এয়ারপোর্ট থাকলেও শুধু শেরমিতভা ছিল আন্তর্জাতিক। ভনুকভা আন্তর্জাতিক হলেও শুধু অফিসিয়াল ডেলিগেটদের জন্য ব্যবহৃত হত। ভনুকভা ছিল অভিদের হোস্টেল যেখানে সেদিকটায়। প্রতি দু তিন মিনিট পর পর একটার পর একটা প্লেন সেখানে নামত।  সেসব দেখে অভির মনে পড়ত ছোটবেলার কথা। ওদের বাড়ির উপর দিয়ে যখন প্লেন উড়ে যেত ও হাঁ করে উপর দিকে তাকিয়ে থাকত। বাংলাদেশের লোকজন মস্কো আসত শেরমিতভা হয়ে। তখন অবশ্য এরোফ্লত খুব ব্যস্ত এয়ার লাইন। তুলনামুলক সস্তা। তাই ইউরোপ অ্যামেরিকা থেকে লোকজন মস্কো হয়ে এশিয়ার দেশগুলোয় যেত। আরব ভিত্তিক বিমান ব্যবসা তখনও শুরু হয়নি। অভি প্রথম যখন আসে তখন ওর রুট ছিল ঢাকা-বোম্বাই-করাচি-তাসখন্দ-মস্কো। মস্কো-ঢাকা টিকেট ছিল বেশ  দুষ্প্রাপ্য, কেন না লন্ডন থেকেই বিমান ভর্তি হয়ে আসত। সিলেটের লোকজন প্লেন ভর্তি করে ঢাকা থেকে লন্ডন আর লন্ডন থেকে ঢাকা যাতায়াত করত। আসলে ঐ সময় সোভিয়েত ইউনিয়নে এতো কড়াকড়ি  ছিল যে আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট ছিল হাতে গোনা কয়েকটা। যাই হোক মস্কোর বাইরে হলেও অভিদের এয়ারপোর্ট যাওয়া মানা ছিল না। এখানে বলে নেওয়া ভালো সেসব দিনে কোন বিদেশীকে তার শহরের বাইরে কোথাও যেতে হলে বিশেষ অনুমতি বা ভিসা নিতে হত। এ যেন এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়া।  অভিদের এয়ারপোর্টে যাওয়ার ধুম পড়ত জুলাই আর আগস্ট মাসে। সোভিয়েত ইউনিয়নে শিক্ষা বর্ষ শুরু হয় সেপ্টেম্বর মাসে। শীত প্রধান দেশ বিধায় এখানে সবাই গ্রীষ্ম কালে  রেস্টে যায়। স্কুল বন্ধ থাকে জুন, জুলাই, আগস্ট মানে পুরা গ্রীষ্ম কাল, ইউনিভার্সিটি জুলাই আর আগস্ট। তাই বিদেশ থেকে ছাত্রছাত্রীরা আসতে শুরু করে জুলাই মাসে, যাতে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই প্রায় সবাই চলে আসে। সে সময় সবাই আসত সোভিয়েত সরকারের বৃত্তি নিয়ে, এখনকার মত পয়সা দিয়ে পড়ার নিয়ম ছিল না। তাই ক্লাস শুরুর আগে পর্যন্ত অভিরা দল বেধে মঙ্গলবার এয়ারপোর্টে যেত নতুন ছাত্রদের বরণ করতে। যারা গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসত, তারা আগে থেকেই ব্যাপারটা জানতো, তাই তাদের ইউনিভার্সিটির বাসে সরাসরি সেখানে নিয়ে যাওয়া হত। অভি নিজেও ১৯৮৩ সালে এয়ারপোর্ট থেকে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ভার্সিটি ক্যাম্পাসে এসেছিল। সাথে তখনকার গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনের সভাপতি মলয় রঞ্জন ধর সহ অনেক বড়ভাই উপস্থিত ছিলেন। তাদের সাথে গান গাইতে গাইতে ওরা নতুন জীবনে প্রবেশ করেছিল।  
যারা গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের নয় তাদের নিয়ে যাওয়া হত ইউনিভার্সিটি নামে এক হোটেলে। এটা মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটির পাশে। পাশে মস্কো স্টেটের হোস্টেল, বালাতন নামে হাঙ্গেরির দোকান। সে আমলে মস্কোয় জিনিসপত্র খুব পাওয়া যেত না। দোকান ছিল সব একই রকম ঠিক যেমন বাড়িঘর। বিভিন্ন স্যোসালিস্ট দেশের দোকান ছিল, যেখানে সেসব দেশের উৎপাদিত বিভিন্ন জিনিসপত্র পাওয়া যেত। এই দোকানের সাথেই ছিল লিতভা নামে সিনেমা হল। ১৯৮৬ সালে রুমা শাওনরা মস্কো আসে। ওরা প্রিপারেটরি করে মস্কো স্টেটে। তখন অভি প্রায়ই ওদের হোস্টেলে যেত বিকেলে আড্ডা দিতে। ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী নিহত হন। এর পর হোটেলের সামনের স্কয়ারটাকে ইন্দিরা স্কয়ার নামকরণ করা হয়। সেখানে তাঁর একটা স্ট্যাচু স্থাপিত হয়। রাস্তার উল্টো পাশেই ছিল মহাত্মা গান্ধীর স্ট্যাচু। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পরে স্থানীয় অনেক কমিউনিস্ট নেতাদের স্ট্যাচু সরিয়ে নিলেও এসব স্ট্যাচু এখনও বহাল তবিয়তেই আছে। যতদিন পর্যন্ত না নতুন ছাত্রদের অন্য কোথাও পাঠানো হত, এরা এই হোটেলেই অবস্থান করত। সবাই চাইত মস্কো থেকে যেতে। কত যে আকুতি মিনতি করত। আমাদের কিছুই করার ছিল না। হয়তো ভাষাগত কারণে এদেশে যারাই আসত প্রায় সবাই শিশুর মত অসহায় বোধ করত। বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে এখানে আসার পর খুব সহজেই মস্কোর ছাত্রদের সাথে ওদের ভাব হয়ে যেত। মস্কোয় নেমে বাংলাদেশিদের কাছে পেয়ে ওরা যেন চাঁদ হাতে পেত। তাই অন্য কোন শহরে পাঠানো হলে ওদের আবার নতুন করে বিচ্ছেদের জ্বালা সইতে হত। প্রায় সবাই যেত ট্রেনে। আমরা সময় সুযোগ মত ওদের ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে আসতাম, নিজেদের ঠিকানা দিতাম, গিয়ে চিঠি লিখতে বলতাম। সবার দেখাদেখি অভিও তাই করত। চিঠি লেখায় অভি বরাবরই ছিল ওস্তাদ। সাথী না পেলে ও যেমন নিজে নিজেই মার্বেল, তাস, দাবা ইত্যাদি খেলত, একইভাবে কখনো কখনো ও নিজে নিজেকেই চিঠিও লিখত। সেটাও ছিল এক মজার খেলা। 
মঙ্গলবার এয়ারপোর্টে যাওয়ার আরও একটা কারণ ছিল। প্রথমত এজন্যে আলাদা পয়সা লাগত না, ওদের যে মান্থলি টিকেট ছিল ওটা দিয়েই পাবলিক ট্র্যান্সপোর্টে করে ওরা প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে এয়ারপোর্ট পৌঁছে যেত। ওখানে মস্কোর বিভিন্ন ইন্সটিটিউট থেকে ছাত্ররা আসত। আর ওখানে ভালো কফি পাওয়া যেত। সে সময় মস্কোয় এসবের অভাব না হলেও দুষ্প্রাপ্যতা ছিল। সব মিলে অভি অনেকটা ক্লাসে যাওয়ার মত করেই এয়ারপোর্ট যেত ১৯৮৮ সাল অব্দি।  ক্লাস শুরু হয়ে গেলে অবশ্য এয়ারপোর্ট আর যাওয়া হত না, তবে বিকেলে যেত হোটেলে। তখন মস্কোয় যারা পড়াশুনা করতে আসত তাদের অধিকাংশই ছিল বাম ঘেঁষা। ওদের কাছ থেকে দেশের অবস্থার, বিশেষ করে রাজনৈতিক অবস্থার তরতাজা খবরাখবর মিলত।
সে সময় মস্কোয় হালকা শীত পড়ে গেছে। মস্কো স্টেটের চত্বরে বিশাল আপেল বাগানে আপেল ধরে আছে। ওরা নবাগতদের নিয়ে সেদিকে হাঁটতে যেত, কখনো আপেল ছিঁড়ে দিত। দেশ থেকে আসা ছাত্রছাত্রীরা এদেশের খাবার খুব একটা খেতে পারত না। সব মিলিয়ে বেশ হৈ হুল্লোড়েই কাটত কয়েক সপ্তাহ। তারপর আবার দীর্ঘ বিরতি। মাঝে মধ্যে দেশ থেকে রাজনৈতিক নেতারা এলে ওরা হোটেলে যেত তাদের সাথে দেখা করতে, তাদের কাছ থেকে দেশের খবর জানতে। অনেকে ওদের হোস্টেলে আসতেন।  সালাম ভাই (বারীন দত্ত), মঞ্জু ভাই, মানিক ভাই এলে বেশ ঘরোয়া আড্ডা হত। মঞ্জু ভাই সবাইকে নিয়ে গান গাইতেন। ফরহাদ ভাই, নুরুল ইসলাম ভাই, সেলিম ভাই, পঙ্কজ দা – এঁদের সাথে আলোচনা অনেক হত। তবে ওঁদের সেসব আলোচনা সভাগুলো ঠিক আদ্দার পর্যায়ে পড়ত না। ফারুক ভাই, তাহের ভাই বা ছাত্র ইউনিয়নের কেউ এলে ভালো আড্ডা জমত। এছাড়া প্রায়ই কমিউনিস্ট পার্টি, যুব ইউনিয়ন আর ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা আসত স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণে। তাদের সাথেও গড়ে উঠত বন্ধুত্ব। পরে, নব্বই দশকের শুরুতে শুধু ছাত্রই নয়, দেশ থেকে প্রচুর লোক আসতে শুরু করে। এক সময় এরোফ্লতের দুটো বিমান সপ্তাহে ঢাকা যেত। এরপর দেশের স্থানীয় লোকদের সাথে হিসেব নিকেশের ঝামেলায় এই রুটটাই বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আসে এমিরাত, কাতার, আরাবীয়া, টার্কিশ এয়ার লাইনের যুগ। মঙ্গলবার আবারও বাকি দশটা দিনের মতই একটা সাধারণ দিনে পরিণত হয়। 


দুবনা, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০




                                           

Comments

Popular Posts