সোভিয়েত ইউনিয়ন – হাঙ্গেরি ৬ - ০


১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল অভির জন্য এক অবস্মরনীয় ঘটনা। এর আগে এভাবে কখনও ফুটবল খেলা দেখেনি ও। দেশে ওদের বাড়িতে টিভি ছিল না। যদিও স্বাধীনতার পরপরই ওর শ্যামল দা হাউজী খেলে টিভি সেট জেতে, গ্রামে ইলেক্ট্রিসিটি না থাকায় সেটা কখনই বাড়ি আনা হয়নি। নরেশ কাকুর দাসরার বাসায় সেটা পার্মানেন্ট ঠিকানা পায়। নরেশ কাকু ওর বাবা কাকাদের বন্ধু। ওনাকে অভি যুদ্ধের আগে চিনত না, নাম শুনেছে বা দেখেছে বলে মনে করতে পারছে না। যুদ্ধের পরে সুতার সাথে সাথে আরও বেশ কিছু ব্যবসায় ওরা যোগ দেয়। সেটা কাপড়ের ব্যবসা, পেট্রোলিয়াম ব্যবসা ইত্যাদি। কাপড়ের ব্যবসার পার্টনার ছিলেন নরেশ কাকু, আসলে উনি ছিলেন দোকানের মালিক আর কাপড়ের ব্যবসায় মূল নিয়োগ ছিল অভিদের। সেখানে তখন ললিত কাকু, রমেশ দা (ললিত কাকুর ভাই, তবে কেন যেন ওরা তাকে দাদা বলে ডাকত) কাজ করতেন। ললিত কাকু কাপড় বিক্রিতে সাহায্য করতেন, রমেশ দা জামাকাপড় তৈরি করতেন। তখন রেডিমেড গার্মেন্টস তেমন পাওয়া যেত না। রমেশ দার কাছে অভি পরে তবলা বাজানো শিখত। ওদের পেট্রোলিয়ামের ব্যবসা ছিল উকিল সাহেবের সাথে। উকিল সাহেবের কি নাম অভি জানে না, সবাই তাঁকে উকিল সাহেব বলেই ডাকত। সেখানে অভিদের কাজ দেখাশোনা করতেন দীনেশ কাকু। এর আগে মানিকগঞ্জ গেলে অভিদের বেড়ানোর জায়গা ছিল কানাই কাকু আর মাখন কাকুদের দেবেন্দ্র কলেজ সংলগ্ন বাড়ি আর ভুপেশ কাকুর বাসা। ভুপেশ কাকু ডাক্তার, বাড়ি জোকা। অভিদের দু গ্রাম পরে। তবে উনি মানিকগঞ্জ থাকতেন, ছিলেন অভিদের পারিবারিক চিকিৎসক। অবশ্য ছোটখাটো ব্যাপারে পাশের গ্রামের রেবতী কাকু বা গ্রামের বিল্ব মামা আসতেন। কানাই কাকু আর মাখন কাকু অভিদের বাড়িতে প্রায়ই আসতেন। কানাই কাকুর মেয়ে লীলা দি অসুস্থ ছিল, তাই উনি তেমন একটা বাইরে যেতে পারতেন না। লীলা দিকে নিয়ে অভিদের ওখানে আসাও ছিল বেশ ঝক্কির। মাখন কাকু আসতেন কালেভদ্রে। উনি প্রচণ্ড ড্রিঙ্ক করতেন। এসেই বলতেন ক্ষেত থেকে মরীচ নিয়ে আসতে। প্রতি গ্রাস ভাতের সাথে দু তিনটে করে মরীচ খেয়ে ফেলতেন। অভি অবাক হয়ে দেখত তাঁর কাণ্ড কারখানা। নরেশ কাকুর সাথে পরিচয়ের পরে ওরা অবশ্য ওখানেই যেত। ওনার ছেলেমেয়েরা অভিদের ভাইবোনদের সমবয়সী আর উনি খুব মিশুক মানুষ। এটাও হয়তো একটা কারণ। তাই শ্যামল দার টিভিটা বাড়ি না এনে ওখানেই রাখা হয়।
এলাকায় তখন কোন বাড়িতেই টিভি ছিল না। ওদের গ্রাম ছিল খুব বড় আর কুটির শিল্পে উন্নত।  এক সময় প্রচুর তাঁতি ওদের গ্রামে বাস করত। চাদর, গামছা, শাড়ি, লুঙ্গি এসব তৈরি হত। গ্রামের তাঁতিরা মূলত ওদের খদ্দের ছিল। ছিল সমবায় সমিতি। ওদের গ্রামের লোকেদের ভোটই নির্ধারণ করত কে হবে এলাকার চেয়ারম্যান, তবুও যখন এলাকায় কারেন্ট এল, গ্রাম্য রাজনীতির খেলায় বিদ্যুৎ ওদের গ্রামের উপর দিয়ে কিন্তু গ্রামকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। পরবর্তীতে গ্রামের তাঁতিদের প্রায় সবার এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার এটাও একটা কারণ। অধকাংশই চলে যায় পশ্চিমবঙ্গে, কেউ কেউ মানিকগঞ্জ জেলার অন্য গ্রামে বা ময়মনসিংহে। কারেন্ট ও টিভি না থাকায় যদি কোন গুরুত্বপূর্ণ টিভি শো থাকত ওরা যেত নদীর ওপারে ডায়রি ফার্মে। ওই ফার্মেই অভি দেখেছিল সত্যজিৎ রায়ের “হীরক রাজার দেশে”। আর ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে দুয়েকটা খেলা। বিশেষ করে মনে আছে ফ্রান্স আর জার্মানির সেমিফাইনাল, যেখানে ভালো খেলেও ফ্রান্স হেরে যায়।
১৯৮৬ সালে অবশ্য ওর নিজের ঘরেই টিভি ছিল, অমল দা পিএইচডি শেষ করে চলে যাওয়ার আগে ওকে টিভিটা দিয়ে যান। তবে খেলা তো আর একলা দেখা যায় না, তাই ওরা সাধারণত এসব খেলা দেখত সবাই মিলে। কখনো নিজেদের ব্লকের নীচে, কখনো বা সাত বা দশ নম্বর ব্লকে যেখানে প্রচুর বাংলাদেশি ছিল। খেলা দেখা মানেই পক্ষ-বিপক্ষ, মানে হৈচৈ। ওর বন্ধুদের অনেকেই ছিল যাকে বলে অন্ধ ভক্ত, তবে ও দেখত চুপচাপ। প্রিয় দল জিতলে ভালো, হারলেও সেটা ফ্যাটাল কিছু না। সেটা ছিল ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ। সবার চোখ আর্জেন্টিনার সেই ছোট্ট জাদুকরের দিকে। ওর প্রতিটি মুভের সে কী চুলচেরা বিশ্লেষণ। গুলিট, ভ্যান বাস্টেন, রবার্তো বাজ্যিও, এরিক কান্তানা এদের যুগ তখনও শুরু হয়নি, সক্রেটিস, জিকোরা বিদায়ের পথে। সবাই ম্যারাডোনাকে  নিয়ে পাগল – কেউ পক্ষে, কেউ বিপক্ষে, কিন্তু আলোচনায় সমালোচনায় ম্যারাডোনা তখন সবার মুখে মুখে। অভিরা সবাই তখন স্বাভাবিক ভাবেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থক। সোভিয়েত দলও সেবার খুব শক্তিশালী। গোলে দাসায়েভ, বিশ্বসেরা গোল কিপার। ছিল ব্লখিন, জাভারভ, রাদিওনভ, বেলানভ, প্রতাসব, বুবনভ, দেমিয়ানেঙ্কো, আলেইনিকভসহ অনেকেই। অনেকেই ইউরোপের নামকরা খেলোয়াড়, তাই তাদের নিয়ে উৎসাহ উদ্দীপনার অন্ত নেই। কাপ জিতুক আর নাই জিতুক গ্রুপ থেকে যে বেরুবে, সেমিফাইনালে অন্তত খেলবে সেরকম বিশ্বাস অনেকেই করত। তাই সোভিয়েত ইউনিয়নের খেলার দিন সমস্ত হোস্টেল এক মাঠে পরিণত হত, গোল হলেই সে কি চিৎকার চেঁচামিচি।
সেই বিশ্বকাপে কী না ঘটেছে
। এমন কি ঈশ্বর মাঠে নেমে ম্যারাডোনার হাত দিয়ে ইংল্যান্ডের জালে বল পাঠিয়েছে। ম্যারাডোনা কী না করেছে সেই বিশ্বকাপে। সবাইকে, বিশেষ করে প্রতিপক্ষকে হতবাক করে একের পর এক খেলোয়াড়কে কাটিয়ে অবলীলায় গোল করেছে আর বলতে গেলে এক হাতেই, মানে এক পায়েই সারা আর্জেন্টিনা টীমকে একের পর এক বাধা টপকে এনে দিয়েছে বহু আকাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ।
তবে আমাদের আজকের গল্প একটা মাত্র খেলা নিয়ে। এটা ছিল গ্রুপ ম্যাচ। ১৯৮৬ সালের ২ জুন হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছিল সোভিয়েত দল। সেই ম্যাচ ও ম্যাচ পরবর্তী ছাত্রদের আনন্দ উৎসব এক অভাবনীয় পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছিল মস্কোর মিকলুখো মাকলায়া স্ট্রীটে। সোভিয়েত ইউনিয়নে এটা ছিল অভূতপূর্ব, প্রায় অসম্ভব এক ঘটনা। খেলা শুরুর অনেক আগে থেকেই ছাত্ররা বিভিন্ন ফ্লোরের টিভি রুমে জড়ো হতে শুরু করল। অনেক আবার নিজেদের ঘরে বসেই দেখল এই খেলা। তবে যেখানেই হোক, সব জায়গাতেই দর্শকদের ভিড়। যদিও তখন সবে মাত্র পরীক্ষা শুরু, তবে খেলা নিয়ে কারো সাথে কোন কম্প্রোমাইজ নেই। শুরু থেকেই বোঝা গেল সোভিয়েত ইউনিয়ন আজ শুধু ভালই খেলবে না, বড় ব্যবধানে জিতবেও। হাঙ্গেরি তখন সমাজতান্ত্রিক দেশ, ওয়ারশ ব্লকের সদস্য, তাই খেলাটা অনেকটা নিজেদের মধ্যে হলেও আবেগের কমতি ছিল না। বেলানভ তখন ফর্মের তুঙ্গে, শুধু বেলানভই নয়, টীমের অনেকেই। অনেক দিন পরে এমন শক্তিশালী একটা দল সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিনিধিত্ব করছে। তাকে ঘিরে মানুষের অনেক আশা, অনেক স্বপ্ন। একটা করে গোল হয়, শুরু হয় চিৎকার চেঁচামিচি। কেউ বা ব্যালকনির টিন বাজিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। প্রায় সবার হাতে হাতে বিয়ারের বোতল। সেই বোতল দিয়েই টোস্ট করে সোভিয়েত দলের জয় কামনা করে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন এ খেলায় ৬ – ০ গোলে জয়লাভ করে। খেলা শেষের বাঁশি পড়তে না পড়তেই সমস্ত হোস্টেল থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে ছাত্ররা। সে আমলে মস্কোয় আজকের মত এত গাড়ি ছিল না, মিকলুখো মাকলায়াকে কোন মতেই ব্যস্ত রাস্তা বলা যেত না। তার পরেও রাস্তা থমকে দাঁড়ালো। দশ নম্বর ব্লক থেকে শুরু করে এক নম্বর ব্লক পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য, মানে ছাত্রে ছাত্রারণ্য। শুরু হল শ্লোগান, বিজয় মিছিল। সে মিছিল মূলত বিদেশি ছাত্রদের। সোভিয়েত দেশের ছাত্ররা জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখছে, হাতে গণা কিছু ছাত্র সাহস করে সামিল হয়েছে এই বিজয় মিছিলের।
অভির প্রায় তিন বছরের সোভিয়েত জীবনে এটাই ছিল এমন স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নে যে মিছিল হত না তা নয়, তবে সেসব হত মিলিশিয়া, গোয়েন্দা আর পার্টি ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রণে। ১৯৮৩ সালে মস্কো আসার পরপরই শান্তির পক্ষে এক বিশাল মিছিল হয়েছিল। অভি অনেকের সাথে সেই মিছিলে অংশ নিয়েছে। বেশ কয়েকবার মে দিবস আর মহান অক্টোবর বিপ্লব দিবসের ডেমনস্ট্রেশনে রেড স্কয়ারে গেছে। ১৯৮৫ সালে যে বিশ্ব যুব উৎসব হয় মস্কোয় সেখানেও অভি সক্রিয় অংশ নিয়েছে। তবে সেসবই ছিল নিয়ন্ত্রিত। আমাদের দেশে যেমনটা ট্রাক ভর্তি ক্যাডার এনে সরকারি দলের মিটিং মিছিল হয় সেগুলোও ঠিক তেমন ছিল। আর এই মিছিল ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, কেউ কাউকে ডাকেনি, প্রথমে কেউ একজন বেরিয়ে এসেছে, পরে সবাই নিজ নিজ তাগিদে রাস্তায় নেমেছে, যেমন হয় গণ অভ্যুত্থানে।  সোভিয়েত ইউনিয়ন জিন্দাবাদ, দা জদ্রাভস্তভুয়েত সভিয়েতস্কি সায়ুজ, সায়ুজ ভেংগ্রিয়া ৬ – ০ ইত্যাদি শ্লোগানে ভরে ওঠে বাতাস। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর রাস্তার দুই প্রান্তে গাড়ি জমে যায়। প্রথমে তারা হর্ন বাজিয়ে সবার সাথে আনন্দে যোগ দিলেও এক সময়ে ওরা অধৈর্য হয়ে পড়ে। বলা দরকার, সোভিয়েত ইউনিয়নে পারতপক্ষে কেউ হর্ন বাজাতো না। শব্দ দূষণ সম্পর্কে ওদের তখন কতটা ধারণা ছিল সেটা জানি না, তবে হর্ন বাজানো এক ধরনের অসভ্যতা মনে করা হত। অবস্থা যখন ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল একে একে আসতে শুরু করল মিলিশিয়ার গাড়ি। ওরা ছাত্রদের বুঝিয়ে ঘরে ফেরাতে চেষ্টা করল, কিন্তু কে শোনে কার কথা। মিলিশিয়া বুঝছিল যে ছাত্ররা সোভিয়েত বিরোধী কোন কর্মকাণ্ডে জড়িত নয়, ওরা কোন ভাংচুর করছে না, শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের এই জয়ে উল্লাস করছে। কিন্তু এভাবে যে অনেকক্ষণ চলতে দেওয়া যায় না সেটাও ওরা ভালো ভাবেই জানতো। তাই ওরা নিজেরা কোন বল প্রয়োগ না করে ইউনিভার্সিটির কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করাই শ্রেয় মনে করল।
মনে রাখতে হবে সোভিয়েত ইউনিয়নে, বিশেষ করে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব বিদেশীরা পড়াশুনা করত তারা অধিকাংশই ছিল রাজনীতি সচেতন, দেশে অনেকেই (ছাত্র)রাজনীতি, বিশেষ করে বাম রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। মিটিং মিছিল এসব ছিল ওদের রক্তে। তাই হঠাৎ পাওয়া ধনের মত মিছিলের এই সুযোগ পেয়ে ওরা যেন একটু মুক্তির বাতাস পেয়েছিল। তাই কখন যে ওরা সীমারেখা অতিক্রম করে ফেলে সেটা নিজেরাই বুঝতে পারেনি। এটা ওদের দোষ নয়, ক্রাউড মানে জনতার মানসিকতা যেখানে ব্যক্তি মানুষ সমষ্টির একজন হয় তাতে মিশে যায়, হঠাৎ নিজেকে জনতার বলে বলীয়ান মনে করে তার হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়, সে তখন নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে না। এই শক্তি সময় মত নিয়ন্ত্রনে আনতে না পারলে বড় অঘটন ঘটে যেতে পারে। এখনও চোখে ভাসে আমাদের ইমদাদ ভাইয়ের উত্তেজিত হতে শ্লোগান দিতে দিতে মিখলুখো মাকলায়া রাস্তার উপর দিয়ে দৌড়ানোর দৃশ্য।  
যাহোক, এক সময় ভার্সিটির প্রোরেক্টর এলেন, অনেকক্ষণ সবাইকে বোঝালেন। শেষ পর্যন্ত একটু একটু করে সবাই হোস্টেলে ফিরতে শুরু করল। কিন্তু সেই উত্তেজনা, সেই রেশ আরও অনেকদিন ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পরবর্তী খেলার সময় আগে থেকেই এলাকায় মিলিশিয়া টহল দিতে শুরু করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন গ্রুপ পর্যায় থেকে বের হলেও কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাছে হেরে যায়। সেই হারে যে রেফারির হাত ছিল এ ব্যাপারে আমাদের কোন সন্দেহ ছিল না। পেরেস্ত্রোইকা তখনও সোভিয়েত সমাজকে নক ডাউন করতে পারেনি। জাতীয় ফুটবল দল তখনও শক্তিশালী ছিল যার পরিচয় আমরা পাব ১৯৮৮ ইউরোপিয়ান কাপে, যেখানে ভ্যান বাস্টেনের অবিশ্বাস্য গোলে হেরে সোভিয়েত ইউনিয়ন রানার্স আপ হয়। সেটা অবশ্য অন্য গল্প।
 

সামাজিক মাধ্যমে স্মৃতিচারণের পজিটিভ দিকটা এই যে এখানে অনেক বন্ধুরা যারা এসব ঘটনার সাক্ষী ছিলেন, লেখাটা পড়ে। আর তাদের মন্তব্যে বা ফোনে ভুলে যাওয়া অনেক কথাই স্মৃতিতে ফিরে আসে। গতকাল মুকুল ভাই ফোন করে মনে করিয়ে দিলেন কিছু কথা। 

সে সময়টা ছিল অ্যামেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগ। দু পক্ষই ব্যস্ত থাকত একে অন্যের ছিদ্র অনুসন্ধানে। সেই সোভিয়েত ইউনিয়ন আর হাঙ্গেরির খেলার পর যখন আমাদের এলাকায় ছাত্রদের বিজয় উৎসব শুরু হয় তখন ভলগিনার দিক থেকে অ্যামেরিকান এম্বাসীর একটা গাড়ি আসতে দেখা যায়। আমাদের ধারণা ওরা ভেবেছিল এখানে ছাত্রদের মধ্যে কোন অসন্তোষ দেখা দিয়েছে আর তার থেকেই বিক্ষাভ। অথবা ওরা ঠিকই বুঝেছিল এটা বিজয় উৎসব, তবে ভাংচুরের ঘটনা দেখিয়ে এটাকে ছাত্র অভ্যুত্থান বলে চালিয়ে দেওয়ার ধান্দায় ছিল। মিলিৎসিয়া ওদের পথ আটকায় আর এর পরেই চেষ্টা করে ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে। আমরা সবাই বিভিন্ন ব্লকে ঢুকে পড়ি। অধিকাংশ ঢুকে ১০ নম্বর ব্লকে। এটা ছিল গ্রীষ্মের শুরু। তখন বিয়ারের দাম ছিল নাম মাত্র। তাই ছাত্ররা ঘর ভরে বিয়ার কিনে রাখত, বিশেষ করে বিশ্বকাপ যেহেতু নাকের ডগায়। সবার হাতে হাতে ছিল বিয়ারের বোতল। যখন এক পর্যায়ে মিলিৎশিয়া ১০ নম্বরে ঢোকার চেষ্টা করে উপর থেকে শুরু হয় বোতল বৃষ্টি। মিলিৎশিয়া বাধ্য হয় পিছু হটতে। আর তখনই সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়াতে ডাক পড়ে প্রোরেক্টরের। ঠিক বলতে পারব না, এটা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে করা হয়েছিল নাকি হোস্টেল কর্তৃপক্ষ করেছিল। তবে যাই হোক, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পরবর্তীতে যেকোনো এক্সেস এড়াতে প্রতিটি খেলার আগেই এলাকায় পাহারা জোরদার করা হয়। তবে এতে খেলা নিয়ে উত্তেজনা কমেনি। আমরা আগের মতই হৈচৈ করে খেলা দেখতাম হোস্টেলে বসে। আসলে সে সবই ছিল অন্য সময়ে অন্য দেশে। বর্তমান রাশিয়ায় খেলা দেখতে অনেকেই ক্যাফে বা রেস্টুরেন্টে চলে যায়। সবাই মিলে হৈচৈ করে। জাপানের বিশ্বকাপে যাতে অনেক লোক একসাথে খেলা দেখতে পারে সেজন্য মানেঝে বিশাল স্ক্রিন বসান হয়। রাশিয়ার পরাজয়ের সুযোগ নিয়ে উগ্রপন্থীরা সেখানে প্রচুর ভাংচুর করে, অনেক লোক আহত হয়। এরপরেই মানেঝের সেই বিশাল চত্বরের নীচ গড়ে ওঠে সুপার মার্কেট।    
 
   
দুবনা, ৩১ জানুয়ারি/১১ মার্চ ২০২০                  








     
 

Comments

Popular Posts