হুক্কা

 

ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে হুক্কা খেতে দেখেছি বাড়ির কাজের লোকদের। সে সময় বাড়িতে সব মিলিয়ে জনা তিরিশেক লোক কাজ করত। কয়েকজন মহিলা যারা ঘর পরিষ্কার করত, থালা বাসন মাজত, ধান সেদ্ধ করত, ধান ভানত আর রান্নার কাজে সাহায্য করত। আর ছিল অনেক পুরুষ - যাদের একাংশ হালচাষ করত, গরুদের দেখাশুনা করত, অন্যেরা সুতা রঙ করত। এই পুরুষ কর্মচারিরাই হুক্কা খেত। এ জন্যে অনেকটা জমিতে প্রতি বছরই তামাক চাষ করা হত। আমার জ্যাঠামশাইও মাঝে মধ্যে হুক্কা খেতেন ওদের সাথে। তাঁর মনে হয় নিজস্ব হুক্কা ছিল, অথবা আগে তাঁকে খাইয়ে অন্যেরা খেত। উনি বিড়িও খেতেন, তবে সেটা আমাদের অলক্ষ্যে, লুকিয়ে লুকিয়ে। হুক্কার সবচেয়ে মজার জিনিস ছিল ওর গুরগুর শব্দ। ঐ শব্দের জন্য নিজেও অনেক সময় কল্পি ছাড়া হুক্কায় টান দিতাম। ১৯৮৩ সালে দেশে ত্যাগের সময়ও বাড়িতে কাজের লোকজন ছিল, ছিল হুক্কা। এখন আর কাজের লোক নেই। ১৯৯১ সালে বাবা মারা যাবার পর ব্যবসা বন্ধ, জমিজমা বর্গা দেয়া। তাই হুক্কাও উধাও। ইদানীং রাশিয়ায় হুক্কা খাওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে। বিভিন্ন জায়গায় সিগারেট খাওয়া নিষিদ্ধ করার ফলে কিনা জানি না। তবে হুক্কার অনেক স্টল আছে, টি স্টলের মত। ওখানে লোকজন যায় আড্ডা দিতে, হুক্কা খেতে। এখানে এর নাম কালিয়ান - নিকোলাই এর সাথে কোন সম্পর্ক আছে কিনা জানি না। একদিন দেখলাম মনিকা হুক্কা কিনে এনেছে। তাও অনেক দিন। খুব খুশি হয়েছিলাম ছবি তোলার একটা বিষয় পেলাম ভেবে। কিন্তু যখন মনে হল, এটা ছবি তোলার জন্য হয়, খাওয়ার জন্য সেই উৎসাহে ভাটা পড়ল। সেভাও দেখি একদিন হুক্কা নিয়ে হাজির। এগুলো বেশ দামি আর দেখতে মুগল দরবারের হুক্কার মত। সেদিন মস্কো গিয়ে দেখি ওরা হুক্কা খাওয়ার আয়োজন করছে। বিশাল এক রিচুয়াল। দেশের হুক্কা সাজাত খুব যত্ন করে। এখানেই দেখি তাই। সব ঠিক করে মনিকা জিজ্ঞেস করল - পাপা, হুক্কা খাবে? - মাথা খারাপ? মনে হয় ছাত্রজীবনে বা মনিকাদের বয়সে কেউ এটা অফার করলে কৌতূহল থেকে খেতাম। এখন আর সেই এক্সপেরিমেন্ট করার ইচ্ছে নেই। তবে ওদের হুক্কা খেতে দেখে সেই ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল।

দুবনা, ২১ ডিসেম্বর ২০২১
 

 

Comments

  1. শুগন্ধী তামাক দিয় মাঝে মধ্যে এক দুই টানমেরে সাধ নিতেই পারেন

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular Posts