করোনার দিনপঞ্জি
আমাদের মত সাধারণ মানুষের কোন ইতিহাস থাকে না, থাকে না কোন জীবন বৃত্তান্ত। যা থাকে তা হল সিভি বা বায়োডাটা, মানে জীবনের প্রায় সবকিছু বাদ দিয়ে দু একটি ঘটনার উল্লেখ, কবে কোন পরীক্ষায় পাশ করলে, কবে কোন চাকরিতে ঢুকলে, কী কী পেপার প্রকাশ করলে এসব আর কি। তবে যারা সোভিয়েত ইউনিয়ন বা রাশিয়ায় থাকে (অন্য দেশেও হয়তো আছে, জানা নেই) তাদের নিজেদের ইতিহাস না থাকলেও থাকে তাদের রোগের ইতিহাস। যে লোকের রোগের ইতিহাস যত সংক্ষিপ্ত তার শরীর স্বাস্থ্য তত ভালো। আমার ঠিক উল্টোটা। অনেক আগেই দৈর্ঘ্যে প্রস্থে আমাকে ছাড়িয়ে গেছে আমার রোগের ইতিহাস। ও এখন ডরিয়েন গ্রের পোরট্রেটের মত, মানে আমি নিজে দেখতে অল্প বয়েসী হলেও আমার রোগের ইতিহাস অতিরিক্ত ওজনে ভোগা এক বৃদ্ধ।
আমি যখন এদেশে আসি, ওজন ছিল মাত্র ৪৩ কেজি। সবার ধারণা ছিল বাংলাদেশ থেকে আসা একটা ছেলেও যদি হাসপাতালে যায় সেটা হব আমি। সকলের আশার গুড়ে বালি দিয়ে আমি সেদিন পর্যন্ত হাসপাতাল এড়িয়ে গেছি। ২৯ ডিসেম্বর ২০২০ প্রথম বারের মত তিন দিনের জন্য দ্মিত্রভের কারডিও-ভাস্কুলার সেন্টারে ছিলাম হার্ট সংক্রান্ত কিছু সমস্যার চেক আপের জন্য। এরপর গত ১৪ থেকে ২২ জানুয়ারি ছিলাম তালদমে করোনা আক্রান্ত হয়ে।
সোভিয়েত আমলে হাসপাতালের চেহারা কেমন ছিল জানি না। মাঝে মধ্যে মস্কোর নামকরা কিছু হাসপাতালে গেছি যেখানে দেশ থেকে আসা পার্টির ডেলিগেটরা চিকিৎসা পেতেন। তবে সেটা সাধারণ হাসপাতাল ছিল না। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গনের পরে সব কিছুর মতই একটার পর একটা হাসপাতাল বন্ধ হতে থাকে। রুশরা বলে, সুখ ছিল না, দুঃখ সাহায্য করল। সেদিক থেকে বলা যায় করোনা সংকট এ দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়েছে। যদিও করোনা মোকাবেলায় খুব দ্রুত অনেক হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো ভ্রাম্যমান নয়, মানে করোনা পরবর্তী সময়ে এরা সাধারণ চিকিৎসা দিয়ে যাবে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করায় রাশিয়া আন্তর্জাতিক শক্তির রোষে পড়ে, বিভিন্ন রকমের এম্বারগো আরোপ করা হয়। তখন থেকে শুরু হয় রাস্তাঘাটের উন্নতি। এর মধ্যে আমি বিভিন্ন জায়গায় গেছি, দেখেছি রাস্তাঘাটের ইনফ্রাস্ট্রাকচার কতটা বদলে গেছে। শুধু তাই নয়, এখন এ দেশ বিশ্বের অন্যতম ফসল উৎপাদনকারী দেশ। আর এখন দেখছি স্বাস্থ্য ক্ষেত্র ঢেলে সাজানো। তবে যে জিনিসটা খুব চোখে পড়ল সেটা আয়নার অভাব। কী দ্মিত্রভ, কী তালদম - দুটো হাসপাতালই আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সজ্জিত। এম আর আই, সিটি স্ক্যান থেকে শুরু করে প্রায় সমস্ত রকমের জটিল যন্ত্রপাতি দিয়ে ভরা। ওয়ার্ডগুলো ঝকঝকে তকতকে। ভোর ছয়টা থেকে শুরু করে রাত নয়টা পর্যন্ত কতগুলো ব্রিগেড সেবা দিয়ে যাচ্ছে। কর্তব্যরত ডাক্তার বাদেও নার্সদের টীম ইঞ্জেকশন আর স্যালাইন দিচ্ছে, নিচ্ছে ব্লাড, ইউরিন - আর এসব করছে বেডে এসে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। প্রতিটি বেডের সাথে কলিং বেল (তালদমে ছিল না, এখানে ম্যাটারনিটি সেন্টার করোনার করুনায় দেওয়া হয়েছে), সকেট (এখন সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন, তাই যাতে চার্জ করতে ঝামেলা না হয়), তালদমে বেডের সাথে অক্সিজেন নেবার যন্ত্র আর ইনহিলার। সকাল দুপুর সন্ধ্যা তিন বার গরম খাবার সারভ করছে আরেক দল আর দিনের মধ্যে বেশ কয়েকবার করে ঘরদোর ডিজইনফেক্ট করছে আরও এক টিম। তবে যে জিনিষটা চোখে পড়ল সেটা হল কোন আয়নার অনুপস্থিতি। প্রায়ই জিজ্ঞেস করতে দেখেছি আয়না আছে কি না আর এ নিয়ে অভিযোগ, যে এত টাকা খরচ করে সব ব্যবস্থা করা হল, আয়নার জন্য দুপয়সা খরচ করলে কী এমন হত। এই অভিযোগ করছিল পুরুষেরা যারা শেভ করতে গিয়ে এ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। জানি না মহিলারা আয়নার অভাব কিভাবে ট্যাকল করেছে। কে জানে, এটা ডাক্তাররা ইচ্ছেকৃত ভাবে করে কি না, হাসপাতালে আয়না না রাখা কোন সংস্কার কি না?
করোনার শুরুতে বন্ধুদের অনুরোধে আমি বেশ কিছু আর্টিকেল লিখি এ ব্যাপারে। ডাক্তারদের এগিয়ে আসা, আর্মির দ্রুত নতুন নতুন হাসপাতাল গড়ে তোলা এসব পজিটিভের মধ্যেও বলেছিলাম, বিশেষজ্ঞ তো দু দিনে তৈরি করা যায় না আর সবচেয়ে বড় কথা একটা সময় ডাক্তার, নার্সসহ হাসপাতালের সাথে জড়িত সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়বে। বিশেষ করে রেড জোনে যারা কাজ করে তারা শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ভাবেও ক্লান্ত হয়ে উঠতে পারে। তাই করোনাকে যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রনে আনা না যায় সেটা একসময় আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। হাসপাতালে যন্ত্রপাতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ তবে যারা সেবা দিচ্ছেন তাদের মানসিক অবস্থা, রোগীর সাথে তাদের আচার ব্যবহার রোগীকে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য মানসিক ভাবে তৈরি করে। তাই বিশেষ করে রেড জোনে ডাক্তার, নার্স, খাবার যারা সারভ করছে তাদের আর স্যানিটারদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা, রোগীদের সাথে তাদের আচার আচরণ করোনা নিয়ন্ত্রনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। সুযোগ যেহেতু এসেই গেল আমার কৌতূহলী মন সব সময় চেষ্টা করেছে সেটা জানতে। এসব নিয়েই আজ দুকথা বলার ইচ্ছে। সাথে হাসপাতালের পরিসরে নিজেদের সময় কাটানোর কথা।
নার্সদের সাথে কথা বলে বুঝলাম ওরা প্রচণ্ড টায়ার্ড। বলল সেই সেপ্টেম্বর থেকে কোন ছুটি ছাড়া কাজ করছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে করোনার প্রথম ওয়েভ রাশিয়া তুলনামুলক সফল ভাবেই মোকাবেলা করে। এরপর আসে গ্রীষ্মের ছুটি। বলতে গেলে এই তিন মাসই এদেশের মানুষ সূর্যের মুখে দেখে। তাই শীতে যেমন রশিয়ার পাখিরা গরমের সন্ধানে উড়ে যায় বাংলাদেশ, ভারত আর আফ্রিকার দেশগুলোতে, গ্রীষ্মে এদেশের মানুষ তেমনি ছুটে যায় দক্ষিণ সাগরে। তখনই সরকার আর বিশেষজ্ঞরা বলেছিল, এর পরিণতি হতে পারে আরও ভয়াবহ দ্বিতীয় ওয়েভ। সোভিয়েত ইউনিয়নে হয়তো জোর করে মানুষকে ঘরে বসিয়ে রাখা যেত, আধুনিক রাশিয়ায় সরকার শুধু তাদের রিকম্যান্ড করতে পারে, জোর করতে পারে না। আর এর ফল আমরা এখন দেখছি। এরপর ছিল নববর্ষের ছুটি আর সব শেষে নাভালনির মূলত টিন এজারদের রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করার ডাক।
খুব কষ্ট হচ্ছে কাজ করতে?
সে আর বলতে। সেই সেপ্টেম্বর থেকে এক নাগারে কাজ করছি। দুদিন কাজ করি দুদিন ছুটি।
দুদিন কাজ করা মানে টানা আটচল্লিশ ঘণ্টা নিদ্রাবিহীন কাজ। কখন কোন রোগীর কাছে যেতে হয় কে জানে? আমাদের ওই জোনে প্রায় ৫০ জন রোগী। সবাইকে তিন বার করে স্যালাইন দেওয়া, ইঞ্জেকশন দেওয়া, সময় মত ব্লাড, ইউরিন এসব নেওয়া, অক্সিজেন দেওয়া, ইনহিলেশন দেওয়া - এক কথায় সে এক মহাযজ্ঞ।
ক্লান্ত হয়ে পড়েন না?
কী আর বলব। প্রথম দিন ভালই চলে। দ্বিতীয় দিন চোখ বন্ধ হয়ে আসে। দু দিন পরে যখন বাসায় ফিরি কোন কিছু করতে ইচ্ছে করে না। পুরো চব্বিশ ঘণ্টা ঘুমাই। এর পরের দিন বাড়ির লোকজনদের জন্য রান্না করি, জামাকাপড় ধুই আরও কিছু কাজকর্ম থাকে। সব মিলে হাতের কাজ বাকি থাকতেই আবার দৌড়ুতে হয় হাসপাতালে।
ইচ্ছে করে না এসব ছেঁড়ে কোথাও চলে যেতে?
আমি না করলে কাউকে তো করতেই হবে। এসব কাজ করব বলেই তো আমরা এসেছি। তাই পেছনে তাকানোর কথাই আসে না। তবে সাধারণ মানুষ যদি আমাদের সমস্যা বুঝত, তারাও যদি নিজেরাই সতর্ক হয়ে চলাফেরা করত তাহলে আমাদের কাজের চাপ কমত। এখন অনেক কিছুই নির্ভর করে যতটা না আমাদের বা সরকারের উপর, তার চেয়ে বেশি মানুষের নিজেদের সচেতনতার উপর। অনেক লোকজন এখানে আসার আগে পর্যন্ত করোনার অস্তিত্বে বিশ্বাস করত না, অনেকেই ভাবত এটা আসলে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে সরকারের প্রোপ্যাগান্ডা, অনেকে আরও এক কাঠি উপরে গিয়ে বলত এটা আসলে অতিরিক্ত মানুষের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য বিভিন্ন দেশের সরকারের আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। কিন্তু এখানে একবার পড়লে বোঝে এটা কোন ফেইক নিউজ নয়, করোনা আমাদের বর্তমান বাস্তবতা, কঠিন বাস্তবতা। এই সত্য মানুষ যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করতে পারবে করোনা জয়ের পথ তত ছোট হবে।
আমি প্রথমবার যখন তিন দিনের জন্য হাসপাতালে ছিলাম ২ ৯ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত, ছিলাম ৫ জনের এক ওয়ার্ডে। সবাই ছিল বেশ বয়স্ক, দুজন বলা চলে বৃদ্ধ। সবাই হেল্পফুল। আসলে এখানে কেউ আর রাজা উজীর থাকে না, সবাই রোগী। তাই কারও কোন সমস্যা হলে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে যেটুকু করা যায় সেটা করে। সারাদিন শুয়ে বসে থাকা, তাই ওঠে জীবনের কথা, সমাজের কথা। রাজনীতি, অর্থনীতি। আর বয়স্ক লোকজন থাকলে সোভিয়েত জীবনের সাথে তুলনা করে। সোভিয়েত আমলের মত একেবারে বিনে পয়সায় না হলেও চিকিৎসার যে উন্নতি ঘটেছে সেটা সবাই স্বীকার করে। এটা অবশ্য কোন সিস্টেমের সাথে জড়িত নয়। বিগত ২০ - ২৫ বছরে বিজ্ঞান অন্য স্তরে পৌঁছেছে আর তার সূত্র ধরেই এমন কি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেও জীবনযাত্রা তথা চিকিৎসার মান উন্নত হয়েছে। সমস্যা যে নেই তা নয়, তবে সেটা অন্য সমতলে। বিজ্ঞান যেভাবে উন্নত হয়েছে মানুষ সেভাবে বিজ্ঞানমনস্ক হয়নি। বরং বলা চলে বিজ্ঞানের আশীর্বাদকে কাজে লাগিয়ে অনেকে সমাজ তথা মানবজাতিকে অভিশপ্ত করছে। মানবিকতার জন্য বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে ব্যবহার করে একদল মানুষ মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তৈরি করছে। বিশেষ করে ধর্ম, যা আদর্শগত ভাবে বিজ্ঞানের জন্ম শত্রু, আজ বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে পুঁজি করেই বিশ্বকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে পেছন পানে। আর রাজনীতিবিদরা ক্ষমতার মোহে এসব দেখেও দেখছে না।
দ্বিতীয় বার আমরা দুজনেই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যাই। ডাক্তার আন্তনের পরিচিত বিধায় আমাদের দুই বেডের এক রুমে রাখে। সেটার পজিটিভ আর নেগেটিভ দুটো দিকই আছে। নেগেটিভ দিক হল অন্যান্য রোগীদের সাথে বলতে গেলে কোন যোগাযোগ ছিল না, ছিল না মতের আদান প্রদান। তাই সাতদিন হাসপাতালে থাকলেও কোন নতুন তথ্য জানতে পারিনি। পজিটিভ দিক হল এই প্রথম এত দিন দুজন এক সাথে থাকা। আসলে করোনার আগে দিনের একটা বিরাট অংশ কাটত বাসার বাইরে। করোনা কালে কাজকর্ম অনলাইন বলে বাসায় থাকা, কিন্তু সবাই নিজ নিজ কাজ নিয়েই ব্যস্ত। আর হাসপাতালে কিছুই করার নেই, শুধু সময় মত চিকিৎসা নেওয়া, স্মার্টফোনে চোখ বুলানো, বই পড়া। আমি শেষ মুহূর্তে বুদ্ধি করে আই প্যাড নিয়ে গেছিলাম, ছিল অনেক বই। তাই অনেকদিনের জমা বইগুলো পড়ার সুযোগ এলো। এছাড়া ছিল ফেসবুক, ক্রিকেট আর মাঝে মঝে কিছু সিরিয়াস পেপার পড়া। গুলিয়ার এখনকার পড়ার বিষয় কুকুর। কোন রঙের কুকুরের সাথে কোন রঙের কুকুরের মিলনে কোন রং পাওয়া যাবে। ও ওর এসব প্ল্যান আমাকে বলে আর আমি আইনস্টাইনের গল্প শুনাই
এক সুন্দরী মহিলা একবার আইনস্টাইনকে বললেন আমদের মিলনে যদি কোন সন্তান হয় সে হবে প্রচণ্ড সুন্দর আর বুদ্ধিমান।
আর যদি উল্টোটা হয়? - হেসে জিজ্ঞেস করেছিলেন আলবার্ট।
তবে গুলিয়ার কুকুর নিয়ে এই গবেষণা আমার খারাপ লাগে না। মনে হয় এটাও যেন খ্রমোডাইনামিক্সের কোন সমস্যা। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে বিগত প্রায় সাত বছরের প্রচেষ্টায় ও বেশ কিছু সুন্দর কুকুর পেয়েছে। হয়তো সময় পেলে অবস্থার উন্নতি ঘটবে। না হলে খোঁজা নাস্রুদ্দিনের মত বলতে হবে, "হয় রাজা মরবে, নয়তো গাধা মরবে আর ভাগ্য খারাপ থাকলে আমি মরব।" তবে এটাও ঠিক পরস্পরের পাশে থাকার একটা ভাল দিক আছে - সেটা সাহস। বাচ্চাদের নিয়ে ২০০৯ সালে গুলিয়া যখন মস্কো ফিরে যায় আমাকে সেভাকে সব সময় ফোন করতে হত। এমনকি ও যদি ফোন রেখে অন্য খেলায় মেতে উঠত তারপরেও লাইন কাটা যেত না। এই যে আমি আছি সেটাই ছিল ওর জন্য সাহসের জায়গা। এখানেও তাই। যা করার ডাক্তার আর নার্সরাই করতেন। তবে মাঝে মাঝে গুলিয়া বলত পিঠে হাত রাখতে। কিছুই না, তবুও সেটা ছিল আশার জায়গা। আমি কি চাইতাম? বরাবর যেটা। একা থাকতে দিতে, মানে আমি যখন কিছু পড়ছি, কথা না বলতে। বাসায় ওর পক্ষে সেটা করা সোজা, কিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। হাসপাতালের চার দেওয়ালে সেটা করা বেশ কঠিন। তবে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় আমরা উত্তীর্ণ হয়েছি। আমাদের পরস্পর নির্ভরতা, পরস্পরের প্রতি ভালবাসা আরও বেড়েছে।
তবে এতদিন যে ঝগড়াটা হয়নি সেটা হল শেষ দিন। ২২ তারিখে ডাক্তার সব রিপোর্ট দেখে বললেন এখন বাড়িতে বসেই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া যাবে। আমি তার কাছ থেকে খুটিয়ে খুটিয়ে কি করা যাবে আর কি ওরা যাবে না সেটা জেনে নিলাম। মূল ব্যাপার ছিল ঘুরতে পারব কিনা। উনি বললেন অল্প স্বল্প ঘুরতে হবে, তবে খুব বেশি নয়। ফুস্ফুসের উপর যেন চাপ না পড়ে। কী কী করতে হবে আর কী কী ওষুধ খেতে হবে তার একটা লিস্ট ধরিয়ে বললেন হাসপাতাল থেকে দুবনা বাস যাবে, চাইলে আমরা ওদের সাথে যেতে পারি। বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসবে।
না, আমরা ট্যাক্সিতে যাব।
কেন, এদের গাড়িতে গেলে সমস্যা কোথায়?
ডাক্তার ভদ্রলোক, বললেন, ঠিক আছে আপনারা ট্যাক্সিতেই চলে যান।
দেখ, এখান থেকে ট্যাক্সি ডাকলে কে না কে আসবে কে জানে। ইয়ান্ডেক্স বা উবারের ড্রাইভাররা সব মধ্য এশিয়ার। ওদের সাথে যাওয়া রিস্কি। তাছাড়া এ জন্যে আমাদের হাসপাতালের বাইরে যেতে হবে। বাসে গেলে ওরা এখান থেকে উঠিয়ে নিত।
ঠিক আছে, তুমি বাসে যাও, আমাকে ট্যাক্সি ডেকে দিও।
আমি ফোন করলাম বন্ধু দেমিদকে। ও বলল ফ্রি আছে। আমাদের নিতে আসবে। দুপুরের খাওয়া শেষ করে আমরা অপেক্ষায় রইলাম দেমিদের। ও এলো পৌনে তিনটের দিকে।
আমরা কি সোজা দুবনা যাব নাকি তোমার অন্য প্ল্যান আছে?
সেদিন দ্মিত্রভ থেকে আমি নিজের দায়িত্বে চলে গিয়েছিলাম, রিপোর্ট নেওয়া হয়নি। করোনার পরে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়, রিপোর্টটা নিয়ে যেতে পারলে ভালো হয়।
ঠিক আছে। ওদের ফোন কর।
আমি দ্মিত্রভ ফোন করলাম। অনেক চেষ্টার পর বুঝাতে পারলাম আমি কে, কবে সেখানে ছিলাম, কী দরকার।
ঠিক আছে, আমরা রেডি করে রাখব, আপনি চলে আসেন। চার তলার দরজায় এসে কলিং বেল টিপবেন। দিয়ে দেব।
গুলিয়ার মোটেই ইচ্ছে ছিল না উল্টো দিকে যাবার। তালদম থেকে দুবনা যেতে আমাদের লাগত ৪০ থেকে ৫০ মিনিট, এ রকম সময় লাগবে দ্মিত্রভ যেতে। সেখান থেকে দুবনা আবার এক ঘণ্টার পথ।
অনেক দিন পরে এবার এত বরফ পড়েছে। রাস্তার দুধারে বারচ, পাইন আর ক্রিস্টমাস ট্রির বন। সবাই যেন বরফের জ্যাকেট পরে দাঁড়িয়ে আছে। ক্যামেরা নেই বলে মনটা একটু বিষণ্ণ লাগছে। দু চোখ জুড়িয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আমরা যাচ্ছি দ্মিত্রভের পথে। দ্মিত্রভ গিয়ে যখন পৌছুলাম, নিজেই ঠিক বুঝতে পারছি না কোন বিল্ডিঙে যেতে হবে। ৩১ তারিখ দেমিদ নিজে আমাকে নিয়ে গেছে। তাই ভাবলাম ওর নিশ্চয়ই মনে আছে। যাহোক, একটা বিল্ডিঙের ওখানে নেমে হাঁটা দিলাম চার তলার দিকে। কিছু লোকজন বাইরে কাজ করছিল, কিছু বলতে পারল না। চার তলায় উঠে যখন বললাম আমি কারডিওলজি ডিপার্টমেন্ট খুঁজছি এক ভদ্রমহিলা বললেন "এটা এ্যাম্বুলেন্স বিভাগ। আপনাকে এখান থেকে নেমে রাস্তা পেরিয়ে হাসপাতাল এরিয়ার অন্য প্রান্তে যেতে হবে।" কী আর করা? বাইরে এসে আর এক ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম কারডিওলজির বিভাগ কোথায়। আমি চেষ্টা করি মেয়েদের কাছ থেকে জানতে। ওদের সাথে কথা বলতে আমার সব সময়ই ভালো লাগে, বিশেষ করে এ সব হালকা ব্যাপারে।
আপনার ঠিক কী দরকার?
আপনি নববর্ষের আগে ওখানে তিন দিন ছিলাম। ৩১ তারিখে ডাক্তার ছিল না, তাই রিপোর্ট না নিয়েই চলে যাই। আজ নিতে এলাম।
নববর্ষের আগে। সবাই মনে হয় মাতাল ছিল?
না না, ডাক্তাররা ছুটিতে ছিল।
উনি আমাকে দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। শেষ মেশ বললেন "আমি ওদিকেই যাচ্ছি, চলুন আপনাকে পৌঁছে দিয়ে যাই।" আমরা এলাম একটা গেটের কাছে। সেখানে আম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে। এর মধ্যে বেশ পরিবর্তন হয়েছে। বললেন, "আম্বুলেন্সের ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করুন। মনে হয় নতুন গেট এখানেই।" ভেতর গিয়ে সব কিছু অপরিচিত মনে হল। একজন নার্সকে দেখে জিজ্ঞেস করায় তিনি সিঁড়ি দেখিয়ে দিলেন। চার তলায় উঠে গিয়ে কলিং বেল টিপলাম। ওই বিল্ডিঙে এখনও মেরামতের কাজ চলছে। কারডিও-ভাস্কুলার ডিপার্টমেন্ট কাজ শুরু করেছে। তাই সাধারণ মানুষের জন্য এখনও লিফট রেডি নয়। ইতিমধ্যে এতটা হেঁটে আমি টায়ার্ড। দম পাচ্ছি না। যাহোক, রিপোর্ট হাতে পেয়ে দেমিদকে ফোন করলাম, ও বলল যেখানে আমাকে নামিয়ে দিয়েছে সেখানেই ওরা বসে আছে। তখন মনে হল আম্বুলেন্স বিভাগের কথা। একজনকে জিজ্ঞেস করে কোন মতে গাড়ি পর্যন্ত এসে পৌছুলাম। গত আট দিন বলতে গেলে কোন মুভমেন্ট ছিল না। এই প্রথম বুঝতে পারলাম শ্বাসকষ্ট। ইতিমধ্যে গুলিয়া দেমিদের সাথে জমিয়ে তার কুকুরের গল্প করছে। আমি দেমিদকে আমাদের পরবর্তী প্ল্যান বলতে লাগলাম। হেমন্তে তালদমে পাখিরা জড়ো হয় আফ্রিকা যাবে বলে। সে সময় সেখানে বিভিন্ন এক্সারশনের আয়োজন হয় বিশেষ করে সারস পাখি দেখার জন্য। তাছাড়া ভালদাইয়ে ভোলগার উৎপত্তি। দেমিদ এখনও যায়নি। সেই প্ল্যানও করা হল। আর সুজদাল, ভ্লাদিমির। সুজদাল গেছি ছাত্রজীবনে। মঝপথে বাস নষ্ট হয়ে যায়, তাই সেখানে পৌঁছুই রাতের বেলায়। ভ্লাদিমির গেছিলাম নব্বুইয়ের দশকে কাকু আর মামুনের সাথে। তারপর এক সময় ঘুমিয়ে পড়ি। বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় পাঁচটা। আন্তনকে বলেছিলাম মাংস বের করে রাখতে। অনেকদিন ঝাল মশলা দিয়ে খাওয়া হয়নি। আন্তন অবশ্য স্যুপ করে রেখেছিল। সব দেখে বুঝলাম এই দ্মিত্রভ যাত্রা গুলিয়ায় একদম পছন্দ হয়নি। ও প্রচণ্ড টায়ার্ড। তবে বাসায় ফিরেই লেগে গেল ঘর পরিস্কারের কাজে। আন্তন আলু মাংস কেটে বেড়াতে গেল বন্ধুর ওখানে। আমি শুরু করলাম রান্না। গত কয়েকদিনে সেদ্ধ খাবারে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে এত যত্ন করে রান্না করা মাংস ততটা টেস্টি মনে হল না। ফলে আমার রান্নার পদ্ধতি বদলে গেল এরপর থেকে। সকালে উঠেই মাংস সেদ্ধ করতে বসাই। এরপর মুসুর বা মাসের ডাল ছেঁড়ে দিই তাতে। সাথে হলুদ, মরিচ, গরম মশলা আর শেষে কিছু সবজি আর প্যাকেটের স্যুপ। এক কথায় ডাল আর মাংসের স্যুপ। এতে পোড়ার সম্ভাবনা নেই। শুধু কী তাই। ঘুম থেকে উঠেই পরিজ করি। এর আগে ওটা সহ্য করতে পারতাম না। এখন জলের মধ্যে একটু দুধ ঢেলে তাতে লবন আর চিনি দিই। সেটা ফুটলেই চিড়া আর হেরকুলিস। এক কথায় জীবনের অভ্যেসগুলোই বদলে গেছে একেবারে। ঘুম ভাঙ্গে খুব সকালে। আগে কখনও ব্রেকফাস্ট করতাম না, একবারে ভাত খেতাম। এখন সকালে পরিজ, এরপর স্যুপ, তার কিছুক্ষণ পরে মাছ বা মাংস দিতে ভাত আবার রাতে ভাত বা ন্যুডলস বা গ্রেচকা। আসলে ক্ষিদে এত বেড়ে গেছে যে মাঝে মধ্যে সন্দেহ হয় এটা কি আমি নাকি আমার বদলে হাসপাতাল থেকে অন্য কাউকে পাঠিয়ে দিয়েছে। গত কয়েকদিনে ৪ কেজি ওজন হারিয়েছি। আসলে করোনা কালে ঘরে বসে বসে আমার ওজন ৬২ থেকে ৬৬ হয়েছিল। এই ৪ কেজি এক্সট্রা ওজন বইতে কী কষ্টই যে হত! ভেবেছিলাম করোনা একটা উপকার করে গেল। এখন যে হারে খাচ্ছি তাতে হিতে বিপরীত না নয়।
ইতিমধ্যে আন্তন মস্কো চলে গেছে। যাবার আগে কেনাকাটি করে গেছে। ওষুধ কিনতে হয়েছে অনেক। ও থাকতে থাকতেই গেলাম বনে। ক্যামেরা ওর কাছে রেখে ঘুরলাম, কিছু ছবি তুললাম। তবে যেসব দৃশ্য আগে আনন্দ দিত আজ যেন ওদের ফ্যাকাসে মনে হল। ঘণ্টা খানেক হেঁটে বাসায় যখন ফিরলাম - হাঁপাতে হাঁপাতে জীবন শেষ। এমন কি পাশের দোকান থেকে দুকেজি জিনিস আনতে মনে হল বিশাল বোঝা গলার পরে। ভিক্তরকে বললাম ঘুরতে যেতে। এখনও ফোন করেনি। মনে হয় ভয় পেয়েছে পাছে সংক্রামিত হয়।
করোনা কালের শুরু থেকেই ভিক্তর ওপেন আক্সেসে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কিছু ম্যাথাম্যাটিক্যাল মডেল তৈরি করে। আমিও ওকে এ ব্যাপারে কিছু কিছু কনসাল্ট করি। এসব থেকে আমাদের যে অভিজ্ঞতা হয় তাতে বুঝি, করোনা ভাইরাস মূলত মানুষের ইমিউনিটি নষ্ট করে দেয়। রোগীদের একটা বিরাট অংশ অসুখের উপস্থিতি টেরই পায় না। আরও একটা অংশ হোম কন্ডিশনে সেরে ওঠে। বাকি যে ২০% মত হাসপাতালে চিকিৎসা পায় তাদের বড় অংশই সাধারণ চিকিৎসার মধ্য দিয়ে ভাল হয়ে ওঠে আর ৫% মত ভেন্টিলেশনে পড়ে। এর শেষের অংশই সবচেয়ে বিপদের মধ্য দিয়ে যায়। তবে আরও যে ব্যাপারটা ঘটে তা হল যারা তুলনামুলকভাবে সহজেই করোনা মুক্ত হয় তাদের পুরোপুরি সুস্থ হওয়া নির্ভর করে ফলো আপের উপর। ডাক্তার যখন রোগীকে করনামুক্ত করে বাড়ি পাঠান এটা আসলে মারাত্মক অবস্থা থেকে তাকে তুলনামুলক স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসেন। পরবর্তী ডেভেলপমেন্ট নির্ভর করে রোগী ডাক্তারের রিকমেন্ডেশন কতটুকু মেনে চলবে আর সবচেয়ে বড় কথা যদি সামান্য সমস্যাও হয় কত দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করবে তার উপর। করোনা দমনে বিভিন্ন রকম হাই পাওয়ার ওষুধ ব্যবহার করা হয়, ফলে অন্যান্য অনেক রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। ইদানীং কালে দেখা গেছে করোনা চিকিৎসার পরে অনেকেরই পক্স আর হামের ভ্যাকসিন নষ্ট হয়ে গেছে। তাই করোনা পরবর্তী দিনগুলোতে বাসায় চিকিৎসা নেবার সময় শরীরের ছোট বড় সব রকমের পরিবর্তনের দিকে খেয়াল রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বেশ কিছু পরিচিত লোকজন মারা গেছেন সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে সময় মত পরিবর্তনের কথা রিপোর্ট না করতে পারায়। অনেকেই এসব ছোটোখাটো ব্যাপার নিয়ে ডাক্তারদের বিরক্ত করতে চায় না। অনেকেই আবার ভাবে এসব জানালে আবার যদি হাসপাতালে নিয়ে যায়। এক কথায় নিজের শরীরের পরতি মানুষের অবজ্ঞাই অনেক সময় কাল হয়ে দাঁড়ায়।
আমি নিজে কতগুলো ব্যপার খেয়াল করলাম। প্রথমত খুব তাড়াতাড়ি ক্লান্ত হয়ে পড়া। প্রতিদিন গড়ে ৫-৬ কিলোমিটার হাঁটলেও এখন ভোলগা পর্যন্ত যেতেই হাপিয়ে উঠি। ডাক্তার এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। ফুস্ফুস পুরোপুরি সেরে উঠতে সময় লাগবে। আরেকটা জিনিস হল প্রেসারের ওঠানামা। আমি গত দশ বছর রেগুলার প্রেসারের ওষুধ খাই। তারপরেও মাঝে মধ্যেই প্রেসার হাই হয়। কিছুদিন আগে একটা কলাপ্সের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় আমার এই হাসপাতালে বসবাস। গত পরশু হঠাৎ এক ধরণের ডিসকমফোরট ফিল করে প্রেসার মেপে দেখি ১০২/৬৩। নিজেই সিদ্ধান্ত নিলাম প্রেসারের ওষুধ না খেতে। গতকাল সন্ধ্যায় বুকে একটু ব্যথা। আগে কখনও এমনটি হয়নি। কারডিও সেন্টার থেকে রিকমেন্ডেশন ছিল একটা স্প্রে ব্যবহার করার। করলাম। এক ধরণের উষ্ণ প্রবাহ বয়ে গেল শরীরের ভেতর দিয়ে, কিন্তু ব্যথা রয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত ইমারজেন্সিতে ফোন করে সব জানালাম।
আমরা আসব?
তার দরকার নেই। বলুন কী করতে হবে, আমি সেটাই করছি।
আপাতত আনালজিন খান।
অন্য কিছু? যেমন পেন্টালজিন, ব্রাল এসব?
না। আপনার প্রেসার এমনিতেই কম। ওরা প্রেসার আরও কমাবে।
বুঝলাম।
আনালজিন খেয়ে ৩০ - ৪০ মিনিটের মধ্যে ব্যথা কমে যাবে। যদি না কমে ফোন করবেন। আমরা চলে আসব।
তখন রাত প্রায় দুটো। আনালজিন ব্যথাটা একটু কমাল, তবে পুরোপুরি গেল না। ভেবে দেখলাম ওদের ডাকলে ওরা একটা পোর্টেবল মেশিন এনে ইসিজি করবে আর কোন একটা ইঞ্জেকশন দেবে। তাই ওদের না ডেকে সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। সকালে চলে গেলাম ক্লিনিকে। ডাক্তার আমার প্রেসারের ওষুধ না খাওয়ার সিদ্ধান্ত স্বাগত জানালেন। ইসিজি করে দেখা গেল ওদিকে কোন সমস্যা নেই। তবে বুকের ব্যথাটা রয়েই গেল। এটা মনে হয় বিভিন্ন হাই ডোজ আন্টিবাইওটিক আর এখন যে সব ওষুধ খাচ্ছি তার ফল। এখন কাজ একটাই, নিজের শরীরটাকে খুব ভালভাবে অবজারভ করা, যেকোনো সমস্যায় ডাক্তারকে জানানো। তবে এর ভালো আর মন্দ দুটো দিকই আছে। গতকাল হঠাৎ মস্কো থেকে ফোন এলো।
আমি কার সাথে কথা বলছি?
আমি তো অবাক! একজন আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করছে কার সাথে কথা বলছে।
আপনি কে? কাকে ফোন করছেন?
আমি মেডিক্যাল সেন্টার মনিকা থেকে। সাহা বিজনের সাথে কথা বলতে চাই। উনি কয়েকদিন আগে করোনা চিকিৎসা নিয়েছেন।
আমি সাহা বলছি। কী জানতে চান?
আপনার সার্বিক পরিস্থিতি।
আমি সংক্ষেপে তাকে সমস্ত অবস্থার বর্ণনা দিলাম। প্রেসার, পালস ইত্যাদি। উনি যেসব রিকমেন্ডেশন দিলেন, আমি নিজেই সেভাবে ভাবছিলাম। পরে বললেন
আমি কোন কারডিওলজিস্টকে আপনার নম্বর দেব। উনি ফোন করলে আপনি বিস্তারিত সব ওনাকে বলবেন। আর অবস্থা ভালো হলে হয় দুবনায় অথবা মস্কোয় রেগুলার কারডিওলজিস্টের সাথে কনসাল্ট করবেন।
আজ যখন ডাক্তারের কাছে গেলাম, উনি সেটাই বললেন। বললেন, করোনারিগ্রাফির রিপোর্ট দেখে মনে হচ্ছে মাঝে মধ্যে স্পাজম হয়। সেটা একমাত্র বিশেষজ্ঞ বলতে পারবে। এখন করোনা পরবর্তী রিকভারি পেরিওড সতর্ক ভাবে চলবেন।
আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আমার খাদ্যাভাসের পরিবর্তন থেকেও বুকের ব্যথা হতে পারে, আমার এমনিতেই এসিডিটি হয়। হয়তো সেটাই হচ্ছে। এই গ্যাস চাপ সৃষ্টি করছে। দেখি এ ধরণের চিন্তা আমায় কোথায় নিয়ে যায়।
কথায় বলে সাবধানের মার নেই। তবে ব্যক্তিগত ভাবে আমার সামনে একটাই অপশন খোলা আছে - ভালো থাকা, সুস্থ থাকা। তবে এটাও ঠিক ভালো মন্দের এই জগতে ভালো থাকার সম্ভাবনা ৫০-৫০।
রাশিয়ায় বলে এদের মাত্র দুজন বন্ধু - আর্মি আর নৌবাহিনী। এই যুদ্ধে আমার বন্ধুর সংখ্যা আরও কম - আমার আত্মবিশ্বাস।
দুবনা, ২৯ জানুয়ারি ২০২১


Comments
Post a Comment