করোনার সাথে বসবাস
বয়স যখন কম ছিল, যৌবন ছিল দুরন্ত, শরীরের অনেক দুর্বলতা মোটেই চোখে পড়েনি। বয়সের সাথে সাথে ধরা পড়েছে ফাঁকি। ২০০৫ থেকে ধীরে ধীরে দেখা গেল হার্ট, গলব্লাডার, কিডনি - অনেক কিছুতেই গোঁজামিল। ভাগ্যিস মা বেঁচে নেই, তাহলে বলতাম তাঁর ভগবানের নামে কেস করতে দুই নম্বরি মাল গজিয়ে দেবার জন্য।
গত প্রায় পনের বছর বছরে কম করে হলেও একবার শরীরটাকে ডাক্তার নামক মেকানিকের হাতে রেখে আসি যাতে দিন দশেক অয়েলিং করে দেহটাকে চলন যোগ্য করে তোলেন। এবার অবশ্য করোনা কারণে ওদিকে যাওয়া হয়নি। মনে হয়েছিল অন্য সব অসুখের চেয়ে করোনা আরও বেশি ভয়ঙ্কর। তবে ডিসেম্বরে যখন দেখলাম "গাড়ি চলে না" ফোন করলাম নিজের ডাক্তারকে, গেলাম পলিক্লিনিকে।
"যদি জানতাম একমাস, দু'মাস বা তিন মাস পরে করোনা চলে যাবে, তাহলে আপনাকে বাসায় যেতে বলতাম। তা যেহেতু পারছি না, আপনি চেক আপ করিয়ে ফেলুন। রিস্ক আছে, তবে অনেক সময় রিস্ক নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের লক্ষণ।"
সাধারণত নিউরোলজিস্ট আর কারডিওলজিস্ট পালাক্রমে প্রতিবছর আমাকে দেখে। গত বছর কারডিওলজিস্ট দেখেছেন, তাই এবার নিউরলজিস্টের কাছে পাঠিয়ে দিল। শুরু হল করোনা ভাইরাসের অ্যান্টিবডি টেস্টের মাধ্যমে। নার্ভের পাশাপাশি হার্টকে তাজা করার জন্য পানানগিন, কাভেন্টিন, পটাশিয়াম, ম্যাগ্নেসিয়াম এসব চালান দেওয়া হল শিরার ভেতর। তারপর ২৮ ডিসেম্বর হল্টার রক্ত চলাচলে সমস্যার কথা জানালে ২৯ তারিখে জোর করে পাঠিয়ে দেওয়া হল দ্মিত্রভ কারডিও-ভাস্কুলার সেন্টারে করোনারীগ্রাফি আর এঞ্জিওগ্রাম করার জন্য। ওরা জানিয়ে দিল কোন সমস্যা হলে সাথে সাথে স্ট্যান্ড বসাবে বা অন্য কোন অপারেশন করবে। রাজী না হয়ে উপায় ছিল না।
একটু সমস্যা থাকলেও কোন অপারেশনের দরকার হয়নি। আরও কয়েকদিন থাকতে বলল। তবে নতুন বছর দাঁড়িয়ে দুয়ারে, তাই বলতে গেলে বন্ড সই করে ৩১ তারিখে বাসায় ফিরলাম। কাঁধের ব্যথা আগেই ছিল, করোনারীগ্রাফির পরে সেটা বাড়ল। শুনলাম এটা স্বাভাবিক ব্যাপার, তাই গুরুত্ব দিলাম না।
নতুন বছরের প্রথম দিনে ভিক্তরকে ডাকলাম ভোলগায় যাব বলে। ও বনে তেমন যেতে চায় না, তাই নদীতে যাওয়া। ভিক্তর দুবনায় আমার হাতে গনা দুয়েকজন সাথীর অন্যতম, অন্যেরা মূলত ফটোগ্রাফির সাথে জড়িত। ভিক্তর গণিতবিদ, আমাকে সাহায্য করে নিউমেরিক্যাল এক্সপেরিমেন্টে। তবে এর বাইরেও আমাদের অনেক কথা হয়। ধর্ম, রাজনীতি, সাহিত্য থেকে শুরু করে সামাজিক সমস্যা পর্যন্ত সব বিষয়ে আমরা কথা বলি। ভিক্তর অপেক্ষা করছিল নদীর ধারে। আমি ছবি তুলতে তুলতে যাচ্ছি। প্রথম আধঘণ্টা কোন কথা নেই। আমি ছবি তুলছি, ও ঘুরছে।
এই যে তুমি বল অবিশ্বাস এটাও বিশ্বাস - তাহলে বিজ্ঞান, গণিত এসব তো শুরুই হয় অবিশ্বাস দিয়ে, তাকেও কি বিশ্বাস বলবে?
তুমি যখন গণিতের কথা বল তার আগে কিছু আক্সিওম ঠিক করে নাও আর তার ভেতর থেকেই বিভিন্ন তত্ত্ব প্রমাণ কর। প্রাকৃতিক নম্বর তুমি হাতেনাতে বোঝাতে পার, বাচ্চা ছেলেকে ফল বা লাঠি দিয়ে দেখাতে পার কোনটা এক, কোনটা দুই, কীভাবে দুটো প্রাকৃতিক নম্বর যোগ করে আরেকটা প্রাকৃতিক নম্বর পাওয়া যায়। কিন্তু শূন্য কি? এটা শুধুই আইডিয়া। অথবা ঋণাত্মক সংখ্যা। তার মানে প্রয়োজনের সাথে সাথে আমরা আক্সিওম বদলাচ্ছি। শুরু হয়েছে অবিশ্বাস দিয়ে। আর নতুন বাস্তবতায় আমরা কিন্তু আমাদের বিশ্বাস নতুন আক্সিওমের উপর ন্যস্ত করি। তবে বিজ্ঞানের কাজ হল প্রশ্নটা অব্যাহত রাখা, প্রশ্ন করে নতুন জ্ঞান অর্জন করা আর এই বিশ্বাস অবিশ্বাসের দ্বান্দ্বিকতার মধ্য দিয়েই নতুন সত্যে উপনীত হওয়া। তবে সত্য ডগমা নয়। এটা অনেকটা অনবরত পারফেকশনের দিকে যাওয়ার মত।
এরপর আমাদের কথা হল কোভিড পরিস্থিতি নিয়ে। কথা হল বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে। কখন যে দুঘণ্টা সময় কেটে গেছে টের পাইনি। পোশাক হালকা ছিল না, তবে এতক্ষণ বেড়ানোর উপযোগী ছিল না। শেষের দিকে মনে হল ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছি। শেষে ভিক্তরকে কাজের কিছু প্ল্যান বলে বাসায় ফিরলাম।
পরের দিন ছিল সেভার জন্মদিন। ভোলগার তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম স্টেশনে, কেক কিনতে। মাঝে মধ্যে হাতের ব্যাথা বাড়ে, তবে গুরুত্ব দিই না। ৫ তারিখে ইন্ডিয়া থেকে এক বন্ধু ভ্লাদিমিরের মৃত্যু সংবাদ দিল। ভিক্তরের পর ও ছিল দ্বিতীয় জন যার সাথে কথা বলে আনন্দ পেতাম, প্রায়ই রাতের বেলা কসমোলজির সর্বশেষ আবিষ্কারের উপর গল্প করতে করতে করতে করতে বাসায় ফিরতাম। তাঁর মৃত্যু সংবাদ ছিল এতটাই অপ্রত্যাশিত যে পায়ের নীচে মাটি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। গুলিয়াকে ডেকে বনে গেলাম বেড়াতে। কিন্তু মন ভারাক্রান্ত। কি যেন নেই। আবেগ আমাকে দুর্বল করেছিল। হয়তো সে পথেই ঢুকেছে রোগ।
রাতে গুলিয়া বলল ওর শরীর খারাপ লাগছে। এদেশের মানুষ দুটো ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত - কে দোষী সেটা বের করতে আর কী করতে হবে সে ব্যাপারে ভাবতে। তবে আমাদের সংসারে গুলিয়া প্রথম অংশ করে, মানে কে দোষী সেটা খুঁজতে ব্যস্ত থাকে। আমি পদার্থবিদ। সমস্যার সামাধান খোঁজা আমার কাজ। তাই কি করে সমস্যার সমাধান করা যায় সে নিয়ে ভাবি।
এই যে তুমি হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরছ, সেটাই ঘরে করোনা ডেকে আনল।
করোনা কে বলল। তাছাড়া শরীর খারাপ লাগলে ডাক্তার দেখাতে হবে। চল কাল পলিক্লিনিকে যাই।
না। ওখানে গেলে আমি আর ফিরে আসব না। মরে যাব।
মহা মুস্কিল। বাচ্চাদের জানালাম। ওরা চেষ্টা করল মাকে বোঝাতে। তার এক কথা একবার বাইরে গেলে সে আর ফিরে আসবে না।
ঘরে মরেই বা লাভ কি? তাছাড়া মরলেও তো বাইরে নিয়েই যাবে। চল নিজেরাই হেঁটে চলে যাই।
না। আমি যাব না।
পরের দিন মানে শুক্রবার আমি ডাক্তার দেখাতে গেলাম। পলিক্লিনিকে ফোন করলে বলল
আপনি আসতে পারবেন? নাকি ডাক্তার পাঠাবো।
বাসায় কোন ডাক্তার আনা যাবে না। আমার কুকুর সরানোর উপায় নেই। গুলিয়া জানিয়ে দিল।
আমি চলে গেলাম পলিক্লিনিকে। এখন ছুটির সময়, তাই ছিলেন একজন দায়িত্বরত ডাক্তার।
ফুস্ফুসের অবস্থা ভালো মনে হচ্ছে না। এই ওষুধগুলো খাবেন আর সোমবার নিজের ডাক্তারের কাছে আসবেন পরবর্তী চিকিৎসার জন্য। আন্টিবাইওটিক দেওয়া দরকার, তবে সেটা ভালো হবে কিছু টেস্টের পরে দিলে।
আমার খুব খারাপ লাগছে। দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমি আর বাঁচব না।
ভয় পাও কেন? আমরা সবাই মরব।
আমি যদি মারা যাই তাহলে কুকুরগুলোকে যার তার হাতে দিও না। ওরা যেন ভালো মানুষের হাতে পড়ে। শোন, এসব ঝামেলার চেয়ে আমার বরং মরে যাওয়া ভালো। তোমাকে কিছু করতে হবে না। এ কয়দিন ফেসবুকে মেমোরি থেকে একটা করে ছবি তুলে দেবে আর মরার সাতদিন পরে একটা চিরকুট পোস্ট করবে। আমি লিখে রাখছি।
আসলে লোকজন মরার আগেই মরে গেলে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। আন্তনকে ফোন করে বললাম চলে আসতে। আন্তন এলো। মাকে বোঝাতে চেষ্টা করল হাসপাতালে যাওয়ার জন্য।
তুই যদি সাহায্য করতে চাস থেকে যা, নইলে মস্কো চলে যা। আমাকে উপদেশ দিতে হবে না।
অবস্থা খারাপ দেখে আমি আন্তনকে মস্কো পাঠিয়ে দিলাম।
আমি শ্বাস ফেলতে পারছি না।
আমি ডাক্তার নই। যদি চাও, চল ডাক্তার ডাকি বা নিজেরাই পলিক্লিনিকে চলে যাই। না চাইলে এসব বলে লাভ নেই।
কুকুরছানাগুলো ছোট। কালির বাচ্চা হবে। আমি গেলে ওদের কী হবে?
তুমি মরে গেলে ওদের যা হবে, হাসপাতালে গেলেও তাই হবে। যদি চাও, আমি আন্তনের সাথে কথা বলি। ও ছুটি নিয়ে চলে আসুক। এদের দেখাশুনা করবে। তবে ও এলে তোমাকে হাসপাতাল যেতে হবে। ভেবে জানিও।
সোমবার আবার একাই গেলাম ডাক্তারের কাছে। সাথে সাথে এক্সরে করালেন। আন্টিবাইওটিক দিলেন। পরের দিন কোভিড টেস্ট আর ব্লাড দিতে হবে। আমি ওষুধগুলো ডাবল কিনলাম। সমস্যা হল টেম্টেপারেচার নিয়ে। এখন এখানে পারদের থার্মোমিটার পাওয়া যায় না। ইলেক্ট্রনিক থার্মোমিটার। ওর রিডিং আমার বিশ্বাস হয়না। আরেকটা কিনলাম। সমস্যা তাতে কমল না, বরং বাড়ল। দুই থার্মোমিটার দু ধরণের রিডিং দিল। অনেক খুঁজে নিজেদের পুরনো থার্মোমিটার বের করে দেখি তাপমাত্রা প্রায় ৩৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড, গুলিয়ার ৩৯। এই প্রথম মনে হল কোভিড হলে হতেও পারে। পরের দিন কোভিড টেস্ট আর ব্লাড দিলাম। বাসায় ফিরে ফোন পেলাম।
ডাক্তার আপনার ওখানে গেছে। আপনি বাইরে যাবেন না, বাসায় অপেক্ষা করেন।
ডাক্তার এলেন। অক্সিজেন ৯৬, গুলিয়ার ৯২। বললেন -
ফুস্ফুস আক্রান্ত। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ভালো। আপনি চাইলে আমি আগামীকাল বা পরশু কাগজপত্র রেডি করে আনব।
আমি তো একা যেতে পারব বা। গেলে দুজনকেই যেতে হবে।
আমি ১৯৯৪ থেকে দুবনায়। যদিও আমার ফর্মাল ঠিকানা মস্কোয়, এখানাকার পলিক্লিনিকে আমার কাগজপত্র আছে। ওরা আমাকে পাঠাবে। কিন্তু গুলিয়ার মস্কো আর দুবনা দু জায়গায় রেজিস্ট্রেশন থাকলেও কোন পলিক্লিনিকে নিজেকে জড়িত করেনি। তাই ওরা কোন পেপার দেবার অধিকার রাখে না।
আচ্ছা। আপনার স্ত্রী কি আমাদের পলিক্লিনিকের সাথে জড়িত?
না।
তাহলে তো আমরা ওকে পাঠাতে পারব না। তবে আপনি ইমারজেন্সি কল করলে ওরা নিয়ে যাবে।
কোথায় নেবে?
ক্রাস্নিয়ে গোরকি বা তালদম, যেখানে জায়গা থাকে। আপনারা নিজেরাও চলে যেতে পারেন যদি সেখানে পরিচিত ডাক্তার থাকে। তবে যত দ্রুত পারেন সিদ্ধান্ত নেন।
আন্তন চলে এল দুবনায়। মনিকা আর ক্রিস্টিনা আসার জন্যে রেডি। সেভা আন্তনকে বলল
তুই বাবা মার জন্য যা করার কর। আমি লাদার দেখাশুনা করব।
এ কথায় ছেলেমেয়ারা যেভাবে পাশের দাঁড়ালো, নিজেই অবাক হলাম। এই প্রথম মনে হল যদি আমাদের কিছু হয় ওরা একে অন্যের পাশে দাঁড়াবে। এটা ছিল বিরাট মানসিক সাপোর্ট। বুধবার রাতে গুলিয়ার অবস্থা খারাপ হল। আমার শ্বাসকষ্ট ছিল, তবে এসব যেহেতু আমার সারা বছর, তাই এ নিয়ে মাথা ঘামাইনি। রাতে এ্যাম্বুলেন্স ডাকলাম।
এই মাত্র ওরা ক্রাস্নিয়ে গোরকি চলে গেল। কখন আসবে জানি না। কোভিড বলে কথা।
তাহলে আমরা কী করব?
ডাক্তার কোন ওষুধ দিয়েছে?
হ্যাঁ।
সেগুলোই খান। সকালে যোগাযোগ করবেন।
এর মধ্যে আন্তন ওর বন্ধুর সাথে কথা বলেছে। ও তালদমে রেড জোনে কাজ করে। আমাদের বলেছে দুটোর মধ্যে চলে যেতে। বলেছে, আমাদের এক রুমে রাখবে। সব মিলিয়ে খুব ভালো অফার। তবে এ্যাম্বুলেন্সের জন্যে বসে থাকলে ওরা অন্য কোথাও নিয়ে যেতে পারে। তাই ট্যাক্সিতে যাওয়া ঠিক করলাম। ইতিমধ্যে কালিও সন্তান প্রসব করল। গুলিয়া আন্তনকে সব বুঝিয়ে দিল। আমরা চললাম তালদমের পথে। তালদম দুবনার পাশে ছোট্ট এক শহর। ৫০ কিলমিটার দূরে। জনসংখ্যা ২০ হাজার মত। এটাকে শহর না বলে বড় গ্রাম বলা যায়। দুবনার চারিদিকে জল। এখানে স্তেপ। তাই সূর্যাস্ত একেবারেই অন্য রকম। এই এলাকায় শরতে পাখীরা জড়ো হয় আফ্রিকার যাবে বলে। অনেকে আসে দেখতে। আমার ছেলেমেয়েরাও এসেছে ছোট বেলায়। আমার আসা হয়নি। প্ল্যান করেছি আসব।
গত কয়েকদিনে আমার মনোভাবের পরিবর্তন হয়নি। ভিক্তরকে জানালাম আর জানালাম এদিককে। এদিক আমার গ্রুপের প্রধান। এদিকে ইউরি পেত্রভিচকে বললাম। ইউরি পেত্রভিচ আমার শিক্ষক, আমি বলি শিক্ষা পিতা। এই মুহূর্তে আমার সবচেয়ে ভরসার স্থল। বললাম দুজন কলিগকে। ১১ আর ১৮ তারিখে পরীক্ষা নিতে হবে। ওরা আমাকে টেনশন না করতে বলল। অনেক আগে যখন মাঝে মধ্যে প্রেসার হাই হত আমি ইমারজেন্সিতে কল দিতাম। মনে হত ভোরের আলো দেখতে পাব কি না। আসলে আমার সমস্ত সমস্যা আসে রাতের আঁধারে। মনে হয়, যদি সূর্যকে একবার দেখতে পারি সব ঝামেল কেটে যাবে। তখন নিজেকে কর্ণের মত মনে হয়। অনেক আগে একজন সময় নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন। সময় বিভিন্ন রকম। আছে কসমিক টাইম যাকে অনুসরণ করে মহাবিশ্বের বিবর্তন ঘটে। আছে বাইওলজিক্যাল টাইম। এ কারণে কেউ ভোরে ওঠে, কেউ বা ভোরে ঘুমায়। মানুষ চলে ঘড়ি আর ক্যালেন্ডার ধরে। কিন্তু গাছাপালা সেটা করে না। তাই শীতেও যদি কোন কারণে প্রকৃতি উষ্ণ হয়, বসন্ত এসেছে ভেবে ওরা ডানা মেলে দেয়, গাছে আসে নতুন পাতা। তারপর শীতের ছোবলে মারা যায়। আবার আছে সাইকোলজিক্যাল টাইম। আমরা অনায়াসে এই সময়ের ঘাড়ে চড়ে ফিরে যেতে পারি শৈশবে বা অতীতে। কোন এক সোভিয়েত বন্ধুর সাথে গল্প করতে করতে হাঁটতে পারি আশির দশকের মস্কোর রাস্তায়। যখন থেকে কসমোলজির উপর কাজ করতে শুরু করি বুঝি সময় একান্তই সাব্জেক্টিভ। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি - এসবই মানুষের সৃষ্টি। প্রকৃতি এসব জানে না। অনন্ত কাল ধরে চলে সামনের দিকে। আমিও ভেসে যাই সেই সময়ের সাথে। তবে জন্ম মৃত্যু নিয়ে আমি ততটা শিওর ছিলাম না। ছোটবেলায় বিপদের সময় ঈশ্বরকে ডাকতাম। এই প্রথম কিছুই মনে হল না। জন্ম মৃত্যু সব যেন এক হয়ে গেছে। জানি জীবনের জন্য এ লড়াইয়ে একমাত্র আমিই সৈনিক, লড়াইটা নিজেকেই করতে হবে। তাই এ ব্যাপারে যত কম লোক জানে তত ভালো। কেননা মানুষ তখন পাশে এসে দাঁড়াতে চায়, সাহস জোগাতে চায়। এটা মানুষকে (অন্তত আমাকে) ইমোশনালি ক্ষতিগ্রস্থ করে। তাই কাজ একটাই। ফেসবুকে রেগুলার স্ট্যাটাস দেওয়া যেন কিছুই ঘটেনি। আর ব্যাক্তিগত কন্টাক্ট এড়িয়ে যাওয়া। তবে রতন আর নিলয়কে জানালাম। বলে দিলাম এ নিয়ে যেন কাউকে কিছু না বলে। আর জানালাম স্বপন দাকে। ও ডাক্তার। তাই ওর সাথে কথা বলে নিজের অবস্থা বুঝতে সুবিধা হবে। কল্যাণ দাকে বললাম স্বপন দাকে জানাতে। তবে অতি উৎসাহী কল্যাণ দা আত্মীয় স্বজনদের গ্রামে খবর রাস্ট্র করায় কিছু কড়া কথা শুনাতে বাধ্য হয়েছি। যাহোক, ছেলেমেয়েদের পাশে দাঁড়ানো ছিল একটা ডিসিসিভ মোমেন্ট। বিশেষ করে আন্তনের বন্ধুর সাথে কথা বলে আমাদের হাসপাতালে ভর্তি করানো। ভাবিনি ছেলেমেয়েরা এত বড় হয়ে গেছে, ওদেরও বন্ধুবান্ধব আছে, যারা পাশে দাঁড়াতে পারে। এই একটা কারণেই ডাক্তারের প্রতি বিশ্বাস বেড়ে যায়। সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আরও যেটা হল এই প্রথম মৃত্যু নিয়ে ভয় পেলাম না। আসলে আমরা সবাই তো জন্ম নিয়েছি বিগ ব্যাঙের পর পর। বিভিন্ন মৌলিক কনা অন্তহীন মহাবিশ্বে ঘুরতে ঘুরতে মিথস্ক্রিয়ায় মিলিত হয়েছে। অন্তহীন সময়ে ভ্রাম্যমান আলোক রেখা পেয়েছে শুরু। এখানেই জন্ম। তারপর একসময় এর দ্বিতীয় বাউন্ডারি ফিক্সড হবে। জীবন থেকে জন্ম নেবে মৃত্যু। লক্ষ কোটি মৌলিক কণা ধ্বংস হবে না, শক্তি হয়ে ঘুরে বেড়াবে অন্তহীন এই মহাবিশ্বে। এই প্রথম মনে হল মৃত্যুকে জয় করতে পেরেছি। সে যে কী আনন্দ!
১৪ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার চলে গেলাম তালদম। সেরগেই অপেক্ষা করছিল। মিনিমাম ফর্মালিটি মেইন্টেইন করে নিয়ে গেল সিটি স্ক্যান করাতে। গুলিয়ার ২৫% এফেক্টেড আমার ২০%। শুরু হল চিকিৎসা। ভোর ৬ টায় শুরু হয় স্যালাইন দিয়ে, এরপর ইঞ্জেকশন, ইউরিন, ব্লাড নেয়। এরপর ব্রেকফাস্ট। কিছুক্ষণ পরে আবার স্যালাইন। আড়াইটার দিকে লাঞ্চ। আবার ইঞ্জেকশন, ইনহেলেশন। অক্সিজেন তো বেডের সাথেই। কত যে নার্স। কিছুক্ষণ পর পর ঘর পরিষ্কার করছে। সময় মত খাবার আসছে। এক কথায় হাসপাতাল তো নয়, স্যানেটরিয়াম। এই প্রথম আমরা দুজন একসাথে কোথাও গেলাম। আগে বাচ্চারা থাকত। তাই বলা যায় ২৫ বছর ঘরকন্না করার পর হানিমুন। মাঝে যখন সম্পর্কের অবনতি হয় ভোলগার ধারে বেড়াতে গিয়ে দেখতাম সত্তর বা আশি বছর বয়সের কলিগরা তাঁদের বউদের নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তখন মনে হত ওই বয়সে আমাদের আর এমন করে ঘোরা হবে না। এই প্রথম বুঝলাম নিজেদের জীবনে পরস্পরের গুরুত্ব। আসলে দুজনে একসাথে থাকা একটা পজিটিভ আট্মস্ফেয়ার তৈরি করেছিল। সব যে এত স্মুথ ছিল তা নয়। আমাদের পাশের রুমে ছিলেন এক বৃদ্ধ। শক্ত সামর্থ্য, তবে খুব বদ মেজাজি। রেড জোনে প্রায় ৫০ জন রুগী। নার্সরা চরকির মত ঘুরছে। কিন্তু উনি প্রায়ই ডাকেন, আউ, আউ। একদিন ইনহেলিশনে যাচ্ছি, গুলিয়ার দেখা নেই। পরে এসে বলল ভদ্রলোক ডায়াপার পড়তে পারছিলেন না, তাই হেল্প করছিল। গুলিয়া, ছেলেমেয়েরা অনায়াসে মানুষকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় যা আমাকে আনন্দিত করে। গুলিয়া সাথে করে কিছু ডায়াপার নিয়ে গিয়েছিল।
শোন, ওগুলো দাদুকে দিয়ে দিই।
যদি তোমার দরকার না হয়, দিতেই পারি। তবে গোটা দুই রেখে দাও।
পরের দিন আমি নিজেই গেলাম অনেক এক গাদি ডায়াপার দিতে। ধন্যবাদ দিল। পরে এসেছে টাকা দিতে।
শোন, আমি বেশ ধনী, টাকার সমস্যা নেই। টাকাটা রেখে দাও।
আমি আপনার মত ধনী নই, তবে কয়েকটা ডায়াপার আমার সংসারে আবহাওয়া তৈরি করে না। খুব খুশি হব যদি আপনি এ নিয়ে আর কথা না বলেন।
ধন্যবাদ।
পরেরদিন বেরিয়েছি। উনি ডাকলেন
সিনক (পুত্র), আমাকে ডায়াপার পরতে একটু সাহায্য কর।
পরিয়ে দিলাম। টয়লেটে ফ্ল্যাশ করে পরিষ্কার করলাম। সিস্টারদের ডাকলে ওরাই করত। কিন্তু এখন আমরা সবাই একই নৌকার যাত্রী। কেউ রুগী, কেউ ডাক্তার। তবে সবার লক্ষ্য এক। এই ঝড়ের রাত পাড়ি দেওয়া। আমি কখনই এসব করতে পারি না। বাবা মা যখন মারা যান দেশের বাইরে ছিলাম। কোন সমস্যা হলে আমি সাধারণত ডাক্তার ডাকি। মনে করি প্রত্যেকের উচিৎ নিজের নিজের কাজটা করা। তবে ওকে সাহায্য করে খুব ভালো লাগল। একটা মানসিক ব্যারিয়ার পার হলাম। করোনা কালে এটা নিঃসন্দেহে একটা পজিটিভ শিক্ষা।
পরের দিন দেখি দাদু হৈচৈ করছে। আউ, আউ।
উনি এত বেশি হৈচৈ করেন, তাতে হীতে বিপরীত না হয়। আমি বললাম গুলিয়াকে।
তুমি বরং নার্সদের ডেকে দাও।
আমি দুজন নার্সকে ডেকে আনতে আনতে দেখি আরও একজন চলে এসেছেন। ওদের অকারণে ডাকলাম বলে নিজেরই খারাপ লাগল।
সন্ধ্যায় নার্স এলো স্যালাইন দিতে।
পাশের ঘরের দাদু মারা গেছেন।
কী হয়েছিল।
থ্রম্বাস ছিড়ে গেছে।
আমি রাতে অনেকবার উঠি। ভেবেছিলাম এই ঘটনা আমাকে ভীত করবে। কিছুই হল না। আবার যেন জীবন আর মৃত্যু একাকার হয়ে গেল, মনে পড়ল ২০১৪ সালের কথা। আমরা ক্রাস্নাদার থেকে মস্কো ফিরব। বাসের অপেক্ষায়। বেশ গরম। হঠাৎ এক ভদ্রলোক অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডাক্তার আসে। তাঁকে বাঁচানোর জন্য চলে যুদ্ধ। উনি হেরে যান। আমার হাতে ক্যামেরা। জীবনে এই প্রথম কাউকে চোখের সামনে মরতে দেখছি। ছবি তুলতে পারলাম না। এই দাদুও মারা গেলেন চোখের সামনে। পরের দিনগুলো ছিল শান্ত। কেউ আর দরজায় দাঁড়িয়ে আউ, আউ করত না। সবাইকে ব্যতিব্যাস্ত করে তুলত না। জীবন আর মৃত্যু একাকার হয়ে গেছে এখানে।
আমাদের রিকভারি ভালই চলছে। গুলিয়ায় একটু সমস্যা। আমার রগগুলো হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। তাই শিরা পেতে ওদের সমস্যা হয় না। চর্বির আদরে গুলিয়া রগ খুঁজে পাওয়া যায় না। স্যালাইন দেওয়া, ব্লাড নেওয়া - সে এক কঠিন ব্যাপার। ওকে ক্যাথেটার লাগিয়ে দিল।
তুমিও বল ওদের ক্যাথেটার লাগাতে।
মাথা খারাপ। দেখ, এখানে আসলে মেডিসিন কম। ডাক্তাররা ডায়াগনোসিস করে কেমিস্ট বা ফারমাকলজিস্টদের বলে কী অনুপাতে বিভিন্ন উপাদান মেশাবে। সেটাই মেডিসিন। কিন্ত ওটা করতে গিয়ে যে ডিভাইস ব্যবহার করা হয় সেটা ফিজিক্স। এই যে আমাদের স্যালাইন দিচ্ছে, সেটা শিরায় দিচ্ছে। শিরা বেয়ে সেটা যাচ্ছে হার্টে। হার্ট রক্ত পরিস্কার করে ধমনীর মধ্য দিয়ে পাঠাচ্ছে শরীর বিভিন্ন অঞ্চলে। এসব কিন্তু হচ্ছে ফিজিক্সের নিয়ম মেনে। তাই আমি ক্যাথেটার নিয়ে বসে থাকতে চাই না, প্রতিদিন তিন চারটে ছিদ্র করে করুক, সাত দশ দিনে আমি পিতামহ ভীষ্মের মত শরশয্যা গ্রহণ করব না।
তবে নাভিতে ইঞ্জেকশন ছিল অসহ্য। নাভিতে ইঞ্জেকশন নিতে হবে বলে আমি শেয়াল কুকুর এড়িয়ে চলি। ওরা কামড় দিলে নাভির নাকি বারোটা বেজে যায়।
বাসায় খেতে অসুবিধা হত। ওখানে সকালে পরিজ, দুপুর স্যুপ, মাছ বা মাংস, কম্পোত, রাতে আমার পরিজ বা ওই জাতীয় কিছু। সেদ্ধ। লবন নেই, মরিচ নেই, মশলা নেই। কিন্তু সব সময় চেটে পুটে খাই। জীবনে এই প্রথম উখা মানে মাছের স্যুপ খেলাম, খেলাম সেদ্ধ মাছ। এ যেন নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ। এক হাতি বসে আছে পেটের ভেতর। বাইরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। বরফ আর বরফ। বন্ধুরা ছবি দেয়। আমি অসহায়ের মত তাকিয়ে থাকি জানালার দিকে। বার বার দুটো গাছের ছবি তুলি। এটা আমার করোনা নেগেটিভ।
সারাদিন শুয়ে বসে কাটে। আমি বরাবরই গান শুনতে পছন্দ করি। রবীন্দ্র সঙ্গীত, ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যাল। এবার শ্রীজাতের লিজেন্ডে রাহুলদেব বর্মণ, গুলজার এদের সুর আর কথার গান শুনে সময় কাটল। হিন্দি গানের প্রতি এত আগ্রহ আমার আগে কখনও হয়নি। এটাও করোনা পজিটিভ। সাথে ছিল বই। তবে বই নিয়ে আলাদা কথা, অন্য লেখায়।
আমাদের রেস্পন্স ভালো ছিল। ২০ তারিখে আবার সিটি স্ক্যান, ২১ তারিখে আরও কিছু টেস্ট। গুলিয়ার দ্যামেজ এখন ১০ - ১৫%, আমার ৫ - ১০%। কিছু পুরান উপস্বরগ ফিরে এসেছে। ডাক্তার বললেন এটা হাই পাওয়ার ওষুধের ফল। ধীরে ধীরে চলে যাবে। একদিন ভুল করে আন্টিব্যাক্টরিসইডাল ল্যাম্প জ্বালিয়ে পড়লাম ঘণ্টা দুই। পরের দিন টের পেলাম ভুলটা কথায়। ডাক্তার বললেন, তোমরা যে পুড়ে যাও নি সেটাই অবাক কাণ্ড। গতকাল মানে ২২ তারিখে বাড়ি ফিরলাম।
গত কয়েক বছরে রাশিয়ার রাস্তাঘাটের অনেক উন্নতি ঘটেছে। কোভিড এদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে সাহায্য করেছে। এর আগে কারডিও-ভাস্কুলার সেন্টারে ছিলাম, এক সপ্তাহ তালদমে। প্রায় তিরিশ বছর এই হাসপাতাল জীবন মরণের সীমানায় দাঁড়িয়ে ছিল। করোনা এখানে নতুন জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে। করোনা যাবে, হাসপাতাল থেকে যাবে। এটাও আমার দেখা এক করোনা পজিটিভ। এক মাসে তিন তিনটে হাসপাতালে ছিলাম। এখানেও পরিবর্তন চোখে পড়ার মত।
কাকতালীয় ভাবে সত্য এ সময়ে যারা আমার সাথে কথা বলতে চেয়েছেন তাঁদের অধিকাংশই চট্টগ্রামের। কথা বলিনি, কেন না কথা বলাটা সত্যিই কষ্টকর। সবাইকে না করেছি। এই লেখা পড়ার পরে তারা সেটা বুঝবেন বলেই আশা করি। বাসায় এসে সব কিছু নতুন মনে হচ্ছে। পড়তে, লিখতে অসুবিধা হচ্ছে না, তবে একটু হাঁটাচলা করলে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আন্তনকে নিয়ে একটু হাঁটতে গেলাম। ভালো লাগছিল। সাথে কেউ থাকলে সাহস বাড়ে। ছেলেমেয়ারা খুশি। ক্রিস্টিনা জানাল হকিং এর সময়ের ইতিহাস পড়তে শুরু করেছে। অনেক কিছুই নাকি বোঝে না। ওকে সাহায্য করতে হবে। এটাও সামনে চলতে সাহায্য করে। সেভা ফোন করে জানাল ক্লাসে যাবে না, কেন না নাভালনি মিটিং ডেকেছে। এক সময় ও এসব নিজের থেকে করত। এখন নিজেই বলল আসলে এরা কেউ দেশের ভালো চায় না, একজনকে সরিয়ে নিজে আসতে চায়, আরও বেশি বড়লোক হতে চায়। আমি নিজে ছাত্র রাজনীতি করতাম, তবে নিজের মত আর অমত সব সময় প্রকাশ করতাম। সেভা সে পথে যাচ্ছে। মনিকা মস্কোর পাশেই চার দিন রেস্ট হাউজে ছিল বন্ধুর সাথে। খুব খুশি হয়েছি। ওরা প্রায়ই ফোন করে। কথা বলতে চায়। আমি নিজে থেকেই বলি এখন বেশি কথা না বলতে, অথচ এক সময় ওদের কথা শোনার জন্য হাপিত্যেশ করে বসে থাকতাম। এক কথায় করোনা না হলে জীবনের একটা দিক না দেখাই থাকত, অনেক অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হতাম। জীবন কী? অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতা।
অনেকেই ভাবছেন আমি কি লিখে রেখেছিলাম গুলিয়ার কাছে। একেবারে মামুলি কিছু কথা। তবে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বন্ধুরা আমি মারা গেছি। তাই আমাকে অযথা ইনবক্সে শুভ সকাল, শুভ সন্ধ্যা জানিয়ে বিরক্ত করবেন না। কোন লিংক দেবার দরকার নেই। কোন রিপ, স্বর্গ কামনা কিছুই দরকার নেই। আমার জন্য ঈশ্বরের কান ঝালাপালা করার দরকার নেই। মহাবিশ্ব বিশাল। দর্শনীয় বস্তু প্রচুর। আপনারা দেখেন, আমাকেও সেটা দেখার সুযোগ দিন। আমি আপনাদের ইচ্ছাকে সম্মান করেছি, আপনারাও সেটা করবেন বলেই আশা করি। যে সময়টা যান্ত্রিক ভাবে অন্যদের শুভেচ্ছা জানান, সেটা বই পড়ে পূর্ণ করুন। দেখবেন এতে আপনি যেমন তেমনি আপনার বন্ধুরাও উপকৃত হচ্ছে। অন্যের বার্তা নয়, নিজে বার্তা লিখুন, নিজের কথা জানান। আমি কিন্তু অন্যের বার্তা পড়ার জন্য আপনার সাথে বন্ধুত্ব করিনি, করেছি আপনার নিজের কথা, নিজের জীবন বোধ শোনার জন্য। মরণের মধ্য দিয়ে জীবন শেষ হয়ে যায় না, এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় জীবনের নতুন পর্যায়। লিখুন, পড়ুন, খুঁজুন। অনন্ত জীবনকে ভালবাসুন। আর হ্যাঁ, এমনকি আপনার যদি কোন আদর্শ থাকেও, শুধুমাত্র সেই আলোকে কিছু না দেখে অন্য জায়গা থেকেও ঘটনা বিচার করুন। আপনার দৃষ্টি যত প্রশস্ত হবে, বিচার হবে তত নিরপেক্ষ। দিনের শেষে শুধু নির্মোহ বিশ্লেষণই কাল উত্তীর্ণ করে।
দুবনা, ২৩ জানুয়ারি ২০২১


Comments
Post a Comment