একাত্তর – ছেঁড়া অ্যালবামে এক ঝাপসা ছবি

 


বাড়ির পুব দিকে বাঁশ ঝাড়ের ওপারে একটা গাব আর একটা তেঁতুল গাছ মৃদু বাতাসে এক সাথে দোলে পূর্ণিমা রাতে নাকি সেখানে বসে ভূতদের আসর কখনো বা কলাবতী বৌকে দেখা যায় বাঁশ ঝাড়ের ওপাশ থেকে উঁকি দিতে আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের দিনগুলো কাটে বেশ সুখে এক দিকে জমজমা সুতার ব্যবসা, অন্যদিকে গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভর্তি গরু লোকজনে ভর্তি বাবা কাকা জ্যাঠার এই বিরাট সংসারে আমরা বারো ভাই আর পাঁচ বোন আমরাই সংখ্যায় বেশি সাত ভাই আর এক বোন – যাকে বলে সাত ভাই চম্পা

অন্যান্য অনেক অবস্থাপন্ন পরিবারের মতই আমাদের বাড়ি
অনেকেই বাস করত কোলকাতায় আমার বাবা আর বড় জ্যাঠা কোলকাতাপড়াশুনা করতেন আত্মীয় স্বজনদের অনেকেই ভারত নামের এক বিরাট দেশে বিশেষ করে বৃহত্তর বাংলার এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন তারপর একদিন বিদেশী সাহেব আর দেশীয় জনাব আর বাবুরা ঠিক করলেন অনেক হয়েছে, এবার বড় হবার পালা, আলাদা করে নিজ নিজ সংসার গড়ার পালা দেশ ভাগ হল সাহেবরা শ্বেতপাথরের টেবিলে দামী মানচিত্র ফেলে আরও দামী কলম দিয়ে দাগ কাটলেন শিক্ষানবিশ দর্জি যেমন অদক্ষ হাতে কাপড় কাটে ঠিক তেমনি তারাও ভারত উপমহাদেশ কেটে ছিঁড়ে তৈরি করলেন নতুন দুটো দেশ – একটার নাম হল ভারত, অন্যটার পাকিস্তান তাদের আঁকা সেই সীমান্ত যতটা না দেশের গায়ে আঁচড় কাটল, তার চেয়ে বেশি আঁচড় কাটল মানুষের মনে কেউ হল ভারত, কেউ হল পাকিস্তান প্রতিটি গ্রামে গঞ্জে বিশেষ করে যেসব স্থানে শতাব্দীর পর শতাব্দী হিন্দু মুসলমান ঝগড়া বিবাদের মাঝেও সুখে শান্তিতে দিন কাটাত এই সীমান্ত তাদের মনকে আকাশ ছোঁয়া পাঁচিল দিয়ে ঘিরে ফেলল গতকালের প্রতিবেশী বন্ধু হল চিরশত্রু এভাবেই ভারতবাসী নামে এক বিশাল জনগোষ্ঠী ভাগ হয়ে গেল তাদের কেউ রইল ভৌগলিক পাকিস্তানে, কেউ বা ভৌগলিক ভারতে আমাদের পরিবারও ব্যতিক্রম ছিল না রাজনীতির পাশার চালে আমাদের আত্মীয় স্বজনদেরও কেউ ভারতীয় রয়ে গেল, কেউ বা হল পাকিস্তানি ফলে কিছুদিন আগে পর্যন্ত অনেকে শুধু নামই জানা ছিল, তাদের উপস্থিতি ছিল না আমার জীবনে যখন ১৯৬৯ সালে মার সাথে প্রথম বার ইন্ডিয়া যাই অনেক গল্প তখন বাস্তব হয়ে ওঠে সুবোধ দা, ভাগবত দা, দীপক দা, স্বপন দা, সন্ধ্যা দি, আরতি দি – এরা সবাই গল্পের বইয়ের পাতা থেকে নেমে আসে আমার পাশে কোলকাতা যাই আমি, রতন আর মা ছোট কাকা বেনাপোল বর্ডার পর্যন্ত আমাদের পৌঁছে দিয়ে আসেন ওখানে বসে থাকা পাঞ্জাবী অফিসার মার সমস্ত গয়নাগাটি খুলে রাখতে বলে গলার হার তো বটেই, কানের দুল, নাকের ফুল – কোন কিছুই বাদ যায় নি অনেক অনুরোধ করেও কিছুই নেওয়া গেল না এর আগে কখনো মাকে গয়না বিহীন দেখিনি আমাদের বাড়ি এলাকায় বেশ নামকরা দারোগা পুলিশ এলাকায় এলে আমাদের বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করত বাবা কাকাকে তারা সবাই সম্মান করত এই প্রথম দেখলাম এক পুলিশের সামনে ছোট কাকাকে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বয়সের সাথে সাথে মানুষের চলাফেরার গণ্ডি বাড়ে, বাড়ে অভিজ্ঞতা – মিষ্টি তেতো সব রকমের অভিজ্ঞতা  

এরপর এলো উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থান সত্তরে প্রথম বারের মত স্কুলে যাওয়া সুধীর দার বিয়ে বিয়ের কিছুদিন পরে ডাকাত পড়ল বাড়িতে আমি ছিলাম বাড়ির সবার ছোট, সবার আদরের আজ এত বছর পরে আমি আগের মত ছোট নেই ঠিকই তবে আদর কমেনি একটুও এখনো সেই ছোট বেলার মতই ভাই বোন সবার ভালোবাসা অনুভব করি

আমাদের এই বিশাল সংসারের ভেতর বাড়ির দায়িত্ব ছিল মা, খুড়িমা আর মেজমার হাতে তাঁরা পালি করে হেঁসেলের কাজ দেখতেন তিন মাস করে একেক জন ছিলেন হেড কুক কাজের লোকেরা তাঁদের সাহায্য করত মা সাধারণত তাঁর পালি শেষে তিন মাসের জন্য ইন্ডিয়া চলে যেতেন মামা আর মাসীমাদের ওখানে মেজমা ছিলেন গ্রামের মেয়ে, তাই কোথাও যাওয়ার তেমন দরকার ছিল না কখনো সখনো ভাগবত দা আর দীপু দাকে দেখতে কোলকাতা যেতেন খুড়িমা দৌলতপুরের দাদু, দিদিমা, চণ্ডী মামা, লক্ষ্মী মাসী বছরের বেশির ভাগ সময় আমাদের এখানেই কাটাতেন তবে তিনিও সন্ধ্যা দি আর আরতি দির সাথে দেখা করতে ইন্ডিয়া যেতেন সেদিক থেকে মার সব ভাই বোনই ইন্ডিয়ায় থাকতেন তাই মা দিন গুনতেন কবে তাঁদের কাছে যাবেন আমরা নিজেরা, আত্মীয় স্বজন, জনা তিরিশ কাজের লোক ছাড়াও বাড়িতে থাকতো অনেক ছাত্র যারা মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজে পড়াশুনা করত এছাড়া সকাল সন্ধ্যার চায়ের আসরে বাবা কাকা এমন কি দাদাদের বন্ধুরাও যোগ দিত রাজনীতি থেকে শুরু করে কত ধরণের আলোচনাই না হত সেসব আড্ডায় তাই বাড়ি সব সময়ই ছিল লোকে লোকারণ্য

মনে পড়ে সত্তরের নির্বাচনের কথা সমস্ত দেশ মেতে উঠেছে নির্বাচনে আমাদের বাড়িতে তখন কেউ সক্রিয় রাজনীতি না করলেও নৌকার সমর্থক ছিল জ্যাঠামশাই লেগে গেলেন নৌকার প্রচারে তাঁর বন্ধু জলিল চাচা নামলেন ভাসানী ন্যাপের কুঁড়ে ঘর মার্কা নিয়ে সেই যে তাঁদের কথা বন্ধ হল, ১৯৮৭ সালে জ্যাঠামশাই মারা যাওয়া পর্যন্ত তাঁদের মধ্যে আর কোনদিন বাক্যালাপ হয়নি বাড়ির বড়রা তো বটেই আমি নিজেও বাড়িতে বাড়িতে নৌকার পোস্টার লাগিয়েছি বিপুল ভোটে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ জয়লাভ করলে সে কী উত্তেজনা সবার তবে এসব কিছুর মধ্যেও জীবন আগের মতই চলতে থাকল আগের মতই বাবা সোমবার আর বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জ যেতেন সুতা আর রঙ আনতে আর পরের দিন ট্রাক ভর্তি মালপত্র নিয়ে বাড়ি ফিরতেন মদন মামার তত্ত্বাবধানে পচা কাকা, হইরা দা, বদু ভাই, শুটু ভাই, নালু ভাই, পাগলা দা, আরশেদ ভাই, ফালান দা সবাই সুতা রঙ করত রঙ খোলায় বর্ষায় নৌকা আর শুকনো মৌসুমে ঘোড়ার পিঠে রঙ্গিন সুতা যায় ঘিওর, ঝিটকা আর জাবরা হাটে বাবা যান সাইকেলে অনেক দূর থেকেই শোনা যায় বাবার কোমরের চাবির গুচ্ছের শব্দ আমরা অপেক্ষায় থাকি বিভিন্ন রকম গাছ পাকা ফলের আর নারায়ণগঞ্জ থেকে এলে আমাদের জন্য আসে আপেল, আঙ্গুর, কমলালেবু, নাশপাতি আর মনাক্কা মনাক্কা – এটা আরবের খেজুর, কেন যে জ্যাঠা এটাকে মনাক্কা বলতেন আজও রহস্য  

রঙ খোলা – এটা আমাদের পুরনো বাড়ি শুনেছি আগে বাড়ির পাশ দিয়েই কালীগঙ্গা বইত এক সময় নদীর ভাঙ্গন শুরু হলে বাড়িটা একশ’ মিটার মত ভেতরে মানে দক্ষিণ দিকে সরান হয় সব কাজ হয়েছিল তড়িঘড়ি করে, তাই ঘরগুলো তোলা হয়েছিল কোন প্ল্যান না করে ফলে অনেক পরে, ১৯৭৭ সালে সবাই ভিন্ন হয়ে গেলে দেখা গেল বাড়িটা ঠিক ভাগ করা যাচ্ছে না সেই পুরনো বাড়িতে এখন ছিল রঙের কারখানা নদী চলে গেছে শ’ দুই মিটার উত্তরে সেই সময়ের সাক্ষী হয়ে আছে দুটো আম গাছ বড়রা গল্প করত আগে বর্ষায় নারায়ণগঞ্জ থেকে সুতা আর রঙ আসতো লঞ্চে, আর সেই লঞ্চ বাঁধা হত এই দুই আম গাছের সাথে ওখানেই ছিল ক্লাব ঘর বিকেলে সেখানে বড়রা ক্যারাম খেলত, কখনো ভলিবল বা ব্যাডমিন্টন পরে আমরা সেখানে দাড়িয়াবান্ধা খেলতাম

একাত্তর উত্তেজনা বাড়ছে বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সে ৭ই মার্চ বস্তুত স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম জয় বাংলা!” এই শ্লোগান এখন মানুষের মুখে মুখে ফিরছে আমরা ছোটরাও কী খেলার মাঠে, কী রাস্তাঘাটে এই মন্ত্র আওড়ে চলছি তিনি আরও বলেছেন যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে শত্রু কে সেটা এতদিনে মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে ঢাকা আরিচা রোডের পাশেই আমাদের বাড়ি তখনও কালীগঙ্গা সড়ক সেতু বা তরা ব্রীজ  হয়নি ভ্যানেল কোম্পানি সবে কাজ শুরু করেছে উত্তর বঙ্গ আর দক্ষিণ বঙ্গ গামী গাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সেই তরা ঘাটে ফলে ঢাকার যেকোনো খবরই তড়িৎ বেগে চলে আসে এখানকার চায়ের দোকানে বাতাসে বারুদের গন্ধ, আকাশে শুকুনের আনাগোনা কিন্তু জীবন থেমে থাকে না সে বাঁচতে চায় আগামী দিনের স্বপ্ন দেখে মানুষ সব কিছুর মধ্যেও দৈনন্দিন কাজকর্ম করে যায় আমাদের বাড়ির উঁচু আম গাছের মাথায় বাঁশ ঝাড় থেকে সবচেয়ে বড় বাঁশটা কেটে বেঁধে দেওয়া হয় আর তাতে পতপত করে উড়তে থাকে কালো পতাকা। এটা ছিল ইয়াহিয়া শাহীর বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ। যেন ঘন কালো রাত একদিন ফুরোবেই, আকাশের কালো রং ভেদ করে একদিন স্বাধীনতার সূর্য উঠবেই উঠবে।                                               

বৃহস্পতিবার মা সকালে উঠেই বাবার জন্য রান্না করেছেন বাবা নিরামিষাশী কোলকাতায় পড়ার সময় মাছ মাংস ত্যাগ করেন তাই বাড়ি থেকেই খেয়ে যান নারায়ণগঞ্জ অবশ্য যাদের কাছ থেকে সুতা কেনেন তারা বাবার গুরু ভাই, ফরিদপুর জগদ্বন্ধু সুন্দর আশ্রমের মহানামব্রত ব্রহ্মচারীর শিষ্য সবাই চাইলে শ্রীনিবাস জ্যাঠাদের ওখানেও খেতে পারেন রাতের বেলায় বরাবরের মতই কাকা আর জ্যাঠা বিদায় দেয় বাবাকে সব শেষে মাকে বলেন “আসি” আমাদের বাড়িতে কেউ কোথাও গেলে যাই বলত না, বলত আসি আমরা নিজেরা কেউ যাই বললে মা বলতেন “যাই বলতে নেই, বল আসি“ আমার স্কুল না থাকলে আমি বাবাকে কখনো রঙ খোলা, কখনো বা তরা ঘাট পর্যন্ত এগিয়ে দিতাম রাস্তায় যেতে যেতে বলতাম কি আনতে হবে বাবা পছন্দ করতেন না আমরা গ্রামের বাজারের চকলেট বিস্কু খাই, তাই ঢাকা থেকেই চানাচুর, বিস্কুট, চকলেট, টফি এসব নিয়ে আসতেন তবে বাবা হাট থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরলে আমরা পা টিপে দিতাম আর টাকা গুনে দিতাম আমি ছোট ছিলাম বলে আমার পড়ত এক টাকার নোট গণার দায়িত্ব সে থেকে আমাদের রেগুলার ইনকাম হত ওটা দিয়ে আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে বিভিন্ন হাবিজাবি কিনে খেতাম

শুক্রবার সকালে বাবার ট্রাক ভর্তি সুতা আর রঙ নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা কিন্তু রাতেই খবর এলো ঢাকায় পাক বাহিনী হামলা করেছে সকালে দেখি বানের জলের মত মানুষ আসছে ঢাকা থেকে ২৬ মার্চ চৈত্র মাস শুকনো মৌসুম তবে আমার কেন যেন মনে হয় ওই সময়টা তরা ঘাট আর রঙ খোলার মাঝে বেশ খানিকটা জল ছিল ওই জল পেরিয়েই লোকজন আসছিল রঙ খোলার দিকে দেখেই বোঝা যায় এরা গ্রামের লোক নয় তাদের পোশাক পরিচ্ছদে শহুরে ভাব ছিল প্রকট গ্রামের কলেজে পড়ুয়া ছেলেরা এরই মধ্যে এসব মানুষের খাবারের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল ডাল তুলতে শুরু করেছিল আমরাও বাড়ি থেকে দেওয়া দুধ এবং পরিষ্কার জল নিয়ে দিচ্ছিলাম ক্ষণিকের অতিথিদের কিন্তু কারো খাওয়ার মত মানসিক অবস্থা ছিল না যেন তাদের কেউ তাড়া করছে পেছন থেকে তারা যত দ্রুত সম্ভব চলে যেতে চায় দূরে বহু দূরে, যেখানে কামানের গোলাগুলি নেই, যেখানে পিঠের উপর পড়ছে না পাক হানাদারদের বিষাক্ত নিঃশ্বাস  সেই সর্বগ্রাসী ভয় আমাদের তখনও পেয়ে বসেনি আমরা তখনও ঢাকা থেকে অনেক দূরে ঠিক ভয় ছিল না ছিল আশা এই বুঝি এই আদি অন্তহীন মানুষের ভিড়ে বাবাকে দেখতে পাব দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা হল, কিন্তু বাবার দেখা মিলল না বাড়িতে একটা চাপা উত্তেজনা, একটা চাপা অস্বস্তি না, মা কাঁদছিলেন না তবে কাকা বা জ্যাঠামশাই কেউ যে মাকে সান্ত্বনা দেবেন তাঁদের সে সাহসটা ছিল না কীই বা বলবেন এখন শুধু একটাই কাজ – অপেক্ষা তখন আমি ছোট ছিলাম, বয়স ছিল মাত্র সাত অনেক কিছুই ঠিক বুঝতাম না পরে অনেক বন্ধুর দেখা পেয়েছি যাদের বাবারা কোন দিন ফিরে আসেনি তাদের প্রতীক্ষার শেষ হয়নি কোন দিনও      

এর মধ্যে খবর আসে বঙ্গবন্ধুকে ওরা গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে গেছে ৭ মার্চের ভাষণের পর আবেগী মানুষ যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলায় প্রস্তুত ছিল এখন বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে সে বুঝতে পারে সেটা কতখানি দুঃসাধ্য ব্যাপার গ্রামের মানুষের মধ্যেও এক ধরণের আতঙ্কের সৃষ্টি হয় সবাই কী এক অশুভ ক্ষণের জন্য অপেক্ষায় থাকে ইতিমধ্যে ঢাকা আরিচা রোড বেকার হয়ে পড়েছে পাক বাহিনী যাতে নদী পার হয়ে আরিচার দিকে যেতে না পারে সেজন্য সমস্ত ফেরিগুলো আমাদের দিকে এনে ভেড়ানো হয়েছে এরমধ্যে এটাও প্রচার হয়ে গেছে যে পাক বাহিনীর লক্ষ্য মূলত হিন্দুরা আমাদের গ্রামে তখন হিন্দু মুসলমানের অনুপাত ছিল ৫০/৫০ গ্রামের কিছু লোক এরই মধ্যে পাক সেনাদের সাথে যোগসাজশ করেছে শুনে হিন্দু পাড়ায় আতঙ্ক শুরু হয়েছে, একটু একটু করে হলেও তাদের গ্রাম ত্যাগের হিড়িক লেগেছে পালাচ্ছে মূলত মধ্যবিত্তরা যাদের ছোট সংসার আর দূরে কোথাও গিয়ে প্রাথমিক ভাবে চলার মত টাকাপয়সাও আছে গরীবের কোন জাত নেই, আর জাত থাকলেও পালানোর উপায় নেই খেতে না পাওয়া মানুষের মৃত্যুর রঙ – সে বাড়িতেই হোক আর বাড়ি থেকে দূরেই হোক – সব জায়গায় একই রকম মানুষ পালাচ্ছিল আসলে আশেপাশের গ্রামগুলোতে তখন আজকের মত এত রাস্তাঘাট ছিল না তাই বাড়ি থেকে কয়েক মাইল দূরে কোন অজ পাড়াগাঁয়ে গেলেই মানুষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচত, ভাবত বিপদ তাকে পাশ কাটিয়ে যাবে মনে হয় দেশ ভাগের পর এই অঞ্চলে মানুষের এতো বড় বাস্তুভিটে ত্যাগের ঘটনা আর ঘটেনি আচ্ছা তখন যদি দেশের গ্রামে গঞ্জে উন্নত রাস্তাঘাট থাকতো, মানুষ কি এতো সহজে পালাতে পারত? অবশ্য পাকিস্তানী শাসকেরা দেশের উন্নয়নে কাজ করলে যুদ্ধের দরকার হত কিনা সেটাও প্রশ্ন সাপেক্ষ    

দিন যায়, রাত আসে, কিন্তু বাবা আসেন না
বাড়িতে শোকের ছায়া মুখ ফুটে কেউ কিছু বলছে না, তবে মনে মনে সবাই আশঙ্কা করছে হাজার হাজার মানুষের মত বাবাও হয়তো হারিয়ে গেছেন পাক হানাদারদের তৈরি এই বর্বরতার ইতিহাসের অন্ধকারে সবাই যখন ধীরে ধীরে আশা ছেড়ে দিচ্ছে, তখন প্রায় আট দিন পরে এক সকালে বাবার ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শোনা গেল খুব সম্ভব শ্যামল দাকে ডেকেই লুটিয়ে পড়লেন বাড়ির আঙিনায় দীর্ঘ সময়ের অনাহারে আর পথের ক্লান্তিতে শেষ শক্তিটুকু নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে বাড়ি ফেরার অদম্য ইচ্ছেই হয়তো তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে চারিদিক থেকে সবাই ছুটে এলো বাঁধ ভাঙ্গলে যেমন হয় ঠিক তেমনি করে মা আর আমাদের চাপা কান্না বেরিয়ে এলো মা, দিদি পাশে বসে বাতাস করতে লাগলেন, আমি আর রতন বাবার পা টেপার কাজে লেগে গেলাম হাট থেকে ফেরার পর আমরা দু ভাই সব সময়ই বাবার পা টিপে দিতাম, তবে এই প্রথম দেখলাম বাবার পা ফুলে যেন কলাগাছ হয়ে গেছে কখনও কখনও বাবা যন্ত্রণায় কাতরে উঠছেন

বছরের এই সময়টা আমাদের বাড়ির সবচেয়ে ব্যস্ত সময় চৈত্রের শেষ সামনেই নতুন বছরের শুরু হালখাতা সব শুরু করতে হবে নতুন করে খদ্দেররা পুরনো ঋণ শোধ করবে নতুন করে তাদের নাম লেখা হবে নতুন খাতায় এ যেন এক ক্লাস থেকে অন্য ক্লাসে ওঠা কে জানে কি কারণে, তবে এবার হালখাতার জন্য আনা মালপত্র অনেক আগেই বিক্রি হয়ে গেল লোকজন আসন্ন যুদ্ধের কথা ভেবে আগে থেকেই কেনাকাটি শুরু করেছিল যতদূর জানি, সেই বেচাকেনার অনেক টাকাই আর কোন দিন ফেরত আসেনি

প্রায় প্রতিদিন সকালেই সামসু চাচা আর নোয়াই চাচা এসে আমাদের গ্রামের খবর, বিশেষ করে মুসলমান পাড়ার হাবভাব জানিয়ে যেতেন এর আগে মার্চের ২৭ বা ২৮ তারিখে আমরা বাড়ি থেকে পালিয়ে পাশের গ্রামে গেলেও বিকেলে ফিরে আসি সেদিন সেই হলুদবরণ সর্ষে ক্ষেতের উপর দিয়ে দৌড়ের দৃশ্য আজও চোখে পড়ে ছেলে বুড়ো, মহিলা পুরুষ সবাই দৌড়ুচ্ছে একের পর এক সর্ষে ক্ষেত পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে অজানার দিকে কেউ জানে না কোথায় যাবে শুধু একটাই লক্ষ্য – নিজেদের বাড়িঘর ফেলে যতদূর সম্ভব দূরে চলে যাওয়া আমি অবাক হয়ে দেখলাম দৌড়ুচ্ছে শুধু হিন্দু পাড়ার লোকেরা যেন যুদ্ধটা শুধু আমাদের পাড়াতেই এসেছে, পাক সেনাদের এই যুদ্ধ যেন শুধু একটা বিশেষ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেই    

বাবা যখন ফিরে আসলেন, গ্রাম অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গিয়েছে এতদিন পর্যন্ত আমরা একান্নবর্তী পরিবার বলে গর্ব করতাম এই প্রথম বুঝলাম বড় সংসারের কত ঝামেলা চাইলেই সবাই কোথাও এক জায়গায় গিয়ে থাকা যায় না তাই শুরু হল চিন্তাভাবনা যদি বাড়ি ছাড়তেই হয় কে কোথায় যাবে এর মধ্যে বড়দা কলতা যাবে বলে ঠিক করলেন যাওয়াটা নিশ্চিত এখন শুধু অপেক্ষা খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হল না এপ্রিলের ৭-৮ তারিখের দিকে একদিন গ্রামের আকাশে হেলিকপ্টার উড়তে দেখা গেল শোনা গেল ওরা প্যারাস্যুট দিয়ে সৈন্য নামাবে সামসু চাচারা এসে বললেন বাড়ি ত্যাগ করতে অভয় দিলেন যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন বাড়ি রক্ষা করতে শুরু হল আমদের বনবাস জীবন আমাদের যাত্রা শুরু হল পশ্চিমে কেউ সাইকেলে, কেউ পায়ে হেঁটে আর বাড়ির মেয়েরা আর ছোট বিধায় আমি নৌকায় ঘিওরের আগে মাইল্যাগী নামে এক গ্রাম হল আমাদের প্রথম আস্তানা দিদিকে দেখে এক পাইকার চিনতে পারে আর আমাদের থাকার ব্যবস্থা করতে উদ্যোগ নেয় বাবাকে তাঁর পাইকাররা সবাই খুব সম্মান করত,  আমাদের ধর্মের কথাটা মাথায় রেখে তারা চেষ্টা করত কোন হিন্দু বাড়িতে রাখার ব্যবস্থা করতে এখন স্বাধীন দেশেও এ ধরণের মনোভাব কল্পনা করা যায় না

যাহোক আমরা গিয়ে উঠলাম সুধা মাসীর বাড়িতে ছোট্ট বাড়ি তবুও এই বিপদে মাথা গোঁজার ঠাই সেখানে আমরা বেশি দিন ছিলাম না এর মধ্যে বাবা আর রতন তরা গেলে আমি বায়না ধরলাম আমার মার্বেলগুলো নিয়ে আসতে তরা থেকে ক্রমশই দুঃসংবাদ আসতে শুরু করল সস্ত্রীক বলাই গোস্বামীকে কুয়ায় ফেলে মারা হয়েছে জগা আর নিতাই কাকাও খুন হয়েছে মেরে ফেলেছে পরেশ কাকাকে বড়দের কথাবার্তায় বুঝলাম খুব তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা হবে না এর মধ্যে স্থানীয় চেয়ারম্যানের ভাস্তে ভয় দেখাতে শুরু করল আবার শুরু হল আস্তনার সন্ধান বাবার আরেক পাইকার কুদ্দুস ভাই প্রস্তাব দিল তার গ্রাম বাঙ্গালায় যেতে ওখানে শশী জ্যাঠামশাই-এর সাথে কথা হয়ছে তবে এবার আমরা গেলাম দু দলে ভাগ হয়ে ছোট কাকার নেতৃত্বে একদল গেল দৌলতপুর, বাকীরা বাঙ্গালা

গত একমাসে জীবন সম্পর্কে এত অভিজ্ঞতা হয়েছে যা কিনা সাত বছরে হয়নি অবস্থাপন্ন পরিবারে জন্ম নেওয়ার ফলে কষ্টটা যে কি সেটা ঠিক বুঝতাম না পাড়ার বন্ধুদের অনেকেরই নুন আনতে পান্তা ফুরত, তবে সেটা উপলব্ধি করা হয়নি এত দিন এই প্রথম বুঝলাম বিছানায় নয়, মাটিতে শুয়েও ঘুমনো যায় যে বাবা কাকাদের প্রায় সর্ব শক্তিমান মনে হত, দেখলাম তারাও কতটা অসহায় বিশাল বাড়ির সেই কোলাহল, সেই ব্যস্ততা হঠাৎ করেই যেন কর্পূরের মত উবে গেল যুদ্ধের ডামাডোলে আমরাও হয়ে গেলাম সাধারণ শরণার্থী

বাঙ্গালায় আমরা গেলাম পায়ে হেঁটে মনে পড়ে প্রায়ই মার কোলে উঠতে চাইছিলাম চারিদিকে বিস্তীর্ণ মাঠ সেই মাঠ পেরিয়ে প্রাণ ভয়ে ভীত আমরা পালিয়ে যাচ্ছি – জীবনের খোঁজে না জীবন থেকে – তখন আমরা জানতাম না শুধু জানতাম যতদূর সম্ভব সবার অলক্ষ্যে আমাদের এই মাঠ পেরিয়ে বাঙ্গালার অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গায় পৌঁছতে হবে এখনও যখন দেশ ভাগ বা একাত্তরে মানুষের পালিয়ে যাওয়ার কোন প্রামান্য চিত্র দেখি – মনে হয় এটা তো আমরাই শরণার্থীদের কোন নির্দিষ্ট চেহারা থাকে না, কোন জাত পাত থাকে না, তারা ধনী বা গরীব হয় না – তারা শুধুই শরণার্থী – প্রাণের দায়ে ঘরবাড়ি সব ফেলে পালিয়ে বেড়ানো মানুষ

বাঙ্গালায় আমরা উঠলাম শশী জ্যাঠামশাইএর বাড়িতে সেখানে প্রতাপ দা, কালি দি, কামাখ্যাসহ অনেকের সাথেই আলাপ হল পরিচিত হলাম পাশের বাড়ির রাম মামার সাথে তাছাড়া কুদ্দুস ভাই তো ছিলই তার ছেলেদের সাথেও খাতির হয়ে গেল তার বাড়ির তাল গাছে বাবুই পাখির বাসা, বেতুল ফল এখনও চোখে ভাসে যেহেতু সারাদিন কোন কাজ ছিল না, মাঝে মধ্যেই দৌড়ে চলে যেতাম কুদ্দুস ভাইয়ের ওখানে অথবা রাম মামার বাসায় বাজার খুব দূরে ছিল না, সেখানেও চলে যেতাম ঘুরতে ঘুরতে এর মধ্যে মানিকগঞ্জ থেকে বেবুরা এলো পাশের কামাখ্যাদের বাড়ি অনেক পরে কলেজে পড়ার সময় ওদের সাথে একই সাথে ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর এসব করতাম

বাঙ্গালায় করার তেমন কিছু ছিল না সারাদিন তো আর বসে কাটে না প্রায়ই মনে পড়ত পাড়ার খেলার সাথী পাগলা, সন্তোষ, মনা, পানা, মন্টু, শঙ্কর, বাদল, তাপসদের কথা কে জানে কোথায় আছে ওরা? হঠাৎ যেন দমকা হাওয়া এসে সব কিছু এলোমেলো করে দিলো পরিচিত জায়গা থেকে একেক জনকে উড়িয়ে নিয়ে গেল একেক জায়গায় আজ সবাই শুধুই স্মৃতি

শশী জ্যাঠামশাইএর বাড়ির সামনে দিয়ে চলে গেছে এক মেঠো পথ তরা গ্রাম হলেও ঢাকা-আরিচা রোডের পাশে বলে গল্প বা কবিতার গাঁয়ের মত ছিল না কি যেন একটার অভাব ছিল সেদি থেকে বাঙ্গালা ছিল সে রকম এক গ্রাম শান্ত নির্জন পরিবর্তনহীন কোন গাড়ির শব্দ এই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করত না আমি প্রায়ই সেই সামনে দিয়ে চলে যাওয়া পথে ধারে বসে থাকতাম কেন? ঠিক জানি না শুধুই বসে থাকা হঠাৎ দূরে কোন পথিক দেখা গেলে দৌড়ে বাড়ি গিয়ে মাকে বলতাম হ্যাঁ, অপরিচিত মানুষেরা তখন ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল অজ্ঞাত বাসের এটাও একটা দিক       

কে যেন বলল এই রাস্তা চলে গেছে স্বরগ্রামে ওখানে আমাদের স্কুলের ঘারা স্যারের বাড়ি স্কেলের ঘারা দিয়ে ছাত্রদের মারতেন পড়া না পারলে তাই সরফরাজ স্যারের নাম ছিল ঘারা স্যার। সেখানে নাকি হাট লাগে কেন জানি না, সেই হাটের নাম ছিল পাকিস্তানের হাট বাড়িতে থাকতে প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় যেতাম মানিকগঞ্জ বা ফরিদপুর আঙিনায় সেই ছোটবেলায়ও কখনও কখনও এক জায়গায় বসে দিন কাটাতে এক ঘেয়ে লাগে বায়না ধরলাম হাটে যাব তখন বায়না ধরার মানুষ ছিলেন রাম মামা কেন যেন নাকে ঠিক নিজের আপন মামা বলে মনে হত মাকে দিদি বলে ডাকতেন যুদ্ধ শেষে আসতেন আমাদের বাড়িতে সেই রাম মামার সাইকেলে চড়ে আমি গেলাম পাকিস্তানের হাটে মনে ভয় যেন পরিচিত কেউ দেখে না ফেলে, আমরা যে বাঙ্গালায় আছি সেটা যেন কেউ না জানে তাই প্রাণপণে চাইছিলাম যেন ঘারা স্যারের সাথে দেখা না হয় হ্যাঁ – সময়টা ছিল অবিশ্বাসের, সন্দেহের 

বাঙ্গালার জীবনে যখন অভ্যস্ত হয়ে উঠছি ঠিক তখনই শুনলাম পাশের তেরশ্রীতে পাক সেনাদের আনাগোনা শুরু হয়েছে কুদ্দুস ভাই বললেন সময় থাকতেই এ জায়গা থেকে সরে যাওয়া ভালো তিনিই প্রস্তাব করলেন বৈলতলা  যাওয়ার আমাদের খদ্দের আজিজ ভাই, কালু ব্যাপারী – তাদের সাথে যোগাযোগ করা হল আমরা চলে গেলাম বৈলতলা মাখন কাকার বাড়ি

আবার যাত্রা শুরু আবার পায়ে হেঁটে যাওয়া এবার সেই গেঁয়ো পথ দিয়ে একদিকে শশী জ্যাঠামশাইদের ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট, অন্য দিকে নতুন জায়গায় যাওয়ার আনন্দ মনে আছে আমি মার পাশে পাশে নাচতে নাচতে যাচ্ছিলাম দেখতে দেখতে শশী জ্যাঠামশায়ের বাড়ি দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল সামনে বিশাল প্রান্তর, ঠিক যেমনটা মার মুখে শুনেছি ঠাকুরমার ঝুলির গল্পে সেই আদিগন্ত বিস্তৃত বৈরাগীর চকের ভেতর দিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম সদ্য বোনা ধান বা পাট আমাদের স্বাগত জানাল অনেক রাস্তা পেরিয়ে, অনেক খড়কুটো পুড়িয়ে আমরা শেষ পর্যন্ত এলাম মাখন কাকার বাড়ি        

বেশ বড় বাড়ি আমাদের মত অত বড় না হলেও নিশ্বাস নেওয়ার জায়গা প্রচুর এরই মধ্যে আমাদের মতই অনেক শরণার্থী সেখানে জায়গা পেয়েছে আমারা থাকতাম বাড়ির এক দিকে, অন্যদিকে মাখন কাকা তার পরিবার নিয়ে মাঝে বেশ কয়েক ঘর শরণার্থী এর মধ্যেই আমাদের জন্য কয়েকটা ঘর ঠিক করা হয়েছিল এক ঘরে আমরা উঠলাম, অন্য ঘরে জ্যাঠামশাইরা সুধীর দা  আর বউদি ঘরের সাথে লাগানো এক বারান্দায় মাখন কাকা ছেলে ছানা আর হারুর সাথে আলাপ হল দুই মেয়েও ছিল আমাদের বয়সী তবে ছানা আর হারুই হল আমার খেলার সাথী ওরা ঘুরে ঘুরে বাড়ির আশেপাশে ঝোপঝাড় দেখাল বাড়ির সাথেই এক বিশাল খাল, খাল তো নয় নদী ওখানে দুটো কুম যেখানে সারা বছর জল থাকে বলল সেই কুমে নাকি চুল প্যাঁচানী বাস করে সুযোগ পেলেই মানুষ ধরে নিয়ে যায় আর ছিল কয়েকটা হিজল গাছ ওর ফলগুলো দেখতে জলপাইয়ের মত গাছগুলো আমার এতো পছন্দ হয়েছিল যে ১৯৮২ সালে যখন আমাদের গ্রামে খেলাঘরের আসর করি তার নাম রেখেছিলাম “হিজল”

এর মধ্যে মদন মামা তার ফ্যামিলি নিয়ে আসে বৈলতলায় যদিও ওরা থাকত একটু দূরে, তবুও সময় পেলেই দৌড়ে যেতাম মামাতো ভাই দুলালের সাথে খেলতে ধীরে ধীরে তরার আরও দু একটা পরিবার চলে আসে এখানে ফলে এখানেও আমাদের গ্রামের কিছু আমেজ পেতে শুরু করি তাছাড়া প্রতি সপ্তাহেই বাড়ি থেকে সালাম ভাই আসতো ধান চাল ইত্যাদি নিয়ে প্রতি সপ্তাহে ঠিক নয়, আসতে হত সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে, পালিয়ে, যাতে কেউ জানতে না পারে যে আমরা এখানে আছি ঠিক যেন পাণ্ডবদের অজ্ঞাত বাস সালাম ভাইয়ের বাড়ি আমাদের পাশের গ্রামে খুব আদর করত আমাকে বাড়ির সবার প্রিয় ছিল আমার অবাক লাগত বদু ভাই, নালু ভাই যারা খুব ছোটবেলা থেকেই আমাদের বাড়িতে কাজ করত তারা কেন আসতো না তবে এসব ব্যাপারে এলাকার অবস্থা দেখে বাবা কাকার সাথে আলোচনা করে সামসু চাচাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতেন সালাম ভাই গ্রামের পরিস্থিতির কথা জানাত তার মুখেই শুনলাম হিন্দু পাড়ার কোন ঘরবাড়ি আর আস্ত নেই, সব ধুলিস্যা হয়ে গেছে শুধুমাত্র আমাদের বাড়ির ঘরগুলো এখনও দাঁড়িয়ে আছে আর সেটা সামসু চাচা আমাদের বাড়ি কিনে নিয়েছেন বলায়

আমরা যখন বৈলতলায় আসি তখনও বর্ষা শুরু হয়নি আমরা হেঁটেই পার হয়েছিলাম বিশাল বৈরাগীর চক এখন চারিদিকে শুধু জল আর জল চক তো নয় যেন সাগর আর বাড়িগুলো যেন একেকটা দ্বীপ চারিদিকে জল, আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামে ফলে আমাদের চলাফেরা আরও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে মাঝে মধ্যে যাই পাশে কেরানীনগর বাজারে কত যে মাছ সেবার হয়েছিল বৈলতলায় অনেক জেলের বাস বাড়ির সামনে খালটা এখন দেখতে ভরা নদীর মত একটু দূরে, কেরানীনগর বাজারের ওপাশে বইছে বিশাল ধলেশ্বরী খালের বিভিন্ন জায়গায় এমন কি অনেক জমিতেও জেলেদের ভেসাল – বাঁশের তৈরি জাল আগে কখনও এতো কাছ থেকে এসব দেখা হয়নি

কথায় আছে বিপদ একা আসে না যুদ্ধের সাথে এলো বিভিন্ন রোগ কলেরা, বসন্ত, খোস পাঁচরা – এসব এখন ঘরে ঘরে আমাদের পাশের ঘরেই পারুল মারা গেল কলেরায় আমার চেয়ে একটু বড় ছিল বয়সে এক সাথে গোল্লাছুট, ছো বুড়ি কত কিছুই না খেলেছি এই যে এতো দিন চলে গেল যুদ্ধের পর, কত মৃত্যুর গল্প শুনলাম – তবে চাক্ষুষ দেখা হয়নি একটাও এমন সময় একদিন খাল দিয়ে ভেসে এলো এক মৃতদেহ – জলে ভেসে ফুলে ঢাক সবাই খালের পাড়ে ভিড় করে দাঁড়িয়ে দেখল কিই বা করার ছিল এক সময় অজানা অচেনা মানুষের মৃত দেহটা হারিয়ে গেল বিশাল জলরাশিতে

ওই সময় নিজে ছোট ছিলাম, আর ঠাকুর দেবতারা ছিলেন বিশালাকায়, মহাশক্তিধর ভক্তি শ্রদ্ধাও ছিল তাঁদের প্রতি তাই প্রতিদিন কলার ডগা দিয়ে কালী ঠাকুর বানিয়ে পূজা পূজা খেলতাম প্রসাদ ছিল এক মুঠো চাল যে বিছানাটায় আমরা ঘুমুতাম তার নিচেই ছিল ঠাকুর ঘর এভাবে এক সময় আমার কয়েক সের চাল জমে গেল এমন এক দুপুরে হঠাৎ শুনি আমাদের বাড়ির দিকে এক নৌকা আসছে সামনের দিক পর্দায় ঢাকা হৈচৈ শুরু হল মা আমাকে পাঠালেন দেখতে কী হল মাখন কাকা বাবা আর কাকাকে নিয়ে দৌড়ে চলে গেলেন, যদিও আমার কেন যেন মনে হয়েছিল আর্মিরা এসে বাবার বুকে বন্দুক ধরেছে মাকে বলাতে মা তো কিছুতেই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবেন না অনেক বলে কয়ে রাজি করানো গেল ছোট্ট নৌকায় দিদি, রতন, আমি, চন্দনা, মেজমা চলে গেলাম পাশের বাড়ি, মা রইলেন ঝাউ গাছের নীচে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে মা সাঁতার জানতেন না তপন দাও জলের ভেতর বেত ঝোপে লুকিয়ে ছিল জানি না কত সময় পেরিয়ে গেল এক সময় আমাদের নিতে এল বাড়ি থেকে শুনলাম রাজাকার এসেছিল বাড়ির সব এমন কি চাল ডাল পর্যন্ত নিয়ে গেছে আমাদের বাড়িতে ছোটবড় গোটা চারেক নৌকা ছিল। কোনটা ধান কাটার জন্য, কোনটা আমাদের ঘুরে বেড়ানোর জন্য। এমন এক নৌকা সালাম ভাই বাড়ি থেকে আমাদের জন্য এনে দিয়েছিল। সেই নৌকায় করেই পরে মদন মামার সাথে আমরা যেতাম বাঙ্গালায় কুদ্দুস ভাইয়ের ওখানে সুতা রং করতে। কল্যাণ দা ওই সময় আমাদের ঐ নৌকা নিয়ে ঘুরছিল রাজাকারদের দেখে ওর ঘড়িটা জলে ফেলে দেয় ওরা ওকে বাধ্য করে ঘড়িটা তুলতে বাড়ি ফিরে শুনলাম আমাদের গ্রামের শশী বসাকের শ্যালক ছানা খবর দিয়ে রাজাকার নিয়ে আসে ঠাকুর দেবতা আছে কি না সেটা  জানা হয়নি, তবে আমার রেখে দেওয়া চাল সেদিন সবার থালায় রাতের খাবার তুলে দিয়েছিল এ ঘটনার পর ঠিক হল দিদি, চন্দনা আর কল্যাণ দাকে ইন্ডিয়া পাঠানো হবে গ্রামের চুনী বাবুরা নৌকা ঠিক করেছিলেন তাঁদের সাথেই পাঠানো হল অনেক আশা, অনেক দুশ্চিন্তার ভেতর দিয়ে আমরা একদিন ওদের বিদায় জানালাম যতদিন না ওদের পৌঁছানোর খবর এলো প্রতিটি দিন কেটেছে এক অজানা আশঙ্কার মধ্য দিয়ে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে যুদ্ধের সময়ও কোলকাতা আর বহরমপুরে দাদা ও মামাদের সাথে আমাদের চিঠির যোগাযোগ ছিল              

দেখতে দেখতে যুদ্ধ আমাদের এলাকায় চলে এলো হঠাৎ এক সকালে পাড়ায় সে কী উত্তেজনা! গতরাতে নাকি একদল পাক সেনাকে ধলেশ্বরীতে ডুবিয়ে মেরেছে আমাদের এখানকার জেলেরা ধলেশ্বরীর তখন পারাপার দেখা যায় না তেমনই এক রাতে পাক সেনারা জেলেদের বলেছে নদী পা করে দিতে জেলেরা মুক্তি সেনাদের ভয় দেখিয়ে ওদের ছইয়ের নীচে বসিয়ে রেখেছে আর নৌকা যখন মাঝ নদীতে, তলা ফুটো করে নিজেরা সাঁতরে তীরে চলে গেছে তখন প্রচলিত বিশ্বাস ছিল যে পশ্চিম পাকিস্তানে কোন নদী নেই, পাঞ্জাবীরা সাঁতার জানে না পঞ্চ নদীর দেশ পাঞ্জাবের মানুষও যে সাঁতার কাটতে জানে সেটা তখন বিশ্বাস হত না

বৈলতলায় খেলার পাশাপাশি আমার সময় কাটত নৌকা বানিয়ে আমাদের পাশেই থাকতো মদন মিস্ত্রী সারা দিন ডুঙ্গা নৌকা বানাত তার এক পর্যায়ে সাট ধরতে হত, মানে সে যখন পাতাম বা চ্যাপ্টা পেরেক দিয়ে দুটো তক্তা জোড়া লাগাত অন্য দিক থেকে হাতুড়ি দিয়ে চেপে ধরতে হত সে জন্যে সে আমাকে করাত দিয়ে কাঠ কাটতে দিত বা সড়কি বা ড্রিল দিলে কাঠ ছিদ্র করতে দিত কখনো বা হাতুড়ি বাটাল দিয়ে কিছু কাটতে দিত সে থেকেই এসববের প্রতি আমার প্রচণ্ড আগ্রহ এখন আমার ঘর এরকম বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দিয়ে ভর্তি
দুপুর কাটত বাবা কাকাদের সাথে
সবাই মিলে রেডিও শুনতেন এম আর মুকুলের চরমপত্র প্রিয় অনুষ্ঠান এখনও আকাশবাণী থেকে নীলিমা স্যান্নাল বা দেব দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলা ভেসে আসে আর ছিল গান জয় বাংলার বাংলার জয়, বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে সেই জনতা বা শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি ... আমরা ছোটরা পাটখড়ি দিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতাম সামনে, পেছনে, ডাইনে, বাঁয়ে, উপরে, নীচে এমনকি মাথার মধ্যেও ছিল যুদ্ধ আর যুদ্ধ শান্তি ছিল না কোথাও শুধু ছিল শান্তির জন্য তীব্র আকাঙ্ক্ষা কিন্তু যুদ্ধের সাথে লড়াইয়ে না পেরে শান্তি তখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে কিন্তু বাংলার বীর সন্তানেরা প্রাণপণে লড়াই করে যাচ্ছে শান্তিকে ফিরিয়ে আনতে আমরাও সাগ্রহে সেই প্রতীক্ষায়ই আছি

আমি বলতে পারব না জেলখানার জীবন কেমন, তবে মনে হয় যুদ্ধের সময় পুরো দেশটা একটা জেলখানায় পরিণত হয় মানুষের স্বাধীনতা ভীষণ রকম খর্ব হয় সীমিত হয় নিত্যদিনের কাজকর্ম স্কুল, কলেজ, কোর্ট, কাছারি কাজ করে না, আর করলেও করে আংশিক ভাবে কিন্তু জীবন থেমে থাকে না, সকালে সন্ধ্যায় ঠিকই খিদে লাগে, মানুষ সময় মত খেতে চায় রাশানে একটা প্রবাদ আছে “যুদ্ধ যুদ্ধই, কিন্তু খাবারটা চাই সময় মত” (ভাইনা ভাইনই, আ আবেদ পো রাসপিসানিউ) তাই যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও মানুষকে কাজ করতে হয় আমরাও ব্যতিক্রম ছিলাম না যুদ্ধের মধ্যেও কিছু কিছু করে হলেও সুতার ব্যবসা চলছিলো সুতা রঙ হত বাঙ্গালায়, কুদ্দুস ভাইয়ের ওখানে মদ মামা আর সালাম ভাই সকালে নৌকা করে সেখানে চলে যেত আর সন্ধ্যায় রঙ্গিন সুতা নিয়ে বাড়ি ফিরত বাবা, কাকা অথবা তপন দা সুতা নিয়ে ঘিওর হাটে যেত পরিচিত পাইকারদের তা পৌঁছে দিতে কখনো কখনো আমি আর রতন যেতাম বাঙ্গালা বেড়াতে মামার সাথে সেটা ছিল মেলায় যাওয়ার মত ফেরার পথে নৌকায় বসে ভাত খেতাম আমার খুব প্রিয় ছিল ছোট মাছের চচ্চড়ি, বিশেষ করে পোড়া চচ্চড়ি আমি বলতাম কালাপোড়া মা আমার জন্যে কিছুটা চচ্চড়ি পুড়িয়ে রাখতেন কে জানে এ কারণেই মনে হয় এখন প্রতিদিনই আমার ভাত তরকারি পুড়ে যায়! সন্ধ্যা নেমে এসেছে চারিদিকে অন্ধকার আদিগন্ত বিস্তৃত বৈরাগীর চক অন্ধকার কালো জলে ডুব দিয়েছে আমাদের নৌকা এগিয়ে চলছে কখনও বা উঠে যাচ্ছে ধান ক্ষেতে সেই আঁধারে নৌকার গলুইয়ে বসে আমি পান্তা ভাত খাচ্ছি শুকনো ডাল আর চচ্চড়ি দিয়ে দূরে কোথাও আলো দেখলে শিউরে উঠছি কোন পাক সেনা বা রাজাকারদের নৌকা ভেবে কখনো কখনো সালাম ভাই তরার গল্প শোনাত হিন্দু পাড়া বলতে গেলে জনশূন্য দু একটা পরিবার যা ছিল সেটা তাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না বলে পরে জিজ্ঞেস করলে বলেছিল “গরীব মানুষের বাঁচা আর মরা“ গ্রামের লোকেরা আগের মতই চলত নিজেদের নিত্য দিনের সুখ দুঃখ সাথে নিয়ে শুধু কিছু লোক যারা পাক সেনাদের প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করত তাদের দাপটে গ্রাম কাঁপত হারুন ড্রাইভার ছিল তাদের অন্যতম সে আমাদের গ্রামের নয়, উত্তর বঙ্গের তবে আমাদের গ্রামে থাকতো অনেক দিন ইপিআরটিসি বাসের ড্রাইভার যুদ্ধের পরে পালিয়ে যায়, আর আসেনি তরা ব্রীজ তখন সবে তৈরি হচ্ছিল সেখানে নাকি পাক সেনারা প্রতি দিনই দূরদূরান্ত থেকে মানুজন ধরে এনে মেরে ফেলত, অনেককে জ্যান্ত বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দিত সালাম ভাইয়ের মুখে এসব গল্প শুনে শিউরে উঠতাম ভয় যেন বাতাস – আনন্দে, বিষাদে, ঘরে, বাইরে সব সময় তখন আমাদের সাথে সাথে চলত ছায়ার মত

এক সময় বর্ষাও টা টা জানায় ধীরে ধীরে বৈরাগীর চক স্নান সেরে নদী থেকে উঠে আসা পল্লী বঁধুর মতই সবুজ শাড়ি পড়ে কাঁখে কলসী নিয়ে হাঁটতে থাকে পাশের ডোবায় মাখন কাকা কচুরি পানা জমিয়ে রাখেন, জিজ্ঞেস করলে বলেন গরুদের খাওয়াবেন আর শুকিয়ে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করবেন ছানা, হারুর সাথে আমি প্রায়ই আবার মাঠে যাই  নতুন ঘাসেরা কোমর দুলিয়ে নাচে আমাদের চারদিকে আমাদের বাড়িতে গোটা কুড়ি গরু ছিল ভাবি বাবাকে বলি একটা গরু বা বাছুর এনে দিতে তাতে হয়তো জীবনের একঘেয়েমি কিছুটা হলেও কমবে

রেডিওর খবর মনে আশার সঞ্চার করে খবর আসে ভারতীয় সৈন্য যুদ্ধ করবে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি এর মধ্যে একদিন বিকট শব্দে সবার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে সারাদিন চলে জল্পনা কল্পনা অবশেষে জানা গেল ভারতীয় সেনা তরা ঘাটের ফেরি ডুবিয়ে দিয়েছে যাতে পাক বাহিনী নদী পারাপার করতে না পারে আর এক ভোরে সহস্র সূর্যের আলোয় সবাই বাইরে বেরিয়ে আসে পুবের আকাশ লালে লাল বিশাল সূর্যের মত লাল লাল বলগুলো এক এক করে নেমে আসছে আকাশ থেকে প্যারাস্যুটে করে ভারতীয় সেনা নামছে জাগীরের ব্রীজ এলাকায় মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মুক্তি বাহিনীর জয়ের খবর আসছে                                                                                          

তারপর একদিন বেতারে ভেসে আসে চির আকাঙ্ক্ষিত সংবাদ জয় বাংলা বলে চিৎকার করে উঠি আমরা ঘরে রাখা বাংলাদেশের পতাকা পাটখড়ির মাথায় বেঁধে সে কি দৌড় বাড়ির একদি থেকে আরেক দিক পর্যন্ত যেন একটা বিশাল পাথর নেমে যায় বুক থেকে দেশ স্বাধীন আর বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াতে হবে না, আর পদে পদে মৃত্যুর ভয় আমাদের তাড়া করবে না চোখের সামনে ভেসে ওঠে আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধবদের মুখ মন উড়ে চলে যায় তরা সেই প্রিয় বাড়ি, সেই চেনা রাস্তাঘাট সব যেন বাঁধ ভাঙা জলের মত হুমড়ি খেয়ে ঢোকে মনের ভেতরে

বড়রা বাড়ি ফিরল কয়েকদিন পরে যখন সামসু চাচা, নয়াই চাচাদের কাছ থেকে গ্রীন সিগন্যাল এলো এর মধ্যে আমাদের পাইকাররা, যাদের সহযোগিতায় আমরা এতদিন এখানে ছিলাম, সরজমিনে দেখে এলো গ্রামের অবস্থা বড়দের পরে মা, মেজমা, খুড়িমা, বৌদি, আমি রওনা হলাম বাড়ি ফিরে দেখি যে ঘরটায় আমরা থাকতাম তার সিমেন্টের ভিটি ছাড়া আর কিছুই নেই প্রচণ্ড মন খারাপ হয়েছিল বাবা বললেন, খুব তাড়াতাড়িই সব ঠিক হবে মিস্ত্রীদের ডাকা হল কাজ চলল পুরো দমে আমাদের বাড়িতেই ছিল মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প আমরা যখন ফিরি তখন চার পাঁচজন মুক্তিসেনা সেখানে ছিল প্রতিদিন সকালে ওদের সাথে দাঁড়িয়ে “আমার সোনার বাংলা” গাইতাম ওরা আমাদের ভিটামিন দিত এক এক করে ওরা চলে যেতে শুরু করল অনেক দিন পর্যন্ত ছিল পোকা নামে এক ছেলে মনে হয় স্কুলে পড়ত পাশের গ্রামেই বাড়ি একদিন পোকাও চলে গেল এর মধ্যে শুরু হল লুটের জিনিসপত্র ফেরত দেওয়ার পালা এ সব আমাদের বাড়িতেই নিয়ে আসতো সবাই, পরে হিন্দু পাড়ার লোকজন প্রমাণ দিয়ে সেগুলো নিয়ে যেত যুদ্ধ শেষ হয়েও যেন শেষ হচ্ছিল না গ্রামে ফিরে সব অবস্থা দেখে অনেকেই ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছিল সেই যে ভাঙ্গন শুরু হয়েছিলো বিশ্বাসে সেটা আর জোড়া লাগেনি এখনো সেই দেশ ছাড়া একটু একটু করে চলছে তো চলছে আমাদের পরিবারের অতীত জৌলুষ আর কোনদিন ফিরে আসেনি অনেক সময় মনে হয় নদী যেমন এক কূল ভাঙ্গে আর অন্য কূল গড়ে যুদ্ধ তেমন কিছু মানুষকে নিঃস্ব করে, কাউকে করে ধনবান সময় যতই এগোচ্ছে আমরা একাত্তর থেকে ততই দূরে সরে যাচ্ছি আমাদের চেতনায় একাত্তর এখন অচেতন, শুধুই স্মৃতি একাত্তরে আমার বয়স ছিল সাত, এখন সাতান্ন দেশ থেকে অনেক দূরে, সুদূর রাশিয়ার দুবনা শহরে তবুও মনে হয় সব চোখের সামনে ভাসছে সেই ভেসে যাওয়া লাশ, সবুজ মাঠ, সেই মুক্তির আনন্দ। কিন্তু মুক্তি কি আদৌ এসেছে? স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি ঠিকই কিন্তু মুক্তি পাইনি। মুক্তি পাইনি কুসংস্কার থেকে, মুক্তি পাইনি সাম্প্রদায়িকতা থেকে। যে দ্বিজাতি তত্ত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ত্রিশ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল আর দুই লক্ষ মা-বোন হারিয়েছিল তাদের সম্ভ্রম, সেই দ্বিজাতি তত্ত্ব নতুন মোড়কে ফিরে এসেছে, ফিরে আসছে প্রতিদিন একটু একটু করে। সমাজতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষতা অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। গণতন্ত্র আজ আইসিইউতে। যে বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতিকে রক্ষার জন্য ১৯৫২ সালে শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন – সেই ভাষা, সেই সংস্কৃতি আজ অবহেলিত। আর্থিক উন্নয়নের ডামাডোলে চাপা পড়ে গেছে আত্মিক উন্নয়ন, চাপা পড়ে গেছে বাঙালি আত্মার কান্না। একাত্তর আজ শুধুই স্মৃতি, পুরনো অ্যালবামে ঝাপসা হয়ে যাওয়া এক ছবি - ছবির রঙ উঠে যাওয়ায় নাকি চোখ অশ্রুসিক্ত হওয়ায় সেটাই প্রশ্ন। 

দুবনা, ১২ মে ২০২১   

 

 


 

          

Comments

Popular Posts