করোনার পরে
হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেছি তাও দু সপ্তাহ। এখনও চলছে রিহ্যাবিলিটেশন পিরিয়ড। বিভিন্ন ওষুধ খাওয়া চলছে, মুলত হাসপাতালে যে সব হাই পাওয়ারের ওষুধ দেওয়া হয়েছিল তার সাইড এফেক্ট মিনিমাইজ করার জন্য। মূল কাজ যথারীতি রেস্ট নেওয়া, ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করা। শ্বাস প্রশ্বাসের জন্য ব্যায়াম করা। এক কথায় নিজের শরীরকে ধীরে ধীরে কার্যক্ষম করে তোলা। আর যেকোনো সমস্যায় দেরী না করে ডাক্তার ডাকা। আর একটু একটু করে হলেও কিছু না কিছু করা যাতে হাড্ডিতে জং না পরে। প্রতিদিন (যদি তাপমাত্রা খুব কম না থাকে) একটু একটু হাঁটাচলা করা।
ঘোরাফেরার ব্যাপারটা আমার বরাবরই পছন্দের। বাসায় ফিরে প্রথম দিনই তাই গেলাম বনে ঘুরতে। একা যাইনি। আন্তন ছিল। ওর হাতে ক্যামেরা দিয়ে হাঁটলাম ঘন্টাখানেক। কিছু ছবিও তুললাম। বুঝলাম, হাঁটাহাঁটি আবার নতুন করে শিখতে হবে।
ছোটবেলা থেকেই আমার বেশ কিছু অসুখ বা বদ অভ্যেস ছিল। গলায় শক্ত কফ জমে থাকত আর বিকট শব্দ করে কাশি দিয়ে সেগুলোর কবল থেকে গলাকে মুক্ত করার চেষ্টা করতাম। গত বছর দশেক ওদের কোন পাত্তা ছিল না। করোনার পরে সেটা আবার ফিরে এসেছে। অনেক আগে প্রায়ই নাক দিয়ে রক্ত পড়ত আর এই রক্ত নাকে জমে থাকত। বিগত বছর সাত আট এটাও উধাও হয়ে গেছিল। আবার ফিরে এসেছে। তার মানে কোন কোন ক্ষেত্রে করোনার কাঁধে ভর করে আমি আট থেকে দশ বছর পিছিয়ে গেছি, মানে ইয়ং হয়ে গেছি। আবার যখন হাঁটতে যাই প্রথম প্রথম এত কষ্ট লাগে যে মনে হয় বয়স বছর কুড়ি বেড়ে গেছে। আমি ইতিমধ্যেই বার্ধক্যে পৌঁছে গেছি। এভাবে করোনার কারণে আমি একই সাথে অতীত আর ভবিষ্যতকে পুনরুদ্ধার করতে পারছি।
আমার বিভিন্ন রকমের শখ বা হবি আছে। ফিজিক্স, ফটোগ্রাফি, বই পড়া, লেখালেখি করা, গান শোনা, একা একা নিজের সাথে ঘন্টার পর ঘণ্টা কথা বলা ইত্যাদি। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে একটা জিনিস বুঝেছি যে জীবনে সে কাজটাই করা উচিৎ যা মনে আনন্দ দেয়, যে কাজটা আমি সত্য সত্যই উপভোগ করি। তবে যেহেতু মানুষ সামাজিক জীব, তাকে আরও দুই দশ জনের সাথে চলেতে হয়, তাই অনেক সময় শুধু আনন্দের জন্য নয়, কর্তব্যের খাতিরেও অনেক কাজই করতে হয়। তাই এক সময় এটাও বুঝেছি যে কোন কাজ যদি করতেই হয় সেটাকে যতদূর সম্ভব উপভোগ করা।
সোভিয়েত ইউনিয়নে আসার আগে পর্যন্ত বাড়িতে কখনই কিছুই করতে হয়নি। এখানে এসেই একটু একটু করে অনেক কাজই করতে শিখি। জুতা সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ পর্যন্ত সব। কারণ একটাই, সোভিয়েত ইউনিয়নে অনেক কিছুই হয় পাওয়া যেত না, নয়তো সেটা ছিল আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তাই প্রথম প্রথম আমরা নিজেরাই নিজেদের চুল কাটতাম। সবাই যে পারত বা সবাইকে যে বিশ্বাস করে সবাই নিজের মাথাটা এগিয়ে দিত তেমন নয়। তবে একটা ব্যাপারে কমবেশি সবাই এক্সপার্ট হয়ে ওঠে। সেটা হল রান্না করা। আমি অবশ্য এ বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কেজি শেষ করতে পারিনি। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে জীবনে প্রথম বারের মত যেদিন রান্নার দায়িত্ব আমার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয় সেদিন অজ্ঞতা বশত মুরগীর মাংসে এক হাড়ি জল ঢেলে দিই। তখন থেকেই সবাই এক বাক্যে রায় দেয় যে আমি রান্নার যোগ্য নেই। এরপর কেউ কখনও আমাকে রান্নার সুযোগ দেয়নি। আমারও আর রান্না শেখা হয়নি। প্রায়ই আমাকে মেস থেকে ছাড়পত্র দিয়ে ঈশ্বরের নামে ছেঁড়ে দেওয়া হত। তাই পুরো ছাত্রজীবন আমি ক্যাফে বা স্তালোভায়ায় রুশ খাবার খেয়েই আর সুযোগ পেলেই বাঙালির ঘরে ঘরে আজান দিয়েই দিন কাটাই। মস্কোর বাঙালি সমাজে আজান বলতে বোঝাতো অনাহুত ভাবে কারও খাবারে ভাগ বসানো। আমি খুব কম খেতাম বলে আমার জন্য কারও নাকি খাবার কম পড়ত না ঠিক যেমনটা আমার জন্য ওভার ওয়েটের কারণে লিফট কখনোই থেমে থাকত না।
আমার রান্না শুরু ১৯৯১ সালে। সেটাও অনেকটা অনুরোধের ঢেঁকি গেলার মত। এক সহপাঠী রাশিয়া ছেঁড়ে আমেরিকা চলে গেল। অনেকটা জোর করেই হাড়ি পাতিল ফ্রিজ এসব ঝুলিয়ে দিলে গেল আমার ব্যথাতুর গলায়। এভাবেই অনেকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও শুরু হল আমার পাচক জীবন। রান্না আমি কখনই ভাল করতাম না, তবে সুবিধা একটাই, যখন খুশী তখন করা যেত। ফলে ক্যাফের রুটিনের সাথে সময় মিলিয়ে নিজের খাওয়ার সময় ঠিক করতে হত না। সংসার শুরুর পর প্রথম কয়েক বছর গুলিয়াই রান্না করত। ক্রিস্টিনার জন্মের পর রান্নার দায়িত্ব ধীরে ধীরে আমার হাতে চলে আসে। তবে রান্না মানেই অনিশ্চয়তা। অনেকটা লটারির মত - মিলিয়ন ডলার কোশ্চেন - খাবার পুড়বে কি পুড়বে না। যদিও প্রতিদিন একই ভাবে রান্না করি কিন্তু ফলাফল সব সময়ই ভিন্ন রকম। এখানেও মনে হয় হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার সূত্র কাজ করে। ইদানিং তো মাঝে মধ্যে মনই খারাপ হত এই ভেবে যে শেষ পর্যন্ত রান্নাটাকে বাগ মানাতে পারলাম না। অন্যান্য সব ক্ষেত্রে যতটুকু আস্থার সাথে কাজ করতে পারি রান্নার ক্ষেত্রে সেটা হয় না। এখানেই হয়তো আমি ভাগ্যের কাছে নিজেকে ছেঁড়ে দিই। কিন্তু সমস্যা হল যদি ফিজিক্স, ফটোগ্রাফি, লেখালেখি, বই পড়া এসব কাজগুলো ইমিডিয়েট ফলাফল আশা না করেও করা যায়, মানে নিজের জীবন দর্শনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কাজের আনন্দে এসব করা যায়, রান্নার ব্যাপারটা ঠিক তেমন নয়। রান্নার প্রক্রিয়া যতই উপভোগ করি না কেন, যদি সেটা পুড়ে যায় বা টেস্টি না হয়, তাহলে আর যাই হোক পেট ভরবে না, মনও ভরবে না। তবে করোনার কারণে এক্ষেত্রে কিছুটা হলেও উন্নয়নের হাওয়া লেগেছে। করোনা আক্রান্ত হওয়ার প্রথম থেকে একেবারেই খেতে পারতাম না। সব কেমন বিস্বাদ লাগত। সেই সময় মাত্র কয়েকদিনে সাড়ে ৪ কেজি ওজন হারালাম। এতে খুশিই হয়েছিলাম, কেননা এই ৪ কেজি ছিল বোঝার উপর শাঁকের আটির মত, মনে হত যেন এই চার - সাড়ে চার কেজি ওজন ঘাড়ে চেপে বসে আছে। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে খেতে শুরু করেছি, তাতে কিছুদিন পরে ফুলে ফেঁপে কোলাব্যাঙ হলেও অবাক হব না।
আমার ঘুম বরাবরই হালকা। ভোর তিন থেকে চারটা পর্যন্ত বারবার বাথরুমে যাই সেই ছোটবেলা থেকেই। ফলে ঘুমটা জমে এর পরে চারটা থেকে আটটা পর্যন্ত। তবে ইদানিং ভোর ছয়টায় ঘুম ভেঙ্গে যায়। উঠে শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যায়াম করি। জীবনে কোনদিন কাসা বা পরিজ পছন্দ করতাম না। এখন সকালে সেটাই খাই। এরপর? হ্যাঁ, মাংস সেদ্ধ করতে বসিয়ে দিয়ে তাতে বাঁধাকপি, আলু, গাজর, বীট এসব ফেলে দিই। সাথে কখনও মাস, মসুর বা রাশান গারখ (মটর জাতীয় ডাল)। আগে প্রায়ই রান্না বসিয়ে বই পড়তাম বা কম্পিউটারে কাজ করতাম। এখন বই পড়লেও কম্পিউটারে খুব একটা বসি না। সময় কাটানোর জন্য রান্না করি। সুপ হয় দেশী ডাল আর রুশ সুপের একটা গোল্ডেন কম্বিনেশন বা জলাতায়া সেরেদিনা। আগে কখনও কাসা বা সুপ করিনি। এখন দেখছি এগুলো করা তেমন সমস্যাই নয়। পরপর কয়েকদিন সুপ খাওয়ার পর গুলিয়া প্লভ বা পোলাও করতে বলল। আমি এটা করি নিজের মত করে। মাংস, চাল, ডাল, সবজি, গরম মশলা সব এক সাথে কষিয়ে সেদ্ধ করি। ভাল কিছু হয় না, তবে হাওয়া পরিবর্তন হয়, মানে প্রতিদিনের একঘেয়ে আইটেম থেকে অন্য আইটেমে চলে যাওয়া যায়। প্লভের কথা শুনে হঠাৎ আমার মনে পড়ল ইব্রাগিমের কথা। ও তাজিকস্তানের লোক। আমার চেয়ে একটু বড়। ওর যখন ৫০ বছর পূর্ণ হল, আমাদের ইনভাইট করেছিল বাসায়। নিজে প্লভ রান্না করেছিল। বিরাট এক টুকরো মাংস, রসুন গোটা গোটা ইত্যাদি পরে পাত্র থেকে তুলে আমাদের সামনেই কেটে কেটে দিল। ভাবলাম ওভাবে কিছু করার। ইউটিউবে দেখলাম কীভাবে উজবেক প্লভ করতে হয়। বেশ সোজা। প্রথমেই মাংস কেটে নেয় (বড় টুকরাও দেওয়া যায়), এরপর অনেক পেঁয়াজ আর গাঁজর। পাত্রে সালা বা চর্বি দিয়ে অপেক্ষা করে সেটা না গলা পর্যন্ত। এরপর তাতে মাংস ছেঁড়ে দেয়। যখন মাংস থেকে সব জল বেরিয়ে যায় তাতে পেঁয়াজ আর গাঁজর ছাড়ে। এরপর কতগুলো আস্ত রসুন আর মরিচ ফেলে দেয়। মশলা দিয়ে জল ঢেলে দেয়। প্রায় এক ঘণ্টা এভাবে সেদ্ধ করতে হয় যাতে মাংস নরম হয়। এক্ষেত্রে ভেড়া, শুয়োর বা গরু - যেকোনো মাংসই চলে। মাংস বসানোর আধাঘণ্টা পরে চাল ধুতে হয়। চালটা আধাঘণ্টা জলেই ভিজতে থাকে। এরপর মাংস থেকে রসুন আর মরিচ উঠিয়ে তাতে চাল ঢেলে দেয়। পরিমাণ মত জল দিতে হয় যাতে চাল জলে ডুবে যায়। এরপর শুধু অপেক্ষা। চাল ফুটে গেলেই রান্না শেষ। তুলে রাখা রসুন আর মরিচ কেটে কেটে ছড়িয়ে দিলেই প্লভ রেডি। ঘরে চর্বি বাদে সবই ছিল। তাই পরের দিন ঘুম থেকে উঠেই গেলাম চর্বি কিনতে। ভেড়ার চর্বি যে এমন দেখতে জানা ছিল না। বাসায় ফিরে একদিকে বোরস করলাম শুয়োরের মাংস দিয়ে। প্লভ করলাম ভেরার চর্বি আর গরুর মাংস দিয়ে। এই প্রথম ইউটিউবে রেসিপি দেখে দেখে প্লভ রান্না করলাম। গুলিয়া তো প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ভাগ্যিস ওর পাঁচটা মুখ নেই, তাহলে কান ঝালাপালা করে ছাড়ত। আমিও দেড় প্লেট খেয়ে ফেললাম। পরে ভাবতে বসলাম, সেই ১৯৯১ সাল থেকে রান্না করছি, কোন সময়ই ভাল রান্না বলতে যা বোঝায় সেটা হয়নি, আর আজ বলতে গেলে প্রথম প্রচেষ্টাতেই এই রেজাল্ট! ব্যাপারটা কী? উত্তর এলো খুব শীগগিরই। যেহেতু রান্না করা রেসিপি দেখে তাই খারাপ হলে দোষটা হত সেই উজবেক ভদ্রলোকের আর ভাল হলে দুজনের। এক কথায় বলতে গেলে আমার কোন দায়দায়িত্ব ছিল না। মনে হয় এ কারণেই রান্নাটা ভাল হয়ে গেছে। আড়াই যুগের প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত রান্নাটাও শিখে গেলাম। করোনার পজিটিভের যেন শেষ নেই।
সত্যি বলতে কী আজকাল প্রতিটি দিনই যেন নতুন করে বাঁচতে শেখা। প্রতিদিন নিজের লক্ষ্য একটু একটু করে বাড়াই আর সেটা অর্জন করার চেষ্টা করি। আগে যে করতাম না তা নয়, তবে এখন অনেক কিছুই, এমনকি অনেক জানা জিনিস নতুন করে করতে হচ্ছে। যেমন প্রথম দিকে এক দেড় কেজি জিনিস মাত্র ২৫ মিটার দূরের সুপার মার্কেট থেকে বাসায় আনতে দম বেরিয়ে যেত। আজ ইচ্ছে করেই ৭ কেজি জিনিস নিলাম। শুধুই নিজের কাছে প্রমাণ করতে যে চাইলে আমি অনায়াসে এসব নিতে পারি। প্রথম দিকে হাঁটতাম বাসার পাশেই। দূরে যেতে শুধু ক্লান্তই হতাম না, ভয় পেতাম, যদি ফিরে আসতে না পারি বা পড়ে যাই। এখন অনায়াসে ৩-৪ কিলোমিটার হাঁটি। অন্তত ভয় হয় না। জানি, টায়ার্ড লাগলে ধীরে ধীরে হাঁটলে বা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেই সব ঠিক হয়ে যাবে যদিও শীতে দাঁড়িয়ে থাকা মোটেই আনন্দের নয়। প্রথম দিকে ক্যামেরা সাথে নিতে ভয় পেতাম, শত হলেও সব মিলিয়ে দু কেজির মত ওজন। এখন আর ওজনটা গায়ে লাগে না। আমার অবশ্য ক্যামেরার ওজন কখনই গায়ে লাগে না। আসলে অনেক দিন হল আমি কাউকে কথা দিই না, কথা দিই নিজেকে, শুধুই নিজেকে। রিচার্ড বাখের লিভিংস্টোন দ্য সীগাল এর মত প্রতিদিন লক্ষ্যটাকে একটু দূরে সরিয়ে দিই আর আপ্রাণ চেষ্টা করি সেই লক্ষ্যে পৌঁছুতে। তবে এটাও ঠিক, আমি সেই লক্ষ্যই নিজের জন্য স্থাপন করি যা পাওয়া না পাওয়া শুধু আমার উপর নির্ভর করে।
অনেকদিন পরে (শেষ গেছিলাম ২০২০ সালের ২৪ ডিসেম্বর) গতকাল ক্লাবে গেলাম। নিকলাই এসে নিয়ে গেল আবার বাসায় পৌঁছে দিল। এতদিন পরে সবাইকে দেখে খুব ভাল লাগল। এসব জায়গায় এলে বোঝা যায় তোমার অনুপস্থিতিতে পৃথিবীতে কোন কিছু থেমে ছিল না, থেমে থাকনি। সব কিছুই চলেছে আগের মতই। তবে অনেক দিন পরে তোমাকে পেয়ে সবাই যে খুব খুশি সেটাও বলাই বাহুল্য। গতকাল আমাদের সময় কাটল আড্ডা দিয়ে। নিকলাইয়ের জন্মদিন ছিল। কেক কাটল ও। তাই আড্ডাটা জমলো। ছবি দেখা হল না যদিও ছবি নিয়ে কথা হল, কথা হল রাজনীতি নিয়ে, ভ্যাকসিন নিয়ে। আমি এমনিতে এসব আড্ডায় খুব বেশি কথা বলি না, শুনতেই ভালবাসি। তবে এখানে এসে আরেকটা অভিজ্ঞতা হল। বেশ কিছুক্ষণ পরে প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগল। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল। করোনারই হোক আর ওষুধেরই সাইড এফেক্ট হোক, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে আরও সময় লাগবে বলেই মনে হচ্ছে। আমার এক বন্ধু অসুস্থ হয়েছিল গ্রীষ্মের শুরুতেই। ও এখনও বলে দুর্বলতা পুরোপুরি কেটে ওঠেনি।
দিন কাটে বই পড়ে, শুয়ে, বসে, রান্না করে, খেয়ে আর প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার এদিক সেদিক হেঁটে। এখন প্রায়ই ইউটিউব দেখে রান্না করি। তবে সব সময় সব ইনগ্রেডিয়েন্ট না থাকায় হাতের কাছে যা আছে তাই দিয়ে কাজ চালাই, মানে ইচ্ছে মত রেসিপি চেঞ্জ করি। সমস্যা হয় নাম নিয়ে। কী বলা যায় পোলাও বা প্লভকে? খুব সোজা একটা উপায় বের করেছি - সব কিছুর নামের শেষ পো বিজনস্কি লাগিয়ে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। এর মানে হচ্ছে বিজনের পোলাও, বিজনের এক্স, ওয়াই, জেড। আজ আমার মেন্যু খারচো পো বিজনস্কি, এটা জর্জিয়ান সুপ। নিজেকে বেশ ক্রিয়েটিভ মনে হচ্ছে, যদিও ব্রহ্মা, বিষ্ণু আর মহেশ্বরের মধ্যে ধ্বংসের দেবতা মহেশ্বরের সাথেই আমার মিল বেশি।
অনেকদিন থেকেই কম্পিউটার মাঝে মধ্যে ঝামেলা করছে। আমি সাধারণত কম্পিউটার কখনোই অফ করি না। ইদানীং কখনও কখনও নিজে থেকেই অফ হয়ে যায়। অন করার সময় ফ্যান এরর দেখায়। কিছুই না, বিওসে গিয়ে রিসেট করলেই হয়। তবে গুলিয়া সেটা পারে না। আগে ভ্যাকুম ক্লিনার দিয়ে মাঝে মধ্যে ধুলা পরিষ্কার করতাম। ক্লিনারটা আমার বোকামিতে নষ্ট হয়ে আছে। আঠা দিয়ে এক টুকরো প্লাস্টিক লাগাতে হবে। ক্লাবে ইলিয়াকে জিজ্ঞেস করলাম। ও সাজেস্ট করল কন্ডেন্সড এয়ার কিনতে। আইডিয়া খারাপ না, দামও বেশি নয় ৪০০ রুবল মাত্র। কিন্তু কীভাবে করব? ইলিয়া বলল ইউটিউবে দেখে নিতে। বাসায় এসে ইউটিউবে পেলাম বিভিন্ন ভিডিও। সবচেয়ে সোজা হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে পরিষ্কার করা। এ জন্যে অবশ্য কুলার খুলতে হবে। কয়েকদিন আগে গুলিয়া আমার পুরানো শেভিং ব্রাশ বের করে বলল কী করবে। আমি ব্রাশ ব্যবহার করি না তাও বছর কুড়ি। এখন দেখি ওটা বেশ কাজে লাগে। কিন্তু গুলিয়া কোথায় যে সেটা রেখেছে সেটা খুঁজে পেতে আরও কুড়ি বছর অপেক্ষা করতে হবে। যাহোক কম্পিউটার খুলে বসলাম পরিষ্কার করতে। একটার পর একটা পার্টস খোলা আর পরিষ্কার করা সমস্যা নয়। সমস্যা হল পরে সেগুলো জায়গা মত সেট করা। আমি যখন ক্লিনিকে গিয়ে লাইনে দাড়াই, কিছুক্ষণ পরেই ভুলে যাই কার পেছনে দাঁড়িয়েছিলাম। তখন ভাবি নেক্সট টাইম ছবি তুলে রাখব। কিন্তু ছবি আর তোলা হয় না। আসলে লাস্ট ম্যান কে সেটা জিজ্ঞেস করার পর "দাঁড়ান, আমি আপনার একটা ছবি তুলে নিই" বলার সাহস হবে কিনা সেটাও জানি না। এখনও ভাবলাম, ইস যদি খোলার আগে ছবি তুলে রাখতাম। তবে ভরসা একটাই, এসব জিনিস ফুল প্রুফ, তাই ভুল্ভাল লাগানোর সুযোগ নেই। কুলার লাগাতে গিয়ে বুঝলাম ওখানে আগে ভুল্ভাল লাগানো ছিল। অনেকদিন পরে ভালই লাগলো কম্পিউটার খুলে। কোন কাজ অনেক দিন না করলে মনে থাকে না। একটা সময় ছিল যখন আজকের মত রেডিমেড প্যাকেজ পাওয়া যেত না। তখন কত রকম ফন্দি যে বের করতে হত! ১৯৯০ এর দশকে অনেক সময় পিএস তৈরি করে পরে সেখানে গিয়ে বিভিন্ন সিম্বল বদলাতাম। কারণ কোরেল ড্রয়ে এসব সিম্বল লেখা যেত না। এখন অবশ্য সব প্রোগ্রামই পাওয়া যায়, তবে অনেক দাম। দামী দামী প্রোগ্রাম কেনার সামর্থ্য নেই, প্রায় সবই চুরি করা। অনেক হ্যাকাররা দরকারি প্রোগ্রামের সিকিউরিটি ভেঙ্গে আমাদের মত সাধারণ মানুষদের সেটা নিজের কম্পিউটারে ইনস্টল করার সুযোগ দেয়। আমরা সেটাই করি।
আরও একটা অবজারভেশন চলছে কুকুরদের উপরে। মানে ওদের মতিগতি, জীবনযাত্রা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাচ্ছি। আগে যে ছিল না তা নয়, তবে দিনের বেশির ভাগ সময় বাইরে থাকতাম। এখন যেহেতু প্রায় সারাদিন ঘরেই বসে থাকি, তাই দেখাটা ভিন্ন রকমের। কুকুর আমাদের বাড়িতে ছিল ছোটবেলা থেকেই। তবে ওরা ছিল অচ্ছুত। মানে ওদের ঘরে ঢোকার অধিকার ছিল না। খেত মূলত উচ্ছিষ্ট। কুকুরের বাচ্চাদের আদর করলেও একটু বড় হওয়ার পরে ওরা সে আদরটুকু থেকেও বঞ্চিত হত। বিড়াল সেদিক থেকে যাকে বলে বামুনের মেয়ে। যেকোনো ঘরে যেকোনো সময়ে যেত। তখন যেহেতু বাড়িতে ডাইনিং টেবিলের চল ছিল না, আমরা খেতাম মেঝেতে পিড়ি পেতে বসে। বিড়াল ঠিক পাতের পাশে বসে থাকত, আর মুখের দিকে এমন ভাবে চেয়ে থাকত যে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাঝে মধ্যে ওকে খাবার না দিয়ে উপায় ছিল না। গুলিয়ার সাথে যখন পরিচয় হয় তখন ওর বাসায় ছিল টিয়ে পাখি। আমাদের বাড়িতেও টিয়ে পাখি ছিল বড়দার বাড়িতে। পরে উড়ে চলে যায়। ১৯৯৬ সালে ওরা টিয়ে সাথে নিয়েই দুবনা আসে। একদিন অফিস থেকে বাসায় ফিরে দেখি বিড়াল। এরপর ক দিন পরে আরও একটা। আসলে এখানে বিড়ালের বাচ্চা হলে কেউ ফেলে দেয় না, বাচ্চারা বাসায় বাসায় ঘুরে কারও কাছে গছিয়ে দেয়। আন্তন আর মনিকার পীড়াপীড়িতে রাখতে হল। এই বিড়াল দুটো পাড়া বেড়ানি। ফলে এক সময় মনিকার পায়ে ঘা। ওদের বিদায় না করে উপায় ছিল না। বিনিময়ে সেই আকালের বাজারেও কিনতে হল পেরশিয়ান বিড়াল। এই বিড়ালকে কেন্দ্র করে গুলিয়ার আলাপ হল বিড়াল প্রেমীদের সাথে। দেখতে দেখতে বাড়িতে এল সাত সাতটা পেরশিয়ান বিড়াল। ঝামেলা শুরু করল আমাদের ঠিক নীচের বাসায় যারা ছিল তারা। ফলে প্রথম বিড়ালটা থেকে সবগুলো বিলিয়ে দিতে হল। এরপর এল কুকুরের পালা। এখন এদের সংখ্যা এত যে আমিও গুনে শেষ করতে পারি না।
প্রথম দিকে বিরক্ত লাগলেও মানুষ ধীরে ধীরে সব কিছুর সাথে অভ্যস্ত হয়ে যায়। আগে যেহেতু প্রায়ই বাইরে থাকতাম, এসব তেমন চোখে পড়ত না। এখন বলতে গেলে সারাদিন ঘরে। সমস্যা হয় শুধু জুম বা অন্য কোন মিডিয়ায় কোন আলোচনায় অংশ নিতে গেলে। শুনতে সমস্যা নেই, বলতে গেলেই ঝামেলা। ওরা কখন আমার কথার মধ্যে নিজেরা কথা বলতে শুরু করবে সেটা আগে থেকে জানার উপায় নেই। তবে এখন কাছ থেকে দেখে ওদের চরিত্রের অনেক দিক বুঝতে পারছি। মানুষ প্রথমত জন্তু। ওদের থেকে আমাদের পার্থক্য শুধু এখানেই যে আমাদের কিছু সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে। তবে সেটা যে জন্তু জানয়ারদের নেই তাই বা বলি কেমনে। হাতি, বাঘ বা অন্য সব প্রানীও তো দলবদ্ধ হয়ে থাকে আর যখনই কোন প্রাণী দলবদ্ধ হয়ে থাকে তাদের কিছু না কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। মানে এক অর্থে তারাও সামাজিক। তাদেরও দায়বদ্ধতা আছে। তাই এক্ষেত্রে মানুষ কোন বিশেষ অবস্থানে নেই। যাহোক, আমার কেন যেন মনে হয় কুকুরদের কাছ থেকেও অনেক কিছুই শেখার আছে। ঠিক মানুষের মতই ছেলে কুকুররা হয় নির্লজ্জ, বিশেষ করে মেয়েদের মাসিকের সময়, যদিও একে মাসিক বলা যায় কিনা জানিনা। এই সময়টা মানুষ সাধারণত যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হয় না। আসলে অন্য প্রাণীরা খুব সম্ভব যৌন সঙ্গম করে বংশ বৃদ্ধির জন্যে। এখান থেকেই হয়তো মহাত্মা গাঁধি তাঁর আত্মজীবনীতে নারী পুরুষের মিলন শুধু বংশ বিস্তারের জন্য করার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে মানুষের জন্য প্রকৃতির ভাবনা ছিল ভিন্ন। মানুষ তাই যৌন সঙ্গমে মিলিত হয় শুধু বংশ বিস্তারের জন্যই নয়, পরস্পরকে উপভোগ করার জন্যও। মানুষ যখন অনেক ক্ষেত্রেই নারীর মতামতের অপেক্ষা না করে জোর করে তাকে ভোগ করে, অনেক সময় একাধিক পুরুষ এ কাজে লিপ্ত হয়, কুকুরদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে চাওয়ার প্রবলতা আছে, কিন্তু জবরদস্তি নেই বলেই মনে হয়। পুরুষ কুকুর বা কুকুরেরা বিভিন্ন ভাবে নারীর মন জয় করার চেষ্টা করে, এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে, কিন্তু একবার নারী কাউকে গ্রহণ করলে অন্যেরা সরে যায়, মানুষের মত সবাই মিলে একজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে না। এক কথায় গৃহপালিত জীবজন্তুদের কাছ থেকেও মানুষ অনেক কিছুই শিখতে পারে।
ধীরে ধীরে সময় যাচ্ছে। আমিও ফিরে আসছি কাজেকর্মে। সাথে সাথে ফিরে আসছে পুরানো অসুখগুলোও। ব্লাড থিনার খাওয়ার ফলে নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হয়েছিল, তাই ডাক্তার সেটা বন্ধ করে দিয়েছেন। সে অর্থে এখন আর করোনা পরবর্তী রিহ্যাবিলিটেশনের জন্য কিছু খাচ্ছি না, তবে বিভিন্ন ওষুধে লিভারের বেশ ক্ষতি হয়েছে, তাই এখন সেটাকে চাঙ্গা করে তুলতে হচ্ছে, কেননা লিভার ঠিক না হলে কোলেস্টেরলের জন্য ওষুধ খাওয়া যাবে না। সারা জীবন সেলফ কনসিস্টেন্ট মানে পরস্পরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমস্যার সমাধান করে গেছি। এখন দেখছি শরীরটাও সে রকম। এক জায়গায় জোয়ার এলে অন্য জায়গায় ভাঁটি। ইতিমধ্যে ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। ২৫ সেপ্টেম্বরের পর ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মত মস্কো গেলাম, এই সুযোগে দুতাবাসেও একটা ঢুঁ মারা হল, অনেকের সাথে দেখা হল, অনেকের বক্তব্য শোনা হল একুশ উপলক্ষে। আমি বরাবরই ভাল শ্রোতা। এ রকম অনুষ্ঠানে আমার যাওয়া মানে বক্তাদের একজন মনোযোগী শ্রোতা পাওয়া।
২২ তারিখে ক্লাস নিলাম তৃতীয় বর্ষের ছাত্রদের। প্রথম বারের মত। গত সেমিস্টার ছিল অনলাইন ক্লাস। তাই অনেক দিনের পরিচিত মানুষদের সাথে নতুন করে পরিচিত হলাম। অনেকটা ফেসবুক বন্ধুদের সাথে প্রথম ফেস টু ফেস পরিচয় হওয়ার মত। দেখলাম আমি এভাবে ক্লাস নিতেই বেশি কনফিডেন্ট ফিল করি। ওরাও বলল এভাবেই নাকি ভাল। আসলে লাইভ ব্যাপারটাই যেকোনো কাজে জীবনের ছোঁয়া নিয়ে আসে।
গত কয়েকদিন আবার প্রেসার ঝামেলা করছে। মাঝে ব্লাড থিনার খেয়ে প্রেসায় লো হচ্ছিল, গত কাল মস্কো থেকে ফেরার পর দেখি ১৭৬/১০৫। এটা আমার নতুন রেকর্ড। ওষুধ খেয়েও প্রেসার নামাতে পারছি না। পরে ইমারজেন্সিতে ফোন করলে ওরা চলে এল রাত দুটোয়। পেসার মাপল। ইসিজি করল। ওষুধ দিল। বলল, ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে ওষুধ ঠিক করতে। এক কথায় আবার নতুন করে জীবন শুরু হয়েছে আমার আর আমার বিভিন্ন ছোটোখাটো অসুখ বিসুখেরও। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল
গত শনিবার আমার প্রেসার ছিল ১৬০/৯৫। আবহাওয়ার কারণে আমার প্রায়ই এমন হয়, থাকে বেশ ক’ দিন। তবে
সেদিন প্রেসার আর মাথা ব্যথার ওষুধ খেলে বেশ তাড়াতাড়ি সব ঠিক হয়ে গেল। রবিবার
দুপুরে গেলাম মস্কো। বাচ্চাদের সাথে সময় কাটালাম, দূতাবাসের একুশের অনুষ্ঠানে
গেলাম। কোন রকম ডিসকমফোর্ট ফিল করিনি। সোমবার
সকালে ক্লাসে যাওয়ার আগে প্রেসার
মেপে দেখি ১৭০/১০০। এটা আমার পুরনো প্রেসার মাপার যন্ত্র, রিস্ট টোনোমিটার। ভাবলাম হয়তো নষ্ট হয়ে গেছে, তাই গুরুত্ব দিলাম না। ইউনিভার্সিটির মেডিক্যাল অফিসারকে দেখানোর কথা ভেবেছিলাম সেটাও হয়ে উঠল না। এরপর বাসায় ফেরার পথে কয়েকটা দোকানে গেলাম, নিজের আর সেভার জন্য বেশ কিছু জিনিসপত্র কিনলাম। রাত ন' টার গাড়িতে দুবনা ফিরলাম। দুবনায় এসে ড্রাইভারের সাথে হালকা কথা কাটাকাটি হল। বাইরে মাইনাস ২০, ও আমার বাসার ওখানে যেতে চাইছে না। সারাদিন এত দৌড়াদৌড়ি, কোন রকম অস্বস্তি ছিল না। রাত একটার দিকে কী মনে করে প্রেসার মেপে দেখি ১৭৬/১০৫। ওষুধ খেলাম, কমল না। এরপর ইমারজেন্সিতে ফোন করে জানতে চাইলাম কি করব? ওরা আরেকটা ওষুধ খেতে বলল, না কমলে যেন আবার ফোন করি। বাসায় অনেক কুকুর বিধায় রাতের দিকে আমি ওদের বাসায় ডাকি না। অনেকেই কুকুর ভয় পায়। তবে কিছুতেই প্রেসার না কমায় ওদের বাসায় ডাকতে হল।
অনেক দিন পরে মস্কো যাওয়া হল। মস্কো যাওয়া মানে শুধু ক্লাস নেওয়াই নয়, ছেলেমেয়েদের সাথে দেখা হওয়া। সেভার সাথে শেষ দেখা হয়েছিল ডিসেম্বরের ২৬ তারিখে, ও দুবনা এসেছিল। ক্রিস্টিনার সাথে শেষ দেখা ১০ ডিসেম্বর যখন ও দুবনা আসে। এর পরেও ও অবশ্য এসেছিল ৩০ ডিসেম্বর, আমি দ্মিত্রভ হাসপাতালে ছিলাম। মনিকার সাথে তো শেষ দেখা সেই ২৫ সেপ্টেম্বর। বাসায় গিয়ে দেখি সেভা সুপ রান্না করছে, মেয়েরা ঘুমে। ওরা উঠতে উঠতে আমার দূতাবাসে যাওয়ার সময় হয়ে এলো। যখন ফিরলাম, মনিকা গেছে বান্ধবীর ওখানে। পরের দিন সকালে ক্রিস্টিনা দুবনা গেল ফটোসেশনে। ক্লাস থেকে ফিরে দেখি মনিকা কাজে চলে গেছে। আমি ওদের জন্য যে উজবেক প্লভ রান্না করে নিয়ে গেছিলাম সেটা আর সেভার সুপ খেলাম। গুলিয়াও মস্কো এসেছিল কাজে, আমরা রাতে ফিরে দেখি ক্রিস্টিনা আর আন্তন গেছে আন্তনের বন্ধুর ওখানে। পরের দিন ওর আবার ফটো সেশন। আগে আমি ওদের ছবি তুলতাম। এখনও বলে, আমিই তুলি না। তবে বলেছি বসন্তে মস্কোয় কিছু ছবি তুলে দেব, ওর আর ওর বান্ধবীদের। ক্রিস্টিনার ছবি অবশ্য সিমিওনকে বললে তুলে দেবে, কিন্তু অন্য লোকের ছবি তো ওকে বিনে পয়সায় তুলতে বলতে পারি না, তাই আমাকেই ওটা করতে হবে। আসলে এই বয়সে বাবার কাছে পোজ দেওয়ার চেয়ে বাবার তরুণ বন্ধুদের কাছে পোজ দেওয়া অনেক রিল্যাক্সড, তাই আমিই বলে দিই। মনিকা আসবে উইক এন্ডে বান্ধবীকে নিয়ে ছবি তুলতে। আমাদের ক্লাবেই। বলল, তোমাদের ডিস্টার্ব করব না, আমরা দু দিনের জন্য একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নেব। আসলে বাসায় এত কুকুর যে আমার নিজেরই ওদের ডাকতে ইচ্ছে করে না। তবে নিজেরা একা একা থাকতে থাকতে এখন আর ছেলেমেয়রা দু তিন দিনের বেশি থাকলে আমি নিজেই অস্বস্তি ফিল করি। কারণ ওদের ধারণা ওরা আমার গেস্ট, ফলে সব আবদার আমার কাছে। বনে বা নদীতে ঘুরতে যাওয়া, বাজার করা, রান্না করা সব। আমার যে খারাপ লাগে তা নয়, তবে আমি সব করি নিজের খেয়াল খুশি মত। আর এখানে এক ধরণের দায়িত্ববোধ ঘাড়ের উপর ভূতের মত জেঁকে বসে থাকে। তাছাড়া ওরা আসে দুদিনের জন্য রেস্ট নিতে, তার উপর যদি কুকুরের অত্যাচার সহ্য করতে হয়, সেটা কষ্টকর। আসলে কুকুর, বেড়াল, মানুষ এসব নিয়েই জীবন। সংসারকে রুশে বলে সিমিয়া বা সেমিয়া, মানে সাতটা আমি। যেখানে এত আমি সেখানে বিভিন্ন মত, বিভিন্ন ইন্টারেস্ট থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। সবার উপর নিজের মত চাপিয়ে দিলে সেটা তো আর সংসার হয় না, হয় জেলখানা, বড় জোর স্বৈরতান্ত্রিক দেশ। ফেসবুকে এসবের বিরুদ্ধে বলব, আর বাড়িতে স্বৈরাচারী হব, সেটা তো কোন কথা হল না। এক কথায় ধীরে ধীরে গতানুগতিক কাজের ট্র্যাকে ফিরে আসছি মানে করোনার বলয় থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।
২০২০ সালের ৬ ডিসেম্বরের পরে ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম বারের মত ইনস্টিটিউট গেলাম। ৬ ডিসেম্বর থেকে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমাদের ওখানে যাওয়া নিষেধ ছিল। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে যাতায়াত শিথিল করলেও কর্তৃপক্ষ চায় আমরা যাতে যতদূর সম্ভব বাসায় বসেই কাজ করি। এর মধ্যে অনেকেই অসুস্থ্য হয়েছে। পুরাদমে ভ্যাকসিন দেওয়া চলছে। মোটামুটি ৭০% কর্মীদের ভ্যাকসিন দেওয়া হলে হয়তো ইনস্টিটিউট নর্মাল অবস্থায় ফিরে যাবে। অফিসে গিয়ে মনে হল না যে প্রায় তিন মাস সেখানে আসিনি। আমি কখনোই খুব একটা মেলামেশা করি না, সোজা অফিসে ঢুকে সারাদিন ওখানেই কাটিয়ে দিই। তবে আজ মনে হল লোকজন বেশ কম। অফিস সেক্রেটারিদের সাথে দেখা হল। কিছু কাগজপত্রে সই করতে হল। জিজ্ঞেস করল শরীরের ভালমন্দ। তবে আবারও বুঝলাম এ পৃথিবীতে কারও জন্যই কিছু বসে থাক না। কেউ চলে গেলে দু একদিন তাকে নিয়ে কথা বলে। তারপর সব চলে নিজ গতিতে। আসলে আত্মীয় স্বজন আর কিছু বন্ধু বান্ধব ছাড়া প্রকৃতি, জীবজগৎ আর অধিকাংশ মানুষই অধিকাংশ মানুষের প্রস্থান টেরই পায় না।
ইতিমধ্যে অব্রাজেও এক্সিবিশনের প্রস্তুতি চলছে। ফোকাসে আমরা বলতে গেলে সারা বছরই গেছি। ফোকাস বন্ধ ছিল না, কিন্তু অব্রাজ বন্ধ ছিল। তবে প্রতি বছর মার্চের শুরুতে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে অব্রাজের পক্ষ থেকে আমরা ছবি প্রদর্শনী করি সেটা এবারও হবে। এবার ছবির সিলেকশন প্রসেস ছিল অনলাইনে। ইতিমধ্যে প্রিন্টের কাজ শেষ। এখন ছবি ফ্রেমে সেট করার কাজ চলছে। আগামী ৩ মার্চ ওপেনিং, তবে বরাবরের মত এবার এদিন ফটোগ্রাফারদের সাথে মতবিনময় অনুষ্ঠান হবে না, সেটা হবে ২৮ মার্চ ক্লোসিং সেশনে। এক সময় আমি রেগুলার পার্সোনাল এক্সিবিশন করতাম। এখন সেটা গরীবের ঘোড়া রোগের মত মনে হয়। যদিও দুবনায় আমার ছবির সমঝদার কম নয়, অনেকেই জিজ্ঞেস করে পরবর্তী এক্সিবিশন কবে, তবুও খরচের কথা ভেবে প্রায় বছর দশ আর একক প্রদর্শনী করা হয় না। ইদানীং ফোকাস থেকেও আমরা আর প্রিন্টেড ছবির প্রদর্শনী করি না, করি অনলাইন। মূল কারণ দর্শকের অভাব। সবাই এখন অনলাইনে এসব দেখতে অভ্যস্ত। অব্রাজ এখনও ট্র্যাডিশন ধরে রেখেছে। আমি রেগুলার সেখানে অংশ নিই। কেননা একমাত্র ঠিকঠাক প্রিন্ট করার পরেই বোঝা যায় একজন ফটোগ্রাফার কতটুকু সফলভাবে নিজের আইডিয়াটা রিয়ালাইজ করতে পেরেছে। এবের আমার বারোটা ছবি সিলেক্ট করেছিল, এরমধ্যে তিনটের প্রিন্ট ঠিকঠাক হয়নি। দুটো একটু ডার্ক, আরেকটা একটু লালচে।
২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে রেগুলার অফিস করছি। শেষ পর্যন্ত যেন হাঁফ ছেঁড়ে বাঁচা গেল। এখন আর সব সময় বাড়িতে বসে থাকতে হয় না। ২৪ তারিখে ক্রিস্টিনা ভোলগায় ঘুরতে গেল। ওরা দুবনায় এলে ভোলগায় যাবেই যাবে। আমিও গেলাম ওর সাথে। কয়েকটা ছবি তুললাম দুজনে। এরপর ও আমাকে কিছুটা পথ এগিয়ে দিল। ও গিতিসে ভর্তি হতে চাইছে। এটা মস্কোর বিখ্যাত থিয়েটার ইনস্টিটিউট। গতবার চান্স পেয়েছিল, আলসেমি করে সময় মত ডকুমেন্ট জমা দেয়নি। এ জন্যে ও স্টেট কোরাসের চাকরি ছেঁড়ে দিয়েছে। গতকাল গেছিল আরেকটা ইন্টারভিউতে। সেটাও এক নাম করা ভোকাল গ্রুপে। ওদের পছন্দ হয়েছে, তবে শর্ত ও গিতিসে চলে যেতে পারবে না। ও রাজী হয়নি। বলল, "স্বপ্নের জন্য লড়াই করতে হয়, অনেক কিছুই ত্যাগ করতে হয়। ওর অনেক দিনের স্বপ্ন গিতিসে ভর্তি হওয়া।" আমি ওর সিদ্ধান্ত সমর্থন করি। অফিস খোলায় একটা সুবিধা হয়েছে। মানসিক ভাবে যে বন্দী দশা ছিল সেটা কেটে গেছে। যদিও পুরো বছরটাই আমি ভোলগায় বা বনে ঘুরে বেরিয়েছি, ছবি তুলেছি, দুবনার আশেপাশে অনেক জায়গায় গেছি, তবুও চাইলেই অফিস যেতে পারছি না এটা ছিল অসহ্য। আসলে আমাদের জন্য অফিসটাই এক সময় বাড়ি হয়ে দাঁড়ায়। তত্ত্বীয় পদার্থবিদদের অফিসে দেখলে এখানে বলে, "কি রেস্ট নিতে এলে মনে হয়?" আসলে আমরা কাজে যাই রেস্ট নিতে। হ্যাঁ, নিজেকে এখন পরিপূর্ণ মানুষ বলে মনে হচ্ছে।
এতদিন অনলাইনে ক্লাস নিয়েছি, তাই লেকচারগুলো রেকর্ড করে রাখা হত। ছাত্রছাত্রীরা বলল, আমি যেন বাসায় অন্তুন লেকচারগুলো রেকর্ড করি। আজ অফিসে সেটা করতে গিয়ে দেখি বার দুয়েক আমি আমি থেমে গেছি। ঠিক ঘুম নয়, হঠাৎই যাকে বলে ব্ল্যাক আউট, যদি মাত্র ৩০-৪০ সেকেন্ডের জন্য। ডাক্তার সেদিন বলেছিলেন করোনার পরে অনেকেরই এমন হচ্ছে। আমি যেন নিউরলজিস্টের সাথে কথা বলি।
গুলিয়াকে দেখি কাজকর্ম করে যাচ্ছে। সমস্যা যে নেই, তা নয়, তবে এ নিয়ে ভাবে না। আমার সমস্যা মনে হয় আমি টপ টু বোটম পদার্থবিদ বা গবেষক বলে, কোন কিছু যেমন হওয়ার কথা তা না হলেই কারণ খুঁজতে লেগে যাই, এ নিয়ে ভাবতে শুরু করি। এটা ভাল বা মন্দ নয়। উদ্দেশ্য একটাই নিজেকে, নিজের সমস্যাগুলো কী ও কেন, সেটা জানা। যেহেতু ডাক্তার নই, উত্তরের চেয়ে প্রশ্নই বেশি।
এতদিন ভোলগায় বা বনে ঘুরলেও নিজেই চেষ্টা করেছি লোকজন এড়িয়ে চলতে। এখন যেহেতু অফিসে যাচ্ছি, তাই ইচ্ছা অনিচ্ছায় অনেকের সাথেই দেখা হয়। একটা জিনিস খেয়াল করলাম, যাদের
সাথে কমবেশি বন্ধুত্ব ছিল, তারা দু চারটে কথা জিজ্ঞেস করলেও হ্যাণ্ডসেক করে না, কথাবার্তাও
যেটুকু না বললেই না সেটুকুই বলে আর যারা অল্প পরিচিত, মানে যাদের সাথে আগে দেখা
হলে শুধু হাই বলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতাম, তারা মূলত কথাবার্তা এড়িয়ে যায় যেন চিনেই
না। এটাই মনে হয় করোনা পরবর্তী নতুন সমাজের, নতুন সম্পর্কের চিত্র। কেননা এখন যারা
অফিসে যাচ্ছে তারা হয় ভ্যাকসিন নিয়েছে অথবা করোনা আক্রান্ত হয়ে তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি
তৈরি হয়েছে। এই যে একটা সাইকোলজিক্যাল স্টেরেওটাইপ তৈরি হয়েছে, সেটা একদিনে যাবে বলে
মনে হয় না। তাই করোনা সিনড্রোম আরও অনেক দিন
থাকবে বলেই আমার বিশ্বাস। ভিয়েতনামের যুদ্ধ শেষ হয়েছে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে তবে
সেই সিনড্রোম এখনও যায়নি। কয়েক দশক পরেও যদি করোনা সিনড্রোম আমাদের তাড়া করে বেড়ায়
অবাক হবার কিছুই থাকবে না। অনেক সমস্যা আগে যেটা কেউ খেয়ালই করত না এখন এমনকি কেউ
হাঁচি দিলেও সবাই সেটাকে করোনার মাইক্রোস্কোপে দেখে। ভবিষ্যতেও দেখবে বলেই মনে হয়।
মাঝে মাঝে ভেবে পাইনা আমি কি সুস্থ্য হচ্ছি নাকি অসুস্থ্য হচ্ছি। করোনা সেরেছে, তার জায়গায় আসছে নতুন সমস্যা, ছোটোখাটো কিন্তু সংখ্যায় অনেক। আমি কি ভয় পাচ্ছি? না। ভয়ের কথা মনে হলে আমার পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে। বাচ্চাদের যখন ইঞ্জেকশন বা টিকা দিতে ক্লিনিকে নিয়ে যেতাম, গুলিয়ার সাথে গেলে ওরা আগে থেকেই কান্নাকাটি শুরু করত। কারণ একটাই। গুলিয়া আগে থেকে নিজেই ভয় পেত, বাচ্চাদের কষ্ট হবে ভেবে ওর চোখ দিয়ে জল পড়তে শুরু করত। তাই এরপর থেকে আমিই যেতাম। আমি জানতাম, আর যাই হোক ইঞ্জেকশন বা টিকা আমাকে দিচ্ছে না, তাই ব্যথাটা আমার লাগবে না। হাজারো শিশু প্রতিদিন এসব নিচ্ছে, সবাই তো বহাল তবিয়তে আছে। তাই আমি কোন রকম ভয় বা দুশ্চিন্তা করতাম না। তাতে বাচ্চারাও সাহস পেত। মরণটাও তাই। যে মরে সে টেরই পায়না। মৃত্যুর পর যদি সব কিছু এতই খারাপ হত এত দিনে কেউ না কেউ ঠিকই বিদ্রোহ করত, কেউ না কেউ ঠিক ফিরে আসত। সেটা যখন হয়নি, তাই এ নিয়ে ভাবার কিছুই নেই। আসলে কষ্ট তাদের যারা বেঁচে থাকে। কিন্তু সেটাও সাময়িক। কেননা সবকিছুর পরেও আমরা বেঁচে আছি, বেঁচে থাকি, কাজকর্ম করি, সন্তান সন্ততিদের মানুষ করি, এক কথায় দিব্যি সময় কাটিয়ে দিই। এই করোনা কালে কত ভাল মানুষের সাথে যে পরিচয় হল। দুঃখ একটাই, এই পরিচয়টা হল মরণোত্তর। এখনই সময় দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠে রবীন্দ্র সঙ্গীত শোনার
আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহ দহন লাগে।
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।।
তবু প্রাণ নিত্য ধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা,
বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে।।
তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে,
কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে।
নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ, নাহি নাহি দৈন্যলেশ --
সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে।।
দুবনা, ফেব্রুয়ারি ০৭ - ২৬, ২০২১


Comments
Post a Comment