সমান্তরাল জীবন
অভিকে একটা বিশাল বিল্ডিঙের নামিয়ে দিয়ে ওর ভাই চলে গেল। চাইলে অবশ্য অপেক্ষা
করত। অভি নিজেই চায়নি। পার্সেল হতে হতে ওর বিরক্তি ধরে গেছে। অভি দেশ ছেড়েছে উনিশে
পা দেওয়ার আগে। এর আগে জীবন কেটেছে গ্রামে। অভি ছিল বাবা মার শেষ সন্তান। ও যখন জন্মায়
বাবার বয়স তখন ৫৬। তাই বাবা ওকে একা কোথাও একটা
যেতে দিতেন না। ফলে না হয়েছে দেশটা দেখা, না হয়ছে তাকে চেনা। আজকাল এমন কি নিজের
গ্রাম পর্যন্ত ঠিকঠাক চিনতে পারে না। নতুন লোকে ভরে গেছে গ্রাম। আগে যেসব মাঠে বর্ষায়
ধান আর শীতে সর্ষে জন্মাত আজ সেখানে জন্মায় মানব সন্তান। লোকে লোকারণ্য চারিদিক। নতুন
নতুন বাড়িঘর উঠছে। নতুন নতুন উপাসনালয়, স্কুল, কলেজ, এমন কি ফ্যাক্টরি। গ্রাম তো নয়,
যেন শহর।
এই বিশাল বিল্ডিঙের সামনে দাঁড়িয়ে অভি ভাবছে ওর বন্ধুর কথা। প্রায় তিরিশ বছর পরে ওদের
দেখা হবে। উত্তেজনায় অভি ভুলে গেছে বিল্ডিঙে ঢোকার কথা। যখন সম্বিৎ ফিরে পেল, গেটে
নক করল। গেট কীপার গেট না খুলেই জিজ্ঞেস করল
- কাকে চাই?
- আমি টমি সাহেবের সাথে একটু দেখা করতে পারি?
- ঐ নামে তো এখানে কেউ থাকে না।
অভি তো আকাশ থেকে পড়ল। তাহলে কি ও ভুল ঠিকানায় এসেছে? নাকি ওর বন্ধুর অন্য কোন পোশাকি নাম আছে? কী করবে এখন? আসলে অভির এই এক দোষ। ক্লাসমেটদের কারও ভালো নাম জানে না। মানে যাদের ডাক নাম ছিল ওদের শুধু ঐ নামেই জানে। এমনও তো হতে পারে ওর বন্ধু এই বাড়িতেই থাকে, শুধু অন্য নামে। মুহূর্তের মধ্যে হাজারটা সম্ভাবনা ঢেউ খেলে গেল ওর মাথায়। ও এই শহরে কিছু চেনে না। ভাইকে বা পরিচিত অন্য কাউকে ফোন করলে নিয়ে যাবে। কিন্তু সেটা কেমন দেখাবে। এত আশা নিয়ে এসে দোর থেকে ঘুরে যাবে? অনেকক্ষণ ভেবে শেষ পর্যন্ত টমিকে ফোন করল।
- টমি, আমি অভি বলছি। তোর দেওয়া ঠিকানায় এসে নীচে অপেক্ষা করছি। তবে গেট কীপার বলল টমি নামে কেউ এখানে থাকেন না। আমি কি ভুল ঠিকানায় এসেছি?
- তুমি অপেক্ষা কর। আমি দেখছি।
তুমি? টমি আমাকে তুমি বলে সম্বোধন করল? দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অভির স্মৃতিতে ভেসে উঠল ওদের মস্কো জীবনের কথা। ওরা ১৯৮৩ সালে মস্কো যায়। টমি ওর এক সপ্তাহ আগে। এরই মধ্যে ও অনেক কিছু শিখে ফেলেছে। দু চারটে রুশ শব্দ জানে। টমি এখন নীচে কমন বাথরুমে স্নান করতে একটুও লজ্জা পায় না। একা দোকান থেকে রুটি মাখন পর্যন্ত কিনে আনতে পারে। অভির কাছে এসবই স্বপ্নের মত মনে হয়। তবে সপ্তাহ খানেক পরে অবশ্য অভিও এসব শিখে যায়। ওরা ক্লাস শেষে প্রায়ই বনে হাঁটতে যায়। কত রকমের গল্প যে করে তা বলে শেষ করা যাবে না। নিজেদের গ্রামের গল্প, স্কুলের গল্প, প্রেমের গল্প কোন কিছুই বাদ ছিল না। এক সাথে রান্না করেও খেত। ওদের বন্ধুত্ব ছিল সর্বজন বিদিত। ঐ সময় প্যাট্রিসে অমল দা আর হামিদ ভাইএর ডাক সাইটে বন্ধুত্ব ছিল। ঘটনা এমন দাঁড়ায় যে অভি আর টমিকে এক সাথে দেখলে অনেকেই বলত দেখ দেখ অমল দা আর হামিদ ভাই এসেছে। যতই দিন যেতে থাকল ওদের সম্পর্ক ততই গাঢ় হল। শুরু হল সিনেমা দেখা, বারে যাওয়া, শনিবার করে ডিস্কোটেকায় নাচা, মাঝে মধ্যে ভদকা খাওয়া। দেখতে দেখতে বছর কেটে যাবে। অভি চলে যাবে শহরের কেন্দ্রে অন্য হোস্টেলে, টমি থাকবে আগের জায়গায়। অভি প্রায়ই এসে রাত কাটাবে টমির ঘরে। তারপর এক সময় টমি প্রেম করবে। মস্কোয় প্রতি বছর জনা পঁচিশ ছেলে এলেও মেয়ে আসত হাতে গনা দু একজন। অভির মনে হবে বুয়েটে ভর্তির কথা। ১৯৮২-৮৩ সালে মোট সীট ছিল পাঁচ শ’র মত, ভর্তি পরীক্ষায় বসেছিল চার হাজার আর ভর্তির আবেদনপত্র জমা পড়েছিল হাজার কুড়ি। মস্কোয় মেয়েদের পেছনে প্রতিযোগীর সংখ্যা অভির মনে হত বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষাকেও অতিক্রম করে যেত। দুই বছর পরে যখন শমি আসে, অন্যদের মত অভি আর টমি দুজনেই মনে মনে আবেদনপত্র জমা দেয়। শমিকে নিয়ে দুজনে প্রায়ই একসাথে ঘুরতে যেত মস্কোর বিভিন্ন জায়গায়। অভি ছবি তুলতে পছন্দ করত, তাই ক্যামেরা কাঁধে ঝোলানোই থাকত, কত ছবি যে তুলত! এভাবে ঘুরতে ঘুরতে একসময় টমির সাথে শমির সম্পর্ক হল। প্রথম কথা দেওয়া, প্রথম চুমু খাওয়া এসব হল অভির সামনেই। সেসব ঘটনা অভির ক্যামেরাবন্দী হল। তারপর একসময় ওরা চলে গেল মসফিল্মে অন্য হোস্টেলে। অভি ছিল ওদের ঘরের নিত্য দিনের অতিথি। ওদের ওখানে আজান না দিলে অভির পেট ভরত না। এসব ভাবতে ভাবতে অভি যখন আশির দশকে হারিয়ে গেছে ঠিক তখনই গেট কীপারের ডাকে ওর ঘোর কাটল।
- স্যার, ডাক্তার সাহেব আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমাকে ব্যাগটা দিন, আমি পৌঁছে দিচ্ছি।
- তার দরকার হবে না, আমিই নিচ্ছি। কীভাবে যাব বলুন।
- এইতো লিফট। আট তলায় বাঁ দিকের দরজা।
- অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
লিফটে ওঠার আগে অভি আবার ব্যাগটা চেক করল। না, তেমন কিছু নেই। টমি স্তালিচনায়া ভদকা খুব পছন্দ করত, সাথে কালো রুটি আর সালা, সল্টেড শসা আর ছিল অ্যালবাম। তাতে ছিল অভির বৌ আর বাচ্চাদের ছবি। ইদানিং সোভিয়েত বন্ধুরা বিভিন্ন খেলা খেলছে সামাজিক মাধ্যমে, যেমন প্রিয় গান বা অ্যালবাম পোস্ট করা, প্রিয় বই, ছবি ইত্যাদি। এ থেকে অভি বুঝে গেছে পুরনো দিনের স্মৃতির ছবি পেয়ে সবাই যারপরনাই আনন্দিত হয়। তাই অভি পুরনো নেগেটিভ খুঁজে খুঁজে টমি শমির কিছু আন্তরিক মুহূর্ত যেমন প্রথম কথা দেওয়া, প্রথম চুমু এসবের ছবি প্রিন্ট করে এনেছে। সাথে ওদের প্রথম সন্তান অমির বেশ কিছু ছবি। হাসপাতাল থেকে অমিকে আনা, ওর প্রথম জন্মদিন, ওদের তিন জনের মস্কোর বিভিন্ন পার্কে ঘুরে বেড়ানো এসব ছবি। না, কোন কিছু ভুলে ফেলে আসেনি। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অভি। এরই মধ্যে লিফট এসে থামে আট তলায়। লিফট থেকে বেরিয়েই দেখে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। একগাল সাদাকালো দাড়ি, মাথায় নামাজের টুপি। নিয়মিত নামাজ পড়ার সাক্ষী ওর ধবধবে কপালে। পরনে লম্বা পাঞ্জাবী আর পাজামা। অভি একটু থমকে যায়। এই কি ওর চিরচেনা টমি?
- অভি!
দরাজ গলায় ডেকে দু হাত প্রসারিত করে এগিয়ে আসে টমি। সেখানে আন্তরিকতার কোন
অভাব নেই। অভি টমির গলায়, টমির প্রসারিত হাতে, আলিঙ্গনে পুরনো টমিকে ফিরে পায়। মুহূর্তের
মধ্যে সব সন্দেহ দূর হয়ে যায় ওর মন থেকে।
ঘরে ঢুকে অভি বুঝতে পারে টমির জীবন প্রাচুর্যে ভরপুর। বিশাল বাসা। টমি একের পর এক সব
দেখাতে থাকে। কয়টা বেডরুম, কয়টা বাথরুম,
গেস্ট রুম, ড্রয়িং রুম – কোন কিছুই বাদ যায় না। এসব দেখার পর অভি যখন সোফায় বসার সুযোগ
পায়, ধীরে ধীরে বের করতে থাকে টমির জন্য আনা সামান্য উপহারগুলো। উপহারে তেমন কিছু ছিল না শুধু স্মৃতি আর ভালবাসা ছাড়া। ভদকার বোতল, কালো রুটি, সালা, শসা আর সব শেষে অ্যালবাম। অভি অবশ্য এর মধ্যেই খেয়াল করেছে ঘরে কাবা শরীফের ছবি ছাড়া তেমন কিছু নেই। মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট বা বর্তমানে বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের শখ করে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ইংরেজি, বাংলা বিভিন্ন ভাষার নামকরা কবি সাহিত্যিকদের বইপত্র কিছুই নেই। এমন কি দামী কোন বুক সেলফও চোখে পড়ল না। কে জানে, হয়তো ওর মত টমিও ইবুক পড়ে। এসব ভাবতে ভাবতে আর উপহারগুলো নামাতে নামাতে অভির চোখ পড়ল টমির চোখে। বিস্ফারিত নয়নে টমি তাকিয়ে আছে অভির উপহারগুলোর দিকে। অভি বুঝতে পারছে না, ওটা কি ঘৃণা, বিস্ময়, ক্ষোভ না অন্য কিছু। পরিবেশটা একটু হালকা করার জন্য অভি বলল
- কিরে টমি, শমি কোথায়? ওকে দেখছি না। বাসায় নেই নাকি? অমি তো অনেক বড় হয় গেছে। ও নিশ্চয়ই অন্য কোথাও থাকে?
কথা শেষ হতে না হতেই অভি দেখল এক ভদ্রমহিলা ঢুকলেন ড্রয়িং রুমে। আপাদমস্তক বোরকায় ঢাকা। এমন কি মুখও। অভির আবার অবাক হবার পালা। কিছু বলার আগেই উনি বললেন
- আসসালামালাইকুম! কেমন আছেন?
- প্রিভিয়েত দারাগাইয়া (শুভেচ্ছা)। কেমন আছ শমি? তুমি আমাকে আপনি আপনি করে বলছ কেন? অমি কোথায়?
- এই আপনাদের চা। গল্প করুন। আমি কিচেনে যাচ্ছি।
অভি বোকার মত হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। আসলে ওরা বাসায় সব নিজেরাই করে। তাই কাজের লোকের কথা ও বেমালুম ভুলে গেছে। টমিও মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। কিছুক্ষণ পিন পতন নিঃশব্দতা। শেষ পর্যন্ত টমি মুখ খোলে।
- শোন তোকে বলা হয়নি। শমির সাথে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে দেশে ফেরার পরপরই। তোর সাথে তো যোগাযোগ ছিল না, তাই বলা হয়নি। অমি ওর সাথেই ছিল, এখন কোথায় জানি না। এখন যাকে দেখলি ও আমার দ্বিতীয় স্ত্রী।
- তাই বল। আমি ত জানতামই না। আমি যে না জেনে কথাগুলো বলে ফেললাম, তোর কোন অসুবিধা হবে না তো?
- কে জানে? আসলে ওরা আমার মস্কো জীবনের কথা, শমি, অমি কারও কথাই জানে না। শমির সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে এক সময় প্রচণ্ড ডিপ্রেশনের মধ্যে দিন কেটেছে। তখনই ওর সাথে আলাপ। ঠিক ওর নয়, চাকরি ক্ষেত্রে ওর বাবার সাথে আলাপ। ওর বাবা বড় আমলা, আর আরও বেশি কনজারভেটিভ। আমাকে বরাবর পছন্দ করতেন। তিনিই তাঁর মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে প্রস্তাব দেন তাঁর এক কলিগের মাধ্যমে। হ্যাঁ, বড় ধরণের টোপ ছিল। বাড়িঘরের অবস্থা দেখে কিছুটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস। তবে স্যাক্রিফাইস আমাকেও কম করতে হয়নি। তোকে আর নতুন করে কী বলব আমার নিজের সম্পর্কে, জীবনের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে। সব থেকে সরে আসতে হয়েছে। কপালের দাগ তো একদিনে হয়নি। কতদিন যে গান শুনিনি! তুই প্রিয় খাবার নিয়ে এসেছিস, কিন্তু খেতে পারব না। কতদিন একটা ভালো বই পড়া হয়নি, ভালো সিনেমা দেখা হয়নি। জীবনটা যেন থমকে গেছে। ভাগ্যিস রুশটা ভুলে যাইনি, তাই মন খুলে তোকে সব বলতে পারছি।
- সেতো বুঝলাম। কিন্তু শমি, অমি – ওদের কথা লুকিয়ে রাখছিস কেন, একটু বুঝিয়ে বলবি?
- কি বলব বল। সমাজটাই এই রকম। আমি তো আর ইউনিক কেউ নই। আমাদের বন্ধুদের কত জনেরই তো ডিভোর্স হয়ে গেছে। কত জন নতুন করে সংসার শুরু করেছে। কিন্তু পারতপক্ষে কেউই তাদের আগের সম্পর্কের কথা বলেনি, বলে না। আমার মত অনেকেই আজ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। আমার বিশ্বাস অনেকে শুধুমাত্র সামাজিকতার জন্যই পড়ে না, একেবারে বিশ্বাস করেই পড়ে। তুই ভদকা, সালা এসব নিয়ে এলি। আমি মাইন্ড করিনি। কিন্তু অনেকে এসব নিয়ে তোকে ঘরে পর্যন্ত ঢুকতে দিত না। আমার বৌ নিজের ইচ্ছায় বোরকা পরে, সত্যি বলতে ওর আর ওদের পরিবারের পীড়াপীড়িতেই আমার এই টুপি দাড়ি। কিন্তু আমাদের অনেকেই আজ নিজের থেকেই দাড়ি রাখে, টুপি পরে, বউদের হিজাব, বোরকা এসব পরায় আর নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে নিজেদের এখনও প্রগতির ধ্বজাধারী ভেবে মনে মনে খুশি হয়। এসব দেখে মনে হয় আমরা কখনোই প্রগতির বাণী, মানব মুক্তির বাণী, নারী পুরুষের সমান অধিকার এসব মন থেকে গ্রহণ করিনি। আমরা বা আমাদের অধিকাংশই সুবিধাবাদী, যখন যে আদর্শ, যে জীবন দর্শন আমাদের জন্য লাভজনক আমরা সেটাই গ্রহণ করি। এটা মধ্যবিত্তের দর্শন। আমরা সবাই তো নিম্ন বা উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। যত আদর্শের কথাই বলি না কেন, আমাদের সবারই উদ্দেশ্য ছিল পড়াশুনা করে ভালো চাকরি করা, অনেক টাকা উপার্জন করা, নিজের পরিবার নিয়ে সুখে শান্তিতে থাকা। সেটা দেশেই হোক আর বিদেশেই হোক। তখন বয়স কম ছিল, জীবনের অভিজ্ঞতা কম ছিল তাই আবেগময় বক্তৃতা দিয়েছি, দেশের জন্য, খেটে খাওয়া মানুষের জন্য প্রাণ দেব বলে চায়ের টেবিলে ঝড় তুলেছি। কিন্তু পড়াশুনা করে ডিগ্রী নিয়ে যখন একের পর এক স্যান্ডেল ক্ষয় করে চাকরি পেয়েছি, সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে হিমশিম খেয়েছি, সত্যিকারের জীবন যুদ্ধে অংশ নিয়েছি, তখনই বুঝেছি রক্ত আর আগের মত সস্তা নেই, অভিজ্ঞতার সাথে সাথে রক্ত দামী হয়েছে, তাই রক্ত দেওয়া আর আগের মত সোজা নয়, সোজা নেই।
- কে জানে? আমি তো দেশে থাকি না। অনেক কিছুই হয়তো বুঝি না। কিন্তু ফেসবুক বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে আমাদের ভিপুস্কনিকদের আক্টিভিটি দেখে মনে হয় ওরা সেই সময়টাকে খুব মিস করে। সেই সময়ের ছবি বা ঘটনার উপর যেসব আবেগময় কমেন্ট করে তাতে তো মনে হয় না আমরা সেই সময় নিয়ে লজ্জিত, সে সময়ের কথা বলতে দ্বিধান্বিত।
- এটা তোর মনে হয় তুই দেশে থাকিস না বলে। খুব দূরে যেতে হবে না। তুই আমার, শমির আর অমির একটা ছবি পোস্ট করে দেখতে পারিস। আমি কিছু মনে করব না। সত্যি বলছি, একেবারেই কিছু মনে করব না। সেটা আমাদের যৌবনের ছবি, আমাদের ভালবাসার ছবি। তুই তো আমাদের কথা সবই জানিস। আমাদের প্রেম, বিয়ে, অমির জন্ম সবই হয়েছে তোর চোখে সামনে। এমন সুখ আমার জীবনে আগে বা পরে কখনও আসেনি। এমন কি ফেসবুকের পাতায় হলেও ক্ষণিকের জন্যেও সেই সুখ ফিরে আসে, মুহূর্তের জন্য হলেও যদি বলতে পারি, দেখ দেখ একটা সময় ছিল, যখন আমিও সুখী ছিলাম, স্বাধীন ছিলাম – সেটা দেখাতে আমার আপত্তি থাকবে কেন? ভালো মন্দ সব মিলিয়েই জীবন। যেকোনো কারণেই হোক না কেন, সেই সময়, সেই সুখ আমি ধরে রাখতে পারিনি, কিন্তু সেটা তো আমি অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু যেটা গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি তা হল আমাদের ভিপুস্কনিকদের মধ্যে অনেকেই এই পোস্টের বিরোধিতা করবে। আমি কি ভাববো বা শমি কি ভাববে এসব অজুহাত তুলবে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, না আমি না শমি – আমাদের অতীত বা বর্তমান এসবে তাদের কিছু আগেও এসে যায়নি এখনও এসে যায় না। তাহলে তারা বলে কেন? বলে, কারণ তারা ভয় পায় নিজেদের অতীতকে। আমি বলছি না, আমরা খারাপ কিছু সেখানে করেছি। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নে যা স্বাভাবিক ছিল, আমাদের দেশে তা নয়। অন্য কথা বাদ দিলাম, গ্লাস হাতে কারও দুটো ছবি দিয়ে দেখ কি ঘটে? এরা কী এখন গ্লাস হাতে নেয় না? এরা কী এখন ঘরোয়া অনুষ্ঠানে নাচে না? এখনও এরা দামী দোকান থেকে দামী মদ কিনে খায়, গান বাজনা সব করে, কিন্তু করে গোপনে। এরা সোভিয়েত জীবন নিয়ে ততক্ষণই উত্তেজিত, আবেগময় যতক্ষণ না সেটা তাদের বর্তমান আর্থসামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে আঘাত না করে। সেই ভিত্তি কী? সেটা তার ধর্মীয় আইডেন্টিটি, মানে সে নামাজ পড়ে কিনা, সে তার বউকে হিজাব পরায় কি না, সে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে খাওয়া দাওয়া করে কিনা। এটাকে বলতে পারিস এক ধরণের পলিট কারেক্টনেস। যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ পলিট কারেক্ট থেকে অতীত স্মৃতি রোমন্থন করছে ততক্ষণ সব ঠিক। যখনই কেউ সেই রেড লাইন ক্রস করে দেখবি তাদের আসল চেহারা।
- তার মানে দাঁড়াচ্ছে এরা সবাই না হলেও একটা বিরাট অংশ অনবরত নিজেদের সাথে প্রতারণা করছে। সত্যের একটা বিরাট অংশ মিথ্যের মোড়কে ঢেকে রেখে শুধু আংশিক সত্য প্রকাশ করছে। নিজের জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, আর বিয়েটা নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে কাছের মানুষদের কাছ থেকে লুকিয়ে কিভাবে সুন্দর, সাবলীল, নির্মল সম্পর্ক গড়া যায় সেটা আমি বুঝি না। ভালো সম্পর্কের একটা মূল ভিত্তি হল ওপেননেস। সেটাই যদি না থাকে, তাহলে বন্ধুত্ব বলে তো কিছু থাকে না।
- দেখ, এই বাজার অর্থনীতির যুগে আমরা সবাই পণ্য, আমাদের আদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গি সব সব পণ্য। যে লোক এই মাত্র তোর কাছে প্রগতির বুলি ঝেড়ে ঝুলি খালি করছে, একটু পরেই তাকে দেখবি অন্য আড্ডায় প্রগতির শ্রাদ্ধ করছে। সেখানে সে প্রতিক্রিয়ার মূর্ত প্রতীক। সবাই মুখোশ পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনে আছে “ফান্টোমাস” মুভিটা? আমরা সবাই ফান্টোমাস। যখন যেখানে যে মুখোশ দরকার, তখন সেখানে সেটা পরি। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপারটা কি জানিস? আমরা নিজেরাই নিজেদের সত্যিকারের চেহারা ভুলে গেছি। আমরা নিজেরাই জানি না আমরা কে? প্রগতিশীল না প্রতিক্রিয়াশীল, আস্তিক না নাস্তিক। আমরা আজ মেরুদণ্ডহীন বায়বীয় পদার্থ, যখন যে পাত্রে রাখে তখন তার রূপ ধারণ করি। আমরা ভাবি এভাবে আমরা সব জায়গায় মানিয়ে চলে অন্যদের ম্যানিপুলেট করছি। আসলে আমরা শুধুই হাতিয়ার। অন্যদের হাতে তাদের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার। তুই ভাবিস না, এটা শুধু আমরাই করছি। হিন্দু, মুসলমান, তাভারিশ, ননতাভারিশ সবাই এভাবেই চলেছে।
- হুম! কিচ্ছু বদলায়নি।
- বদলায়নি মানে? সব বদলে গেছে। তুই কিছুই দেখতে পাচ্ছিস না।
- না রে। তোর কি মনে হয় না আমরা নিজেদের একেবারে অন্য ভাবে গড়ে তুলতে পারতাম? কত সুযোগ ছিল। শতাধিক দেশের ছেলেমেয়ে পড়ত আমাদের সাথে। শতাধিক সংস্কৃতি। কিন্তু আমরা কী করেছি? আড্ডা, পরনিন্দা, পরচর্চা, তাস পেটানো আর রাজনীতি ভেবে খুব ক্ষুদ্র পরিসরে সব ঘটনাবলীর বিচার করা। মস্কোর বৃহত্তর সমাজে আমরা থেকেছি বাঙ্গালী, তারপর নিজেদের ছোট ছোট হাজারো দলে ভাগ করে সময় পার করেছি। দেশে এর ব্যতিক্রম হবে কেন? আমার বিশ্বাস, সোভিয়েত ইউনিয়ন না ভাংলে অথবা বাম রাজনীতি বা সিপিবি আগের অবস্থানে থাকলে আমাদের অনেকেই হয়তো একটা বৃহত্তর প্ল্যাটফর্ম পেত নিজেদের জন্য। আর সেটা পায়নি বলেই যে যেভাবে পারছে, পেরেছে নিজেকে নতুন বাস্তবতায় মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। কেউ গেছে মসজিদে, কেউ ইস্কনে। কিন্তু সমস্যা হল সোভিয়েত জীবন আমাদের উপর একটা পার্মানেন্ট ছাপ ফেলে গেছে। সেটা সবার উপরই। আর এ কারণেই শত দ্বিধাবিভক্তির মধ্যেও আমরা পেছনে ফিরে যেতে চাই, তাই ভিপুস্কনিকরা যে দেশেই থাকুক না কেন, সেখানেই কোন না কোন ভাবে সঙ্গবদ্ধ থাকতে চায়। বিভিন্ন দেশে আলুম্নি এ্যাসোসিয়েশন সেটাই বলে। কসমোলজিতে মাল্টিভারস বলে একটা থিওরি আছে। সেখানে বলা হয় আমাদের ইউনিভার্সের মত অনেক অনেক ইউনিভার্স আছে। আমরা একই সময়ে বিভিন্ন রিয়ালিটিতে বাস করে একেক জায়গায় একেক কাজ করছি। তোর কথা শুনে তো তাই মনে হল। আমরা একই সঙ্গে বিভিন্ন গ্রুপে আছি যারা চরিত্রগত ভাবে সমান্তরাল বাস্তবতায় অবস্থান করছে আর এসব জায়গায় অবস্থান করে আমরা একই সাথে শান্তির দূত, মানবতার পূজারী, প্রতিক্রিয়াশীল, প্রগতিশীল আরও কত কি?
- একসময় তোর উপর খুব রাগ হত দেশে ফিরলি না বলে। এখন মনে হয় ভালই করেছিস না এসে। এখানে তুই টিকতে পারতিস না।
- কেন? তোরা পারলি, আমি পারব না কেন?
- এখানে টিকতে হলে প্রতিনিয়ত সব কিছুর সাথে কম্প্রোমাইজ করে চলতে হয়। তুই তো সেটা পারিস না।
- কে বলল? বন্ধুত্বও তো এক ধরণের কম্প্রোমাইজ। আমি কি তোদের অনেকের সাথেই
বন্ধুত্ব করছি না?
- মনে আছে, একদিন কাকুর বাসায় গেলাম আমরা ক’ জন মিলে। কী একটা ব্যাপারে কাকী কাকুকে
বললেন তোকে একটু বুঝিয়ে বলতে। কাকুর উত্তর মনে আছে?
- বল।
- কাকু বলেছিলেন, অভিকে বলে লাভ কি? ও কি শুনবে তোমার আমার কথা? ও কি জীবনে কারও কথা
শোনে?
- কথাটা ঠিক নয়।
- সেটা তোর ব্যাখ্যা। কাকুকেও বলেছিলি গোর্কির উদ্ধৃতি দিয়ে। “সবার কথা
শুনবি, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিবি নিজে”। তোর প্রিয় কোটেশনগুলোর একটা।
- তাহলেই দেখ, আমি অন্যদের কথা শুনি।
- কিন্তু কাকু কথা শোনার কথা বলতে “এক কান দিয়ে শোনা আর আরেক কান দিয়ে বের করা”র কথা
বোঝাননি। উনি মানার কথা বলেছেন।
- সেটা কাকুর সমস্যা। আমার নয়।
- এটা তোর আরেকটা ফিরমেন্নি মানে ট্রেডমার্ক বাণী।
- এই সেরেছে।
- কি হল আবার?
- না আজকাল লোকজন আমার বাণীর পেছনে লেগেছে কিনা, তাই।
- দেশের কথা কি বলব, তুই তো মস্কোতেই নিজেদের মধ্যে মানিয়ে চলতে পারতিস না। নিজের চিন্তাটাই বড় করে দেখতিস। তোকে বড় ভাইরা পছন্দ করত, তোকে নিয়ে অনেক আশা ছিল। তোকে তো ওদের কেন্দ্রীয় গ্রুপে নেওয়ার প্ল্যান ছিল। তুই কি করলি? অবিসংবাদী নেতাকে চ্যালেঞ্জ করলি, তাকে মাফ চাইতে বললি। আমার যতদূর বিশ্বাস তার কমরেডরা তো বটেই, তার শত্রুরাও ঐ সময় তাকে এমন কথা বলার সাহস পেত না। দেশে তো আছি প্রায় তিরিশ বছর। খুব ভালো ভাবে জানি এখানকার নাড়িনক্ষত্র। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই বলছি এখানে তুই টিকতে পারতিস না।
- কে জানে? হয়তো হাড্ডিসার বলে আমাকে তেমন ফ্লেক্সিবল মনে হয় না। যাহোক আমি যখন যেখানে থাকি সে জায়াগাটা অন্তর থেকে ভালবাসি, তবে আমার মত করে। চেষ্টা করি ভালবেসে নিজের কাজটা করতে। এক কথায় প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করার চেষ্টা করি। তাই দেশের বাইরেও যেমন নিজেকে রিয়ালাইজ করতে
পারছি, দেশে এলেও তা পারতাম বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
- তুই নিশ্চয়ই আমাকে এভাবে দেখে অবাক হয়েছিস? নীচে যাইনি কেন জানিস? ভয় ছিল যদি আমাকে
দেখেই আবাউট টার্ন করে চলে যাস। আমি তো তোকে
হাড়ে হাড়ে চিনি।
- না, ঠিক অবাক বলতে যা বোঝায় তা নয়, তাছাড়া চলে যাওয়ার প্ল্যান ছিল না। জানিস তো এ
শহরে আমি কিছুই চিনি না। এ কারণে হলেও থাকতে হত। তাছাড়া কেন এমন হয়, কেন এমন হলি সেটাও
তো জানা দরকার।
- তুই অবাক হয়েছিলি। না করিস না। তুই তো বরাবরই খোলা বই। আমি তো বটেই, মস্কোর অনেকেই
তোকে অনায়াসে পড়তে পারত। তোকে কোন প্রশ্ন করলে তুই বলার আগেই অনেকেই বলে দিতে পারত
কি তার উত্তর হবে, ঠিক কোন শব্দটা তুই ব্যবহার করবি। হ্যারে, যারা এভাবে তোকে পড়ত তাঁদের
সাথে যোগাযোগ আছে?
- যোগাযোগ যদি যোগ আর বিয়োগের মিলন হয় তবে যোগ নয়, বিয়োগ আছে। আছে মোটা দাগেই।
- আবার শুরু হল হেঁয়ালি। কথায় বলে না কয়লা ধুলে ময়লা যায় না।
- ঠিক বলেছিস। গায়ের রং কালো তো এমনি এমনি হয়নি।
- আবার!
- আবার আবার কি? জানিস তো কথা আমার কাছে খেলা। কথা তো তেমন বলি না, তবে শুরু হলে খেলতে
ভালবাসি। কথা মাটিতে পড়লে খেলা জমে না।
- অভি, অভি!
- দেখিস, হয়ে যাবি কবি!
- আচ্ছা, তুই তো ফেসবুক করিস। যত দূর জানি খুব আক্টিভলিই করিস। শুনেছি সেখানেও আগের
মতই অন্যের মতামতের তোয়াক্কা না করে নিজের
মতামত লিখিস। অনেকে মাইন্ড করে। এটা কি তোর খুব দরকার?
- দেখ, প্রশ্নটা তুই প্রথম করলি না। এর আগেও অনেকেই করেছে। জিজ্ঞেস করেছে ফেসবুকে না
লিখলে কি আমার পেটের ভাত হজম হয় না?
- এসবের পরেও যেহেতু লিখিস, তার মানে কারণ আছে।
- ১৯৯৪ পর্যন্ত আমি মস্কো ছিলাম। খুব বেশি মেলামেশা
না করলেও কিছু বন্ধু সব সময়ই ছিল, যাদের সাথে কথা বলতে পারতাম, মত বিনিময় করতে পারতাম।
এরপর যখন দুবনা চলে যাই মত বিনিময় করা যেত মূলত ফিজিক্স বা ম্যাথেম্যাটিক্সের প্রব্লেম
নিয়ে। কিন্তু এর বাইরেও তো জীবন আছে। তখন নিজের ইমেইল আক্যাউন্ট হয়। ইন্টারনেট অ্যাক্সেস
পাই। শুরু করি নেটে বন্ধুদের খুঁজতে। সে সময় আজকের মত এতো সহজে কাউকে পাওয়া যেত না।
আর পাওয়া গেলেও খবর আদান প্রদান করতে হত লিখে লিখে, তাও আবার সেই এয়ারপোর্টের বিল বোর্ডের
মত। একের পর এক নতুন মেসেজ আসত। সেই নিউজ ফ্লো’র মধ্যে খুঁজতে হত বন্ধুর খবর। অনেক
সময় অড সিচুয়েশনে পড়তে হত। এরপর কিছু বন্ধুর ইমেইল পেলাম। মাঝে মধ্যে ওদের সাথে মত
বিনময় করতাম, বিভিন্ন বিষয়ে তর্ক বিতর্ক কম হত না। তার পর খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে
এলো ফেসবুক, অদনাক্লাস্নিকি, ভকন্টাক্টে। এখানে খুঁজে পেলাম যেমন রুশ বন্ধুদের, তেমনি বাংলাদেশি
বন্ধুদেরও। তখনও ফোনে কথা বলা এতো সস্তা ছিল না। ফেসবুক ছিল আত্মীয় স্বজনদের সাথে যোগাযোগের
বলতে গেলে একমাত্র মাধ্যম। না না, আমি যে খুব কথা বলি তা নয়। তবে যখন দেখি কেউ অনলাইনে
মনটা শান্ত হয়। মাঝে মধ্যে অন্যদের
স্ট্যাটাস পড়ি আর তাতেই খুঁজে তাই হাসির খোরাক। জানিস তো কথার পিঠে পিঠে কথা বলতে আমি বরাবরই
পছন্দ করি। এভাবেই শুরু হয় রেগুলার স্ট্যাটাস লেখা। এক সময় সেটা নেশায় পরিণত হয়। সকালে
চা না খেলে যেমন দিনটা জমে না, তেমনি সারাদিন কোন কিছু না লিখলে মনে হয় কি যেন একটা
করা হয়নি। তাছাড়া দেখ, এটাই কিন্তু আমার বাংলা চর্চার একমাত্র জায়গা। বাসায় কথা বলি
রুশে, রাস্তাঘাটেও। কাজে রুশ, ইংলিশ। পড়াটাও মূলত এসব ভাষায়। ২০১১ সালে ১৪ বছর পরে
যখন দেশে যাই, দেখলাম অনেক কথাই বুঝছি না, অনেক শব্দের অর্থ বদলে গেছে। ২০১৬ সালে এক
বন্ধুর অনুপ্রেরণায় যখন একাত্তরের স্মৃতি নিয়ে লিখতে শুরু করলাম, দেখি অনেক বানান ভুলে
গেছি আবার অনেক বানান বদলে গেছে। সত্যি বলতে কি আমরা তো বাংলা শিখেছি স্কুলে আর কলেজে,
তাও দায়সারা ভাবে। এরপর তো এমুখ হওয়া হয়নি। ছেলেমেয়েরা যখন স্কুলে গেল, ওদের পড়ানোর
পদ্ধতি দেখে বুঝলাম, আমাদের বিশেষ করে আমার গ্রামের স্কুলে ভাষা শিক্ষায় কত গলদ ছিল।
হ্যাঁ, বই আগেও পড়তাম, এখনও পড়ি প্রচুর। কিন্তু ভাষার উপর কিছু বই পড়ি লিখতে শুরু করে।
সেদিক থেকে বলতে পারিস ফেসবুক আমাকে নতুন করে ভাষা শেখাচ্ছে। লিখতাম তো স্কুল জীবনেই,
মস্কোয় দেওয়াল পত্রিকায় লিখতাম, একতায় লিখতাম মাঝেমধ্যে। তারপর তো সেটা ভুলেই গেছিলাম।
ফেসবুকে লেখার ফলে আবার লেখার অভ্যাসটাও ফিরে এসেছে।
- তার মানে শুধু প্লাস আর প্লাস।
- তা বলব না। তবে জানিসই তো আমি সব কিছুতেই পজিটিভ দেখি, এমন কি নেগেটিভ হলেও এর মধ্যে
আমি পজিটিভ কিছু বের করে ফেলতাম।
- তাহলে শুধু কি এটাই তোর লেখালেখির কারণ?
- না। জানিস তো ফটোগ্রাফি করি। বেশ কয়েকটা প্রদর্শনী হয়েছে। একবার এক প্রদর্শনীর শেষে
স্থানীয় এক পত্রিকা থেকে সাক্ষাৎকার নিতে এলো। প্রশ্ন করল আমি ফটোগ্রাফি করি কেন? এ
প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। তবে উত্তর বেড়িয়ে এলো। মনে পড়ল সেই প্রস্তুতি পর্বের কথা, তোদের কথা। ছবি তুলতাম আর বলতাম, একদিন
যখন দেশে ফিরে যাব, এই ছবিগুলো আমাদের যৌবনের সাক্ষী হয়ে থাকবে। তাই বললাম, প্রথমত
আমি ছবি তুলি বর্তমানের আমিকে ভবিষ্যতে দেখব বলে। কারণ ছবি তো শুধু ছবি নয়, এটা আমার
এই সময়কার মুড, এই সময়ের ইতিহাস, আমার আশেপাশের মানুষজন। আমার আজকের ছবি, এটা আজকের
আমি। আমি ভবিষ্যতে সেই আমির কাছে ফিরে যেতে চাই এই ছবির মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত আমি ছবি
তুলি আমার একাকীত্ব থেকে মুক্তি পেতে। ঐ সময়ে আমাদের সম্পর্ক অগ্নি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে
যাচ্ছিল। বৌ ছেলেমেয়েরা মস্কো ফিরে গিয়েছিল, দুবনায় ছিলাম আমি একা। হঠাৎ অফুরন্ত সময়
এসে হাজির হয় আমার সামনে। ছেলেমেয়েদের কোলাহল থেমে যায়, চারিদিকে পিন পতন নৈশব্দ। এই
সময়টা কোন কিছু দিয়ে পূরণ করার দরকার ছিল। আবার এগিয়ে আসে চিরচেনা ক্যামেরা। তৃতীয়ত
আমি ছবি করি নিজের সাথে থাকার জন্য।
- সেটা আবার কি?
- দেখ, আমরা যারা তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যায় কাজ করি আমাদের মাথায় সব সময় বিভিন্ন সমীকরণ
দৌড়ঝাঁপ করে। শুধু যখন ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখি তখন সব কিছু দূরে চলে যায়।
ঐ সময়টা আমি নিজে একান্ত নিজের থাকি। এরপর অবশ্য আরেকটা পয়েন্ট যোগ হয়। এর মধ্যে আমাদের
সম্পর্ক সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। মস্কোয় আমরা সংগঠন করি। রেগুলার যাতায়াত শুরু
হয় মস্কোয়। প্রায়ই বিভিন্ন অনুষ্ঠান। কিন্তু এই কয় বছর একা থাকতে থাকতে আমি অনেক লোকের
উপস্থিতিতে অল্প সময়ের মধ্যেই হাঁফিয়ে উঠি।
আবার ক্যামেরা তার হাত বাড়িয়ে দেয়। লোকের ভিড়ে হাঁফিয়ে উঠলে ক্যামেরা হাতে নিই। কেউ
আমাকে বিরক্ত করে না। আমি আপন মনে ছবি তুলে যাই। তাই বলতে পারিস মানুষের ভিড় থেকে বাঁচতে
আমি ফটোগ্রাফি করি। ঠিক এ কথাগুলোই বলা যায় লেখার ক্ষেত্রে, তা সে ফেসবুক হোক আর অন্য
কোথাও হোক।
- তোর ফটোগ্রাফি সম্পর্কে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
- কর।
- তুই কি প্রফেশনালি ছবি করিস, মানে পয়সার বিনিময়ে?
- না।
- ছবি তো খারাপ তুলিস না। এক্সিবিশনও হয়েছে বেশ কয়েকটা। তাহলে এখান থেকে ইনকাম করতে
আপত্তি কোথায়?
- আপত্তি নেই। তবে…
- তবে আবার কি?
- এক শিল্পীকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করল, ছবি বিক্রি করেন?
- করি।
- অনেক দামে?
- অনেক দামে।
- অনেক ছবি বিক্রি করেছেন?
- একাটাও না।
- কেন?
- কেউ কেনে না।
- আবার হেঁয়ালি।
- হেয়ালির কী হল। আসলে দেখ, অনেকেই আমাকে এটা বলে। তারা যতটা না আমার ছবির কোয়ালিটি
নিয়ে ভাবে তার চেয়ে বেশি ভাবে আমার পকেটের অর্থনৈতিক দুর্যোগের কথা। দেখ আমি ছবি করি
আনন্দের জন্য। মানুষ যখনই তার সৃষ্টি, তা সে বই হোক, ছবি হোক আর যা কিছুই হোক, বিক্রির
কথা ভাবে, সে তখন অন্যের, মানে সম্ভাব্য ক্রেতাদের ভালোলাগা মন্দ লাগার কথা ভেবে সেটা
করে। এভাবে অন্যের মনোরঞ্জন করতে করতে সে একসময় নিজের কথা ভুলে যায়। ভুলে যায় ছবি তোলার
আনন্দ। একসময় পয়সা নিশ্চয়ই মনকে সান্ত্বনা
দেয়, তবে মনে শান্তি আনে কিনা জানি না। জানি, তুই হয়তো আমার লেখালেখি নিয়েও এমন প্রশ্ন
করার কথা ভাবছিস। তাই উত্তরটা আগেই দিয়ে রাখছি। না, আমি বই লেখার কথা ভাবছি না। বছর
দুই আগে একাত্তরের উপর স্মৃতিকথা লিখতে শুরু করি। নিজেও ভাবিনি এতসব আমার মনে আছে।
দেখতে দেখতে আকার বেশ বড় হল। কাকুকে আমি সব সময়ই আমার লেখা দেখাতাম। উনি যখন মস্কো
ছিলেন তখনও দেখিয়েছি। সে সময়ও বলেছেন লেখার চর্চাটা ধরে রাখতে, লিখতে। একাত্তরের স্মৃতিটা
শেষ করার আগেই তাঁকে পড়তে দিই। উনি শুধু আমাকে ঢাকায় নিজের বাসায় ডেকেই আনেননি, আমি
যাতে সেটা বই আকারে প্রকাশ করি তাও বারবার বলে গেছেন। বইটা আমি নিজের মত করেই শেষ করি।
এরপর সেটা এক প্রকাশনী থেকে অন্য প্রকাশনীতে ঘোরাফেরা করতে শুরু করে কলকাতা আর ঢাকা
দু’ শহরেই। অপেক্ষা, বিভিন্ন শর্ত। সে এক অস্বস্তিকর অবস্থা। গবেষণার কাজে আমাকে প্রচুর
লিখতে হয়, শতাধিক পেপার আছে। কিন্তু এই বই নিয়ে আমি যত টেনশনে সময় কাটিয়েছি তেমনটি
কখনও হয়নি। পদার্থবিদ্যার উপর পেপার লিখতে গিয়ে রিভিউয়ারের সাথে দ্বিমত পোষণ করা যায়,
অংকের মাধ্যমে নিজের কাজের যৌক্তিকতা প্রমাণ করা যায়। এখানে সে সুযোগ নেই। এখানে যুক্তি
নেই, আছে আবেগ। লেখার স্বাধীনতা নেই, আছে পাঠকের মন জয় করার আপ্রাণ চেষ্টা। তাই প্রফেশনালি
ফটোগ্রাফি করা বা লেখালেখি করার চিন্তা ভল্গার জলে বিসর্জন দিয়েছি এবং দিয়ে বেশ সুখে
আছি।
- তোর লেখা নিয়ে অনেক সময় সমালচনার ঝড় ওঠে, ছবি নিয়ে তা হয় না।
- কথাটা ঠিক নয়। আমি ছবি আপলোড করি মূলত বিভিন্ন ফটো সাইটে। সেখানে ভালমন্দ বিভিন্ন
কথাই হয়। তবে সেখানে আমার পরিচিত কেউ নেই, সারা পৃথিবীর লোক দিয়ে ভরা। ফেসবুকেও তাই,
তবে ফেসবুকে আমরা বাঙ্গালী কমিউনিটির ভেতর ঘোরাফেরা করি কিনা তাই এমন হয়। তাছাড়া একটা
জিনিস আমি জানি, তুই যেটা লিখছিস সবাই যে সেটাই পড়বে
তা নয়। লেখক লেখে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, পাঠক পড়ে তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। দুজনের
মত আর দেখা যদি একই ফেজে থাকে তাহলে শান্তি, আর আন্টিফেজে থাকলে অশান্তি। তাই সমস্যা শুধু আমার লেখায় নয়, যে পড়ছে তার জীবন দর্শনেও। কিন্তু আমরা চাইলেই তো আর সবার প্রিয় হতে পারব না, সেটা হওয়ার দরকারও নেই। পরমত গ্রহণ করার বা পরমতকে যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করার সংস্কৃতি যদি গড়ে তোলা যায় তাহলে সমস্যা থাকে না। সমস্যা হল কথাকে বন্দুক বা কিরিচ দিয়ে খণ্ডন করার সংস্কৃতি।
- তাহলে কি ফেসবুকে লেখালেখি বন্ধ করার কোনই সম্ভাবনা নেই?
- আমার এক বন্ধু তার জন্য একটা মন্ত্র বাতলে দিয়েছে রাশান টিভির এক অ্যাড থেকে। তবে আমি তো মন্ত্রে বিশ্বাসী নই তাই জপ করি না। তবে কোয়ান্টাম জগতে সব কিছুরই সম্ভাবনা থাকে এমন দুই দুগুণে চার না হওয়ারও। পদার্থবিদ্যায় একটা কথা আছে, থিওরি প্রমাণ করা যায় না, তাকে শুধু ভুল প্রমাণ করা যায়। যতদিন পর্যন্ত তথ্য প্রমাণ সহ টলেমীর ভূকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের তত্ত্ব ভুল প্রমাণ করা না গিয়েছিল, সেটাই ছিল সত্য। তারপর এলো সৌরকেন্দ্রিক মহাবিশ্ব। এখন তো মহাবিশ্বের কোন কেন্দ্রই নেই। এখন ভারী ভারী তত্ত্বই যখন ধোপে টেকেনি সেখানে আমি বা আমার ফেসবুকিং কোন ছার। এমনও হতে পারে আমাদের আগেই ফেসবুক তলিয়ে যাবে বিস্মৃতির আড়ালে। আরও একটা কথা। আমরা সাধারণত সব প্রশ্নের
উত্তর জানি, মানে আমাদের শিক্ষাটাই এমন যে বিভিন্ন ধর্মের পবিত্র গ্রন্থসমূহে সব
লেখা আছে। আর যেহেতু উত্তর আছে, আমরা প্রশ্ন করাটা ঠিক শিখিনি। কোন বিষয়ে যে ভিন্ন
মত থাকতে পারে, কোন কিছু যে ভিন্ন কোণ থেকে দেখা যায় সেটা আমরা অনেকেই বিশ্বাস করি
না। তাই তো আমাদের রাজনীতিতে অন্ধ বিশ্বাসের ছড়াছড়ি, যেমনটা পড়াশুনায়। আমি কোণ বিষয়েই
বিশেষজ্ঞ নই, তাই আমার লেখায় উত্তর থাকে না। তবে প্রশ্ন করার বা যেকোনো জিনিস যে
প্রচলিত ধারণার বাইরেও দেখা যায় সেটা বলার চেষ্টা করি। লোকজন লেখা পড়ে না, পড়ে
কাগজের উপর কালির দাগ। এই যে অন্ধ বিশ্বাসের সংস্কৃতি, প্রশ্ন না করার সংস্কৃতি –
এখানেই সমস্যা। আমাদের দেশে সর্বশেষ কথা শিক্ষকের। শিক্ষক জানা জিনিস শেখান, ছাত্রের
প্রশ্নের উত্তর দেন। গবেষণার সংস্কৃতি আমাদের গড়ে ওঠেনি। গবেষক উত্তর দেন না, প্রশ্ন
করেন, উত্তর খোঁজেন। দেশে গুরু, হুজুর এরাই এখন বড় শিক্ষক।
- কঠিন কেস!
- কী ব্যাপার? তুই কি সাইকিয়াট্রিস্ট
নাকি? সেটা তো জানা ছিল না।
- না না। কিন্তু তুই যেভাবে সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিস, মনে হয় আটঘাট বেঁধেই এসেছিস।
- না রে। দেখনা আমার কতগুলো পকেট? গোটা কুড়ি। আমি কোথাও গেলে পকেট ভরে নানা প্রশ্ন আর তার উত্তর নিয়ে যাই। এখনও কিন্তু পকেটে হাত দিইনি।
- বাপ রে বাপ। তাহলে আমাদের গল্প তো দেখছি কয়েক দিনেও শেষ হবে না।
- তোর ভয় পাওয়ার কারণ নেই। চোখে মুখে একটু বিরক্তি প্রকাশ করিস, দেখিস চুপচাপ চলে যাব। জানিস তো আমি জোর করে কোথাও থাকি না। অপাংক্তেয় হওয়া সব চেয়ে অপছন্দ করি।
- অনেকেই তোর লেখা পড়ে মনে করে তুই আওয়ামী লীগ বিরোধী। তুই কি বলিস এ ব্যাপারে?
- যারা ভাবে ভুল ভাবে। সত্যিকারের আওয়ামী লীগ সম্পর্কে তাদের ধারণা কম, তাই এমন ভাবে।
দেখ ১৯৬৮ সাল মানে আমার বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর
রহমানকে আমি জানতাম বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের মূর্ত প্রতীক হিসেবে, কিন্তু যখন তাঁর “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” পড়ে জানলাম, তিনি পাকিস্তান আন্দোলনকে
এদেশে জনপ্রিয় করেছিলেন, দেশভাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, অবাক হয়েছিলাম। আমি
বরাবরই মনে করি দেশভাগ ভুল ছিল। কারণ যেসব সমস্যার সমাধানের জন্য দেশভাগ হয়েছিল তার
একটারও সমাধান হয়নি, বরং নতুন নতুন সমস্যা তৈরি হয়েছে, হচ্ছে। সবচেয়ে খারাপ যেটা তা
হল তিয়াত্তর বছর পরও এই দেশভাগ আমাদের রাজনীতিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ
ও পাকিস্তানে ভারত বিরোধিতা আর ভারতে পাকিস্তান বিরোধিতা উপমহাদেশের রাজনীতিতে সাফল্যের চাবিকাঠি। গঠন নয়, ভাঙ্গন যেখানে রাজনীতির চালিকা শক্তি
সেখানে সার্বিক উন্নয়ন আশা করা যায়না। ফিরে আসি আওয়ামী লীগের কথায়। একথা তো অস্বীকার
করার উপায় নেই যে দ্বিজাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে যে রাজনীতি বিশ শতকের চল্লিশের
দশকে এ দেশের জনমানসকে নিয়ন্ত্রিত করছিল আওয়ামী লীগের হাত ধরেই তা জাতীয়তাবাদী রূপ
পায়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই এ দেশের মানুষ এক সাগর রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করে।
বাহাত্তরের সংবিধান আওয়ামী রাজনীতিরই ফসল। দ্বিজাতি তত্ত্ব
থেকে শুরু করে “গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সার্বভৌমত্ব” নামক চার স্তম্ভের
উপর দাঁড়ানো তো চাট্টিখানি কথা নয়। তাই আওয়ামী বিরোধিতা মানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে
অস্বীকার করা। তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হল আওয়ামী লীগ আজ নিজেই তার বা বলা যায় বঙ্গবন্ধুর
রাজনীতির বলয় থেকে সরে এসেছে। ক্ষমতা আর ভোটের রাজনীতি আওয়ামী লীগকে তার আদর্শের সাথে
কম্প্রোমাইজ করতে বাধ্য করেছে। আমার বিরোধিতা এখানেই। আমি আসলে সরকারি দলের বিরুদ্ধে,
তবে বিরোধী দলের নই। সরকার যেহেতু দলমত নির্বিশেষে সবার সরকার, তার উপর মানুষে আশা
বেশি, তাদের দায়িত্বও বেশি। তাই তাদের ব্যর্থতাও বেশি, সমালচনাও বেশি। তবে তার মানে
এই নয় বিরোধী দলের কোন দায়িত্ব নেই। তাই আমি কাজের ভিত্তিতে কী সরকারি, কী বিরোধী
– দু’দলকেই সমালোচনা করি। আরেকটা কথা মনে রাখতে হবে, এক সময় আওয়ামী লীগ ছিল আশার পার্টি,
ভরসার পার্টি। দেশের প্রগতিশীল মানুষ, সংখ্যালঘু – এরা সবাই আওয়ামী লীগের মুখের দিকে
তাকিয়ে থাকত আশা নিয়ে। আজ আমাদের অনেক বন্ধুকে বলতে শুনি ”আওয়ামী লীগ মন্দের ভালো।
ওরা হারলে দেশ হারবে।“ আশার জায়গা থেকে আওয়ামী লীগ আজ ভীতির জায়গায় চলে এসেছে। অনেক সুযোগ ছিল দেশে সুস্থ রাজনীতিকে ফিরিয়ে
আনার। গণজাগরণ মঞ্চকে ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বিরোধী দল গঠন করতে
সহযোগিতা করতে পারত আওয়ামী লীগ। কিন্তু ক্ষমতার লোভে তারা ভিন্ন পথে চলল। দেশে আজ পারতপক্ষে
প্রতিক্রিয়ার অবাধ বিচরণ। আমার বিশ্বাস আওয়ামী লীগের অনেক নিবেদিত প্রাণ কর্মীও এভাবেই
ভাবে, তবে দলীয় বাধানিষেধের কারণে সেটা বলে না, বলতে পারে না। যদি সেটা পারত, সেটা
করত, দিনের শেষ তা আওয়ামী লীগেরই উপকারে আসত। তাই আমাকে আওয়ামী বিরোধী তারাই বলে যারা
তাদের ভালো চায় না, যারা আওয়ামী লীগকে নিজেদের উন্নতির সোপান মনে করে। আসলে আমি সব
কিছু দেখি গণিতের লজিক থেকে। এখানে আবেগের জায়গা নেই। আবেগকে প্রশ্রয় দিলে লাভ ক্ষতির
প্রশ্ন আসে, গাণিতিক লজিক সেটা মেনে চলে না, তখন যেকোনো ঘটনাকে অব্জেক্টিভলি বিচার
করার প্রশ্নটাই মূল হয়ে দেখা দেয়। আর সেটা করতে হয় প্রচলিত আক্সিওমের মধ্যে থেকেই।
অনেককেই বলতে শুনি, আওয়ামী লীগ যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নিজের নীতি নির্ধারণ করছে, যুগের সাথে চলাই তো আধুনিকতা। কথাটা
ঠিক নয়। যদি আমরা পদার্থবিদ্যার কথা বলি, দেখব কোয়ান্টাম তত্ত্ব নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে
ক্ল্যাসিকাল তত্ত্বে ফিরে আসে, একই কথা রিলেটিভিস্টিক আর নন-রিলেটিভিস্টিক তত্ত্বের
ক্ষেত্রে। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে আমরা সেটা দেখছি না। রণকৌশল থেকে যেকোনো ভাবেই হোক
ভোট আর ক্ষমতার রাজনীতি তাদের রণনীতিতে পরিণত হচ্ছে, হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা যুগের সাথে
সে বদলাচ্ছে বটে, তবে তা প্রগতির দিকে নয়, প্রতিক্রিয়ার
দিকে।
- এসব কি অজুহাত?
- নারে, অজুহাত হবে কেন? তুই প্রশ্ন করলি, নিজের ভাবনাটা তাই বললাম। সব কিছু তো আর লেখা যায় না, এতো সময় কোথায়? তাছাড়া মানুষ তার
নিজের মত করে দু এক লাইন পড়ে সেটা নিয়েই নিজের মত করে লেখকের একটা অবয়ব গড়ে তুলে। শোন,
সময় তো কম হল না। তোর বৌ মনে হয় এদিকে আর পা বাড়াবে না। আমার সাথে স্তালিচনায়া, কালো
রুটি, সালা – এসব আছে। হবে নাকি?
- না খেলে খুব মাইন্ড করবি?
- মাইন্ড করব কেন? তবে তুই যে খেতে চাস, সে তো তোর চেহারা দেখেই বুঝতে পারছি। অফুরান
সুরা আর তিয়াত্তরটা হুরের জন্যই তো এই সাজগোজ। তা লাস ভেগাসে গিয়ে যখন এসব করবিই, এখানে
শুরু করলেই বা দোষ কি? নাকি ভয় পাচ্ছিস আদম যেমন আপেল খেয়ে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছিল,
তেমনি এখানে স্বর্গীয় সুধা পান করলে তোর স্বর্গের ভিসা বাতিল হয়ে যাবে?
- তোকে নিয়ে আর পারা যাবে না। যা ঢাল। আর বল, তুই কি একারণেই ওখানে বিয়ে করেছিস?
- ঠিক ধরেছিস। তোদের মত আমার ভাগ্যে তো আর স্বর্গের শিকে ছিঁড়বে না, তাই নরকের সিংহ
দুয়ারটা যাতে সাদরে আমায় বরণ করে নেয় তাই এখানেই হুরপরীদের নিয়ে ঘরকন্না করছি। হল তো?
- রেগে যাচ্ছিস মনে হয়?
- উঁহু!
- তবে?
- তবে আর কি? খাচ্ছি।
- খাবার দিতে বলব?
- তুই খুব ভালো রান্না করতিস। নিজে রান্না করবি?
- না রে। ভুলে গেছি। তাছাড়া রাঁধতে চাইলেই বা করতে দেবে কে?
- হুম।
- কী, খাবি? খাবার দিতে বলব?
- না।
- ক্ষিদে পায়নি?
- কোন ব্যাপার না। ওঠার সময় হল।
- যাবি কোথায়?
- দোস্তের ওখানে। ও বিয়ে-থা করেনি। ওর ওখানে গিয়ে দুজনে একসাথে কিছু একটা রান্না করে
খাব আর ছাত্র জীবনের মত সারারাত জেগে আড্ডা দেব।
- তা যাবি কীভাবে?
- ও এখনও চেম্বারে। একটু পরে ফোন করে ওকে বলব এখান থেকে আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটল নিঃশব্দে। দেখতে দেখতে বোতলটা খালি হয়ে গেল, উধাও হল কালো রুটি, সালা, শশা। অভি টমিকে নিজের বৌ বাচ্চাদের ছবি দেখাল এক এক করে। দেখাল ওদের মস্কো জীবনের ছবিও। টমি আর শমির কথা দেওয়া, ওদের প্রথম চুমু, অমির শিশুকালের ছবি। টমিকে খুব মুডি মনে হল।
- মনে হচ্ছে আবার যেন সেই আশির দশকের মস্কো ফিরে গেলাম। ভদকার সাথে স্মৃতির জাকুস্কা – আহা!
- এখানেই সমস্যা। সবাই শুধু ক্ষণিকের জন্য সে সময়ে ফিরে যায়। একটু স্মৃতিরোমন্থন, পুরনো বন্ধুদের মনে করা, তারপরেই সব শেষ। আবার স্ব-মূর্তি ধারণ করা। এ যেন ঘুষ নেওয়ার সময় আজানের ধ্বনি শুনে মসজিদে যাওয়া আর ফিরে এসে আবার সেই ঘুষ দুর্নীতি করা।
- তুই আর বদলাবি না। তিরিশ বছর পরেও তোকে দেখছি সেই আগের অভিই রয়ে গেছিস। বৌ, একগাদা ছেলেমেয়ে তারপরেও আগের মত ছেলেমানুষই রয়ে গেলি। সংসার করিস কীভাবে?
- ওরা সবাই বুঝে গেছে যে আমি গন কেস। কেউ আর এ নিয়ে মাথা ঘামায় না। আর আমাকে বিরক্ত না করলে আমিও কাউকে বিরক্ত করি না।
বলে অভি মুচকি মুচকি হাসবে।
- হ্যাঁরে, বলতে ভুলে গেছি তোর হাসিটাও একদম বদলায়নি, সেই ট্রেডমার্ক হাসি।
- তোর হাসিটা কিন্তু আগের মত নেই। এক সময় তোর হাসিই আমার আমার মন জয় করেছিল, বলতে পারিস তোর হাসির প্রেমে পড়েছিলাম। বোঝাই যাচ্ছে দাঁতগুলোর পদোন্নতির সাথে সাথে হাসিটার পদোবনতি হয়েছে। নিত্যতার সূত্র সব জায়গায়ই কাজ করে।
অভি এবার সজোরে হেসে উঠবে। হাসতে হাসতে চালাবে মান্না দের «কফি হাউসের সে আড্ডাটা আজ আর নেই»।
- লাস্ট ড্রপস!
- ঢাল।
- আমাদের জন্য!
আমাদের অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের জন্য! আমাদের ভালবাসা আর ভালোলাগার জন্য। সুখের মৃত্যুর জন্য।
গানের রেশ না মেলাতেই অভির ফোন বেজে উঠবে।
- দোস্ত, আমি নীচে অপেক্ষা করছি। চলে আয় তাড়াতাড়ি।
বিদায়ের ঘণ্টা বাজে। অভি উঠে দাঁড়ায়। আলতো করে টেনে নেয় টমির হাত। চোখে চোখ রেখে বলে
- মস্কো থেকে চলে যাওয়ার পর প্রায় কারও সাথেই তেমন যোগাযোগ ছিল না হাতে গনা দুয়েক জন
ছাড়া। ২০১০ থেকে ফেসবুকে ধীরে ধীরে আবার সবাই জড়ো হতে শুরু করে। পরিচিত, অপরিচিত, দেশের,
বিদেশের – সোভিয়েত ভিপুস্কনিক দেখলেই মনে হয় আত্মার আত্মীয়। ১৯৯৬ সালে ইতালী ছিলাম
বেশ কিছুদিন। ওখানে দেখা নাইজেরিয়ার এক ছেলের সাথে। যখন শুনল মস্কো থেকে এসেছি, ওর
সেকি আনন্দ। মনে হয় সব দেশের সোভিয়েত ভিপুস্কনিকরাই এ রকম। এটাই মনে হয় মগজ ধোলাই।
তুই তো ভালো করেই জানিস ছাত্র জীবনে আমাদের দলাদলির কথা। কেউ ছিল প্রাণের বন্ধু, কেউ
ছিল চিরশত্রু। কিন্তু প্রায় দেড় যুগ পরে যখন সবাইকে ফিরে পেলাম, বন্ধু শত্রু সব এক
হয়ে গেল, সবাই হল প্রিয় ভিপুস্কনিক। আশ্চর্যের ব্যাপার হল নতুন করে গড়ে ওঠা এই সম্পর্কে
পুরনো শত্রুরা কেউ অভিমান করেনি, ডাকলে সাড়া না দিয়ে যায়নি। এটা মনে হয় আমরা ডাকার
সময় কোন কিছু আশা করিনি বলে। কিন্তু পুরনো বন্ধুদের
অনেকেই পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। এটাও মনে হয় চাওয়া পাওয়ার হিসাব না মেলায়। পুরনো বন্ধুদের
অনেকেই ধীরে ধীরে দূরে চলে গেছে, অনেকে ডাকে সাড়া দেয়নি, অনেকে ফোন করতে মানা করেছে।
খারাপ লাগে? হয়তো লাগে, হয়তো লাগে না। আসলে আমার যেমন স্বাধীনতা আছে কাউকে ডাকার, সেই
কারোও তেমনি স্বাধীনতা আছে আমার ডাকে উত্তর না দেওয়ার।
না না, কেউ যদি আমার ডাকে সাড়া না দেয় তার মানে এই নয় সে খারাপ। আমার সাথে চলাফেরার
উপর নির্ভর করে কেউ ভালো বা খারাপ হয় না, হতে পারে না। বন্ধুত্ব হল মনের মিল, মতের
মিল। আমরা সাধারণত মানুষের একটা দিক দেখি, যেমন সে ডাক্তার, সে কমিউনিস্ট, সে মৌলবাদী
ইত্যাদি। মানুষ আসলে করোনার মত। হাজারটা হাত চারিদিকে বাড়িয়ে বসে আছে। যার যেখানে মিল
সে সে হাতটাই ধরে, বন্ধুত্ব করে, শত্রুতা করে। মানুষ বহুমুখী, বহুরুপী। তাই চাইলে যেমন
কারও সাথে বন্ধুত্ব করা যায়, তেমনি শত্রুতাও করা যায়। আমরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী
দোষে গুণে তৈরি মানুষের গুণ অথবা দোষ খুঁজি। আর সেটা খুঁজি নিজের প্রয়োজন থেকে, নিজে
কার সাথে কি রকম সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই সেই চাহিদা থেকে। এখানে সবাই স্বাধীন। খুব সোজা
হিসাব। তবে একদিন যাদের জন্য সব কিছু করতে প্রস্তুত ছিলাম, তাদের এমন ব্যবহার ভাবায়।
আমি তো পদার্থবিদ। সব কিছুর পেছনেই কোন না কোন কারণ থাকে এটা বিশ্বাস করি। যদি কেউ
ডাকে সাড়া না দেয় তাহলে নিজের অজান্তেই নিজের ভেতর কারণ খুঁজতে শুরু করি, নিজের ভুলটা
জানার চেষ্টা করি। তাদের মৌনতা নয়, নিজের অজ্ঞানতা সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। যাকগে, কথার
কোন শেষ হবে না।
- যদি কিছু মনে না করিস, একটা কথা জিজ্ঞেস করব। জানি তুই কী উত্তর দিবি, তবুও জানতে চাইছি «তুই কেমন আছিস?»
- এ প্রশ্নের উত্তরে আমি সব সময়ই বলি ভালো থাকা আমার পেশা। খারাপ থাকার আমার জন্য বিলাসিতা। অনেকেরই সেটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। কেন জানিস? অধিকাংশ মানুষ ভালো থাকার সাথে গাড়ি, বাড়ি, ব্যাংক ব্যালাঞ্চ ইত্যাদি জিনিস গুলিয়ে ফেলে। পদার্থবিদ্যায় সব বস্তুই চায় মিনিমাম শক্তি ব্যায় করে স্থিতিশীল অবস্থায় থাকতে। মেন্টাল পীস মানে মানসিক শান্তি পয়সা দিয়ে কেনা যায় না। আমি যাই করি ভালবেসে করি বা কোন কিছু করতে হলে সেটাকে ভালবাসি। আমি কাজের ফল নয়, কাজ, কাজের প্রসেস উপভোগ করি, করার চেষ্টা করি। অধিকাংশ মানুষ নিজের শক্তির উপর বিশ্বাস রাখে না। আত্মবিশ্বাসহীন মানুষ সব সময় কাঁধ অথবা ঘাড় খোঁজে। নিজের সমস্যা সে অন্যের কাঁধে
রেখে সমাধান করতে চায় আর ব্যর্থ হলে তার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপায়। হয়তো কাঁধ আর ঘাড় প্রতিবেশি বলেই এমন হয়। আমি চেষ্টা করি নিজের কাজ নিজেই করতে, ব্যর্থতার ভার বইবার জন্যও নিজের ঘাড়ই যথেষ্ট। ব্লকের ভাষায় «প্রিনিমায়ু তিবিয়া নেউদাচি ই উদাচা তিবিয়ে মই প্রিভিয়েত – ব্যর্থতা তোমায় গ্রহণ করছি, সাফল্য তোমায় আমার শুভেচ্ছা»। সেটা আর যাই করুক আর না করুক নিজেকে নিজের মত করে থাকতে দেয়, নিজেকে নিজের থাকতে দেয়। সুখ – এটা তো নিজের মত থাকা, নিজের থাকা। তবে আমি যে নিজেকে খুব ভালো চিনি সেটা নয়, অনবরত নতুন নতুন প্রশ্ন জাগে মনে, অনবরত সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজি, পথ চলি। চলাটাই তো জীবন। হ্যাঁরে, আমি ভালো আছি। আমি ভালো থাকি।
অভি টমির হাতটা ছেড়ে দেবে। বলবে
- রুশরা বলে «নি গভারি প্রাশাই, স্কাঝি দো সভিদানিয়া»। আমিও তাই বিদায় বলছি না। বলছি দেখা হবে। দো সভিদানিয়া দ্রুগ মই!
অভি বুকে টেনে নেয় টমিকে। তারপর ধীরে ধীরে দরজা পেরিয়ে লিফটের দিকে এগিয়ে যায়। লিফটের দরজা বন্ধ হতে হতে অভির কানে ভেসে আসে টমির কণ্ঠস্বর
- দো সভিদানিয়া! ভালো থাকিস! সাবধানে থাকিস!
টমি, অভি, মস্কো, স্মৃতি, বেদনা সব এক সময় হারিয়ে যায় বাইরের ঘন অন্ধকারে।
দুবনা, ২১ জুন ২০২০


Comments
Post a Comment