ছাত্র সংগঠন
৫ সেপ্টেম্বর
১৯৮৩। সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আমরা অবশেষে মস্কোগামী
বিমানে উঠে বসলাম। এটাই আমার প্রথম বিমান ভ্রমণ। সেদিনই জীবনে প্রথম থ্রী পিস পরলাম। এর আগে পার্টি অফিসে
ক’জনের সাথে আলাপ হয়েছিল। আমরা ছিলাম দশ জন। সবাই মস্কো যাচ্ছি। ওরা অবাক হয়ে দেখছিল আর বলছিল “অভি
দেশ না ছেড়েই বুর্জোয়া হয়ে গেছে।“ হ্যাঁ, থ্রী পিস আমার নিজের কাছেও ছিল অস্বস্তিকর। কিন্তু কি আর করা। বাড়ি থেকে খুব শখ করে বানিয়ে দিয়েছে। তখন ফ্যাশন ছিল টাইট ফিট পোশাক পরা। তাই দর্জিকে এমনভাবে
বানাতে বলেছিলাম যেন কোটের ভেতর মাছি পর্যন্ত ঢুকতে না পারে। সমস্যা হল মস্কো এসে। এখানে জামাপ্যান্টের নীচে আন্ডার
গার্মেন্টস পরতে হয়, জামার উপরে সোয়েটার। তাই শেষ পর্যন্ত দেখা
গেল এসবের উপর কোট আর প্যান্ট উঠছে না। ওরা তাই কঙ্কালের মত আলমারিতেই ঝুলে
কাটিয়ে দিল জীবন।
৬ সেপ্টেম্বর সকালে মস্কো যখন নামলাম আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন বড় ভাইরা। সাথীরা বলছিল, এদের কথা দেশ থেকেই নাকি আমাদের বলা হয়েছিল, তবে কি এক অজ্ঞাত কারণে এ তথ্য আমার মাথার উপর দিয়ে চলে গেছে। যাহোক, এয়ারপোর্টে আমাদের নিতে এসেছিলেন মলয় দা, মাহমুদ ভাই, আলোময় দা, বাবুল ভাই আরও কে কে যেন। আমি খুঁজছিলাম সালাম ভাই আর মিন্টু দাকে। সালাম ভাই মানিকগঞ্জের, মিন্টু দার বড় ভাই বুয়েটে আমার রুমমেট ছিলেন। ওরা ক্লাসে ছিল। তখনই শুনলাম মস্কোয় ছাত্র সংগঠন আছে। মলয় দা তখন প্যাট্রিস লুমুম্বা গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের বা সংক্ষেপে প্যাট্রিস লুমুম্বার ছাত্র সংগঠনের প্রেসিডেন্ট আর মাহমুদ ভাই সম্পর্কে বলা হল উনি অল সোভিয়েত ছাত্র সংগঠনের ভাবী প্রেসিডেন্ট। ওনারা দুজন আবার একই ঘরের বাসিন্দা। সে সময় অল সোভিয়েত ছাত্র সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রফিক ভাই।
৬ সেপ্টেম্বর সকালে মস্কো যখন নামলাম আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন বড় ভাইরা। সাথীরা বলছিল, এদের কথা দেশ থেকেই নাকি আমাদের বলা হয়েছিল, তবে কি এক অজ্ঞাত কারণে এ তথ্য আমার মাথার উপর দিয়ে চলে গেছে। যাহোক, এয়ারপোর্টে আমাদের নিতে এসেছিলেন মলয় দা, মাহমুদ ভাই, আলোময় দা, বাবুল ভাই আরও কে কে যেন। আমি খুঁজছিলাম সালাম ভাই আর মিন্টু দাকে। সালাম ভাই মানিকগঞ্জের, মিন্টু দার বড় ভাই বুয়েটে আমার রুমমেট ছিলেন। ওরা ক্লাসে ছিল। তখনই শুনলাম মস্কোয় ছাত্র সংগঠন আছে। মলয় দা তখন প্যাট্রিস লুমুম্বা গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের বা সংক্ষেপে প্যাট্রিস লুমুম্বার ছাত্র সংগঠনের প্রেসিডেন্ট আর মাহমুদ ভাই সম্পর্কে বলা হল উনি অল সোভিয়েত ছাত্র সংগঠনের ভাবী প্রেসিডেন্ট। ওনারা দুজন আবার একই ঘরের বাসিন্দা। সে সময় অল সোভিয়েত ছাত্র সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রফিক ভাই।
মস্কোর সংগঠন
দেশের সংগঠনের মত নয়, এটাকে বরং বলা যায় বাংলাদেশ থেকে আগত সমস্ত ছাত্রদের ক্লাব। এটা কোন আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি। প্রতিটি দেশ থেকে আগত
ছাত্রদের নিয়ে এরকম সংগঠন গড়ে উঠেছিল। তখন শ্রীলংকার সংগঠন ছিল সিংহলী
আর তামিলদের আন্তকলহে বিস্ফোরনমুখ। ভারতীয় সংগঠনেও সমস্যা কম ছিল না। আমরাও যে এসব থেকে একেবারে মুক্ত
ছিলাম তা নয়। বাংলাদেশ থেকে তখন ছেলেমেয়েরা আসত
মূলত বামপন্থী রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে। সরকারি বৃত্তিতেও আসত, তবে খুব অল্প সংখ্যক। ছাত্রদের সিংহভাগই আসত কম্যুনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, মৈত্রী সমিতি ইত্যাদির
স্কলারশিপে, এর পরেই ছিল ন্যাপের। কিছু বাকশালের। তাই ছাত্র সংগঠনে এই তিন দলের সমর্থকদের নিয়ে তিন ভিন্ন স্রোত গড়ে উঠেছিল। এটা রাজনৈতিক স্রোত। এর বাইরে আরও দুটো ভাগ ছিল। একদল ব্যবসা করত না, লন্ডন কাজ করতে যেত না, অন্য দল এসব করত। আসলে সে সময় জিন্স বিক্রি, ডলার বিক্রি এসব কালোবাজারি হিসেবে ধরা হত। এসব ছিল সোভিয়েত আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই অনেকেই এ থেকে দূরে থাকত, তবে সেটা কতটা নিজের থেকে আর কতটা পার্টি বলেছে বলে
– সেটা তর্ক সাপেক্ষ। পরবর্তী ইতিহাস বলে এটা যতটা না
নিজের ন্যায় অন্যায় বোধ থেকে করা তার চেয়ে বেশি পার্টির নিষেধাজ্ঞা মানা। এ নিয়ে অনেকসময় তুমুল বিতর্ক হত নিজেদের মধ্যে। অভি লন্ডনে কাজ করাকে খারাপ মনে করত না, তবে সেখান থেকে ফিরে এসে বেআইনি ভাবে ডলার
পাউন্ড ভাঙ্গানো পছন্দ করত না। নিজে এসব করত না, কারণ মনে করত ও
এখানে পড়তে এসেছে, সেটাই ওর একমাত্র কাজ। প্রথম দিকে এসবের বিরুদ্ধে
জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখলেও বছর দু তিন পরে কেউ জিজ্ঞেস করলে বলত, “আমি করি না, তুমি
করবে কি করবে না সেটা তোমার ব্যাপার।“
সেপ্টেম্বর থেকেই
ক্লাসের পাশাপাশি শুরু হত ছাত্র সংগঠনের কাজকর্ম। অক্টোবরের প্রথমেই নির্বাচিত হত প্যাট্রিসের কার্যকরী কমিটি। আমরা যখন আসি তখন সভাপতি ছিলেন মলয় দা। আমরা আসার পরে সভাপতি
নির্বাচিত হন বাবুল ভাই। অন্য সব পদ বিনা ভোটে হলেও সভাপতি
পদে নির্বাচন হয়, মোয়াজ্জেম ভাইকে হারিয়ে সিপিবি পন্থীদের প্রার্থী হিসেবে বাবুল ভাই
জিতে যান বিপুল ভোটে। এর পরে ২ নম্বর ব্লকের ১৬৩ নম্বর
রুমে, মানে অমল দার ঘরে এ উপলক্ষ্যে ছোট্ট পার্টির আয়োজন করা হয়। এখানেই জীবনের প্রথম অভি শ্যাম্পেনের স্বাদ পায়। প্যাট্রিসের কমিটির পরপরই নির্বাচিত হয় মস্কো কমিটি মস্কোর বিভিন্ন ইন্সটিটিউটের
প্রতিনিধিদের নিয়ে। এরপরে অল সোভিয়েত কমিটির জন্য মস্কোর
ডেলিগেট নির্বাচন করা হয়। অল সোভিয়েত কমিটির সম্মেলন হত ফেব্রুয়ারির
প্রথমে শীতের ছুটির সময়ে। হত বিভিন্ন শহরে। সে এক বিশাল অভিজ্ঞতা। সে বিষয়ে পরে কখনো ফিরব। প্যাট্রিসের ছাত্র সংগঠনের
নতুন কমিটির অভিষেক কাম নবীন বরণ হত বেশ জাকজমকের সাথে। গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর প্রোফেসর স্ত্যানিস ছিলেন তখন সোভিয়েত বাংলাদেশ
মৈত্রী সমিতির সভাপতি। তাই এই অনুষ্ঠানে তিনি নিজেই আসতেন। প্রোফেসর স্ত্যানিসের বিশেষ মনোযোগ আমাদের সংগঠনকে একটু আলাদা করে তুলেছিল।
ছাত্র সংগঠনে
ছিল সিপিবি পন্থীদের একচ্ছত্র অধিকার। একমনা নামে ওপেন সিক্রেট সংগঠনের
মাধ্যমে তারা ছাত্র সংগঠনে কাজ করত, যদিও একমনার অস্তিত্ব তারা স্বীকার করত না। এর চেয়েও গোপন ছিল পার্টি গ্রুপ। অনেকটা দেশে ছাত্র ইউনিয়ন বা অন্যান্য
সিপিবি পন্থী গণ সংগঠনে যেমনটা ছিল তেমন। ন্যাপের সংগঠন স্টাডি
সার্কেল প্রকাশ্যেই কাজ করত আর মস্কোতে প্রায়ই ছাত্র সংগঠনের সাথে একই দিনে বিভিন্ন
অনুষ্ঠান করে ছাত্র সংগঠন থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করত। বাকশালের লোকবল তেমন ছিল না। সাধারণত ১৭ মার্চ মাদি ইনস্টিটিউটে
বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালনের মধ্যেই ওদের প্রকাশ্য সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সীমিত ছিল। ওরা একমনার লোকদের সাথে দর কষাকষি করে সংগঠনের বিভিন্ন কমিটিতে থাকত। সে সময় সংগঠনের পক্ষ থেকে বেশ কিছু অনুষ্ঠান করা হত। একুশের অনুষ্ঠান হত প্যাট্রিস লুমুম্বার তিন নম্বর ব্লকের লেকচার রুমে বেশ ভাব
গম্ভীর পরিবেশে। পরে অবশ্য ক্রেস্টেও হয়েছে একাধিক
বার। তবে ক্রেস্টের হলগুলো ছিল মুলত সাধারণ সভার জন্য নির্ধারিত। একুশের অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ পাঠের সাথে সাথে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত। একবার একুশের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কমরেড
মোহাম্মদ ফরহাদ। এত সুন্দর রাজনৈতিক বক্তৃতা অভি এর আগে বা পরে কখনও শুনেনি। একুশের অনুষ্ঠানে কখনও কখনও দুতাবাসের লোকজন আসতেন। একবার ক্রেস্টে একুশের অনুষ্ঠানে প্রবন্ধে এরশাদ বিরোধী কথাবার্তার প্রতিবাদে রাষ্ট্রদূত দুতাবাসের কর্মীদের নিয়ে অনুষ্ঠান থেকে
বেরিয়ে যান।
৮ মার্চ আন্তর্জাতিক
নারী দিবস পালিত হত প্লেখানভ ইন্সটিটিউটে। করত মস্কো কমিটি। স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান হত মস্কো পাওয়ার ইন্সটিটিউটে (মেই) মস্কো কমিটির তত্ত্বাবধানে। স্বাধীনতা দিবসে অবশ্য বাংলাদেশ দুতাবাসেও একটা অনুষ্ঠান হত যেটাকে আমরা কাঙালি
ভোজ নামে ডাকতাম। বিজয় দিবস পালিত হত প্যাট্রিস লুমুম্বা
ছাত্র সংগঠনের উদ্যোগে দনস্কায়া ক্লাবে। স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের
অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পর্ব ছাড়াও ছিল ডিস্কোটেকা।
তিন নম্বর ব্লকের লেকচার রুমে নির্বাচন ও পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান হত। পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিল নাটক। শফিউল ভাই এর পরিচালনায় সমসাময়িক জনপ্রিয় বাংলা নাটক মঞ্চস্থ হত। নিজেকে অবাক করে অভি নিজেও এসব নাটকে অভিনয় করার চেষ্টা করত। গুপি গাইন বাঘা বাইনে বাঘার চরিত্রে ওর লিকলিকে শরীর দর্শক মহলে হাসির উদ্রেক করে। তবে সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান
ছিল সারাদিন ব্যাপী মস্কো মেলা। এটা হত প্যাট্রিসে নভেম্বরের প্রথম
দিকে। তার আগের সপ্তাহে প্যাট্রিসের স্পোর্টস কমপ্লেক্সে
হত বার্ষিক খেলাধুলা।
এখন ছাত্র জীবনের যে অনুষ্ঠান সবচেয়ে বেশি মিস করি, সেটা হল
মস্কো মেলা। মস্কো মেলা হত সাধারণত নভেম্বরের শুরুতে, অক্টোবর বিপ্লব
দিবসের ঠিক পর পরই। সেটা হত সাধারণত ইন্টার ক্লাবে। আমার হোস্টেল থেকে ওখানে যেতে রাস্তার দু ধারে ছিল ছোট ছোট গাছ। ওখানে মার্বেলের মত সাদা সাদা এক ধরণের ফল ধরে থাকত। আরিফ আর আমি বাচ্চাদের মত ওগুলো একে অন্যের গায়ে ছুঁড়তে ছুঁড়তে যেতাম অনুষ্ঠানে। আরিফ পড়ত মস্কো পাউয়ার ইন্সটিটিউটে। মস্কো মেলার দিন আসত আমার
ওখানে। তখন ছিল সমাজতন্ত্রের যুগ। আইন কানুন যথেষ্ট কড়াকড়ি। শীত বসন্ত সবই আসত সোভিয়েত ইউনিয়নের
কম্যুনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশ অনুসারে। এখনকার মত ইচ্ছে হল শীত এল, ইচ্ছে হল না এল না – এমনটি হত না।
মস্কো মেলার অনুষ্ঠান ছিল সারাদিন ব্যাপী। অনেক আগে থেকেই শুরু হত দেওয়াল পত্রিকার কাজ। প্যাট্রিসের বাইরে মেই থেকে আসত দেওয়াল পত্রিকা। প্রতিযোগিতা হত এ নিয়ে। প্যাট্রিসের পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন
আলোময় দা, মেহেদী ভাইয়ের মত কবিরা। তারা তখনই বেশ ভালো লিখতেন। এখনও তাঁদের লেখা পাঠকদের আনন্দ দেয়। অভি নিজেও লিখত। কখনো ছড়া, কখনো ভ্রমণ কাহিনী অথবা মস্কো জীবনের গল্প। আসলে সে সময় আজকের মত সবাই কবি সবাই লেখক ছিল না, দেওয়াল পত্রিকার লেখা সংগ্রহে
রীতিমত যুদ্ধে নামতে হত। ১৯৮৪ সালের মস্কো মেলায় গতানুগতিক দেওয়াল পত্রিকার পাশাপাশি
আরেকটা দেওয়াল পত্রিকা বের করা হয়। সেটা করে রফিক ভাই আর নাঈমা আপার নেতৃত্বে
কিছু ছাত্রছাত্রী। রফিক ভাই কিছুদিন আগেও অল সোভিয়েতের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। কি কারণে যেন বন্ধুদের সাথে মতানৈক্য। সে থেকেই একটা প্যারালেল
কিছু করার চেষ্টা।
মস্কো মেলায়
হত একক সঙ্গীত প্রতিযোগিতা। কবিতা আবৃতির প্রতিযোগিতাও হত। ছিল বিতর্ক। আর সব শেষে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। একক ছাড়াও কোরাস বাংলাদেশ গান পরিবেশন
করত। অভি নিজেও ছিল সেই কোরাসের সদস্য। কখনো গান গাইত, কখনো তবলা বাজাতো। তবে এসব করত যতটা না দক্ষতার বলে তার
চেয়ে বেশি যোগ্য লোকের অভাবের কারণে। কোরাসের প্রধান শিল্পী ছিলেন পার্থ
দা আর রুচিরা আপা। এছাড়া জেসমিন আপা, পলি আপা, নীলা আপা, লায়লা আপা, আলোময়
দা, হাই ভাই, মিন্টু দা – এরাও যোগ দিতেন সেই দলে। পরে আসে বাপ্পা, রুমা, তাসমিনা, টিটো, তপন, নীপা, শাওন, সাবিনা, সুস্মি, তপু, ইভান,
জলি, নাঈম ভাই, রুবিনা, কুমু সহ অনেকে। সে সময় কখনো সখনো মুস্তাফা মাহমুদ ভাইও
গান গাইতেন অনুষ্ঠানে। কোরাস ছিল অনেকটা সরাই খানার মত, মানে নতুন কোন শিল্পী
আসলেই অভিদের মত অস্থায়ী শিল্পীরা নিজেরাই বিদায় নিত। তবে ওর সোভিয়েত জীবনের প্রথম দিকে অভি ছিল কোরাসের রেগুলার মেম্বার। নিজেদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাওয়া ছাড়াও গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ বছর পূর্তি
উপলক্ষ্যে গালা কনসার্টে ও অংশ নেয়। সেটা ছিল ১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। সেই ১৯৮৫ সালের গ্রীষ্মে মস্কোয় অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব যুব উৎসব। সেখানেও অংশ নেয় কোরাস বাংলাদেশ আর সেই উৎসবের অংশ হিসেবে উৎসবের আগে ও পরে গণ
মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের কালচারাল টীমের পক্ষ থেকে ওরা মস্কোর বিভিন্ন কল-কারখানায় বিভিন্ন
অনুষ্ঠানে গান গায়। শুধু মস্কো নয় মস্কোর আশেপাশের বিভিন্ন শহরেও ওরা যায়
গান গাইতে। এমন কি ওদের কোরাস কিরঘিজিয়া, কাজাখস্তানে এক্সারশনে গেলে
বিভিন্ন জায়গায় গান গেয়েছিল।
অভি তার ছাত্র জীবনে দু বার সংগঠনের সম্পাদক মণ্ডলীতে কাজের দায়িত্ব পেয়েছিল। প্রথমবার ১৯৮৪ - ১৯৮৫ সালে সে প্যাট্রিসের শিক্ষা ও সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কাজ করে। দ্বিতীয়বার ১৯৮৬ – ১৯৮৭ সালে একই দায়িত্ব পালন করে অল সোভিয়েত কমিটিতে। ও মনে করত বাংলাদেশ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নে যারা এসেছে তাদের একমাত্র না হলেও প্রধান দায়িত্ব ভালভাবে লেখাপড়া করা। লেখাপড়ার ফলাফল দিয়েই কাউকে বিচার করা উচিত, বিশেষ করে তাদের পরবর্তী শিক্ষার ক্ষেত্রে। এখানে কে কোন দল থেকে এসেছে বা কোন দল এখন করে সেটা গৌণ। ওর খুব ভালো ভাবে মনে ছিল বাংলাদেশের কম্যুনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল ইসলাম নাহিদ ভাইয়ের কথাগুলো। ও এসেছিল সিপিবির স্কলারশিপে। কয়েকবার নাহিদ ভাইয়ের সাথে ওদের ব্রিফিং হয়েছিল। যখন সব কিছু ফাইনাল নাহিদ ভাই ওকে অপেক্ষা করতে বললেন। অন্যেরা চলে গেলে তিনি ওকে কাছে ডেকে বলেছিলেন, “আমরা অনেক ছেলেমেয়েকে বৃত্তি দিয়ে বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক দেশে পাঠাই বিভিন্ন ক্রাইটেরিয়ার ভিত্তিতে। আপনি দেশে ভালো পড়াশুনা করতেন। আমরা চাই ওখানে গিয়ে আর কিছু করেন না করেন পড়াশুনাটা ভালো ভাবে চালিয়ে যাবেন। এটাই হবে আপনার প্রতি পার্টির দায়িত্ব।“
এই চিন্তা থেকেই ও যখন প্যাট্রিসের শিক্ষা ও সাহিত্য সম্পাদক ছিল গতানুগতিক কাজের বাইরেও সবাই ঠিক মত ক্লাস করছে কিনা সেটার খোঁজখবর নিত, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সময় ক্লাসে উপস্থিতির তালিকা প্রকাশ করত। সেটা অনেকেই পছন্দ করত না। তবে অভি মনে করত ছাত্র সংগঠনের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত এর সদস্যদের পড়াশুনার ব্যাপারে খোঁজখবর রাখা, দরকারে সাহায্য করা।
অভি তার ছাত্র জীবনে দু বার সংগঠনের সম্পাদক মণ্ডলীতে কাজের দায়িত্ব পেয়েছিল। প্রথমবার ১৯৮৪ - ১৯৮৫ সালে সে প্যাট্রিসের শিক্ষা ও সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কাজ করে। দ্বিতীয়বার ১৯৮৬ – ১৯৮৭ সালে একই দায়িত্ব পালন করে অল সোভিয়েত কমিটিতে। ও মনে করত বাংলাদেশ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নে যারা এসেছে তাদের একমাত্র না হলেও প্রধান দায়িত্ব ভালভাবে লেখাপড়া করা। লেখাপড়ার ফলাফল দিয়েই কাউকে বিচার করা উচিত, বিশেষ করে তাদের পরবর্তী শিক্ষার ক্ষেত্রে। এখানে কে কোন দল থেকে এসেছে বা কোন দল এখন করে সেটা গৌণ। ওর খুব ভালো ভাবে মনে ছিল বাংলাদেশের কম্যুনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল ইসলাম নাহিদ ভাইয়ের কথাগুলো। ও এসেছিল সিপিবির স্কলারশিপে। কয়েকবার নাহিদ ভাইয়ের সাথে ওদের ব্রিফিং হয়েছিল। যখন সব কিছু ফাইনাল নাহিদ ভাই ওকে অপেক্ষা করতে বললেন। অন্যেরা চলে গেলে তিনি ওকে কাছে ডেকে বলেছিলেন, “আমরা অনেক ছেলেমেয়েকে বৃত্তি দিয়ে বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক দেশে পাঠাই বিভিন্ন ক্রাইটেরিয়ার ভিত্তিতে। আপনি দেশে ভালো পড়াশুনা করতেন। আমরা চাই ওখানে গিয়ে আর কিছু করেন না করেন পড়াশুনাটা ভালো ভাবে চালিয়ে যাবেন। এটাই হবে আপনার প্রতি পার্টির দায়িত্ব।“
এই চিন্তা থেকেই ও যখন প্যাট্রিসের শিক্ষা ও সাহিত্য সম্পাদক ছিল গতানুগতিক কাজের বাইরেও সবাই ঠিক মত ক্লাস করছে কিনা সেটার খোঁজখবর নিত, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সময় ক্লাসে উপস্থিতির তালিকা প্রকাশ করত। সেটা অনেকেই পছন্দ করত না। তবে অভি মনে করত ছাত্র সংগঠনের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত এর সদস্যদের পড়াশুনার ব্যাপারে খোঁজখবর রাখা, দরকারে সাহায্য করা।
১৯৮৭ - ১৯৮৮ সালে অভি যখন চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ওকে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব নিতে বলা হয় পার্টি থেকে। ও সেই দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে। গত চার বছরে অভি দেখেছে দায়িত্বে যেই থাকুক সংগঠনের কাজ হয় পার্টির দু একজন নেতার মর্জি মাফিক। অভি বিশ্বাস করত সংগঠনের সভাপতি হলে সে সব সদস্যের কাছে দায়বদ্ধ, সবার স্বার্থে কাজ করতে বাধ্য। যেহেতু ও জানত এই প্রশ্নে পার্টির সাথে ওর বিরোধ অবশ্যম্ভাবী তাই ও দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে। শুরু হয়
সংঘাত। গনতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতায় বিশ্বাসী কমরেডরা এটা হজম করতে পারে না। অভি ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে। এই ঘটনার প্রায় দেড় বছর পর অভি মাস্টার্স কমপ্লিট করে দেশে যায় চৌদ্দ সপ্তাহের জন্য। পিএইচডির জন্য ডিপার্টমেন্ট থেকে ডাক পেলেও তখন নিশ্চিত ছিল না ফিরবে কিনা। সেটা মুলত কমরেডদের সাথে তিক্ত সম্পর্কের কারণে। ১৮৮৯ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি ফিরে আসার পরে ওর সাথে পার্টির সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয়ে যায়। ইতিমধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নে
পরিবর্তন শুরু হয়। ১৯৯০ বা ১৯৯১ সালের একুশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ও নিজের উদ্যোগে মিউজিক ও স্লাইড শো'র আয়োজন করে। অনুষ্ঠান সফল হলেও সেখানেও বিভিন্ন বিতর্ক তৈরি হয়। ১৯৯১ সালের এপ্রিলে তিন নম্বর ব্লকের লেকচার হলে নববর্ষ পালন করা হয়। সেটাই ছিল ওর শেষ অনুষ্ঠান। ও ছিল একান্তই দর্শক। পরের দিন ও দেশে যায়। এরপর আরেক বার ও সংগঠনের সাধারণ সভায় উপস্থিত ছিল। সেটা অবশ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পরে। সেখানে মস্কোর সবাই উপস্থিত ছিল। সংগঠনের ভবিষ্যতে নিয়ে কথা হচ্ছিল। অভি বিশ্বাস করত ফর্মালি ছাত্র হলেও এখন অধিকাংশ মানুষই মূলত ব্যবসায়ী। এমতাবস্থায় সংগঠনের থাকাটা আদৌ প্রয়োজন কিনা সেটা নতুন করে ভেবে
দেখা দরকার।
আগেই বলেছি, অভি যখন আসে তখন প্যাট্রিসের সভাপতি ছিলেন মলয় দা
(মলয় রঞ্জন ধর)। এরপর পালাক্রমে বাবুল ভাই (ফখরুজ্জামান বাবুল), আলময় দা (আলোময় বিশ্বাস),
মুকুল ভাই (আতাউর রহমান), হাই ভাই (আব্দুল হাই), কালাম (আবুল কালাম আজাদ), টিটো (খন্দকার
রহমতুল্লাহ), জগদীশ (জগদীশ এষ) সভাপতি হয় (সবার নাম মনে পড়ছে না, কেউ হয়তো ঠিক করে
দেবেন)। সংগঠনের সভাপতি হওয়া যে খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল তা নয়। আমার মনে হয় এর
চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল পড়াশুনায় ভালো করা। তবে একসময় সাইকেলের জন্য তালা
কিনতে গিয়ে আমি যখন জিজ্ঞেস করি, “তালাটা ভালো তো?” দোকানদার বলেছিলেন “তালা ব্যাপারটাই
সিম্বলিক। যারা নিয়ম মানে তারা তালা না থাকলেও তোমার সাইকেল নেবে না, আর যারা চুরি
করার তারা তালা ভেঙ্গে হলেও সাইকেল চুরি করবে।“ আইন, পদ সেসবও তাই। আইন হল প্রিভেন্টিভ
মেজার যাতে বলা হয় তুমি অন্যায় করলে এই সাজা পাবে। একদল লোক আছে তারা আইন জানুক আর
নাই জানুক, নিয়ম ভাংবে না, অর্থাৎ লাল আলোতে রাস্তা ক্রস করবে না, যেখানে সেখানে থু
থু ফেলবে না। আরেকদল জেনেশুনেও আইন অমান্য করবে। কথাটা বলছি এজন্যে যে তখন ছাত্র সংগঠনের
পোস্ট কোন সুবিধা দিত না আর যদিও দিত আমাদের বন্ধুরা সেটা ব্যবহার করত না, অন্তত আমার
জানা মতে। তবে কেউ কেউ ছাত্র সংগঠনের কথা বলে এক ঘরে একা থাকার সুযোগ নিত বা ভিসা নিত
বাইরে যাওয়ার। আসল কথা এরা ছাত্র সংগঠনের কোন দায়িত্বে না থাকলেও এসব সুযোগ নিত। দায়িত্বে
থাকায় সেটা ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ এটা পদ, পদবী নয় এক ধরণের মাইন্ড সেট। সে সময় সংগঠনে
জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি তেমন হত না, যদিও একবার ন্যাপের ছেলেমেয়েদের সাথে দ্বন্দ্ব
এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে ছাত্র সংগঠনের কাজে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। ওরা নির্বাচনের ফলাফলকে
মানতে অস্বীকার করে। গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করা হয়েছে বলে ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষের কাছে
অভিযোগ করে। সংগঠন যাতে দ্বিধা বিভক্ত না হয় (শ্রীলংকার সংগঠনের পরিস্থিতি তাদের মাথায়
ছিল) সেজন্যে ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ আমাদের ডেকে কিছু বিশেষ পদক্ষেপ নেন, গঠনতন্ত্রে
কিছু পরিবর্তন আনা হয়। এই ঘটনায় প্রফেসর স্ত্যানিস খুবই মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন। এর জের
স্বরূপ প্রথমবারের মত নতুন কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে আসতে অস্বীকার করেন।
মুকুল ভাই যখন সভাপতি তখন কিছু ছাত্র ডলার কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত
হয়। সে সময় ডলার বা বিদেশি মুদ্রা কেনাবেচা ছিল অবৈধ, শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই ঘটনায়
কয়েক জনের জেল পর্যন্ত হয়। কয়েকজনকে পড়াশুনা শেষ না করেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ত্যাগ করতে
হয়। এটা ছিল পঁচাশি-ছিয়াশির শিক্ষা বর্ষ। গর্বাচভ সবে ক্ষমতায় এসেছেন। পেরেস্ত্রইকা
তখনও শুরু হয়নি। ধারনা করা যেতে পারে যদি ঘটনা সত্য হয়ে থাকে তবে টাকার অঙ্ক ছিল বেশ
বড় রকমের। কেননা সে সময় অনেক ছাত্রছাত্রীই টুকটাক ডলার, পাউন্ড, মার্ক এসব ভাঙ্গাত।
তাই খুব বড় রকমের অঙ্ক না হলে কেজিবি এ ঝামেলায় যেত না। তবে এসবই অনুমান। আমরা এসব
ব্যাপারে খুব বেশি কিছু জানতাম না। আসলে সোভিয়েত আমলে এসব ঘটনা থাকত গোপনীয়তায় ঢাকা।
পরে এদের কারো কারো সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। যাদের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে তারা সবাই
খুব প্রতিভাবান ও অমায়িক। পরবর্তীতে অনেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন।
তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গার পর অনেক গোপনীয়তা
আলোর মুখ দেখলেও সেসব অভিযোগের সত্যতা ও ভিত্তি নিয়ে আমার অন্তত প্রশ্ন বেড়েছে বই কমেনি।
যতদূর জানি এরপরে সংগঠনের সভাপতি মুকুল ভাইকে ডেকে ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ
করা হয়। কেননা এতে করে পার্টি ও সরকারের চোখে ইউনিভার্সিটির মানসম্মান খোয়া যায়।
তখন একটা কথা চালু ছিল যে ছাত্র সংগঠন চাইলে কারও পরবর্তী পড়াশুনার
ক্ষেত্রে মানে পিএইচডি করার ক্ষেত্রে বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে। সত্যি বলতে কি কারো ক্ষতি
করতে চাইলে সংগঠনের দরকার হয় না, সেটা যে কেউ পারে। সে সময় যে সমস্ত লোকজন ছাত্র সংগঠনের
বিভিন্ন কমিটির মূল দায়িত্বে ছিল তাদের কেউ এমন করতে পারে বা করবে বলে আমার মনে হয়নি।
তবে কেউ কেউ, যারা সরাসরি দায়িত্বে ছিলেন না, কিন্তু পেছনে থেকে ছাত্র সংগঠনের পক্ষে
বা বিপক্ষে কলকাঠি নাড়ানোর ক্ষমতা রাখতেন, তারা এটাকে ব্যবহার করতেন কাউকে ভয় দেখানো
জন্যে বা কাউকে পথে আনার জন্য। অভিকে ব্যক্তিগত ভাবে এ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি।
তবে সে গল্পে আমরা পরে কখনও ফিরব। ভয়ভীতির অস্ত্র সবাই সবসময়ই ব্যবহার করতে চেয়েছে,
এটা নতুন কিছু নয়। একটা কথা আছে ক্ষমতা মানুষকে নষ্ট করে। হতে পারে। তবে আমার কেন যেন
মনে হয় নষ্ট মানুষ ক্ষমতায় যেতে চায় আর যেতে পারলে নিজে তো নষ্ট হয়ই ক্ষমতাকেও নষ্ট
করে। এক্ষেত্রে আরও একটা কথা, বর্তমানে ছাত্র সংগঠন আছে। এর সভাপতি বা সম্পাদক হওয়ার
জন্য এখন যে ধরণের দ্বন্দ্ব দেখা যায়, আমাদের সময় সেটা ছিল কল্পনাতীত। কারণ জানি না,
তবে এটাও মনে হয় দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ ও এদেশে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রতিফলন।
আগেই বলেছি আমাদের ছাত্র সংগঠন দেশের সংগঠনের মত নয়। পেছনে
ফিরে দেখলে মনে হয় এটা ছিল দেশের ছাত্রদের অধিকার ও দাবী দাওয়া নিয়ে আন্দোলনকারী
বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও সরকারি ছাত্র সংগঠনের এক সংমিশ্রণ। দেশে ছাত্র ইউনিয়ন সহ
বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছাত্রদের দাবী দাওয়া নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করত, অন্যদিকে
ছাত্র লীগ ও ছাত্র দল আওয়ামী লীগ বা বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন মূলত সরকারের স্বার্থ
রক্ষায় ব্যস্ত থাকত। সোভিয়েত ইউনিয়নে, যেখানে সব ছাত্রই স্টাইপেণ্ড পেত আর ছিল পড়াশুনার
আদর্শ পরিবেশ (অন্তত আমাদের দেশের তুলনায়) ছাত্রদের খুব যে বেশি দাবী দাওয়া ছিল তা
নয়। তবুও কোন ছাত্র কোন সমস্যায় পড়লে সেটাকে কর্তৃপক্ষের গোচরে আনার দায়িত্ব পালন
করত ছাত্র সংগঠন, ছিল শহর পরিবর্তন, পরবর্তীতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের সমস্যা। আর সব
চেয়ে বড় কথা এই বিদেশ বিভূঁইয়ে একত্রে থাকার, পরস্পরের পাশে থাকার প্ল্যাটফর্ম। অন্তত
এদেশে পড়তে আসার প্রথম পর্যায়ে প্রায় সবার জন্য এর প্রয়োজনীয়তা ছিল অপরিহার্য। অন্যদিকে
সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের দরকার ছিল কোন ভাবে তাদের মেসেজ ছাত্রছাত্রীদের কাছে পৌঁছে
দেওয়া। মনে রাখতে হবে এদেশে তখন ছাত্ররা আসত বিভিন্ন বামপন্থী রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে। এদেশের কর্তৃপক্ষ
নিঃসন্দেহে চাইত এসব ছাত্রছাত্রীদের তাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে। আরও একটা ব্যাপার
হচ্ছে সাংস্কৃতিক দিক। সোভিয়েত ইউনিয়নে সবসময়ই প্রচেষ্টা ছিল এদেশের বিভিন্ন ছোট ছোট
জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি এসব টিকিয়ে রাখার। মনে হয় এখানে পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের
জন্যেও তারা একই নীতি গ্রহণ করেছিল। যদি পশ্চিমা দেশগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তৃতীয়
বিশ্বের প্রতিভাবান ছাত্রছাত্রীদের কাজের ব্যবস্থা করে তাদের সেবা লাভ করা, সোভিয়েত
ইউনিয়নের নীতি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। তারা চাইত যেসব ছাত্রছাত্রী সোভিয়েত বৃত্তি
নিয়ে পড়াশুনা করছে, তারা যেন বিশেষজ্ঞ হয়ে নিজের দেশে ফিরে যায় এবং অর্জিত জ্ঞান
নিজের দেশের উন্নয়নে কাজে লাগায়। তাই নিজের মূল থেকে যাতে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায় তার
জন্য দরকার ছিল বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ছাত্রছাত্রীরা যাতে নিজ নিজ সংস্কৃতির চর্চা
করতে পারে সেটা নিশ্চিত করা। আর এ লক্ষ্য থেকেই এসব ছাত্র সংগঠন গড়ে তোলা। এখনও
এসব ছাত্র সংগঠন নতুন রাশিয়ায় কাজ করে যাচ্ছে, বিশেষ করে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
দুবনা, ১৪ মার্চ ২০২০


Comments
Post a Comment