চুরাশির গ্রীষ্ম
১৯৮৪ সালের গ্রীষ্ম।
দিনের কাজের শেষে খাওয়া দাওয়া সেরে ঘুরতে বেরিয়েছে অভি। ক্যাম্প থেকে বেশি দূরে নয়,
দুটো রাস্তা পেরুলেই সামনে আদিগন্ত বিস্তৃত তৃণভূমি, স্তেপ। স্তেপের কথা অভি আগে শুধু
বইয়েই পড়েছে, রুশ দেশের বিভিন্ন বইয়ে। এই প্রথম সে চাক্ষুষ দেখল স্তেপ কি জিনিস। এর
আগে সে শুধুই তাদের গ্রামের দক্ষিণের চক দেখেছে আর একাত্তরে যখন পালিয়ে গিয়েছিল বাড়ি
থেকে তখন দেখেছে বিশাল বৈরাগীর চক। তবে আকাশ মাটি ছোঁয়ার আগেই সেখানে দূরের গ্রামের
গাছ গাছালির মাঝে আটকা পড়ে যেত। আর এই স্তেপ তো সীমাহীন, তৃণভূমি তো নয়, যেন সাগর।
বিশেষ করে সবুজ ঘাসের উপর যখন বাতাসের ঢেউ বয়ে যায় কে বলবে এটা সাগর নয়! সারাদিনের
ভ্রমন শেষে ক্লান্ত সূর্যটা ঝুলে আছে আকাশের গায়। ঘুমে টলমল তার চোখ। পাকা আপেলের মত
রাঙা সূর্যটা এই বুঝি লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমুতে যাবে। গোধূলির ভূতুরে আলোয় চারিদিক আরও
নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ। কিন্তু দূরে ওটা কী।
- দোস্ত, দেখ, দেখ, ওখানে একটা জলাশয়!
- না দোস্ত, ওটা মরীচিকা। মনে নেই, স্কুলে পড়েছি মরুভুমিতে মরীচিকার কথা?
- দোস্ত, দেখ, দেখ, ওখানে একটা জলাশয়!
- না দোস্ত, ওটা মরীচিকা। মনে নেই, স্কুলে পড়েছি মরুভুমিতে মরীচিকার কথা?
অভির পাশেই বসে
ছিল ঝুনু। সোভিয়েত জীবনে ঝুনু ওর থেকে সাত দিনের বড়। অভি এসেছে গত বছর মানে ১৯৮৩ সালের
৬ ই সেপ্টেম্বর, ঝুনু ২৯ আগস্ট। তারপর কেমনে কেমনে যেন ওদের মাঝে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।
অনেক সময় হয় মানুষ কারো সাথে বন্ধুত্ব করতে চায়। এক্ষেত্রে সে রকম কিছুই হয়নি। ওদের
স্রেফ ভালো লাগত একসাথে হোস্টেলের পেছনের বনে ঘুরে বেড়াতে, ফেলে আসা দিনগুলোর কথা বলতে।
সবচেয়ে বড় কথা ওরা একে অন্যেকে বিশ্বাস করতে আর নিঃসঙ্কোচে মনের কথা খুলে বলত। আজ প্রায় চল্লিশ বছর পরেও ওদের সেই বন্ধুত্ব আগের
মতই অটুট।
ওরা এখন কাজ করছে একটা আন্তর্জাতিক ছাত্র নির্মাণ দলে। প্রতি গ্রীষ্মে বিভিন্ন দেশের ছাত্ররা তখন যেত এসব নির্মাণ দলে কাজ করতে। গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা থাকত। কেউ যেত ব্ল্যাক সীর পাড়ে তোয়াপসে বা মাকাপসে নামক বীচে রেস্ট নিতে, কেউ যেত মালদাভিয়ায় আপেল, আঙুর এসব তুলতে। অনেকেই বিভিন্ন শহরে ভ্রমনে যেত। কেউ বা যেত ইংল্যান্ডে কাজ করতে। এই সময়ে আবার দেশেও বেড়াতে যেত অনেকেই। আবার অনেকেই যেত নির্মাণ দলে কাজ করতে। এতে সোভিয়েত দেশ গঠনে ওদের যেমন হাত থাকতো তেমনি কাজের শেষে কিছু উপার্জনও হত যা দিয়ে পরের বছর দেশে বেড়াতে যাওয়া যেত। অন্তত যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করত তাদের অনেকেই এই বিশ্বাস নিয়েই যেত সে কাজে। অভিরাও সে উদ্দেশ্যেই এসেছে। এই দলে বাংলাদেশ থেকে ওরা ছিল তিনজন, সহপাঠী। তিতু, ঝুনু আর অভি। তিতু আর ঝুনু পড়ত মেডিসিনে, অভি ফিজিক্সে। আর ওরা কাজ করত ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির নির্মাণ দলে। ভাবা হত মেডিসিন বা ফিজ-ম্যাথ ফ্যাকাল্টির চেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির নির্মাণ দলে কাজ করলে বেশি টাকা উপার্জন করা যায়। তিতুর এক ভাই এখান থেকে পড়াশুনা শেষ করে দেশে ফিরেছেন, ওর ভাবী তখনও মস্কোয়। তাই নির্মাণ দলে আসার আগে ও খুব ভালো ব্রিফিং পেয়েছিল। ঝুনুরও কিছু ঘনিষ্ঠ লোকজন এ দেশে পড়াশুনা করেছে, তাই কিছুটা হলেও ওর এদেশ সম্পর্কে একটা ধারণা ছিল। অভির জানাশোনা সব বই পড়ে আর সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখে।
ওরা এখন কাজ করছে একটা আন্তর্জাতিক ছাত্র নির্মাণ দলে। প্রতি গ্রীষ্মে বিভিন্ন দেশের ছাত্ররা তখন যেত এসব নির্মাণ দলে কাজ করতে। গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা থাকত। কেউ যেত ব্ল্যাক সীর পাড়ে তোয়াপসে বা মাকাপসে নামক বীচে রেস্ট নিতে, কেউ যেত মালদাভিয়ায় আপেল, আঙুর এসব তুলতে। অনেকেই বিভিন্ন শহরে ভ্রমনে যেত। কেউ বা যেত ইংল্যান্ডে কাজ করতে। এই সময়ে আবার দেশেও বেড়াতে যেত অনেকেই। আবার অনেকেই যেত নির্মাণ দলে কাজ করতে। এতে সোভিয়েত দেশ গঠনে ওদের যেমন হাত থাকতো তেমনি কাজের শেষে কিছু উপার্জনও হত যা দিয়ে পরের বছর দেশে বেড়াতে যাওয়া যেত। অন্তত যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করত তাদের অনেকেই এই বিশ্বাস নিয়েই যেত সে কাজে। অভিরাও সে উদ্দেশ্যেই এসেছে। এই দলে বাংলাদেশ থেকে ওরা ছিল তিনজন, সহপাঠী। তিতু, ঝুনু আর অভি। তিতু আর ঝুনু পড়ত মেডিসিনে, অভি ফিজিক্সে। আর ওরা কাজ করত ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির নির্মাণ দলে। ভাবা হত মেডিসিন বা ফিজ-ম্যাথ ফ্যাকাল্টির চেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির নির্মাণ দলে কাজ করলে বেশি টাকা উপার্জন করা যায়। তিতুর এক ভাই এখান থেকে পড়াশুনা শেষ করে দেশে ফিরেছেন, ওর ভাবী তখনও মস্কোয়। তাই নির্মাণ দলে আসার আগে ও খুব ভালো ব্রিফিং পেয়েছিল। ঝুনুরও কিছু ঘনিষ্ঠ লোকজন এ দেশে পড়াশুনা করেছে, তাই কিছুটা হলেও ওর এদেশ সম্পর্কে একটা ধারণা ছিল। অভির জানাশোনা সব বই পড়ে আর সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখে।
অভিরা কাজাখস্তানের
এই দূর গ্রামে এসেছিল মস্কো থেকে। সে ছিল এক
দীর্ঘ ট্রেন যাত্রা। এর আগে এত লম্বা যাত্রার অভিজ্ঞতা ওর ছিল না। সেই ১৯৭০ সালে মার
সাথে পুরী আর ১৯৭২ সালে গয়া কাশী গিয়েছিল ট্রেনে চেপে, ১৯৭২ সালে গোয়ালন্দ থেকে দর্শনাও
সেই ট্রেনে চেপেই গিয়েছিল অভি। তবে তখন ছিল
ছোট, সাথে মা, দাদু অনেকেই ছিল, তাই অনেকটা বাড়ির মতই মনে হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে এসে
ট্রেনে চেপে গেছে মিনস্ক, ছাত্র সংগঠনের সম্মেলনে। তবে সেটা গেছে পুরো এক ওয়াগন ভাড়া
করে সব বাংলাদেশিরা মিলে হৈ হুল্লোড় করতে করতে। এবার ছিল সবই অন্য রকম। ওদের সাথে আরও
অনেক বাংলাদেশি ছিল অবশ্য, তবে বিদেশীদের সংখ্যাই ছিল বেশি। প্রায় তিন দিনের জার্নি।
গরম। খোলা ট্রেন যাকে এরা বলে প্লাসকার্ড। ওখানেই প্রথম দেখে মস্কো থেকে অনেক দূরে
চলে যাওয়ার পর কিভাবে ট্রেনে লোকজন উঠে এসে বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রি করছে। সেদ্ধ আলু,
টম্যাটো, শশাসহ অন্যান্য খাবার আর ছিল হাতে তোলা পর্ণ ছবি। নিজের চোখে না দেখলে অভি
অবশ্য বিশ্বাস করত না এসব। ওদের ট্রেনের শেষ গন্তব্য ছিল কারাগান্দা নামে এক কাজাখ
শহর। ওরা অবশ্য আগেই নেমে যায় ৎসেলিনাগ্রাদ নামে এক শহরে। ব্রেঝনেভের লেখায় ও অবশ্য
এসব জায়গার নাম শুনেছে। স্তেপের ভেতর কিভাবে শহর তৈরি করে মানুষের বাসযোগ্য করে তোলা
হয়েছিল সেই গল্পের নাম ছিল “পদন্যাতিয়ে ৎসেলিনী” বা “অহল্যা ভূমি”। এরপর অভি এই শহরে
এসেছিল ১৯৮৫ সালে বিশ্ব যুব উৎসবের পরে। তখন ও এখানে স্থানীয় কমসোমল নেতার সাথে প্রতিযোগিতায়
জিতে বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছিল। আর অনেক রাত পর্যন্ত “পাদ মস্কোভনিয়ে ভেচেরা” গান গেয়ে
ছোট্ট সেই শহরের রাস্তা দিয়ে হেঁটেছিল সবাই মিলে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গার কিছুদিন পরে
এই শহর কাজাখস্তানের নতুন রাজধানীতে পরিণত হয়। নাম রাখা হয় আস্তানা। কিছুদিন আগে নাম
পরিবর্তন করে রাখা হয় নুর সুলতান, কাজাখস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্টের নামানুসারে।
কাজাখস্তানে
যে গ্রামটায় ওরা কাজ করত, সেটা খুব বেশি বড় নয়। এক ঘর কাজাখ বাদে সবাই জার্মান। সম্রাজ্ঞী
দ্বিতীয় ইয়েকাতেরিনার সময় থেকেই রাশিয়ায় অনেক জার্মান বাস করত। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের
সময়ে এদের কাজাখস্তানে নির্বাসনে পাঠায় স্ট্যালিন। অভিরা থাকত একটা ক্যাম্পে বা লাগেরে।
হতে পারে স্কুল, এখন গ্রীষ্মের ছুটি বলে ফাঁকা পড়ে আছে। একেক ঘরে চার জন করে। এসেই
নিজেরা টয়লেট, বাথরুম এসব তৈরি করে। দুটো লম্বা ঘরে সবার থাকার ব্যবস্থা। আরেকটা কিচেন।
ওখানে খাওয়া দাওয়া বাদেও টিভি দেখা, আড্ডা দেওয়া বা নির্মাণ দলের মিটিং হত। একটু দূরেই
গ্রামের ক্লাব। সেখানে শনি-রবিবার ডিস্কোটেকা। সাথেই সিনেমা হল। প্রায়ই নতুন নতুন ছবি
দেখাত ওখানে। এ সময় টিভিতে চলছিল কমিসার কাত্তানিওর সারা জাগানো ইতালীয়ান সিরিয়াল স্প্রুত
(অক্টোপ্পাস)। মাফিয়াদের কাহিনী। সবাই মিলে দম বন্ধ
করে দেখত ওরা আর কমিসার কাত্তানিওর জন্য খুব দুশ্চিন্তায় থাকত। ক্যাম্পের সামনে অজগর
সাপের মত শুয়ে আছে এক রাস্তা, রাস্তার ওপারে টিউব ওয়েল। এখানে দেশের মত পাম্প করে জল
তুলতে হয় না, হাতলটা উপরে তুললে এমনিতেই জল পড়ে। রাস্তা ধরে একটু হাঁটলে হাতের বাঁদিকে
দোকান। খুব বেশি জিনিসপত্র সেখানে নেই। মস্কোয় অভি এরকম দোকান অনেক দেখেছে আর মনে মনে
এই ভেবে অবাক হয়েছে যে ওদের গ্রামের দোকানে যা পাওয়া যায়, এখানে তাও পাওয়া যায় না।
তবে অভি সময় পেলেই ওখানে যেত, যদি হঠাৎ কিছু পাওয়া যায়? এই রাস্তার শেষে ছিল খামার।
আসলে ওরা কাজ করছিল একটা সাবখোজে। তখন এদেশে কালখোজ (কালেক্টিভনোয়ে খজাইস্তভা) ও সাবখোজ
(সভিয়েতস্কোয়ে খজাইস্তভা) নামে দু ধরনের কৃষি সমবায় ছিল। এটা তাদেরই একটা। ওদের কাজ
ছিল এই সমবায়ের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করা। ওদের দলে ছিল একজন কম্যান্ডার যে কিনা সার্বিকভাবে
দলের দেখাশুনা করত। ইগর নামে পঞ্চম বর্ষের এই ছাত্রের কাজ ছিল ওদের জন্য কন্ট্রাক্ট
যোগার করা। এরপরেই ছিল মাস্টার, নাম ছিল আনাতলি। ওকে বলা চলে সুপারভাইজার। আনাতলির
কাজ ছিল ওদের কাজকর্ম ঠিক মত হচ্ছে কিনা, ওরা ঠিক মত কাজের মালমসলা পাচ্ছে কিনা সেটা
দেখা। কমিসার ভিক্টরের কাজ ছিল বাজারহাট করা যাতে ওদের খাবার সাপ্লাইয়ে কোন সমস্যা
না হয়। ছিল দুটো মেয়ে, রাঁধুনি। অভিরা যখন কাজে থাকত, ওরা তখন ওদের জন্য খাবার তৈরি
করত। বাকি সবাই ছিল নির্মাণ কর্মী। এরা তিন ব্রিগেডে বিভক্ত ছিল। ঝুনু আর তিতু ছিল
এক ব্রিগেডে, অভি আরেক ব্রিগেডে। কে জানে, হয়তো ওদের বিভিন্ন সাবজেক্ট ছিল বলে এই ব্যবস্থা।
খুব ভালো ভাবে যাদের কথা এখনও ওর মনে আছে তাদের
একজন হল আফ্রিকার ইসসো (ISSO)। ওর নাম মনে থাকার প্রধান কারণ হল এসব নির্মাণ দলকে বলা
হত ইন্তারনাশিওনালনি স্তুদেনচেস্কি স্ত্রইতেলনি অত্রিয়াদ (ISSO). আরও ছিল কার্ল আর
আরনে নামের পূর্ব জার্মানির দুই ছেলে, খুব জলি। অভিদের বিকেলের আড্ডা ওদের সাথেই হত।
ওরা ছিল মস্কোর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক এক নামকরা ইন্সটিটিউটের ছাত্র। মস্কো ফিরেও
ওরা বেশ কয়েকবার দেখা করেছে অভির সাথে। উল্লেখ করার মত আরও ছিল নীনা (খুব সম্ভবত) নামের
এক মেয়ে, মহিলাই বলা চলে। যদিও ও তখন তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী, বয়সে ছিল অনেক বড়। ছোটখাটো
এই কাজাখ মহিলা ছিল অনেকটা কিংবদন্তির মত। সোভিয়েত আমলে কাজের ধারা ছিল ভিন্ন। সেখানে
বেতন খুব বেশি ছিল না, কিন্তু যারা ভালো কাজ করত তাদের অন্য বিভিন্ন ভাবে পুরস্কৃত
করা হত। সে সময় প্রতিটি মানুষের জন্য বার্ষিক কাজের একটা নরমা (নির্দিষ্ট পরিমাণ কাজ)
করা থাকতো। নীনা যেখানে কাজ করত, সে সেই নরমা শুধু পূরণই করেনি, তার চেয়েও বেশি কাজ
করেছে আর সেটা করেছে একাধিক বার। আর সে সময় এদেশে শ্রম ও শ্রমিকের খুব মূল্য (আর্থিক
নয়) দেওয়া হত। পত্র পত্রিকায় ছবি ছাপা হত, টিভিতে ফিচার করা হত এসব। তাই নীনা ছিল অন্যদের
জন্য আদর্শ। আর ঘটনাক্রমে নীনা ছিল অভির সহকর্মী বা নাপারনিকের বান্ধবী। সে কথা পরে।
নীনার এই কাজের পুরস্কার হিসেবে সে পেয়েছিল গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করার
সুযোগ।
কাজ ছিল বিভিন্ন রকমের। প্রথম দিকে কাজ করেছে স্থানীয়
খামারে। গোয়ালের ছাদ মেরামত করা আর সারা বছরে শুয়োরদের যে বিষ্ঠা জমে ছিল শুয়োরখানায়
তা পরিষ্কার করা। প্রথম দিন কোন রকমে নাকমুখ
বন্ধ করে ঢুকলেও কয়েক ঘণ্টা পরে আর অসুবিধা হয়নি। এমন কি ওখানেই দুপুরের খাবার খেয়ে
এক বন্ধুর কাঁধে মাথা রেখে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে সেটাও টের পায়নি। ঘুমানোর কায়দা ছিল
বেশ, দুজন দুজনের কাঁধে মাথা রাখত আর পাগুলো চুম্বকের বিপরীত মেরুর মত উল্টো দিকে থাকতো।
আসলে খামারে যাবার পথে (কখনও ওরা যেত গাড়িতে, কখনও হেঁটে – খুব বেশি দূরে ছিলনা তো)
অভির চোখে পড়ত বেশ কিছু নাদুসনুদুস শুয়োর। এর আগে ও দেশে শুয়োর দেখেছে। ওগুলো ছিল ময়লা,
নোংরা। সাধারণত কালেভদ্রে এই শুয়োরগুলো ওদের গ্রামে নিয়ে আসত অন্য কোন গ্রাম থেকে।
ওরা রাস্তার সমস্ত ময়লা খেয়ে একাকার করে ফেলত। সেসব শুয়োরের তুলনায় এরা তো সব সাহেব
বিবি। ফুটফুটে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। তাই হয়তো
এসব কাজ করতে তেমন অসুবিধা হত না। তাছাড়া ওরা সবাই ছিল ছাত্র, সবাই একই ধরনের
কাজ করত। ছোট বা বড় – এ প্রশ্ন ছিল না। আর যেখানে সমতা, সেখানে মানুষ অনেক কিছুই করতে
পারে। ব্রিগেডে অভির সহকর্মী বা নাপারনিক ছিল সেরগেই। ইউক্রাইনের ছেলে। ওর চেয়ে বছর
দুয়েকের সিনিয়র। লম্বায় মিটার দুই। যাকে বলে দৈত্যাকার। ওজন একশ কেজির বেশি। অভির তিতাল্লিশ
কেজির কাছে সেটা অনেকটা পাহাড় প্রমান। ওদের একসাথে সব কাজ করতে হত। আর কাজ ছিল সিমেন্ট,
ইট এসব সরবরাহ। সেরগেই ইচ্ছে মত স্ট্রেচার ভরত, তারপর সামনের দিকটা ধরে হাঁটতে শুরু
করতে। অভি ছিল ওর সেন্টিমিটার তিরিশেক খাটো। তাই সমস্ত সিমেন্ট বা ইটের ভার পড়ত ওর
ওপর। হাত ছিঁড়ে যায় যায়, তবুও অভি জেদ করে কিছু বলত না, কোন রকমে পা টানতে টানতে সেরগেইএর
পেছন পেছন হাঁটত। অভি মনে মনে ভাবত সেরগেই যদি আরও অনেক বড় হত তাহলে ও হয়তো সেই গল্পের
নাপিতের মত স্ট্রেচারের পেছনে বসে যেতে পারত, দৈত্যের মত সেরগেই টেরও পেত না। একদিন ওদের ব্রিগেডিয়ার এটা দেখে অভিকে বকা, “তুই
ওকে বলিস না কেন যে এত ভারি জিনিস তুই টানতে পারবি না।“ অভি হেসে উত্তর দেয় “টানছি
তো।“ “যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে, তখন উত্তর দেবে কে?” এরপর নিজেই সেরগেইকে বলে দিল খুব
বেশি জিনিস একবারে না টানতে।
নির্মাণ দলে কাজ শুধু কাজই ছিল না, ছিল বিভিন্ন
রকম ফান। প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু মজার ঘটনা ঘটত। একবার ওরা গেল একটা ঘর বানাতে।
মাপ জোক দিয়ে ফাউন্ডেশনের ভিত খুঁড়ে বসে আছে, কিন্তু সিমেন্ট নেই তো নেই। সিমেন্ট এল
দিনের শেষে, কাজ শেষের আধ ঘণ্টা আগে। অবাক হয়ে অভি দেখল সিমেন্ট গর্তে ফেলে নষ্ট করা
হল। ওদের যুক্তি “ওরা সময় মত সিমেন্ট সরবরাহ করেনি, এটা ওদের সমস্যা। ওটা এমনিতেই নষ্ট
হত। আমরা তো আর রাত দুপুর পর্যন্ত কাজ করতে পারব না।“ একেই বলে সরকারি মাল দরিয়া মে
ঢাল। এমন ঘটনা সোভিয়েত জীবনে অভি প্রচুর দেখেছে। আবার একদিন সকালে ওখানে গিয়ে দেখে
আগের দিনের রেখে যাওয়া জিনিসপত্র হাওয়া। আসলে তখন চাইলেই সব কিছু কিনতে পাওয়া যেত না।
ফর্মালি সবই ছিল জনগণের। তাই জনগণ সুযোগ পেলেই নিজের ভেবে সরকারের পকেট কাটত। সব কিছুই
ছিল যাকে বসে খাস। এটাও মনে হয় সোভিয়েত দেশ ভাঙ্গার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
একবার ওরা গেল গ্রাম থেকে বহুদূরে এক ষ্টেশনে মালগাড়ি
থেকে কাঠ নামাতে। বিশাল বিশাল কাঠ। আস্ত আস্ত গাছ। সেই কাঠ তুলতে গিয়ে অভির পা কাঠ
চাপা পরে গেল, অভি নির্বাক। সেরগেই রেগেমেগে বলল, “তুই চিৎকার করতে পারিস না?” “বা
রে, চিৎকার কেন করব। চিৎকারে কি কাজ হয়?” কাঠ নামাতে নামাতে মধ্যাহ্ন বিরতির সময় হয়ে
এল। ভিক্টর নিয়ে এল গরম খাবার। খাওয়া শেষ। কোত্থেকে যেন ভদকার বোতল বের হল। এর আগে
অভি ভদকা খায়নি। কয়েকবার শ্যাম্পেন বা ওয়াইন, তাও বড় ভাইদের ওখানে, জন্মদিন বা অন্য
কোন উপলক্ষ্যে খেয়েছে। ওরা সবাই গোল হয়ে বসে আছে। তখন সোভিয়েত ইউনিয়নে ২০০ গ্রামের
এক ধরনের গ্লাস ছিল। এক সময় অভির হাতে কে যেন পরিপূর্ণ একটা গ্লাস ধরিয়ে দিল। অভি বসে
আছে। সাধারণত এসব ক্ষেত্রে সবাই গ্লাস হাতে নেয়, টোস্ট বলে, তারপর পান করে। “নে, তাড়াতাড়ি
খেয়ে নে। একটাই গ্লাস। অন্যেরা সিরিয়ালে বসে আছে।“ “আমি এতটা পারব না।“ “কোন পারব না
নয়। খেয়ে ফেল।“ কী আর করা চোখ বন্ধ করে এক চুমুকে গ্লাসটা শেষ করে পাশের জনকে দিল।
কে যেন এক টুকরা কালো রুটি বাড়িয়ে দিল ওর দিকে। অন্য জায়গায় অভি এটা করত কিনা কে জানে।
তবে তখন সবাই ছিল কমরেড, সহযোদ্ধা। জানতো,
কিছু হলে কেউ ওকে ফেলে যাবে না।
আরেকদিনের ঘটনা মনে পড়ে। আগের রাতে অভিকে বলা হল
সকালে ওকে ক্যাম্প পরিষ্কার করতে। সে জন্যে সকাল সাতটা পাঁচে ওকে যেখানে এসেম্বলি হয়
সেখানে আসতে হবে। রাশান ভাষায় সময়টা বিভিন্ন ভাবে বলা যায়। অভির কেন যেন মনে হল ওকে
আসতে হবে আটটা বাজতে পাঁচে। এসে দেখে সবাই দাঁড়িয়ে। নিজের ভুল বুঝতে পারল, কিন্তু শাস্তি
এড়ানো গেল না। সেদিন ওকে কাজে নিল না। সারাদিন শুয়ে বসে কাটল, মাঝে মধ্যে মেয়েদের সাহায্য
করল রান্না ঘরে। অভি বুঝল কাজ না করাটাও কেমন একঘেয়ে, কেমন শাস্তি মূলক হতে পারে।
আরেকদিন কী একটা ব্যাপারে ভোটাভুটি হবে। সবাই জড়ো হয়েছে ডাইনিং রুমে। ভোটের রাশান নাম গোলাস বা ভয়েস। অভি বসে আছে কখন শব্দ করতে হবে। এর মধ্যেই যে সবাই হাত তুলে ভোট দিয়ে ফেলেছে ও সেটা খেয়ালই করেনি। যখন ভুল ভাংল, তখন ইগর অলরেডি রেজোল্যুশন লিখছে।
একবার ওদের কাজ পড়ল এক বাড়িতে। সেখানে দেয়াল ঠিক করতে হবে। এই প্রথম ইঁট দিয়ে দেয়াল গাঁথা শুরু করল। এখানে শারিরীক শ্রম কম ছিল তবে কাজ করতে হত খুব মনোযোগ দিয়ে। বাড়ির গৃহিণী মাঝে মধ্যে আপেল, পিঠে বা চা দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। অনেকটা বাড়ির মত। প্রায় এক বছর পরে অভি একটু হলেও বাড়ির স্বাদ পেল।
অভিরা যেখানে থাকত তার সামনে দিয়ে চলে গেছে রাস্তা। হাই ওয়ে নয়, তবে পাকা রাস্তা। গ্রামের ছেলেরা মোটর বাইক নিয়ে চলে যায়, আরও ছোটরা সাইকেল চালায়। রাস্তার ওপাশেই এক বাড়ি, গ্রামের একমাত্র কাজাখ পরিবার থাকে ওখানে। একদিন ওখানে আমাদের ডাক পড়ল কাজের। তাদের বানিয়া বা ষ্টীম বাথরুম মেরামত করতে হবে। সারাদিন কাজ করল ওখানে। মূলত হাতুড়ি দিয়ে পেরেক লাগান, করাত দিয়ে কাঠ কাটা। অভি এসব খুব পছন্দ করে, তাই কাজ করে বরং আনন্দই পেল। ওখানে থাকতেন এক বৃদ্ধ কাজাখ আর তাঁর বউ। ছেলেমেয়েরা দূরে শহরে থাকে। কাজের শেষে গৃহকর্তা ওদের বানিয়ায় স্নান করতে বললেন। খুব আনন্দে স্নান করল ওরা। তারপর রাতের খাবার। এই প্রথম অভি এদেশে কোন বাসার ভেতরে গেল। বাইরে থেকে খুব সাধারণ মনে হলে কী হবে, ঘর একেবারে প্রাসাদের মত। দামী কার্পেট, আসবাব, বুক সেলফ, কী নেই। আর খাবার? বিভিন্ন মাংস, মদ। এমন আতিথেয়তা এদেশে এই প্রথম পেল। মনে মনে ভাবল, ইস কাজটা যদি একটু বেশি হত।
অভি গ্রামের ছেলে। তাই খুব সহজেই গ্রামটা খুব আপন হয়ে গেল। মস্কোয় ওদের কখনও কেউ কালো বলেনি বা বললেও ও বোঝেনি। ওখানে ছোট বাচ্চারা, যারা জীবনে এমন লোকজন দেখেনি, অভিদের দিকে ইশারা করে ওদের বাবুশকা মানে দিদাদের বলত, দেখে দেখ কাল্লু যাচ্ছে। আর লজ্জিত দাদীরা ওদের কাছে ক্ষমা চাইতেন, বলতেন কিছু মনে না করার জন্য। ওদের স্নানের ব্যবস্থা ছিল ক্যাম্পেই। একটা বিরাট টবে সকালে জল ভরা হত। সারাদিন রোদের তাপে সেটা গরম হত। সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে ওরা সেখানেই কাক স্নান করত। কখনো সখনো গাড়িতে করে কিছু দূরে যে ডোবার মত ছিল, সেখানে যেত সাঁতার কাটতে। আবার বানিয়াতেও যেত সময় সুযোগে। এর মধ্যে একবার ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করা হল। সব নির্মাণ দলের কর্মীরা মিলিত হল এক জায়গায়। ওটা কি ৎসেলিনাগ্রাদ ছিল? অভির ঠিক মনে নেই। তবে ছোটখাটো এক শহর। ওদের বাংলাদেশি বন্ধুদের সাথে আবার দেখা হল। কত গল্পই না করল সবাই। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অভি, শফিক গান গাইল। আবার এল ঘরে ফেরার পালা, মন খারাপের পালা। সবাই যে যায় কর্মস্থলে ফিরে গেল।
আরেকদিন কী একটা ব্যাপারে ভোটাভুটি হবে। সবাই জড়ো হয়েছে ডাইনিং রুমে। ভোটের রাশান নাম গোলাস বা ভয়েস। অভি বসে আছে কখন শব্দ করতে হবে। এর মধ্যেই যে সবাই হাত তুলে ভোট দিয়ে ফেলেছে ও সেটা খেয়ালই করেনি। যখন ভুল ভাংল, তখন ইগর অলরেডি রেজোল্যুশন লিখছে।
একবার ওদের কাজ পড়ল এক বাড়িতে। সেখানে দেয়াল ঠিক করতে হবে। এই প্রথম ইঁট দিয়ে দেয়াল গাঁথা শুরু করল। এখানে শারিরীক শ্রম কম ছিল তবে কাজ করতে হত খুব মনোযোগ দিয়ে। বাড়ির গৃহিণী মাঝে মধ্যে আপেল, পিঠে বা চা দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। অনেকটা বাড়ির মত। প্রায় এক বছর পরে অভি একটু হলেও বাড়ির স্বাদ পেল।
অভিরা যেখানে থাকত তার সামনে দিয়ে চলে গেছে রাস্তা। হাই ওয়ে নয়, তবে পাকা রাস্তা। গ্রামের ছেলেরা মোটর বাইক নিয়ে চলে যায়, আরও ছোটরা সাইকেল চালায়। রাস্তার ওপাশেই এক বাড়ি, গ্রামের একমাত্র কাজাখ পরিবার থাকে ওখানে। একদিন ওখানে আমাদের ডাক পড়ল কাজের। তাদের বানিয়া বা ষ্টীম বাথরুম মেরামত করতে হবে। সারাদিন কাজ করল ওখানে। মূলত হাতুড়ি দিয়ে পেরেক লাগান, করাত দিয়ে কাঠ কাটা। অভি এসব খুব পছন্দ করে, তাই কাজ করে বরং আনন্দই পেল। ওখানে থাকতেন এক বৃদ্ধ কাজাখ আর তাঁর বউ। ছেলেমেয়েরা দূরে শহরে থাকে। কাজের শেষে গৃহকর্তা ওদের বানিয়ায় স্নান করতে বললেন। খুব আনন্দে স্নান করল ওরা। তারপর রাতের খাবার। এই প্রথম অভি এদেশে কোন বাসার ভেতরে গেল। বাইরে থেকে খুব সাধারণ মনে হলে কী হবে, ঘর একেবারে প্রাসাদের মত। দামী কার্পেট, আসবাব, বুক সেলফ, কী নেই। আর খাবার? বিভিন্ন মাংস, মদ। এমন আতিথেয়তা এদেশে এই প্রথম পেল। মনে মনে ভাবল, ইস কাজটা যদি একটু বেশি হত।
অভি গ্রামের ছেলে। তাই খুব সহজেই গ্রামটা খুব আপন হয়ে গেল। মস্কোয় ওদের কখনও কেউ কালো বলেনি বা বললেও ও বোঝেনি। ওখানে ছোট বাচ্চারা, যারা জীবনে এমন লোকজন দেখেনি, অভিদের দিকে ইশারা করে ওদের বাবুশকা মানে দিদাদের বলত, দেখে দেখ কাল্লু যাচ্ছে। আর লজ্জিত দাদীরা ওদের কাছে ক্ষমা চাইতেন, বলতেন কিছু মনে না করার জন্য। ওদের স্নানের ব্যবস্থা ছিল ক্যাম্পেই। একটা বিরাট টবে সকালে জল ভরা হত। সারাদিন রোদের তাপে সেটা গরম হত। সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে ওরা সেখানেই কাক স্নান করত। কখনো সখনো গাড়িতে করে কিছু দূরে যে ডোবার মত ছিল, সেখানে যেত সাঁতার কাটতে। আবার বানিয়াতেও যেত সময় সুযোগে। এর মধ্যে একবার ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করা হল। সব নির্মাণ দলের কর্মীরা মিলিত হল এক জায়গায়। ওটা কি ৎসেলিনাগ্রাদ ছিল? অভির ঠিক মনে নেই। তবে ছোটখাটো এক শহর। ওদের বাংলাদেশি বন্ধুদের সাথে আবার দেখা হল। কত গল্পই না করল সবাই। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অভি, শফিক গান গাইল। আবার এল ঘরে ফেরার পালা, মন খারাপের পালা। সবাই যে যায় কর্মস্থলে ফিরে গেল।
এর মধ্যে একরাতে সবাই কি একটা ব্যাপারে ফিসফিস করতে
লাগলো। অভি যে ব্যাপারটা খুব বুঝল তা নয়, তবে
সবার কথায় ঘাড় নাড়িয়ে সায় দিয়ে ঘরে চলে গেল ঘুমানোর আগে বই পড়বে বলে। এটা ওর জন্মগত
অভ্যেস। বই পড়া। পরের দিন সকালে এসেম্বলিতে দাঁড়িয়েছে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই কম্যান্ডার
আর মাষ্টারকে হাতকড়া পরানো হল। কমিসার দৌড়ে পালিয়ে গেল। এর নাম ক্যু। আসামীদের বিরুদ্ধে
ছাত্রদের শোষণের অভিযোগ আনা হল। ফাঁসির দাবি উঠলো চারিদিক থেকে। ওরা নিজেদের ভুল স্বীকার
করলে মৃত্যুদণ্ডের বদলে ওদের এক দিনের কারাবাস হল। ওদিন ওরা কাজে গেল না। বেশ ভালো
খাবারের আয়োজন করা হল। পরে শুনেছে এটা নির্মাণ দলে ট্র্যাডিশন, পেরেভারত বা ক্যু করা।
যতই দিন যেতে লাগলো, অভি এই গ্রামকে ততই ভালবাসতে শুরু করল। একদিকে মস্কো ফেরার আকুতি, অন্য দিকে এই গ্রামের টান। অভির সারা জীবন কেটেছে বাংলার গ্রামে। একটি দুটো নয়, উনিশ উনিশটি বছর। তারপর সব ছেড়ে মস্কো আসা। মস্কোয় গাছপালার অভাব না থাকলেও গ্রামের সেই শান্ত পরিবেশ ছিল না। তাই এক বছর পরে কাজাখস্তানের গ্রামে এসে অভি যেন নতুন করে ফেলে আসা দিন ফিরে পেল। শেষের দিকে কাজ ছিল মূলত গ্রামের মধ্যেই, দূরে কোথাও যেতে হত না। মনে পড়ল দেশে শেষ দিনগুলোর কথা। প্রতিটি দিনই শেষ দিন, প্রতিটি দিনই নিজের গ্রামকে নতুন করে উপভোগ করত অভি। এখানেও তাই। কাজ করা, সময় পেলে স্থানীয় লোকদের সাথে কথা বলা। অভির মনে পড়ল গ্রামের যাত্রার দলের কথা। ওদের গ্রামে দুটো যাত্রার দল ছিল, একটা ছিল নিজেদের বাড়িতেই ওর বড়দার। বিভিন্ন জায়গা থেকে অভিনেতা অভিনেত্রীরা আসত এসব দলে। অনেকদিন চলত রিহার্সাল। এরই মধ্যে অনেকের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে যেত। ওরা যখন গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে, অভির মনে হত বন্ধুরা বিদায় নিচ্ছে। এখানেও সেই অবস্থা। শেষ শনিবার। সবাই মিলে ক্লাবে গেল ওরা। কার্ল, আরনেসহ সবাই নাচছিল। অভিও নাচতে পছন্দ করত। হঠাৎ দেখে কার্লের সাথে স্থানীয় এক ছেলের ধাক্কাধাক্কি। অভি দৌড়ে গেল কার্লের হয়ে হয়ে কথা বলতে। আসলে একসাথে থাকতে থাকতে কালেক্টিভ মনভাব গড়ে ওঠে। যে অভি বরাবরই ছিল খুবই আত্মকেন্দ্রিক, নিজেকে নিয়ে, নিজের সাথে সময় কাটাতে অভ্যস্ত নিজেকে এভাবে কে ঠিক কে ভুল সেটা না জেনে কার্লের পাশে দাঁড়াতে দেখে নিজেই অবাক হল। তারপর এল শেষ বিকেল। কোন কাজকর্ম নেই। পাড়ার ছেলেমেয়েরা সবাই এসেছে ক্যাম্পে। আজ ওদের উঠানে ডিস্কোটেকা। এই ছয় সপ্তাহে কত জনের সাথে কত জনের যে বন্ধুত্ব হয়েছে তার হিসেব কে রাখে? মনে হল সারা গ্রামের লোক এসেছে ওদের বিদায় দিতে। এটা শুধু স্থানীয়দের কাছ থেকেই বিদায় নেওয়া নয়, নিজদের কাছ থেকেও। ওরা জানত, মস্কো ফেরার পর খুব কম লোকের সাথেই আবার দেখা হবে। চল্লিশ দিন একসাথে থাকা, খাওয়া, কাজ করার মধ্য দিয়ে যে এক ধরনের কমরেড সুলভ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তার অবসানও এখানে।
পরের দিন ভোরে ওদের নিয়ে বাস ছুটল ৎসেলিনাগ্রাদের দিকে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে স্থানীয় লোকেরা হাত নেড়ে ওদের বিদায় জানাল। স্থানীয়দের জন্য এটাও ছিল এক ধরনের অভিজ্ঞতা। বিদেশীরা তো আর সব সময় এখানে আসে না! দেখতে দেখতে গ্রাম চোখের আড়ালে চলে গেল। একের পর এক গ্রাম পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ওরা পৌঁছুল এয়ারপোর্টে। বলে রাখা ভালো, এখানে গ্রামগুলো বাংলাদেশের গ্রামের মত নয়, সব মিলিয়ে ছোটখাটো এক শহর যেন। তাছাড়া বাংলাদেশে যেমন একগ্রাম শেষ না হতেই আরেক গ্রাম শুরু হয়, এখানে মাইলের পর মাইল পেরুতে হয় কোন নতুন গ্রামের দেখা পেতে। প্লেনের অনেক দেরি। ছোট্ট এয়ারপোর্টে চা, কফি খেয়ে অভিদের সময় কাটল। শেষ পর্যন্ত প্লেনের দেখা মিলল। সবাই প্লেনে উঠে যাত্রা করল মস্কোর উদ্দেশ্যে। প্রায় এক বছর পরে আবার আকাশ পথে মস্কো এল অভি। ওদের কাজ শেষ, তবে বেতন পায়নি এখনও, এমন কি কে কত পাবে সেটাও জানে না। বলা হল কয়েকদিনের মধ্যেই বেতন পৌঁছে দেবে। ভনুকভা এয়ারপোর্ট থেকে ইউনিভার্সিটির বাসে ওরা ক্যাম্পাসে ফিরল। ক্যাম্পাস ফাঁকা, মানে বন্ধুদের প্রায় সবাই বাইরে – কেউ দেশে গেছে, কেউ রেস্টে, কেউবা ইউরোপে। টাকা পয়সা নেই বললেই চলে। অভির হোস্টেল তখন অনেক দূরে পাভ্লভস্কায়া হলেও ও উঠলো সাত নম্বর ব্লকে বন্ধু ঝুনুর ২৬৩ নম্বর ঘরে। দুপুর ঘুম থেকে উঠে গেল পাশের ব্লকে, হামিদ ভাইয়ের ওখানে। কিভাবে যেন জেনেছিল হামিদ ভাই আছেন। উনি সবে মাত্র ২৫ কোপেকের একটা বিশাল রুটি নিয়ে ঘরে ফিরেছেন। অভি কিভাবে যে বাটার দিয়ে সেই রুটিটা শেষ করে ফেলল নিজেও বুঝতে পারল না। ও জানেনা হামিদ ভাই মাইন্ড করেছিলেন নাকি অভিকে পরম তৃপ্তি সহকারে রুটি খেতে দেখে নিজেও আনন্দ পেয়েছিলেন।
যতই দিন যেতে লাগলো, অভি এই গ্রামকে ততই ভালবাসতে শুরু করল। একদিকে মস্কো ফেরার আকুতি, অন্য দিকে এই গ্রামের টান। অভির সারা জীবন কেটেছে বাংলার গ্রামে। একটি দুটো নয়, উনিশ উনিশটি বছর। তারপর সব ছেড়ে মস্কো আসা। মস্কোয় গাছপালার অভাব না থাকলেও গ্রামের সেই শান্ত পরিবেশ ছিল না। তাই এক বছর পরে কাজাখস্তানের গ্রামে এসে অভি যেন নতুন করে ফেলে আসা দিন ফিরে পেল। শেষের দিকে কাজ ছিল মূলত গ্রামের মধ্যেই, দূরে কোথাও যেতে হত না। মনে পড়ল দেশে শেষ দিনগুলোর কথা। প্রতিটি দিনই শেষ দিন, প্রতিটি দিনই নিজের গ্রামকে নতুন করে উপভোগ করত অভি। এখানেও তাই। কাজ করা, সময় পেলে স্থানীয় লোকদের সাথে কথা বলা। অভির মনে পড়ল গ্রামের যাত্রার দলের কথা। ওদের গ্রামে দুটো যাত্রার দল ছিল, একটা ছিল নিজেদের বাড়িতেই ওর বড়দার। বিভিন্ন জায়গা থেকে অভিনেতা অভিনেত্রীরা আসত এসব দলে। অনেকদিন চলত রিহার্সাল। এরই মধ্যে অনেকের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে যেত। ওরা যখন গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে, অভির মনে হত বন্ধুরা বিদায় নিচ্ছে। এখানেও সেই অবস্থা। শেষ শনিবার। সবাই মিলে ক্লাবে গেল ওরা। কার্ল, আরনেসহ সবাই নাচছিল। অভিও নাচতে পছন্দ করত। হঠাৎ দেখে কার্লের সাথে স্থানীয় এক ছেলের ধাক্কাধাক্কি। অভি দৌড়ে গেল কার্লের হয়ে হয়ে কথা বলতে। আসলে একসাথে থাকতে থাকতে কালেক্টিভ মনভাব গড়ে ওঠে। যে অভি বরাবরই ছিল খুবই আত্মকেন্দ্রিক, নিজেকে নিয়ে, নিজের সাথে সময় কাটাতে অভ্যস্ত নিজেকে এভাবে কে ঠিক কে ভুল সেটা না জেনে কার্লের পাশে দাঁড়াতে দেখে নিজেই অবাক হল। তারপর এল শেষ বিকেল। কোন কাজকর্ম নেই। পাড়ার ছেলেমেয়েরা সবাই এসেছে ক্যাম্পে। আজ ওদের উঠানে ডিস্কোটেকা। এই ছয় সপ্তাহে কত জনের সাথে কত জনের যে বন্ধুত্ব হয়েছে তার হিসেব কে রাখে? মনে হল সারা গ্রামের লোক এসেছে ওদের বিদায় দিতে। এটা শুধু স্থানীয়দের কাছ থেকেই বিদায় নেওয়া নয়, নিজদের কাছ থেকেও। ওরা জানত, মস্কো ফেরার পর খুব কম লোকের সাথেই আবার দেখা হবে। চল্লিশ দিন একসাথে থাকা, খাওয়া, কাজ করার মধ্য দিয়ে যে এক ধরনের কমরেড সুলভ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তার অবসানও এখানে।
পরের দিন ভোরে ওদের নিয়ে বাস ছুটল ৎসেলিনাগ্রাদের দিকে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে স্থানীয় লোকেরা হাত নেড়ে ওদের বিদায় জানাল। স্থানীয়দের জন্য এটাও ছিল এক ধরনের অভিজ্ঞতা। বিদেশীরা তো আর সব সময় এখানে আসে না! দেখতে দেখতে গ্রাম চোখের আড়ালে চলে গেল। একের পর এক গ্রাম পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ওরা পৌঁছুল এয়ারপোর্টে। বলে রাখা ভালো, এখানে গ্রামগুলো বাংলাদেশের গ্রামের মত নয়, সব মিলিয়ে ছোটখাটো এক শহর যেন। তাছাড়া বাংলাদেশে যেমন একগ্রাম শেষ না হতেই আরেক গ্রাম শুরু হয়, এখানে মাইলের পর মাইল পেরুতে হয় কোন নতুন গ্রামের দেখা পেতে। প্লেনের অনেক দেরি। ছোট্ট এয়ারপোর্টে চা, কফি খেয়ে অভিদের সময় কাটল। শেষ পর্যন্ত প্লেনের দেখা মিলল। সবাই প্লেনে উঠে যাত্রা করল মস্কোর উদ্দেশ্যে। প্রায় এক বছর পরে আবার আকাশ পথে মস্কো এল অভি। ওদের কাজ শেষ, তবে বেতন পায়নি এখনও, এমন কি কে কত পাবে সেটাও জানে না। বলা হল কয়েকদিনের মধ্যেই বেতন পৌঁছে দেবে। ভনুকভা এয়ারপোর্ট থেকে ইউনিভার্সিটির বাসে ওরা ক্যাম্পাসে ফিরল। ক্যাম্পাস ফাঁকা, মানে বন্ধুদের প্রায় সবাই বাইরে – কেউ দেশে গেছে, কেউ রেস্টে, কেউবা ইউরোপে। টাকা পয়সা নেই বললেই চলে। অভির হোস্টেল তখন অনেক দূরে পাভ্লভস্কায়া হলেও ও উঠলো সাত নম্বর ব্লকে বন্ধু ঝুনুর ২৬৩ নম্বর ঘরে। দুপুর ঘুম থেকে উঠে গেল পাশের ব্লকে, হামিদ ভাইয়ের ওখানে। কিভাবে যেন জেনেছিল হামিদ ভাই আছেন। উনি সবে মাত্র ২৫ কোপেকের একটা বিশাল রুটি নিয়ে ঘরে ফিরেছেন। অভি কিভাবে যে বাটার দিয়ে সেই রুটিটা শেষ করে ফেলল নিজেও বুঝতে পারল না। ও জানেনা হামিদ ভাই মাইন্ড করেছিলেন নাকি অভিকে পরম তৃপ্তি সহকারে রুটি খেতে দেখে নিজেও আনন্দ পেয়েছিলেন।
দুবনা, ২২ জানুয়ারি ২০২০


কী চমৎকার লেখা, বিজনদা! লেখা চলুক, একটা বই হোক। অপূর্ব হবে কিন্তু।
ReplyDelete-রমা
রমা, বই হোক আর নাই হোক, লেখা চলবে, ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক সে আসবে!
ReplyDelete