ছবির মানুষ
মস্কোর শরত। শীতকে যদি একটা বিশাল অজগরের
সাথে তুলনা করা যায়, তবে তার মাথা ইতিমধ্যে এদিক সেদিক থেকে উঁকি দিচ্ছে, যদিও লেজ
রয়ে গেছে সুদূর সাইবেরিয়ায়। হলুদ লাল আর সোনালী রঙের হোলি খেলায় মেতে ওঠা গাছগুলো একটু একটু করে বিবস্ত্রা হতে
শুরু করেছে। মানুষেরাও শরতের শেষ দিনগুলোকে উপভোগ করার জন্য সময় পেলেই ঝাপিয়ে পড়ছে প্রকৃতির কোলে।
বিংশ শতাব্দীর আশির দশকের
মাঝামাঝি কোন এক সময়। পেরেস্ত্রোইকার দমকা হাওয়া তখনও সমাজতন্ত্রের আদর্শের ঘরবাড়িতে লাগেনি। চারিদিক শান্ত। এমন কি ঈশান
কোণে মেঘের আভাষ পর্যন্ত নেই। এমনি এক বিকেলে অভি হাঁটছিল নভদেভিচি গির্জার লেকের
পাশের পার্কে। সাথে দেশ থেকে সদ্য আসা এক শিশু। শিশু এজন্যেই যে, যদিও এদেশে ছাত্রছাত্রী আসতো কলেজের পাঠ চুকিয়ে ১৮-১৯
বছর বয়েসে, তবুও এখানকার পরিবেশ পরিস্থিতি এতো ভিন্ন ছিল যে তাদের হাঁটা বাদে সব কিছুই নতুন করে শিখতে শুরু করতে হত। কী কথা বলা, কী
আচার আচরন, কী জীবন যাপন। ও এসেছে মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে। তারপর থেকেই ওর সাথে অভির কেমন একটা ভাব হয়ে গেছে। আগে যেখানে অভি
ক্লাসের পর আড্ডা দিত বন্ধুদের সাথে, চায়ের কাপে বিপ্লব করত বা পরনিন্দা-পরচর্চার ডোবায়
সাঁতার কেটে সময় হত্যা করত, সেসব বাদ দিয়ে এখন সে আসে নতুন এই বন্ধুর কাছে। ঘুরতে যায় এদিক সেদিক। কখনো মস্কো
স্টেটের আপেল বাগানে, কখনো বা একটু দূরে মস্কো নদীর এপাশ ওপাশ। হাঁটে আর কত
জন্মের জমে থাকা কথা বলে। শোনে বন্ধুর কথা।
মানুষের কথা বলার বিষয়গুলো খুব
উদ্ভট। সাধারণত তারা
অন্যকে নিয়ে কথা বলে। তবে সে জন্যে দরকার কমন পরিচিত মানুষ, কমন মেমোরি। বলতে পারে কোন আদর্শের কথা, আবার
একই দলের লোক হলে বলতে পারে দলের ভবিষ্যৎ কাজকর্মের কথা। কিন্তু
ওদের না ছিল কমন কোন বন্ধু, না ছিল কমন মেমোরি। রাজনৈতিক কথাবার্তায় অভি এতো
ফেডআপ যে সেটা নিয়ে বলতেও পছন্দ করত না। তাই ওরা বলত বইয়ের কথা, গানের কথা, বিশেষ করে রবীন্দ্র
সঙ্গীতের কথা। ও গান গাইত মানে শিল্পী, অভি শুধুই শ্রোতা। বই পড়তেও দুজনাই খুব ভালবাসত। তাই বই নিয়েও কথা হত অনেক।
কে জানে শরতের লেকের সেই সুন্দর
পরিবেশ নাকি অন্য কিছুর প্রভাবে আজ গল্প গেল অন্য পথে। অভি বরাবরই শুনতে পছন্দ করে। বলে না যে তা
নয়, বলে তবে যদি কোন ব্যাপারে এক মত না হয় হয়। এমনিতে সাধারণত হ্যাঁ, আচ্ছা এসবের
মধ্যে দিয়েই ও কাজ সেরে ফেলে। আজ কি এক নস্টালজিয়ায় পেয়ে বসেছিল ওর বন্ধুকে। বলছিল দেশের
কথা, দেশের বন্ধুদের কথা। অপরিচিত কত নাম। কিন্তু এমনভাবে বলছিল অভির মনে হচ্ছিল ওরা যেন তারও চিরপরিচিত। আর বলতে বলতে একটা ছবি বের করে
দেখিয়েছিল। এক পলকের জন্য। ছবি যে এতো ছোট হতে পারে অভির সেটা জানা ছিল না। ওর জানা ছিল না
যে কেউ মানিব্যাগে কারো ছবি নিয়ে ঘুরতে পারে। এক কথায় অভি ছিল গেঁয়ো ভূত। কিন্তু কী এক
অলৌকিক কাণ্ড। এদিনের পর থেকে ওরা যখনই বিকেলে ঘুরতে যেত ছবির সেই মানুষটাও যেন ওদের
পাশে পাশে ঘুরত ছায়ার মত। অভি অবশ্য সেটা কখনই বুঝতে দিত না। সাহস করে ছবিটা
আবার দেখতেও চায়নি কোন দিন, তবে ছবির মানুষটাকে নিয়ে কথা উঠলেই কান পেতে শুনত। অভির ধারণা ছবিটা খুব ছোট ছিল বলেই নিঃশ্বাসের সাথে মনের একেবারে ভেতরে ঢুকে
পড়েছিল আর সেই মানুষটাকে কোনদিন না দেখলেও শুধু
ওই ছবি আর দু মিনিটের গল্পেই সে তার চির চেনা হয়ে থাকতো।
মানুষের স্মৃতিই এমন, কিছু ঘটনা দিন
তারিখ সহ মনে থাকে, কিছু শুধু ঘটনাই মনে থাকে, স্থান কাল সব জীবনের ঘটনা প্রবাহের
সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। প্রায় তিরিশ বছর
পরে এখন অনেক স্মৃতি উজ্জ্বল থাকলেও ক্যানভাসটা কেমন যেন ঝলসে গেছে। সেই ধুসর ক্যানভাসে স্মৃতিগুলো
উজ্জ্বল আলোর মত জ্বল জ্বল করছে। হঠাৎ জানা গেল আমাদের সেই তিনির বাবা আসবেন মস্কো বেড়াতে। সেই উপলক্ষ্যে তিনিও আসছেন
মস্কো ভ্রমনে। সেসব দিনে মস্কো কেউ বেড়াতে এলে হৈচৈ
পড়ে যেত। ছাত্র আর পার্টি নেতারা বাদে তেমন কেউ আসতেন না, তাই এর বাইরের কেউ এলে সবাই
আরও বেশি আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করত। বিশেষ করে সেই কেউ যদি আমাদেরই কোন ছাত্রছাত্রীর
আত্মীয়-স্বজন হন।
সময়টা ঠিক মনে নেই অভির। তবে লোকে বলে ছিল শীত কাল। সূর্য অস্ত গেছে ভর দুপুরে। চাঁদনী রাতের মৃদু আলোয় দশ নম্বর ব্লকের সামনে যে বাসস্টপ সেখানে একদল বাংলাদেশিকে নিয়ে বাস থামল। বিশাল সেই ভিড় ছাপিয়ে অভির চোখের সামনে ভেসে উঠলো ঠিক যেন সেই ছবিটাই। সেখানে এক মুখ হাসি যা কিনা চাঁদের আলোকেও হার মানায়। সেই থেকে ওই হাসিটাও অভির হয়ে গেল।
দুবনা, ২১ ডিসেম্বর ২০১৯


Comments
Post a Comment