শেষ থেকে শুরু
আমি অভি। আমার অবশ্য একটা পোশাকি নাম আছে, আর সে নামটাও আমার প্রচণ্ড পছন্দ, তবে অভি নামটাও আমার ভালো লাগার নামগুলোর একটা। তাই এ নামেই লিখছি।
ঐ যে বলছিলাম না পোশাকি নাম! মা বলেছিল, আমার জন্মের সময় দেশে খুব সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছিল, বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল সবাই। নির্জন, জনহীন চারিদিক। তাই আমার নাম রাখা হয় বিজন। নামটা আমার শুধু যে পছন্দের তাই নয়, ওটা আমার স্বত্বার বহিঃপ্রকাশ। আমি যে মানুষ বা মানুষের সঙ্গ পছন্দ করি না, তা নয়। তবে একা থাকতে, নিজের সাথে সময় কাটাতে আমার সবচেয়ে বেশী ভালো লাগে। দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতে পারি একা একা। দিনে কয়েক ঘণ্টা নিজের সাথে দেখা না হলে, নিজের সাথে কথা না বললে আমার পেটের ভাত হজম হয় না, চোখে ঘুম আসে না। তার পরেও ভাবছি অভি নামেই লিখবো।
এই অভি কিন্তু রবি ঠাকুরের রবিবারের অভয়াচরন বা অভীক কুমার থেকে নয়। আমার অভি মহাভারতের অভিমন্যু থেকে। মহাভারত আমার প্রিয় গ্রন্থের একটি। মাইকেল মধুসূদন যেমন রামায়ণে মেঘনাদকেই বেশী পছন্দ করতেন, আমিও ঠিক তেমনি ভাবে মহাভারতে অভিমন্যুকেই বেশী পছন্দ করি। ওখানে দু’জন বীর ছিল – ভীমের পুত্র ঘটোৎকচ আর অর্জুন তনয় অভিমন্যু। তাদের সম্বন্ধে খুব বেশী কিছু লেখা নেই সেখানে – মাত্র দু’দিনের যুদ্ধে তারা শুধু নিজেদের প্রতিষ্ঠাই করে নি, বলতে গেলে পালটে দিয়েছে যুদ্ধের গতি। এই ঘটোৎকচকে মারতে গিয়েই কর্ণ ব্যবহার করে ইন্দ্রদত্ত মহাস্ত্র যা সে অর্জুনকে বধ করবে বলে রেখেছিল। আর সপ্তরথী মিলে অভিমন্যুকে অন্যায় যুদ্ধে হত্যা করে এরা ক্ষত্রিয়ের যোদ্ধা হবার অহঙ্কার হারিয়ে ফেলেছিল।
মহাভারতে আছে, অর্জুন যখন নারায়ণী সৈন্যদের সাথে লড়াইয়ে মত্ত, তখন দ্রোণাচার্য চক্রব্যুহ নামে এক কৌশল প্রয়োগ করে পাণ্ডব সেনাদের সংহার করতে থাকে। অর্জুন ব্যতীত কেউই সেই ব্যুহে প্রবেশ করার উপায় জানত না। সেই সময় অভিমন্যু বলে, সে যখন মাতৃগর্ভে, তার পিতা অর্জুন তার মাকে কিভাবে চক্রব্যুহে প্রবেশ করতে হয় সেই গল্প শুনিয়েছিল। কিন্তু এক সময় তার মা ঘুমিয়ে গেলে ব্যুহ থেকে বেরুনোর কৌশল তার আর শেখা হয় নি। যুধিষ্ঠির একটু ইতস্তত করতে শুরু করলে এগিয়ে আসে ভীমসেন, বলে অভিমন্যু আগে প্রবেশ করুক, তারপর সে গদা যুদ্ধে অন্যদের হারিয়ে চক্র থেকে বের করে আনবে অভিকে। সেটা আর করা হয় নি। অভিমন্যু বীরবিক্রমে একের পর এক কৌরব মহারথীদের পরাস্ত করতে থাকে। উপায় না দেখে যুদ্ধের সব নীতি নিয়ম বিসর্জন দিয়ে দ্রোণ, কর্ণ প্রভৃতি সপ্ত রথী এক সাথে আক্রমন করে নির্মম ভাবে হত্যা করে অভিমন্যুকে।
মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় যে কিছু শেখা যায়, সেটা আমার কাছে বরাবরই ছিল কৌতূহলের বিষয়। বিজ্ঞান বলে অনাগত শিশু অনেক কিছুই মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময়েই শিখতে পারে। তবে যে কারনে অভি আমার প্রিয়, সেটা তার শেষ পরিনতি। এটা যেন আমাদের সবারই কথা, সবারই পরিনতি। প্রতিটি মানুষই পৃথিবীতে যখন আসে, সে পায় এক অপরিচিত বৈরী পরিবেশ। এই প্রকৃতির সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করে তাকে বাঁচতে হয়, বড় হতে হয়, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। কিন্তু শত সাফল্য, শত ভালো কাজ, শৌর্য-বীর্য, ধন-দৌলত কিছুই তাকে অমর করে না। দু’দিন আগে হোক আর দু’দিন পরে হোক – অভির মতই তাকে বিদায় নিতে হয় পৃথিবী থেকে, বিদায় নিতে হয় অন্যায় যুদ্ধে হেরে। কেননা এই যুদ্ধে শুধু একটাই অপশন। এ জন্যেই হয়তো রাশিয়ায় বলে “জীবন – এটা খুবই ক্ষতিকর এক রোগ, যা যৌন পথে সংক্রামিত হয় আর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যায়।“
মানুষের জীবনে অন্যতম দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে জন্ম আর মৃত্যু। কিন্তু ব্যক্তি মানুষ এ দুটো ঘটনা সম্পর্কে নিজে কিছু জানে না। জন্মের গল্প যদিও পরে লোক মুখে শোনে, কিন্তু সেটা উপলদ্ধি করা হয়না কখনোই। মৃত্যুও তাই। এমনকি সেটা উপলদ্ধি করলেও এই অভিজ্ঞতার গল্প করার মানুষ সে পায়না। আমিও আমার জন্ম সম্পর্কে কিছুই বলতে পারব না, বলতে পারব না জীবনের প্রথম কয়েক বছর সম্পর্কে, মানে শোনা কথা ছাড়া। তাই আমার গল্পও শুরু হবে ঠিক সেই দিনগুলো থেকে যার স্মৃতি এখনো আমার মনে আছে, যাকে আমি নিজে দেখেছি, অনুভব করেছি। তবে সে গল্প আজ নয়, কিছুদিন পরে, একটু বড় হলে। দুবনা, ১৮ এপ্রিল ২০১৭


বিজন দারুন লিখেছিস।
ReplyDeleteজানিনা, কতটা দারুন, তবে নিজের কথা, জীবনের কথা - ফিরে দেখা, কিছুটা হারানো, কিছুটা ফিরে পাওয়া - এটাই তো জীবন। সোভিয়েত ইউনিয়নের মত বড় একটা দেশ হারালে আমাদের গায়ে লাগে, কিন্তু এই যে প্রতি মুহূর্তে আমাদের বর্তমানগুলো হারিয়ে যাচ্ছে অতীতের গহ্বরে - সেটা প্রায়ই খেয়াল করি না।
Delete